লেখা

ইকুইটি না ইকুয়্যালিটিঃ ইসলাম বনাম ফেমিনিজম
ইকুইটি না ইকুয়্যালিটিঃ ইসলাম বনাম ফেমিনিজম
লিখেছেন মাহমুদ নাঈম
২৮ মার্চ ২০১৬

   নারী অধিকার সংক্রান্ত আলোচনায় ইসলামের অবস্থান খুব ভালনারেবল হিসেবে দেখা হয় পশ্চিমা ফিলোসফিতে। যদিও ইসলাম একজন নারীকে মানুষ হিসেবে যথার্থ মূল্যায়নসহ সর্বোচ্চ অধিকার এবং মর্যাদা দিয়েছে। তবে এই অভিযোগটা সম্পূর্ণ মিথ্যা হলেও বাহ্যিকভাবে অস্বীকার করার তেমন সুযোগ নেই। এর পেছনের কারণ অবশ্য মুসলিমদের প্র্যাকটিসের উপরেই বর্তায়, যেখানে এখন পর্যন্ত নারীদের ক্ষমতায়ন (অধিকার এবং মর্যাদার দৃষ্টিতে) কোথায়ও তেমন দেখা যায়না। ইসলাম নারীর স্বাধীনতা, মর্যাদা ও অধিকার যা দিয়েছে তা অধিকাংশ মুসলিম সোসাইটি, পরিবার কিংবা ব্যক্তিগত পরিমন্ডলে মানা হয়না।

   এখানে নারীর ক্ষমতায়ন শব্দটা ব্যাখার দাবি রাখে, ইসলামের যার সুনির্দিষ্ট সীমারেখা আছে। রাসুল এবং সাহাবীদের যুগে জ্ঞানচর্চা, দা’ওয়াহ, অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে শুরু করে যুদ্ধের ময়দানে পর্যন্ত মহিলা সাহাবীদের অনন্য ভূমিকা ছিলো। এমনকি খিলাফতের সময় কখনো কখনো মজলিশে শুরা, ফতোয়া বোর্ডে মহিলা স্কলারদের দেখা গিয়েছিলো। কিন্তু পরবর্তী যুগে এসে তেমন একটা দেখা যায়নি, এমনকি জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রেও নাহ। ক্রুসেডের সময়কালে জ্ঞানচর্চা ও ইসলামে তাঁদের প্রত্যক্ষ অবদানের ধারা থমকে যেতে শুরু করে। কেউ কেউ ব্যাখ্যা দিয়েছেন এভাবে যে, ক্রুসেডের সময় মহিলাদের দ্বারা ছড়িয়ে পড়া ফিতনার কারনেই তৎকালীন স্কলাররা মহিলাদের প্রতি অনমনীয় মনোভাব পোষণ করেছিলেন, যা তাদেরকে আড়ালে চলে যেতে বাধ্য করে।

   তবে আসলেই কি পরবর্তী যুগে মুসলিম মহিলাগণ পর্দার আড়ালে ছিলেন নাকি তাঁদের কথা আমরা জানিনা! এই প্রশ্নটা ওঠছে, সম্প্রতি প্রকাশিত আকরাম নদভীর ‘Al-Muhaddithat: The Women Scholars in Islam’ বইটার কারণে। ৪০ খন্ডের এ বইটাতে উনি ৮০০০ মহিলা মুসলিম স্কলারদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন, যাদের কথা আমরা কোনদিনই জানতাম নাহ। এমনকি লেখক নিজেও এ বিষয়ে কাজ শুরু করার পূর্বে ৩০-৪০ জন মহিলা স্কলার খুঁজে পাবার কথা চিন্তা করেছিলেন। এত বৃহৎ সংখ্যক নারীদের কথা আমরা জানিনা, তাঁদের কোন বই বা ফতোয়া আমরা দেখিনা এর কারণ হিসেবে এটা বলা খুব অযৌক্তিক হবেনা যে, ইসলাম নয় বরং মুসলিম পুরুষরা আসলেই নারীদের উপর ডমিনেটিং ছিলো সবসময়। এর ফলেই তারা পর্দার আড়ালেই থেকে গেছে সবসময়।

 

   সাধারণ মানুষ একটা দল বা ধর্মের মূলনীতি পড়ার বদলে সেই দল তার অনুসারীদের প্র্যাকটিস দেখেই ধর্ম বা দলটাকে বিচার করে। সুতরাং ইসলামের বহিরাগত লোকদের জন্য নারীদের ব্যাপারে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি সংক্রান্ত এই ধারনা পোষণ করার দায়টা মুসলিমদেরই অনেকাংশে, যদিও অধিকাংশ মুসলিমেরই এতে কোন মাথাব্যাথা নেই- বরং তারা সেটা উপভোগই করে। আর বাকি দায়টা পলিটিসাইজেশন অব নলেজকে দেয়া যেতে পারে।

 

   নারী ও পুরুষের অধিকারের ভিত্তিটা কি, সাম্যতা (Equality) নাকি ন্যায্যতা (Equity), সেটা নিয়েই সাধারন মুসলিমদের ভেতর স্পষ্ট ধারণা নেই। যেখানে অধিকাংশ মুসলিম স্কলারগণও সাধারণত এই বিষয়ের সুক্ষ্ম পার্থক্য এবং ইসলামের বিধানটা ক্লিয়ার করতে মনোযোগী নন। যার ফলে অধিকাংশ মুসলিমই ফেমিনিজম-এর ‘সাম্যতা’কেই ইসলামের বিধান হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন। আর এই সাম্যতার কথা বলতে গেলেই কিছু প্রশ্ন ওঠে আসে যা ইসলামের প্র্যাকটিসের সাথেই সাংঘর্ষিক। ফলে নন-মুসলিমরা ইসলামের নারী-পুরুষের সমতার বিষয়টিকে সহজেই খারিজ করে দেয়।

          নারী-পুরুষের সমতার সাথে সাংঘর্ষিক এবং একই সাথে সবচেয়ে মূখ্য যে অভিযোগটা ইসলামের প্রতি সেটা হচ্ছে, পলিগ্যামি। এই ব্যাপারটা শুধুমাত্র অমুসলিমদের-ই মাথাব্যাথা না, বরং সেমি-ওয়েস্টার্ন কালচারে বড় হওয়া অনেক মুসলিমকেও এটা কনফিউজড করে দেয়। তাদের সবচেয়ে বড় পয়েন্ট হচ্ছে, ইসলাম পলিগ্যামির বিধান রাখলেও পলিয়্যান্ড্রি (মহিলাদের বহুগামীতা)-র বিধান নেই কেন?

         আসলে শিল্পবিপ্লবের পরে ক্যাপিটালিজমের বিপরীতে ‘সাম্যবাদ’ টার্মটা ছিলো আধুনিকতাবাদের হাত ধরে গড়ে ওঠা  টার্মগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ফ্রড এবং আনএপ্লিকেবল। চিন্তাশক্তিসম্পন্ন একটা মানব সোসাইটিতে এটা আসলে কাজ করতে পারেনা। শুনতে যতই মধুর শোনাক, এপ্লাই করার পর এটার তিক্ত রুপটা বেড়িয়ে এসেছে সবসময়। এই সাম্যবাদ তাই কোথাও টিকে থাকেনি। একজন পরিশ্রমী, জ্ঞানী মানুষ এবং একজন অলস, মুর্খ মানুষ কোনদিনই সমান হতে পারেনা। উভয়েরই মানবিক কিছু কমন অধিকার থাকতে পারে, তবে প্রত্যেকেই একই লাইফ ডিজার্ভ করেনা। সুতরাং ইসলামও কখনো সাম্যবাদের কথা বলেনি, বরং ন্যায্যতার কথা বলেছে।

   শুধুমাত্র নারী-পুরুষের অধিকারের বেলায়-ই নয়, বরং ইসলাম প্রায় বিধানের ক্ষেত্রেই Equality এর পরিবর্তে Equity এর কথা বলেছে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে কম্যুনিজমের সাম্যবাদের মধুর প্রস্তাবনার বিপরীতে ইসলাম অনেক উন্নত যৌক্তিক অর্থনৈতিক ন্যায্যতার কথা বলেছে। প্রত্যেকেই তার মেধা, পরিশ্রম অনুযায়ী সম্পদের মালিক হতে পারে। কিন্তু আবার এই অর্থনৈতিক উঁচু-নিচু ভেদাভেদ দূর করার জন্য মানবিক সাম্যের মাধ্যমে ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ধনীদের জন্য গরিবদের প্রতি যাকাতের বিধান রেখেছে। চাকরের প্রতি মালিকের দায়িত্ব নির্ধারণ করে দিয়েছে।

 

   Equality আর Equity এর মধ্যে পার্থ্যক্যটা আসলে Worth/Value তে নয়, পার্থ্যক্যটা হলো এপ্লিকেশনে। ইকুয়্যালিটি-তে ভ্যালু থেকে শুরু করে এপ্লিকেশন, পরিমাপ সবই এক। তবে ইক্যুইটি-তে ভ্যালুটা এক, তবে প্রয়োজন অনুযায়ী এপ্লিকেশন এবং পরিমাপে ভিন্নতা হয়। একজন নারী এবং পুরুষ বায়োলজিক্যালি ভিন্ন, তাঁদের প্রয়োজনও অবস্থা ভেদে ভিন্ন হয়। ইসলাম সেই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই সমতা নয়, ন্যায্যতা বিধান করেছে নারী পুরুষের মাঝে। কাউকে ক্ষমতা বেশি দিয়েছে, বিপরীতে কাউকে মর্যাদা বেশি দিয়েছে।

   ব্যাপারটা অনেকটা এইরকম- এক কৃষকের মুরগির ফার্ম আছে, আরেকজনের ধানের ক্ষেত আছে। এককেজি চালের দাম ৪০ টাকা, একহালি ডিমের দামও ৪০ টাকা। এখন সরকার ফার্মের মালিককে এককেজি চাল দিলো, আর ধানের জমিওয়ালাকে একহালি ডিম দিলো। যার ফলে ফার্মের মালিকও ভাত-ডিম দিয়ে খেলো, ধানের জমিওয়ালাও ভাত-ডিম দিয়ে খেলো- দুজনেরই পেট ভরলো। কিন্তু দুজনকে দেয়া জিনিস কিন্তু এক ছিলো না, তবে জিনিসের মূল্য সমান ছিলো, এপ্লিকেশন ও পরিমাপ ভিন্ন ছিলো।

   এবার চিন্তা করি, ফার্মের মালিক একজন মহিলা আর ধানের জমিওয়ালা একজন পুরুষ। এবার ফার্মের মালিক ফেমিনিজমের আইডিয়া গ্রহণ করে প্রতিবাদ শুরু করলো, ধানওয়ালা পুরুষ বলে তাকে ৪ টা ডিম দেয়া হবে আর আমি নারী বলে মাত্র ১ কেজি ধান দেয়া হবে, সেটা মানবো না। তাকে যা দেয়া হবে আমাকেও তা দিতে হবে। তাহলে দেখা যাবে পরদিন কারো মুখেই ভাত-ডিম দুইটা একসাথে জুটবে না।

 

   ইসলামের নারীর অধিকারের সাথে ফেমিনিজমের এইখানেই তফাৎ। সো-কল্ড ফেমিনিজম সব ক্ষেত্রেই নারীর সমান অধিকার চায়, কড়ায়-গন্ডায়। অথচ ইসলাম নারী ও পুরুষের মাঝে ন্যয্যতা বিধান করে নারীকে অন্য যেকোন মতবাদের চেয়ে বেশি মর্যাদা ও অধিকার দিয়েছে। ইসলামে নারীকে শিক্ষার অধিকার, মতামত প্রধানের অধিকার থেকে শুরু করে সব ধরনের অধিকার দেয়া হয়েছে।

   হ্যাঁ, ইসলামে পুরুষকে নারীদের উপর ক্ষমতাবান হিসেবে ঘোষণা দেয়া হয়েছে। পুরুষদের তুলনায় নারীদের দুর্বলতার এই ব্যাপারটা বায়োলজিক্যালিও প্রামাণিত। তবে একই সাথে অনেক হাদীসে নারীকে পুরুষের উপর মর্যাদাবান হিসেবে ঘোষণা দেয়া হয়েছে- বাবার উপর মাকে গুরত্ব দেয়া হয়েছে, পুত্র সন্তানের উপর কন্যাসন্তানকে। ইসলামে মেয়েরা বাবার সম্পত্তি কম পায়, কিন্তু সে স্বামী-ছেলের সম্পত্তি থেকেও ভাগ পায়। আবার সংসারের সমস্ত দায়ভার পুরুষের উপর। তবে পাপ-পূণ্য বা বিচারের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের বিধান বা অধিকার আবার এক।

   ইসলামে আসলে ‘নারী অধিকার’ বলে আলাদা কোন টার্ম নেই। মানবিক অধিকার বা মর্যাদাগত দিক থেকে ইসলাম নারী-পুরুষকে আলাদা করেনি কখনো, শুধুমাত্র প্রয়োজন ও বাস্তবতার উপর ভিত্তি করে কিছু নির্দিষ্ট বিষয়ে আলাদা আলাদা নিয়ম বেঁধে দিয়েছে। বরং ইসলাম মানবিক অধিকারের বিধান প্রতিষ্ঠা করেছে, যেখানে প্রত্যেকটা ইন্ডিভিজুয়্যাল পারসন এর স্বতন্ত্র মর্যাদা এবং অধিকার আছে। আর সেই মর্যাদা এবং অধিকার কোন শ্রেণী বৈষম্যের ভিত্তিতে নয়, বরং মানুষ বা মুসলিম হিসেবে তার কর্মের ভিত্তিতে ইক্যুইটি অনুযায়ী বন্টিত হয়েছে।

 

   তাহলে ফেমিনিজমের সাথে ইসলামের দ্বন্দটা কোথায়? দ্বন্দ্বটা কি, ইসলাম একতরফা অযৌক্তিক সমতায় বিশ্বাস করেনা, তার বদলে ন্যায্যতায় বিশ্বাস করে! কিন্তু সেই ইক্যুইটি অনুসারেও ইসলামে নারীর মর্যাদা অন্য সব প্রচলিত মতবাদ থেকে বেশি। তাহলে? খুব সম্ভবত দ্বন্দ্বটা এসে দাঁড়িয়েছে পলিগ্যামি আর হিজাবে।হ্যাঁ, ইসলাম পুরুষের জন্য পলিগ্যামিকে বৈধতা দিয়েছে, একজন পুরুষ অনধিক চারটি নারীকে বিয়ে করতে পারবে। সেই সাথে ইসলাম শর্তও আরোপ করেছে, স্ত্রীদের ভরণ পোষণের ক্ষমতা থাকতে হবে এবং তাদের মধ্যে ন্যায়বিচার করতে হবে। সেটা সম্ভব না হলে সেই অনুমতি বাতিল করেছে।অনভ্যস্ত একটা সমাজের কাছে এই পলিগ্যামির বিষয়টা হঠাৎ বর্বোরচিত মনে হতে পারে। কিন্তু এই পলিগ্যামির বিধান কি পরিস্থিতিতে এসেছিলো, সে পরিস্থিতি বিবেচনা করলে বরং পলিগ্যামি অনেক ক্ষেত্রেই নারীদের জন্য অনুগ্রহ স্বরুপ।

   আরবের তৎকালীন সমাজে প্রচুর এতিম মেয়েরা ছিলো, যাদের কার্যত অভিভাবক ছিলোনা। সেই সকল এতিম মেয়েদের নিরাপত্তা-ই নিশ্চিত করেছিলো সুরা নিসার ৩ নং আয়াত, যাতে অনধিক চারজন স্ত্রী গ্রহণের অনুমতি দেয়া হয়েছিলো। তাছাড়া তখনকার সময়ে যুদ্ধে পুরুষরা নিহত হওয়ার ফলে বিধবা নারীর সংখ্যা প্রচুর বেড়ে যেতো, আর সেই বিধবাদের চরম অসহায় অবস্থার মধ্য দিয়ে যেতে হতো। তাদের এই অসহায় অবস্থা থেকে মুক্তির একমাত্র চিরস্থায়ী পথ ছিলো অন্যকারো সাথে বিবাহে আবদ্ধ হওয়া। তাছাড়া তৎকালীন সমাজে কিছু দাসী নারীদের দাসত্ব থেকে মুক্ত জীবন মিলেছিলো এই পলিগ্যামির ফলেই।

   রাসুলের খাদিজা পরবর্তী ১০ জন স্ত্রীদের মধ্যে ৩ জন ছিলেন বিধবা অসহায়, ১ জন দাসী এবং ১ জন ছিলেন যিনি তাঁর স্ত্রী হবার প্রবল ইচ্ছে পোষণ করেছিলেন। যাদেরকে রাসুল বিয়ে করে সামাজিক অধিকার এবং উম্মুল মু’মিনীনে হওয়ার মতো মর্যাদা অর্জনের সুযোগ দিয়েছিলেন। অথচ তাঁর ৫০ বছর বয়স পর্যন্ত একমাত্র খাদিজাই ছিলেন স্ত্রী। সাহাবীদের মধ্যেও অনেকেই বিধবা মহিলাদের গ্রহণ করেছেন ২য়-৩য় স্ত্রী হিসেবে, যেসব মহিলাদের জন্য কাউকে বিয়ে পারাটা ছিলো পুনরায় সুস্থ একটা সামাজিক জীবন ফিরে পাবার মতো।

   অথচ এই পলিগ্যামির ইতিহাস খুব প্রাচীন। পুর্বের প্রায় প্রত্যেকটা ধর্মে, প্রত্যেকটা অঞ্চলেই পলিগ্যামির প্র্যাকটিস ছিলো। ক্রিশ্চিয়ান চার্চ পলিগ্যামিকে নিষিদ্ধ করেছে গ্রিকো-রোমান কালচারের অনুকরণে। যে কালচারে বিয়ের মাধ্যমে পলিগ্যামি নিষিদ্ধ ছিলো, কিন্তু প্রত্যেক পুরুষই একজন স্ত্রীর সাথে অসংখ্য মিসট্রেস বা দাসী রাখতে পারতো। পলিগ্যামির ইতিহাসে ইসলামের সাথে অন্যদের পার্থ্যক্য হলো, ইসলামে পলিগ্যামিকে অনধিক চারে নিয়ন্ত্রিত করা হয়েছে, যেখানে অন্য মতবাদগুলোতে পলিগ্যামি ছিলো অনিয়ন্ত্রিত।

 

   পশ্চিমা/ফেমিনিস্টদের ভাবনায় আসলে পলিগ্যামি নয় বরং বিয়ে টার্মটাই আপত্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমনকি প্রোটোফেমিনিস্টদের অনেকেরও বিয়েতে আপত্তি ছিলো। এঙ্গেলস তো বিয়েকে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন, ‘Dreary mutation of slavery’। সে পথ পেরিয়ে আজকাল তাদের দাবিটা পৌঁছে গেছে সেক্সুয়াল ফ্রিডমে। অথচ পশ্চিমা সমাজে সিরিয়াল পলিগ্যামির অবাধ চর্চা হয়, যেখানে বিয়ে-ডিভোর্স-বিয়ে সমীকরন চলতেই থাকে- যদিও তারা এটাকে সিরিয়াল পলিগ্যামি হিসেবে স্বীকার করে না। তাছাড়া বিয়ে ছাড়া বহুগামীতা, অন্যের স্ত্রীগামীতা বহুল চর্চিত বিষয়। এটাকে তারা যৌন স্বাধীনতা স্বাধীনতার কাতারে ফেলেন। আর ইসলাম সিরিয়াল পলিগ্যামিকে নিরুৎসাহিত করেছে এবং বিয়ে ছাড়া বহুগামীতাকে নিষিদ্ধ করেছে।

   ইসলামে বহুবিবাহের ব্যাপারটা একটা অপশন, যাতে বাধ্যবাধকতা নেই। যদিও কিছু স্কলার এটাকে সুন্নাত হিসেবে মত দিয়েছেন, তবে অনেকের মতেই এটা একটা প্রয়োজন সাপেক্ষে অনুমোদিত ব্যাপার। যা অনেক ক্ষেত্রেই নারীর জন্য মর্যাদা বয়ে নিয়ে এসেছে।

 

   আসলে ফেমিনিজম মুভমেন্ট বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে আলোচিত আন্দোলন হলেও, এর শেকড়টা খুব পুরনো। খুব সম্ভবত ফেমিনিজমের প্রথম সুর ভেসে আসে, প্লেটোর বিপাবলিক থেকে। তারপরের প্রোটোফেমিনিস্টদের লিস্টটাও কম লম্বা নয়। তবে ফেমিনিজম টার্মটা যখন অজ্ঞাত ছিলো তখনকার প্রোটোফেমিনিস্টদের ভাবনায় নারীদের সামাজিক, পারিবারিক আর সম্পদের অধিকারগুলোই মুখ্য ছিলো। তবে ধীরে ধীরে বিংশ শতাব্দীর শেষদিকে এসে ফেমিনিজমের প্রধান মটো হয়ে দাঁড়িয়েছে, যৌন স্বাধীনতা। যার বিশেষায়িত রুপ হোমোসেক্সুয়ালিটি বা এলজিবিটি মুভমেন্ট।

 

   আয়রনি হলো, ম্যাটেরিয়ালিস্টিক এই সোসাইটিতে নারীকে যেখানে পণ্য হিসেবে বিবেচনা করা করা হয়, সেখান থেকেই আবার ফেমিনিজমের সুর ভেসে আসে। কই, ফেমিনিজম কি যুদ্ধে নিহত ব্যক্তির স্ত্রীদের ভবিষ্যত নিয়ে কখনো কিছু বলেছিলো? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সেই সব অসহায় নারীদের জায়গা হয়েছিলো বাস্তার মোড়ে, গজিয়েছিলো একেরপর এক ব্রোথেল। কারণ, আধুনিক সভ্য পশ্চিমা সমাজে দ্বিতীয় বিবাহ হারাম, কিন্তু ব্রোথেলে কোন মেয়ে গ্রহণ করা নয়। কারণ তাদের কাছে দিনশেষে মেয়ে একটা উপভোগের বস্তু। নারীদের দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করাটা অমর্যাদাকর, কিন্তু বেশ্যা হিসেবে নয়।

 

   ফেমিনিজম সম অধিকারের কথা বলে, চাকরি-বাকরি থেকে শুরু করে সব ক্ষেত্রেই মহিলা পুরুষদের সবকিছুই সমান সমান হিসেবে বিবেচনা করার দাবি জানায়। সেক্ষেত্রে যেখানে একজন নবাগত সন্তানের পিতা সন্তান জন্মের পূর্বে যেখানে প্যাটার্নাল লিভ নেয়না, সেখানে একজন মায়ের ম্যাটার্নাল লিভের ব্যাপারটা তো অযৌক্তিক হওয়ার কথা। এটা স্পেশ্যাল কেস? হুহ! না, এটাই হলো নারী এবং পুরুষের বিশিষ্ট্যতা। তাদের জীবনের কিছু প্রয়োজন, কিছু আচার-অনুষ্ঠান একে অপর থেক ভিন্ন। তাই ইসলাম সম অধিকারের কথা বলেনা, বরং পরিস্থিতি অনুযায়ী ন্যায্যতার কথা বলে। ইসলাম ব্যক্তি হিসবে ইন্ডিভিজুয়াল রাইটস এর কথা বলে, ইক্যুইটির কথা বলে।

 

   এখন কথা হলো, ফেমিনিজম কি সামগ্রিক ভাবে নারীদের কথা বলে? নাকি একটা নির্দিষ্ট সোসাইটি কিংবা নির্দিষ্ট মানসিকতার নারীদেরই প্রতিনিধিত্ব করে? যারা একটা স্ট্যাবল সোসাইটির ন্যাচারাল রুলসগুলো ভেঙে দিতেই আগ্রহী। যে মেয়েটা হিজাব করতে ভালোবাসে, তখন তো হিজাব করাটা ইসলামের বিধান ছাড়িয়ে তার নারী অধিকারের ভেতর পড়ে। তাহলে হিজাব ব্যান কি নারী অধিকারের লঙ্ঘন নয়? ফেমিনিজম কি এই ব্যানের বিরুদ্ধে কিছু বলেছে কখনো? আসলে ফেমিনিজম নারীর ইচ্ছের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেনা, বরং একটা নির্দিষ্ট (পুরুষতান্ত্রিক) গোষ্ঠির ইচ্ছায় বিশ্বাস করে, যাদের ম্যানিপুলেশনের অংশ তারা।

 

   ইন্টারেস্টিং ফ্যাক্ট হলো, ফেমিনিজমের বুলি কপচানো পশ্চিমা ফিলোসফি নারীকে কেবল একটা পণ্য হিসেবেই দেখে। আর ইসলাম নারীকে একজন পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবেই দেখে। আর সেখানেই ইসলামের সাথে পশ্চিমা ফিলোসফির ফেমিনিজমের দ্বন্দ্ব। এই ফেমিনিজম একজন নারীর হিজাব পরাটাকে নারী অধিকার লঙ্ঘন হিসেবে দেখে, আর টেলিভিশনের পর্দায় কিংবা ক্লাবের বলরুমে নারীকে পণ্যের মতো উপস্থাপন করাকে নারী স্বাধীনতার সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত করে। কিন্তু এই সংজ্ঞায়ন করে কারা, কাদের জন্য? হা হা হা! দিনশেষে সেই ফেমিনিষ্টরা যে পুরুষদের সামনে নিজেদের বিকিয়ে দিতে দিতে পুরুষদের শেখানো রাস্তা ধরেই ফেমিনিজমের বুলি কপচাতে কপচাতে ঝিমিয়ে যায়। এভাবেই যে পুরুষদের জন্যই বেঁচে থাকে ফেমিনিজম- মাথাখোলা ফেমিনিস্টের ভাবনায় তা ধরেনা।