লেখা

ইন্ডিয়ার দিনলিপি: যা দেখলাম, যেমন ছিলাম - তৃতীয় পর্ব
ইন্ডিয়ার দিনলিপি: যা দেখলাম, যেমন ছিলাম - তৃতীয় পর্ব
২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৬

 

১১.১০.২০১৫

১১ অক্টোবর ভারতের জনপ্রিয় চলচ্চিত্র অভিনেতা অমিতাভ বচ্চনের জন্মদিন। ১৯৪২ সালে এলাহাবাদের এক হিন্দু-শিখ পরিবারে জন্ম নেয়া বিগ বি-কে ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসাবে মনে করা হয়। একই দিনে জন্ম নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সাবেক অধ্যাপিকা ও বিশিষ্ট সাহিত্যিক ড. নীলিমা ইব্রাহিম। সময়টা ১৯২১ সাল। সে বছরই প্রতিষ্ঠিত হয় প্রাচ্যের অক্সফোর্ড ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং একই বছরের ডিসেম্বরে কুমিল্লা থেকে কলকাতা ফেরার পথে কাজী নজরুল ইসলাম রচনা করেন তার বিখ্যাত কবিতা ‘বিদ্রোহী’। আর এর ঠিক এক বছর আগে, উত্তর প্রদেশের আলীগড়ে স্যার সৈয়দ আহমদ খান প্রতিষ্ঠিত মোহামেডান অ্যাংলো-ওরিয়েন্টাল কলেজ আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়।

১১ তারিখ সকালেই পূর্বা এক্সপ্রেস ট্রেনে কলকাতা থেকে আলীগড়ের উদ্দেশ্যে আমাদের টিকেট কাটা ছিল। সকাল ৮:১৫ মিনিটে হাওড়া স্টেশন থেকে ট্রেন। খুব ভোরেই ঘুম থেকে উঠে প্রস্তুত হয়ে নিলাম। হোটেলের সামনেই ট্যাক্সি ঠিক করা ছিল। সকালবেলার ফাঁকা রাস্তায় আধা ঘন্টার মধ্যেই স্টেশনে পৌঁছে গেলাম। পথে দেখে নিলাম সেইন্ট জন’স গির্জা ও বিখ্যাত ইডেন গার্ডেনস স্টেডিয়াম। ইডেন গার্ডেনস ভারতের সব চাইতে বড় এবং বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম ক্রিকেট স্টেডিয়াম। ১৮৬৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এই স্টেডিয়ামে প্রথম টেস্ট ম্যাচ গড়ায় ১৯৩৪ সালে। ১৯৮৭ সালে বিশ্বকাপ ক্রিকেটের চতুর্থ আসরের ফাইনাল ম্যাচটি এই মাঠেই অনুষ্ঠিত হয়। ইংল্যান্ডকে হারিয়ে এলান বোর্ডারের অষ্ট্রেলিয়া ঐ বছর বিশ্বকাপ জিতে নেয়।

ইডেন পেরিয়ে কিছুদূর গেলেই হুগলি নদী। নদীর উপরে স্বমহিমায় দাঁড়িয়ে ঐতিহ্যবাহী হাওড়া ব্রিজ। হাওড়া ও কলকাতাকে সংযোগকারী এই ব্রিজ নির্মিত হয় ১৮৭৪ সালে। ১৯৪৫ সালে পুরনো সেতুটির সংস্কার করে বর্তমানের ক্যান্টিলিভার সেতুটি উদ্বোধন করা হয়। বছর পঞ্চাশেক আগে নাম বদলে রাখা হয় রবীন্দ্র সেতু। সেতুর পুরো কাঠামোটি রিভেট দ্বারা নির্মিত। কোথাও নাট ও বোল্ট ব্যবহার করা হয় নাই। হাওড়া ব্রিজ ৭০৫ মিটার দীর্ঘ এবং ৯৭ ফুট চওড়া। ব্রিজের কাঠামো দুটি স্তম্ভে ২৬,৫০০ টন প্রসারণ সাধ্য ইস্পাত দ্বারা নির্মিত। প্রতিটি স্তম্ভ রাস্তার ঊর্ধ্বভাগে ৯০ মিটার জুড়ে অবস্থিত। বাংলা সাহিত্যের অনেকের লেখায় উপনিবেশ আমলের ভাবগাম্ভীর্য বজায় রাখা এই ব্রিজটির কথা এসেছে।

হাওড়া ব্রিজ পার হয়ে বিখ্যাত হাওড়া স্টেশন। হাওড়া স্টেশন বলতেই আমার চোখের সামনে একটি দৃশ্যই ভেসে আসে। হাওড়া থেকে ট্রেনে চড়ে উত্তরবঙ্গে যাওয়ার দৃশ্য। উত্তরবঙ্গ মানে জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং; শিলিগুড়ি বা ডুয়ার্সের চা বাগান। এবারের সফরে ঐ দিকে যাওয়া হবে না। পরে কোন এক সময় যেতে হবে এবং তা খুব কাছাকাছি সময়ের মধ্যেই হতে হবে। হাওড়া স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম আর কমলাপুর রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্ম, তেমন ফারাক নাই। ভাসমান, ছিন্নমূল মানুষের রাত্রিযাপনের নিরাপদ আশ্রয়স্থল। স্টেশনের ক্যান্টিনেই নাস্তা করে ট্রেনে উঠলাম। যথাসময়ে ঠিক সকাল সোয়া আটটায় ট্রেন ছাড়ল। থ্রি-টায়ারের এসি ট্রেন। বন্দোবস্ত ভালোই। আমাদের সামনে এক ভদ্র মহিলার সিট পড়ল। উনার ছেলে এসেছিলেন এগিয়ে দিতে। তিনি যাবেন বারানসী। সেখানকার বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে তার নাতনী পড়ে। তাকে দেখতেই যাচ্ছেন। ভদ্রমহিলার সাথে বেশ আলাপ জমে গেল। উনার পূর্ব-পুরুষ বাঙ্গাল ছিলেন। অর্থাৎ পূর্ব বাংলা থেকে এসেছিলেন। দাদাবাড়ি ছিল গোপালগঞ্জের কোটালিপাড়ায় আর নানাবাড়ি বরিশালের উজিরপুরে। অবশ্য উনার জন্মের অনেক আগেই তার বাবা-মা কলকাতায় চলে এসেছিলেন। ১৯৬৮ সালে বিয়ে হয় উনার। তারপর বছর পাঁচেক কলকাতায় থেকে স্বামী ও নিজের কর্মসূত্রে লক্ষ্ণৌ চলে যান। চল্লিশ বছর সেখানে থেকে আবার কলকাতায় থিতু হয়েছেন। এক ছেলে-এক মেয়ে। দুজনই কলকাতায় থাকে।

উনার সাথে ঘটি-বাঙ্গালের দ্বন্দ্ব নিয়ে কথা হল। অনেকটা কমে এলেও এখনো যে ফারাক কিছুটা থেকে গেছে তা জানালেন। কিছু মজার গল্পও বললেন। একসময় কলকাতায় ফুটবল অনেক জনপ্রিয় ছিল। ঘটিদের ক্লাব ছিল মোহনবাগান। আর বাঙ্গালরা সমর্থন করত ইস্টবেঙ্গল ক্লাব। মোহনবাগান ও ইস্টবেঙ্গলের খেলার দিন পুরো কলকাতা জুড়ে চাপা উত্তেজনা কাজ করত। মোহনবাগান জিতলে ঘটিরা চিংড়ি মাছের মালাইকারী রান্না করত। বিপরীতে ইস্টবেঙ্গল জিতলে বাঙ্গালদের ঘর থেকে ইলিশ মাছ ভাজির সুবাস ছড়িয়ে পড়ত। ঘটিদের পছন্দ ছিল মিষ্টি। অন্যদিকে বাঙ্গালরা ঝাল খেতেই ভালোবাসত। অবশ্য এটাও জানালেন এখন কলকাতার সবাই ইলিশের জন্য পাগল। উনার কাছে ১৯৭১ সম্পর্কে জানতে চাইলাম। বললেন, ঐ সময় নকশালদের খুব উৎপাত ছিল। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে তেমন কিছু বলতে পারলেন না। খোদ কলকাতায় থেকেও ভদ্রমহিলা ৭১’কে আঁচ করতে পারলেন না? কিন্তু কেন? নিছক ঘর-সংসার নিয়ে তো ব্যস্ত ছিলেন না। রীতিমত শিক্ষিত ও সচেতন চাকুরীজীবি ছিলেন। বেশ অবাক হলাম।

ট্রেনে কমল সিং নামে বাঙালি তরুণের সাথে পরিচয় হল। পেশায় সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার কমলের বাড়ি দূর্গাপুর। সম্ভবত এটা বর্ধমান জেলায় পড়েছে। ওখানেই পড়ালেখা শেষ করে ছোট একটা চাকরি করছে। এখন নতুন চাকরির ইন্টারভিউ দিতে কানপুর যাচ্ছে। মধ্যবিত্ত বাঙালি যুবকের চিরন্তন প্রতিচ্ছবি দেখলাম কমলের মাঝে। বারবার বাড়িতে ফোন দিয়ে বাবা ও স্ত্রীর খোঁজ নিচ্ছিল। কমলের কাছ থেকে যাওয়ার পথের স্টেশনগুলো সম্পর্কে ধারণা পেলাম। ইন্ডিয়ার শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কেও কিছুটা ধারণা পেলাম। বুঝতে পারলাম, ইন্ডিয়া অন্তত পড়া-লেখার জায়গাটাতে কোন ধরণের ছাড় দিতে রাজি নয়। এর সুফলও পাচ্ছে তারা।

পশ্চিম বঙ্গ ছাড়িয়ে ঝাড়খণ্ড হয়ে বিহার। গয়া, মোগলসরাই পার হয়ে উত্তর প্রদেশ। যে ইন্ডিয়ার কথা আমরা শুনি বা টিভিতে দেখি কিংবা যে ইন্ডিয়াকে কলকাতায় দেখে আসলাম, ঝাড়খণ্ড বা বিহারে সেই ইন্ডিয়াকে খুঁজে পেলাম না। দারিদ্র্য আর বঞ্চনার সাক্ষী হয়ে আছে এসব জনপদ। লক্ষ্ণৌ পার হলাম সন্ধ্যার পরে। আধো-আলোয় গঙ্গার ঘাটগুলো পৌরাণিক চরিত্রগুলোকে মনে করিয়ে দিচ্ছে। বারানসী স্টেশনে বাঙালি ভদ্রমহিলা নেমে গেলেন। কমল এবং তার জায়গায় দুজন তরুণী উঠল। একজনের বাড়ি কেরালায়, আরেকজন বিলাতি। লন্ডন থেকে চাকুরিসূত্রে ইন্ডিয়ায়। তারা দিল্লির একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছে। বারানসী এসেছে এখানকার বিখ্যাত বেনারসি শাড়ি কিনতে। দুজনই ঢাকাই জামদানি ও মিরপুরের বেনারসির প্রতি তাদের আগ্রহের কথা জানাল। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক কেরালার চটপটে তরুণী ইন্ডিয়ান একসেন্টে শুদ্ধ ইংরেজিতেই অনর্গল কথা বলছিল। সে জানাল তার মায়ের ঢাকাই শাড়ির বিশেষ কালেকশন আছে।

কোথায় ঢাকা, কোথায় কেরালা! কেরালার এক ভদ্রমহিলা মিরপুরের শাড়ির জন্য ফেসিনেশন বোধ করেন শুনে বেশ ভালো লাগছিল। সেই শৈশব থেকে মিরপুরের সাথেই তো গাঁটছাড়া বাঁধা পড়েছে আমার। গল্পে গল্পে রাত হয়ে আসাতে এক সময় শুয়ে পড়লাম। ঘুমে ঘুমেই ভোর নাগাদ পৌঁছে গেলাম আলীগড়। তার আগে জীবনে প্রথমবার ট্রেনেই হল নিদ্রাবিলাস।