লেখা

ইন্ডিয়ার দিনলিপি: যা দেখলাম, যেমন ছিলাম - দ্বিতীয় পর্ব
ইন্ডিয়ার দিনলিপি: যা দেখলাম, যেমন ছিলাম - দ্বিতীয় পর্ব
০৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৬

১০.১০.২০১৫

আজকের দিনটা ব্রিটিশ ভারতের প্রথম রাজধানী কলকাতার জন্য। কলকাতার সাথে প্রথম পরিচয় সুনীল-সমরেশ-শীর্ষেন্দুর সূত্রে। সেই কবে কৈশোর বয়সে এদের উপন্যাস পড়া শুরু করেছিলাম। এদের মাধ্যমেই চিনেছি এসপ্ল্যানেড, রেইস কোর্স, গড়ের মাঠ, রবীন্দ্র সদন, কলেজ স্ট্রীট, কফি হাউজ আরো কত কি। আজ নিজ চোখে দেখব সেসব জিনিস। ভেতরে ভেতরে অদ্ভূত সুখানুভূতি হচ্ছিল। বারবার হারিয়ে যাচ্ছিলাম ‘সেই সময়’-এ, ‘পূর্ব-পশ্চিম’ কিংবা ‘কালবেলা’য়।

আজকের যে কলকাতা তা সপ্তদশ শতকের শেষ দিকে সুতানুটি, গোবিন্দপুর ও কলিকাতা নামের তিনটি গ্রামে বিভক্ত ছিল। ব্রিটিশ ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৬৯০ সালে মোঘল সরকারের কাছ থেকে এই তিনটি গ্রামের দেওয়ানি লাভ করে এবং এখানে শহরের গোড়াপত্তন করে। তখন থেকেই কলকাতা ব্রিটিশদের ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্রে পরিণত হয়। বাংলার নবাবের পতনের পরে ১৭৭২ সালে মুর্শিদাবাদ থেকে রাজধানী কলকাতায় স্থানান্তর করা হয়। এরপর ১৯১১ সাল পর্যন্ত কলকাতা সমগ্র ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী ছিল। এই দীর্ঘ প্রায় ১৪০ বছরে কলকাতা সমগ্র ভারতের শিক্ষা-দীক্ষা, সাহিত্য-সংস্কৃতি এবং রাজনীতি ও অর্থনীতির কেন্দ্রে পরিণত হয়। সমগ্র ভারতবর্ষের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও ভাষাভাষির মানুষজনের সম্মিলন ঘটায় কলকাতা এক বৈচিত্র্যময় রূপ ধারন করে। সাহিত্যচর্চা, পাড়া-সংস্কৃতি ও বাঙালির স্বভাবজাত আড্ডামুখর পরিবেশ এতে আরো প্রাণচাঞ্চল্য দান করে। এসব বৈচিত্র্যের জন্যই কলকাতাকে ‘সিটি অব জয়’ বা ‘আনন্দনগর’ বলে ডাকা হয়। কলকাতার পথে-ঘাটে ঘুরলে এখনো এর রেশ টের পাওয়া যায়।

আমরা সকাল বেলা কলকাতার বিখ্যাত আলু পরোটা, আলুরদম ও গরুর গোশত দিয়ে নাস্তা সারলাম। তারপর পায়ে হেঁটেই কলকাতা ভ্রমণে বের হলাম। মার্কুইস স্ট্রিট হয়ে দক্ষিণ কলকাতার দিকে কিছুদূর যাওয়ার পর চৌরঙ্গী রোড। এই রোডেই অবস্থিত ইন্ডিয়ান মিউজিয়াম। বাংলায় লেখা ভারতীয় সংগ্রহালয়। এটি ভারতের বৃহত্তম জাদুঘর। ১৮১৪ সালে এশিয়াটিক সোসাইটি অব বেঙ্গল এই জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করে। বর্তমানের সুবিশাল ভবনটি তৈরী করা হয় ১৮৭৫ সালে। একটি প্রাচীন মিশরীয় মমিসহ সুপ্রাচীন বিভিন্ন সংগ্রহে সমৃদ্ধ এই জাদুঘর। জাদুঘরের পাশেই জিওলজিকাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার প্রধান কার্যালয়। এই প্রতিষ্ঠানটির জন্ম ১৮৫১ সালে।

সৈয়দ মুজতবা আলীর লেখা কোন এক গল্পে পড়েছিলাম, ‘কলকাতার পদে পদে না হলেও বাঁকে বাঁকে পানের দোকান’। পানের দোকান তেমন চোখে পড়ল না। তবে রাস্তার মোড়ে মোড়ে ছোট ছোট ফলের দোকান দেখেছি। অনেকটা আমাদের দেশের চায়ের দোকানের মত। এগুলোতে তাজা ফল ও ফলের রস পাওয়া যায়। হাঁটতে হাঁটতে গলা শুকিয়ে গেছে। পথের পাশে মোসাম্বির জুস খেয়ে গলা ভিজালাম। তারপর আবার পা বাড়ালাম সামনে। মাদার টেরিজা সড়ক পার হয়ে ইলিয়ট পার্কের পাশ দিয়ে আরো কিছু দূর সামনে এগিয়ে এম.পি. বিড়লা প্লানেটেরিয়াম বা তারামণ্ডল। সংস্কার কাজ চলছিল বলে বাইরে থেকেই দেখতে হল। এক নজর দেখেই পাশের সেন্ট পল’স ক্যাথেড্রাল-এ প্রবেশ করলাম। এটি ভারতের অন্যতম প্রাচীন গির্জা। ইন্ডিয়ান আবহাওয়ার উপযোগী করে ইন্দো-গোথিক ধাঁচের তৈরী এই গির্জার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয় ১৮৩৯ সালের ৮ অক্টোবর। আট বছর পরে ১৮৪৭ সালে নির্মাণকাজ শেষ হবার পর এটি প্রাচ্যের প্রথম এপিস্কোপাল ক্যাথিড্রাল চার্চ হিসাবে স্বীকৃতি পায়।বাইরে স্থাপিত ফলক থেকে জানা যায় মূল ভবনটি ২৪৭ ফুট দীর্ঘ এবং ৮১ ফুট চওড়া। এতে অনেক দুষ্প্রাপ্য চিত্রকর্ম ও প্রাচীন বইপত্র সংরক্ষিত আছে।

ক্যাথেড্রাল থেকে বের হয়ে গেলাম ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল। সাদা মার্বেল পাথরে তৈরী এই ভবনটি ব্রিটিশ আমলের অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্থাপত্য কর্ম। রানী ভিক্টোরিয়ার মৃত্যুর পরে তার স্মৃতির উদ্দেশ্যে এটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯০৬ সালে এর  নির্মাণ কাজ শুরু হয় এবং ১৯২১ সালের ২৮ ডিসেম্বর রাজা অষ্টম এডওয়ার্ড এটি উদ্বোধন করেন। এতে একই সাথে ইন্দো-ইসলামিক ও ইউরোপীয় স্থাপত্যরীতির অনুসরণ করা হয়। রোমান ও মোঘল স্থাপত্যকলার অপূর্ব সঙমিশ্রণ ঘটায় এর শৈলী দেখে মুগ্ধ হতে হয়। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের উত্তর পাশে গড়ের মাঠ। কিছুক্ষণ সেখানে বসে কৈশোরে পড়া উপন্যাসগুলার সাথে মিলাতে চেষ্টা করলাম। স্মৃতিকাতরতা পেয়ে বসল। ছোট্ট এক জীবনে মানুষ কত বৈচিত্র্যই না বয়ে নিয়ে চলে।

হাঁটতে হাঁটতেই চলে গেলাম রবীন্দ্র সদন। কলকাতার সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের কেন্দ্রবিন্দু নন্দন-রবীন্দ্র সদন কমপ্লেক্স। একই কমপ্লেক্সের ভেতরে শিশির মঞ্চ ও পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি। নন্দনে একটা সিনেমা দেখার শখ ছিল। কিন্তু সময় না মিলায় দেখা হল না। এরপরের গন্তব্য কলেজ স্ট্রিট। মুখের ভাষা বাংলা হলেও আমরা যে ভিনদেশি তা ট্যাক্সিচালকরা বুঝে গিয়েছিল। মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরত্বের কলেজ স্ট্রিট যেতে অনেক টাকা চাচ্ছিল। অবশেষে এক বাঙালি যুবককে পেয়ে গেলাম। তাকে গিয়ে বলতেই সাদরে গ্রহণ করল। দাদার নাম অভিজিৎ। পূর্বপুরুষ বাঙ্গাল ছিল। অর্থাৎ পূর্ব বাংলার লোক। তবে উনার জন্ম এখানেই। বিবিএ পড়ছেন। তিনি মিটারে একটি ট্যাক্সি ঠিক করে দিলেন। মাত্র পঞ্চাশ রূপিতে কলেজ স্ট্রিট পৌঁছে গেলাম। কলকাতা মেডিকেল কলেজের মোড়ে নেমে পড়লাম আমরা। পেশায় যেহেতেু ডাক্তার তাই ডাক্তারখানা দেখার লোভটা সামলাতে পারলাম না।

medical

কলকাতা মেডিকেল কলেজের বয়স ১৮০ বছর। পশ্চিমা এলোপ্যাথি চিকিৎসাবিদ্যা প্রসারের উদ্দেশ্যে ১৮৩৫ সালে ‘মেডিকেল কলেজ, বেঙ্গল’ নামে কলেজটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। এটি সমগ্র এশিয়ার মধ্যে ইউরোপীয় চিকিৎসা শাস্ত্রে শিক্ষাদানকারী দ্বিতীয় এবং ইংরেজি ভাষার প্রথম ডাক্তারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এর আগে ১৮২৩ সালে ফরাসিরা পন্ডিচেরিতে একটি মেডিকেল স্কুল প্রতিষ্ঠা করে। বর্তমানে তা ‘জওহরলাল ইনস্টিটিউট অব পোস্ট গ্রাজুয়েট মেডিকেল এডুকেশন এণ্ড রিসার্চ’ নামে পরিচিত। বারডেমের প্রতিষ্ঠাতা ডাঃ মোহাম্মদ ইব্রাহিম, জাতীয় অধ্যাপক এম আর খান, পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ডা: বিধান রায়-সহ আরো অনেক নামজাদা ডাক্তারের আলমা মেটার এই মেডিকেল কলেজ। ব্রিটিশ আমলের পুরানো স্থাপত্যরীতির বেশ কয়টি ভবনের সাথে নতুন কিছু ভবনের সমন্বয়ে বিশাল এলাকা জুড়ে কলেজ ও হাসপাতাল ক্যাম্পাস।

তবে কলকাতার এই মেডিকেল কলেজের প্রতি আমার আগ্রহ অন্য কারনে। আগ্রহের কারন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’র নায়ক শশী ডাক্তার। শশী কলকাতার এই মেডিকেল কলেজে পড়েই ডাক্তার হয়েছে। এখানে এসেই গাওদিয়ার সংকীর্ণ, স্থুল রসবোধ সম্পন্ন শশী কল্পনাপ্রবণ ও গভীর জীবনবোধ সম্পন্ন হয়ে উঠে। মেডিকেল শিক্ষাজীবনের শুরুর দিকেই উপন্যাসটি পড়ি আমি। পড়তে পড়তেই শশীর প্রতি একটা মায়া জন্মে যায়। মায়াটা এখনো আছে। সে কারনেই হয়ত, সশরীরে কলকাতা মেডিকেল কলেজের সামনে দাঁড়াতেই অনুভূতির জগতে শশী ডাক্তারের পদচারণা টের পেলাম।

হাসপাতালের ভিতরে ঢুকে খুব অবাক হলাম। সরকারী হলেও আমাদের দেশের সরকারী মেডিকেল কলেজের মত ভিতরটা নোংরা বা জনাকীর্ণ নয়। বরং বেশ পরিস্কার। দেখা করার জন্য রোগীর স্বজনদের সময় নির্দিষ্ট করে দেয়া আছে। ব্যবস্থাপনাও খুব ভালো। অযথা উৎপাতের সুযোগও তাই কম। রোগীর স্বজনদের রাত্রিবাসের জন্য হাসপাতাল কমপাউণ্ডেরে মধ্যেই ছোট একটি একতলা ভবন আছে দেখলাম। পরিসর ছোট হলেও উদ্যোগটা প্রশংসা করার মত এবং অনুসরণীয়। সব চাইতে অবাক করার মত বিষয় হচ্ছে আমাদের দেশে যেখানে নিম্নবিত্তের মধ্যেও বেসরকারী হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়ার প্রবণতা বাড়ছে, সেখানে কলকাতার উচ্চমধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্যদেরও মেডিকেল কলেজের বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসতে দেখলাম। ন্যায্য মূল্যের ওষুধের জন্য হাসপাতাল ভবনে ঢুকার মুখেই বেশ কয়টি ওষুধের দোকান স্থাপণ করা হয়েছে। লাইন ধরে অনেকেই সেখান থেকে ওষুধ কিনছে। আমাদের দেশের মত হাসপাতালের সামনে ফার্মেসি, ওষুধের দোকান বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের আধিক্য চোখে পড়ল না।

মেডিকেল কলেজ পেরিয়ে সামনে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ক্যাম্পাস। বিশ্ববিদ্যালয়েরই প্রাক্তন উপাচার্য আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের নামে এই ক্যাম্পাসটি আশুতোষ শিক্ষাপ্রাঙ্গণ নামে পরিচিত। এই ক্যাম্পাস ছাড়াও পুরা কলকাতা জুড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের আরো পাঁচটি ক্যাম্পাস রয়েছে। পলাশীর যুদ্ধে পরাজয়ের শত বছর পরে ১৮৫৭ সালে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে। ভারতের বর্তমান রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি-সহ নেতাজি সুভাসচন্দ্র বসু, শেরে বাংলা এ.কে. ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দি, জ্যোতি বসুর মত অসংখ্য গুণীজন এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষালাভ করেছেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা শেখ মুজিবর রহমানও এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ (বর্তমানে মাওলানা আজাদ কলেজ) থেকে বি.এ. ডিগ্রি লাভ করেন। দেশভাগের আগে তরুণ ছাত্রনেতা হিসাবে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে তার অগাধ যাতায়াত ছিল। অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন-সহ এই বিশ্ববিদ্যালয়ের চারজন প্রাক্তন ছাত্র নোবেল পুরস্কার বিজয়ী।

পাশেই আরেক ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়। সময়ের হিসাবে আরও প্রাচীন। ১৮১৭ সালে ভদ্র হিন্দু ঘরের সন্তানদের ইংরেজি সাহিত্য ও ইউরোপীয় জ্ঞান-বিজ্ঞানে পরদর্শী করে তুলতে হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮৫৫ সালে নাম বদলে প্রেসিডেন্সি কলেজ করা হয়। ২০১০ সালে পশ্চিম বঙ্গ সরকার গেজেট পাস করে একে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত করে। সদ্যপ্রয়াত তপন রায় চৌধুরীর বাঙালনামা বইতে প্রেসিডেন্সি কলেজ সম্পর্কে উঁচু দরের মন্তব্য পড়েছি। তিনি স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে আই. এ পাস করে প্রেসিডেন্সি-তে ভর্তি হন। তার লেখাতেই পড়েছি সেই সময়ে প্রেসিডেন্সি কলেজের শিক্ষকদের অনেকেরই পান্ডিত্যের গভীরতা ও ব্যাপ্তি ছিল দেখার মত। মেধার দিক দিয়ে ছাত্ররাও ছিল অনেক উঁচুমানের। এই প্রতিষ্ঠান থেকে পাঠ নিয়েই পরবর্তীতে ভারতবর্ষের অনেক প্রথিতযশা ব্যক্তির আবির্ভাব হয়েছে। কাছাকাছি হেয়ার স্কুল, হিন্দু স্কুল ও সংস্কৃত কলেজও দেখলাম। সবগুলো নিয়ে বলতে গেলে লেখা আর শেষ হবে না। তবে এসব ঐতিহাসিক বিদ্যাপীঠ দেখে মনটা ভরে গেল।

কলেজ স্ট্রিটের আরেক নাম বইপাড়া। নতুন বই-পুরান বই-পাঠ্য বই সব কিছু মিলিয়ে এক অপূর্ব সমাহার। এক দোকানে ঢুকলেই বইয়ের বিশাল রাজ্যে হারিয়ে যেতে হয়। বই দেখলে এমনিতেই আমার হাত নিশপিশ করে। শেষ পর্যন্ত দুইটা বই কিনে বের হয়ে গেলাম। না হলে পকেট শুন্য হবার উপক্রম হত। বই কিনেই ঢুকলাম কফি হাউজ। মানে কলেজ স্ট্রিটের অ্যালবার্ট হল। ষাটের দশকে কলেজ স্ট্রিটে সন্ধ্যা নামলেই মুখর হয়ে উঠত এই কফি হাউজ। সুনীল-শক্তি-বিনয় থেকে শুরু করে আরো অনেকের উত্থানপর্বের সাথে নিবিড়ভাবে মিশে আছে এর নাম। ভেতরে ঢুকে মান্না দে’র অমর চরিত্রগুলোর সাথে দেখা না হলেও কফি হাউজের বিকেলগুলো যে এখনো আগের মতই আড্ডামুখর আছে তা আঁচ করতে কষ্ট হয় না। স্কুল পড়ুয়া থেকে প্রবীণ ব্যক্তি পর্যন্ত অনেককেই গল্পে মশগুল হয়ে থাকতে দেখলাম। কফির পেয়ালায় চুমুক দিতে দিতে আনমনে গাইছিলাম ‘কতজন এলো গেল কতজনই আসবে কফি হাউজটা শুধু থেকে যায়’। বেঁচে থাকুক কফি হাউজ- এই প্রত্যয় নিয়ে আমরাও ফেরার পথে পা বাড়ালাম।

পথে ধর্মতলায় দেখলাম টিপু সুলতান মসজিদ। ১৮৪২ সালে টিপু সুলতানের ছোট ছেলে প্রিন্স গোলাম মহম্মদ এই মসজিদটি নির্মাণ করান। সংস্কারহীন মসজিদটি দেখে খুব খারাপ লাগল। শুনলাম একসময় মুসল্লিদের ওযুর সুবিধার জন্য পাশে একটি বড় পুকুর ছিল। কিন্তু পুকুরটিরও কোন অস্তিত্ব চোখে পড়ল না। কার কাছে যেন একবার শুনেছিলাম ১৯৪২ সালের পরে নাকি কলকাতা শহরে আর কোন নতুন মসজিদ তৈরী হয় নাই। সত্য কিনা জানি না। তবে প্রায় ২৫ ভাগ মুসলমান অধিবাসীর কলকাতায় মসজিদের সংখ্যাটা না বাড়লেও অন্তত পুরানগুলোর সংস্কার হওয়াটা বাঞ্চনীয়।

কলকাতার রাস্তায় দুটি ঐত্যিহ্যবাহী যান হচ্ছে টানা রিকশা ও ট্রাম। টানা রিকশার চালককে দেখে খুব কষ্ট লেগেছে। শুধুমাত্র ঐতিহ্যের খাতিরেই নাকি এটা টিকিয়ে রেখেছে ইন্ডিয়ানরা। কিন্তু এতে যে কারো উপর চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে অমানবিক কষ্ট তা কি কেউ ভেবেছে। ঐতিহ্যের নাম করে কেন খারাপ বিষয়গুলো টিকিয়ে রাখা হবে? কলকাতার নতুন প্রজন্মের মুখ থেকে যে বাংলা ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে, কই তা সংরক্ষণের তো কোন উদ্যোগ নাই। ইংরেজি আর হিন্দির আগ্রাসনে কি কলকাতায় বাংলা ভাষা ছাগলের তিন নম্বর বাচ্চার মত হাহাকার করছে না? মনে পড়ে গেল ভবানীপ্রসাদ মজুমদারের সেই বিখ্যাত ছড়া, ‘দাদা, আমার ছেলের, বাংলাটা ঠিক আসে না’।

বিদ্যুৎচালিত ট্রাম কলকাতার আরেকটি পর্যটক আকর্ষণ। ব্রিটিশরা ভারতবর্ষের বেশ কয়টি জায়গায় ট্রাম চালু করলেও এখন শুধু কলকাতাতেই তা টিকে আছে। যদিও আধুনিক কলকাতায় শ্লথ গতির ট্রাম চলা নিয়ে অনেকেরই আপত্তি আছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক নেতাদের অনেকেই মনে করেন ট্রাম বরং শহরের মধ্যে যানজটের অন্যতম প্রধান কারন। তারপরও পশ্চিম বঙ্গ সরকার ট্রামকে বহাল রেখেছে। তাদের দাবী ট্রামে চলা সহজ ও স্বাস্থ্যকর এবং এটা পরিবেশবান্ধব। তবে যতটা ধারণা করেছিলাম ট্রাম তার চাইতেও ধীরে চলে। ক্যাডেট কলেজে পড়ার সময় আমাদের প্যারেড করতে হত। দুই ধরনের প্যারেড ছিল, জলদি চল ও ধীরে চল। আমরা যে গতিতে ধীরে চলতাম কলকাতার ট্রামও সেই একই গতিতে চলে। এই স্বল্প গতির ট্রামের নিচে পড়ে জীবনানন্দ দাস কিভাবে মারা গেলেন তা বুঝে আসল না। গত একশ বছরের ইতিহাসে ট্রাম দুর্ঘটনায় নিহত হওয়া একমাত্র ব্যক্তি তিনি। যদিও অনেকের ধারণা আত্মহত্যার চেষ্টাই ছিল দুর্ঘটনার মূল কারন।

টানা রিকশা, ট্রাম আর ব্যস্ত কলকাতা দেখতে দেখতে হোটেলে ফিরলাম। ব্যাগ-লাগেজ গুছিয়ে হোটেলের দেনা-পাওনা পরিশোধ করলাম। এরপর খেতে বের হলাম। আসার আগেই ঠিক করা ছিল কলকাতার বিখ্যাত কস্তুরি হোটেলে এক বেলা খাব। রাতের খাবার খেতে তাই সেখানেই গেলাম। ভাত, কয়েক প্রকারের সবজি, ডাল আর মুরগী। খাবার খেয়ে কলকাতার রাস্তায় আরো কিছুক্ষণ হাঁটলাম। মাটির ভাঁড়ে চা খেলাম। চা যে বাঙালির কাছে নিছক পানীয় নয়, তা ঢাকার মত কলকাতায় এলেও বুঝা যায়। চা খাওয়াকে কেন্দ্র করে জমে ওঠে বৈচিত্র্যময় আলোচনা, সর্বব্যাপী আলাপ।

কলকাতার অলি-গলিতে ঢুঁ মারতে মারতে মাথার ভেতর অনেক কিছু ঘুরপাক খেতে লাগল। এই কলকাতায় এক সময় দাবরিয়ে বেড়িয়েছেন বরিশালের বাঙ্গাল শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক। ছিলেন সর্বভারতীয় কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক। লাহোর প্রস্তাব তারই দেয়া। চেয়েছিলেন বাংলা আলাদা স্বাধীন রাষ্ট্র হোক। হয়নি। রেডক্লিফের আঁকা মানচিত্রে পূর্ব-পশ্চিমে জুদা হয়ে গেছে বাংলার একান্নবর্তী সংসার। ব্রিটিশ উপনিবেশ কলকাতাকে অনেক কিছু দিয়েছে। কলকাতার মোড়ে মোড়ে সুউচ্চ প্রাসাদ দেখে তার কিছুটা অনুমান করা যায়। এ কারনেই কলকাতাকে বলা হয় সিটি অব প্যালেসেস বা ‘প্রাসাদ নগরী’। কলকাতার শিক্ষা-সংস্কৃতি, চিন্তা-মননেও ব্রিটিশদের অবদান অনেক। তবে ব্রিটিশ উপনিবেশ বাঙালিদের কাছ থেকে যা কেড়ে নিয়েছে তা কি আর কখনো ফেরত পাওয়া সম্ভব? শত সমস্যার পরও ঢাকার বাতাসে যে দিলখোলা ভাব আছে তার বিপরীতে কলকাতাকে কেমন যেন আড়ষ্ট ঠেকেছে আমার কাছে। এটা কি শুধুই ভ্রম বা ক্ষণিকের অনুভূতি? নাকি আল মাহমুদ-সুনীলের মত অনুযায়ী কলকাতাকে ছাড়িয়ে ঢাকার বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির রাজধানী হয়ে উঠার চিহ্ন মাত্র? এসব নয়-ছয় ভাবতে ভাবতে হোটেলে ফিরলাম। পরদিন খুব ভোরে বের হতে হবে। দেরি না করে ঘুমিয়ে পড়লাম। ঘুমের ঘোরে বারবার চোখের সামনে ভাসছিল ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র দু’টি লাইন, ‘নেতারা যদি নেতৃত্ব দিতে ভুল করে, জনগণকে তার খেসারত দিতে হয়। যে কলকাতা পূর্ব বাংলার টাকায় গড়ে উঠেছিল সেই কলকাতা আমরা স্বেচ্ছায় ছেড়ে দিলাম’। আসলেই কি আমরা কলকাতাকে স্বেচ্ছায় ছেড়ে দিয়েছি? কি এমন হত যদি দুই বাংলা এক থাকত?