লেখা

ইন্ডিয়ার দিনলিপি: যা দেখলাম, যেমন ছিলাম - প্রথম পর্ব
ইন্ডিয়ার দিনলিপি: যা দেখলাম, যেমন ছিলাম - প্রথম পর্ব
০১ ফেব্রুয়ারি ২০১৬

১.

ভূমিকা

ইন্ডিয়া, ভারত বা হিন্দুস্তান যাই বলি না কেন নানা জাতি, নানা ভাষা ও সংস্কৃতির জনবহুল রাষ্ট্র ভারত প্রজাতন্ত্র সম্পর্কে আগ্রহ সেই ছোটবেলা থেকে। বাংলাদেশকে তিনপাশ থেকে ঘিরে থাকা দেশটার প্রতি হৃদয়ের গভীর থেকে এক ধরনের টান অনুভব করি। না! এটা বলিউডি বা ক্রিকেটিয় টান নয়। যদিও আমাদের প্রজন্মের অধিকাংশেরই ইন্ডিয়ার প্রতি আকর্ষণের কারন ক্রিকেট মাঠে ব্যাট-বলের চমক কিংবা বলিউডের চটকদার রঙিন দুনিয়া। কিন্তু আমার নৈকট্য ভারতবর্ষের ইতিহাসের সাথে, সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের সাথে; সুদীর্ঘ কয়েকশ বছর এক সীমারেখার অধীনে হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান, আরব-অনারব-তুর্কি-পরসিক, আর্য-অনার্য-আশরাফ-আতরাফ ভেদে পাশাপাশি বসবাস করার ঐতিহ্যের সাথে।

সময়ের পরিক্রমায় বদলে যায় দেশ; পাল্টে যায় সমাজ, মানচিত্র, ভূখণ্ডের সীমারেখা। কিন্তু ইতিহাস? ইতিহাসকে কি অস্বীকার করা যায়? ফেলে আসা সময় বা কাল, তা কি মুছে ফেলা যায় কখনো? কিম্বা সীমাবদ্ধ করা যায় কোন নির্দিষ্ট সময়সীমার গণ্ডিতে? বাংলা ভাগ হওয়া সম্পর্কে তপন রায় চৌধুরী ‘বাঙালনামা’ বইতে তার বাবার বরাতে লিখেছেন, দুই বাংলা এক পরিবার। সম্পত্তি নিয়ে পরিবারের ভাইদের মধ্যে কাজিয়া লেগেছে। জুদা হওয়া ছাড়া গতি নাই। শরীকি বাড়ির ছেলে তপন রায় চৌধুরী তার বাবার দেয়া ব্যাখ্যা সহজেই বুঝেছিলেন।

ভারত ভাগ বা অবিভক্ত বঙ্গ নিয়ে আমার আগ্রহের কমতি নাই। তাই ইতিহাসের সান্নিধ্যে আসতে, জুদা হয়ে যাওয়া ভূখণ্ডের স্পর্শ গায়ে জড়াতেই ইন্ডিয়া ভ্রমণ। যাওয়ার আগে বন্ধু নাঈমের সাথে আলাপ হচ্ছিল। কলকাতার কই কই যাওয়া যায় সে ব্যাপারে। কফি হাউজ, কলেজ স্ট্রিট, গড়ের মাঠ আরও কত কি! সুনীলের বরাতে পুরো কলকাতার হুবহু বর্ণনা। হবে না কেন? কৈশোরের দিনগুলোতে সুনীলের সুবাদে আমি, নাঈম, জাহিদ বা ফারশাদ কতবার যে ঘুরে এসেছি সেসব জায়গায় তার কোন ইয়ত্তা নাই। এবার সশরীরে যাবার পালা। ইন্ডিয়ার ভিসার ব্যাপারে অনেকেরই খারাপ অভিজ্ঞতা আছে। তবে আমি খুব সহজেই পেলাম। ই-টোকেনের জন্য আবেদন করার পর সব আনুষ্ঠিকতা সেরে ১৪ দিনের মাথায় ভিসা পেয়ে গেলাম। কিন্তু আমার সাথে আরো তিনজন আবেদন করেছিল। তাদের বেশ ভোগান্তি পোহাতে হল। শেষ পর্যন্ত তিনজনের একজন মাত্র ভিসা পেল, বাকি দুইজন পেল না। ভিসা পেয়েই বাসের টিকেট করে নিলাম। ঢাকার কল্যাণপুর থেকে গ্রীনলাইন পরিবহণের বাস। যাত্রার দিনক্ষণ অক্টোবরের ৯ তারিখ, রাত দেড়টায়।

২.

০৯.১০.২০১৫

প্রথম বিদেশ ভ্রমণ বলে মনের ভিতর এক ধরনের রোমাঞ্চকর অনুভূতি কাজ করছিল। সেই অনুভূতি নিয়েই শুরু হল ইন্ডিয়া যাত্রা। রাত ঠিক দেড়টায় বাস ছাড়ল। বেনাপোল পৌঁছাতে পৌঁছাতে সকাল আটটা বেজে গেল। সীমান্তের খুব কাছেই নাস্তা সেরে ইমিগ্রেশনের কাজ শুরু করলাম। ইমিগ্রেশন ফর্ম পূরণ ও ট্রাভেল ট্যাক্স প্রদানের পর দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে, পাসপোর্টে সিল নিয়ে সীমান্ত পার হলাম। ওপারে গিয়ে পেট্রাপোল ইমিগ্রেশন সেন্টার। সেখানে গিয়ে রীতিমত ঘন্টা-তিনেক দাঁড়িয়ে থাকত হল। অবশেষে ইন্ডিয়া প্রবেশের ছাড়পত্র পেলাম। সীমান্তের দু’পাশেই দালালের অধিক্য দেখলাম খুব। টাকার বিনিময়ে দালালরা অনেককেই লাইনের সামনের দিকে ঢুকিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু বলার কেউ নাই। ইমিগ্রেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাথে দালালদের যোগসূত্র আছে বলে মনে হল।

ওপারে যাওয়ার পরই দেখলাম গ্রীনলাইন পরিবহনের বাস দাঁড়িয়ে আছে। পাশেই কাউন্টার। ঢাকা বা কলকাতা থেকে ছেড়ে আসা সব বাসেরই নিয়ম এক। সীমান্ত পর্যন্ত এক বাস। তারপর সীমান্ত পার হয়ে একই পরিবহনের অন্য বাসে উঠতে হয়। ভাড়া আলাদাভাবে দিতে হয়। আমরা কাউন্টারে গিয়ে ২৮০ রূপি ভাড়া পরিশোধ করে টিকেট নিলাম। গন্তব্য ব্রিটিশ উপনিবেশ আমলের প্রথম রাজধানী কলকাতা। যারা কম খরচে যেতে চান তাদের জন্য আরেকটি উপায় আছে। পেট্রাপোল থেকে ২০ রূপিতে বনগাঁ রেলস্টেশন। সেখান থেকে মাত্র ২২ রূপিতে কলকাতার শিয়ালদহ স্টেশন। আমাদের সাথে আসা ইন্ডিয়ান নাগরিকদের বেশিরভাগকে এই পথেই যেতে দেখলাম।

দুপুর সাড়ে বারটায় বাস ছাড়ল। যশোর রোড ধরে এগুতে লাগল গাড়ি। বহু ইতিহাসের সাক্ষী এই যশোর রোড। এই রাস্তা ধরেই ব্রিটিশদের সাথে লড়াই করতে এসেছিলেন বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলা। উপনিবেশ আমলে পূর্ব বাংলা ও পশ্চিমবঙ্গের সংযোগ সড়ক ছিল এটি। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশ থেকে যাওয়া শরণার্থীরা এই সড়কের দুই পাশে স্থাপিত শিবিরগুলোতে আশ্রয় নেয়। ১৯৭১ সালের শেষ দিকে মার্কিন কবি অ্যালেন গিনেসবার্গ তার বন্ধু সদ্য প্রয়াত সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়-কে নিয়ে শরণার্থী শিবিরগুলো দেখতে যান। প্রচন্ড বৃষ্টির কারনে সে সময় যশোর রোড পানিতে ডুবে যায়। দুজনে নৌকায় করে সেখানে পৌঁছান ও শরণার্থীদের দুর্দশা প্রত্যক্ষ করেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই অ্যালেন গিনেসবার্গ লিখেন তার বিখ্যাত কবিতা ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’। তিনি নিজেই সুর করে একে গানে রূপ দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে অকাল প্রয়াত খান মোহাম্মদ ফারাবি একে বাংলায় অনুবাদ করেন। ১৯৯৯ সালে সদ্য প্রয়াত চলচ্চিত্র পরিচালক তারেক মাসুদ তার ‘মুক্তির কথা’ চলচ্চিত্রে বাংলা গানটি ব্যবহার করেন। কণ্ঠ দেন ওপার বাংলার জনপ্রিয় শিল্পী মৌসুমী ভৌমিক।

যশোর রোড ধরেই বনগাঁ। বনগাঁর পথ ধরে যেতে যেতে পাকিস্তান আন্দোলনের তরুণ ছাত্রনেতা শেখ মুজিবর রহমানের লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র কথাগুলো মনে পড়ছিল। দেশভাগের সময় ‘যশোর জেলার সংখ্যাগুরু মুসলমান অধ্যুষিত বনগাঁ জংশন অঞ্চল কেটে’ নেয়ায় তিনি বেশ আফসোস প্রকাশ করেছিলেন। ৪৭’র আগে যশোর, ঝিনাইদহ, মাগুরা, নড়াইল এবং বনগাঁ- এই পাঁচটি মহকুমা নিয়ে ছিল বৃহত্তর যশোর জেলা। রেডক্লিফের প্রথম প্রকাশিত মানচিত্রেও বনগাঁ মহকুমা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অধীনে ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে ১৮ আগস্ট শার্শা ও মহেশপুর থানা বাদ দিয়ে বাকি বনগাঁ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের অধীনে দিয়ে নতুন মানচিত্র প্রকাশ করা হয়। বনগাঁ স্টেশন অনেক আগে থেকেই প্রসিদ্ধ। ব্রিটিশ আমলে পূর্ব বাংলার সাথে যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম ছিল এই জংশন। স্টেশনটি দেখা হল না। দেখতে না পারার অতৃপ্তি থেকে গেল।

পেট্রাপোল থেকে কলকাতা মাত্র ৮৪ কি.মি.। পুরা পথ উত্তর চব্বিশ পরগণা জেলায়। সমগ্র বাংলার রূপ আসলে একই রকম। কোন ফারাক নাই। যেতে যেতে ধারণাটা আরো মজবুত হল। মনে হচ্ছিল বুঝি বাংলাদেশেরই কোন এক মহাসড়ক ধরে যাচ্ছি। রাস্তার দুই পাশে সেই একই সবুজ ধানখেত, সারি সারি কলাগাছ, নুয়ে পড়া কচুপাতা বা কচুরিপানার পুকুর। থেকে থেকে গেরস্থ বাড়ির পুকুর পাড়ে সগর্বে দাঁড়িয়ে থাকা নারকেল গাছ ও বয়ে যাওয়া ছোট ছোট খাল। সাথে বাঙালি নারীর কর্মব্যস্ত দুপুর আর নাম না জানা পাখির ডাকতো ছিলই। বাস এগুতে থাকে।

বারাসাত পেরিয়ে কলকাতায় ঢুকার মুখেই জ্যামে পড়লাম। জ্যামের মধ্যেই আস্তে আস্তে পার হচ্ছিলাম শিয়ালদহ স্টেশন। সেই শিয়ালদহ স্টেশন। কালবেলার নায়িকা মাধবীলতা যে স্টেশন থেকে ট্রেন ধরে বেলঘরিয়া যেত প্রতিদিন। আহ! মাধবীলতা। আমাদের আধাসামরিক দিনগুলোর প্রথম কদম ফুল। মাধবীলতার স্টেশনেও নামা হল না। দূর থেকে দেখেই সন্তুষ্ট থাকতে হল। বাস চলছে। আমাদের গন্তব্যস্থান মধ্য-কলকাতার নিউমার্কেট এলাকার মার্কুইস স্ট্রিট। সেখানে পৌঁছাতে পাক্কা পাঁচ ঘন্টা লেগে গেল। বাস থেকে নামলাম সাড়ে পাঁচটার দিকে। ততক্ষণে কলকাতায় মাগরিবের সময় হয়ে গেছে। দুই রাতের জন্য কাছের একটি হোটেলে রুম ভাড়া করলাম। খরচ খুব বেশি নয়। হোটেলে গিয়ে গোসল সেরে কিছুক্ষণ জিরিয়ে নিলাম। তারপর নিউমার্কেট এলাকা দেখতে বের হলাম। পূজার সময় বলে পুরা মার্কেট এলাকা বেশ জমজমাট। শুধু কেনা-কাটা নয়, আড্ডার জন্যও অনেকে জড়ো হয়েছে। মোড়ে দাঁড়িয়ে অনেকেই চা খেয়ে আর খোশগল্প করে আড্ডাপ্রিয় বাঙালির চিরায়ত রূপের জানান দিচ্ছে।

কলকাতা নিউ মার্কেট ও এস হগ মার্কেট এলাকা অনেকটাই আমাদের নিউমার্কেট ও বঙ্গবাজার এলাকার মত। মার্কেটের বাইরে ফুটপাতেও অনেকে পসরা বিছিয়ে বসেছে। হকারদের মুখে ‘একশ-দুইশ’ সুর শুনে ঢাকার কথা মনে পড়ছিল। বেশ অল্প দামেই অনেক কিছু পাওয়া যায়। বিশেষ করে স্ট্রিট ফুড, কসমেটিক্স এবং মেয়েদের সাজ-সরঞ্জামের জিনিসপত্রের দাম বাংলাদেশের তুলনায় অনেক কম মনে হল। নিউমার্কেটের পাশেই একটি মুসলিম হোটেলে রাতের খাবার খেলাম। বাংলাদেশ থেকে ফেরার টিকেট করে আসতে পারি নাই। পূজার মৌসুমের কারনে টিকেট সংকট বলে জানিয়েছিল দেশের ট্রাভেলস এজেন্সিগুলো। হোটেলে ফেরার আগে তাই ফেরার টিকেটের খোঁজ নিতে হল। অবশেষে ডিভা ট্রাভেলস এর মুন্না আংকেলের সুবাদে টিকেট পেলাম। যদিও টাকা কিছুটা বেশিই লেগেছে।এরপর আশেপাশের আরো কিছু অলি-গলি ঘুরে সাড়ে দশটা নাগাদ রুমে ফিরলাম। তারপর ঘুমের প্রস্তুতি এবং ঘুম। নিঃস্বপ্ন নিদ্রায় কেটে গেল বিদেশ বিভূঁইর প্রথম রাত।