লেখা

আনিসুজ্জামানের লিগেসির সন্ধানে ২ঃ গেরুয়া বুদ্ধিজীবিতা ও বাংলা ভাষা
আনিসুজ্জামানের লিগেসির সন্ধানে ২ঃ গেরুয়া বুদ্ধিজীবিতা ও বাংলা ভাষা
২৮ মে ২০২০

 

মুসলমানিত্ব থাকলে আর বাঙালি থাকা যায়না বরং অচ্ছুৎ হয়ে যেতে হয় তা আমরা কম বেশি জানি। উদাহরণ হিসেবে তাই আমরা দেখি কেন শরৎচন্দ্রের কাছে মুসলমান আর হিন্দুর মধ্যেকার খেলা মুসলমান আর বাঙালির খেলা হিসেবে চিহ্নিত হয় ।

কিন্তু মুসলমানিত্বের চিহ্ন থাকলে বাংলা ভাষা আর বাংলা ভাষা না থেকে একটা অচ্ছুৎ মিশ্র ভাষায় পরিণত হয় তা আমরা সবাই জানি কিনা? আনিসুজ্জামান তার 'বাঙালি মুসলিম মানস এবং বাংলা সাহিত্য' নামক 'ম্যাগনাম ওপাসে' দেখিয়েছেন অষ্টাদশ শতাব্দীর মুসলিম লেখকদের বাংলায় অনেক বেশি আরবী- ফারসি শব্দের ব্যবহার। তাই তার মতে সেটাকে আর বাংলা ভাষা বলা যায়না। আরবী-ফারসি শব্দের বদৌলতে বাংলা ভাষা তাই জবন-মুসলমানের মত জাত বিহিন হয়ে পড়ে। তাই সে ভাষাকে বাংলা না বলে তিনি এটাকে মিশ্র ভাষা হিসেবে অভিহিত করেছেন।

Image may contain: text

Image may contain: text

অবশ্য এতে অবাক হওয়ার কিছু নাই। বাংলা ভাষা সুলতানী আমলের আগে অচ্ছুৎদের ভাষাই ছিল। তখনকার উচ্চ বর্ণের ব্রাহ্মণ শাসিত এ অঞ্চলে বাংলা ভাষা অচ্ছুৎ নিম্ন বর্ণের নম-শুদ্রদের ভাষা হিসেবেই পরিচিত ছিল। তাই তখন বাংলা ভাষায় হিন্দু ধর্মের চর্চা যেমন নিষিদ্ধ ছিল তেমনি বাংলা ভাষার প্রচার ছিল শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সংস্কৃত ভাষাই ছিল তাদের কাছে একমাত্র গ্রহণযোগ্য ভাষা। বাঙ্গালায় মুসলিম সালতানাত প্রতিষ্ঠার পর বাংলা ভাষা অচ্ছুৎদের ভাষা থেকে রাজ সভায় স্থান পায়।

অবশ্য ইংরেজ আমলে হিন্দুত্ববাদিরা আগের ভুল আর করেননি। তারা এবার সংস্কৃত ভাষার প্রচারের বদলে বাংলাকেই সংস্কৃতায়ন করেন। আর সংস্কৃতায়িত বাংলা ভাষাকে একমাত্র বাংলা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। আর মুসলমানিত্বের চিহ্ন বহন করা আরবী- ফারসি যুক্ত বাংলা হয়ে ওঠে অচ্ছুৎ।

ইতিহাসের এই জিনিওলজি ধরে আলাপ করা ছাড়া আনিসুজ্জামানদের আদৌ বোঝা সম্ভব নয়। এ আলাপ ছাড়া আনিসুজ্জমানরা কেন আরবী- ফারসির মধ্যে আগ্রাসন খুঁজে পান আর ঔপনিবেশিক প্রকল্পের আওতায় বাংলার সংস্কৃতায়নের মধ্যে স্বাধীনতার গন্ধ পান তা ধরা যাবেনা। এই ঐতিহাসিক বোঝা-পড়ার মধ্য দিয়ে আপনি অনায়াসে ধরতে পারবেন- আনিসুজ্জমানদের বাঙালি জাতিয়তাবাদি প্রকল্প উপমহাদেশের হিন্দুত্ববাদি প্রকল্পেরই অংশ বিশেষ বৈ কিছুই নয়। শাহবাগ কেন ইস্লামোফোবিক আর নীতি শাস্ত্রের পরীক্ষা দেবার বদলে তারা কেবল বাংলা পরীক্ষা দিতে চায়, কিংবা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কেন বারবার ইসলামকে ভিলিফাই করতে ব্যবহার হয় তার ঐতিহাসিক পরম্পরা এভাবেই আপনি আবিস্কারে সক্ষম হবেন।