লেখা

ইসলামী ফাইন্যান্স না হালাল ক্যাপিটালিজম? একটি পলিটিকাল-ইকনমি পর্যালোচনা (দ্বিতীয় পর্ব )
ইসলামী ফাইন্যান্স না হালাল ক্যাপিটালিজম? একটি পলিটিকাল-ইকনমি পর্যালোচনা (দ্বিতীয় পর্ব )
০১ ফেব্রুয়ারি ২০১৬

প্রথম পর্বে আমরা দেখেছিলাম কিভাবে “ইসলামী অর্থনীতি” তার আদর্শগত ফোকাস থেকে বিচ্যুত হয়ে প্রচলিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থার হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। বহু ইসলামী পণ্ডিত ও বুদ্ধিজীবী এই তথাকথিত ইসলামী অর্থনীতির প্রকাশ হিসেবে ইসলামী ব্যাংকিং সিস্টেমের অগ্রযাত্রাকে নিছকই পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক পদ্ধতির “ধর্মীয় সম্প্রসারণ” হিসেবে দেখছেন। এ সমস্যা থেকে উত্তরণে অধুনা বিশ্বের রাজনৈতিক অর্থনীতির আলোকে ইসলামী অর্থনীতির বাস্তবায়নকে সুগভীরভাবে পর্যালোচনা সময়ের দাবী। রাজনৈতিকভাবে সচেতন নয় এরকম যেকোন অর্থনৈতিক চিন্তাভাবনা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে বাধ্য, কেননা রাজনীতিই অর্থনীতিক ক্রিয়াকলাপের প্রাণশক্তি যুগিয়ে থাকে।

রাজনৈতিক অর্থনীতি’র মোড়কে ইসলামী অর্থনীতির বাস্তবায়ন সম্ভাব্যতার আলোচনার পূর্বে “রাজনৈতিক অর্থনীতি” প্রত্যয় সম্পর্কে একটি মৌলিক ধারণা থাকা জরুরী। অষ্টাদশ শতাব্দীতে রাষ্ট্র ও অর্থনীতির মধ্যকার সম্পর্ক বিশ্লেষণের প্রেক্ষাপটেই এ প্রত্যয়টির উদ্ভব ঘটে এবং বর্তমান সময় পর্যন্ত এটি বিভিন্ন সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার আলোচনা –সমালোচনায় বহুল ব্যবহিত। রেনেসাঁ পরবর্তী সময় থেকে অষ্টাদশ শতকের প্রারম্ভিককাল পর্যন্ত সমাজ- রাষ্ট্রের খ্যাতিমান চিন্তকদের আলোচনায় অর্থনীতি তেমন গুরুত্ব পায়নি, যদিও অর্থনীতিক কাঠামো রাষ্ট্রের ভিত্তিপ্রদায়ক শক্তিসমুহের অন্যতম। এই বিষয়টিকে সামনে রেখেই রাজনৈতিক অর্থনীতি প্রত্যয়টির আগমন ঘটে।

অর্থনীতি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজ বিজ্ঞান প্রভৃতি একাডেমীক শাখা থেকে উদ্ভূত তত্ত্ব, পদ্ধতি, নিয়মনীতি প্রভৃতির সমাবেশ ঘটিয়ে রাজনৈতিক অর্থনীতি ব্যক্তি ও সমাজের মধ্যকার অর্থনীতিক সম্পর্ক, সমাজের বিভিন্ন দল, গোষ্ঠী, উপগোষ্ঠীর মধ্যকার রাজনৈতিক- অর্থনৈতিক সম্পর্ক, রাষ্ট্র ও বাজারের সম্পর্ক, রাষ্ট্রের উপর বাজারের প্রভাব অথবা বাজারের উপর রাষ্ট্রের অথবা একটির দ্বারা অন্যটির নিয়ন্ত্রণ প্রভৃতির বিশদ আলোচনা করে। খুব সংক্ষিপ্ত ও সহজভাবে বললে, রাজনৈতিক-অর্থনীতি হল এক ধরনের অধ্যয়ন যেখানে সমাজ-রাস্ট্র জীবনের বহুবিধ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ফ্যাক্টরসমুহ বিবেচনায় রেখে একটি রাষ্ট্র কিভাবে পরিচালিত হয় সে বিষয়ে আলোকপাত করে।


উপরের আলোচনা থেকে এটা স্পষ্ট যে রাজনৈতিক অর্থনীতি সমাজ অথবা রাষ্ট্রকে একটি সামগ্রিক প্রেক্ষাপট থেকে আলোচনা ও বিশ্লেষণ করে। শুধু রাজনীতি অথবা শুধু অর্থনীতির আলোচনায়  পদ্ধতিগত ফাঁকফোকর বা অসংলগ্নতা থেকে যায় ; রাজনৈতিক অর্থনীতির আলোচনার এমনটি হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। গত কয়েক দশকের ইসলামী অর্থনীতির বিভিন্ন ধারনার বাস্তবিক প্রয়োগে শুধু অর্থনৈতিক বিষয়টিকে বিবেচনা করে যে ভ্রান্তির উদ্ভব ঘটেছে তা মোকাবেলায় এজন্যই রাজনৈতিক অর্থনীতি দৃষ্টিভঙ্গিটি গুরুত্বপুর্ন আলোচনা ও অধ্যয়নের দাবীদার।

পৃথিবীতে বর্তমানে অস্তিত্বশীল মতাদর্শসমূহের মধ্যকার পার্থক্যের একটি মূলসূত্র হল “অর্থনীতি কিভাবে পরিচালিত হবে”,।  অর্থনৈতিক নীতিসমুহই সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মধ্যকার সম্পর্কেরই ভিত্তি প্রদান করে। পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের – গত শতাব্দীর দ্বিতীয় দশক থেকে নবম দশক পর্যন্ত পৃথিবীতে প্রভাবশালী দুটি সামাজিক ব্যবস্থা- মধ্যকার আসল পার্থক্যই হল নিজ নিজ রাজনৈতিক অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর সমাজতান্ত্রিক আদর্শকে কয়েকটি দেশে কোনরকমে অক্সিজেন দিয়ে বাঁচিয়ে রাখলেও পুঁজিবাদীদের তাণ্ডবে খুব বেশীদিন টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে বলে মনে হবেনা।

সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন উঠতে পারে ইসলাম কি তাহলে পুঁজিবাদ বা সমাজতন্তের মতই কোন জীবন বা রাষ্ট্রব্যবস্থা? উত্তর হল হ্যা, ইসলামও এদের মতই  সমাজ বা রাষ্ট্র ব্যবস্থা। ইসলামকে একটি সম্পূর্ণ জীবনব্যবস্থা হিসেবে মেনে নেওয়া ও মান্য করা একজন মুসলিমের উপর ফরজ। মজার ব্যাপার হল ইসলামকে রাজনীতি থেকে বা জীবনের বৃহত্তর পরিসর থেকে আলাদা করে শুধুমাত্র কয়েকটি নিষ্ক্রিয় ক্ষেত্রে (জন্ম, মৃত্যু বা বিবাহের অনুষ্ঠানের) সীমাবদ্ধ করে ফেলার যে স্পৃহা বা প্রচেষ্টা তা ইসলামকে হেয় করা বা অস্বীকার করারই নামান্তর। ইসলাম যেমন শুধুমাত্র আল্লাহ্‌র ইবাদতে মশগুল হওয়ার খায়েশে বন-জঙ্গলে সাধুসন্ন্যাসীদের একাকী ইবাদতকে সমর্থন করেনা, ঠিক তেমনি আল্লাহকে ভুলে বস্তুগত অর্জনকেও সমর্থন করেনা। এই দুয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখেই মানবের আল্লাহ্‌কে সন্তুষ্টি করার পথই ইসলাম বাতলে দেই।

ইসলাম সর্বকালের জন্য, সবার জন্য তার প্রমান হল ইসলাম মানবজাতিকে একটি সুসংহত রাজনৈতিক অর্থনীতিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রেসক্রিপশন করেছে। এটা কিছুটা অযৌক্তিক মনে হতে পারে এই মর্মে যে রাজনৈতিক অর্থনীতি প্রত্যয়টির জন্মই হয়েছে কয়েকশত বছর আগে অর্থাৎ ইসলামের বহু শতাব্দী পরে। উত্তরে শুধু এটুকুই বললে পর্যাপ্ত হবে যে মানবজাতির সূচনালগ্ন থেকে এটির অস্তিত্ব বিদ্যমান ছিল। পরবর্তীতে এটিকে একটি “জ্ঞান শাখার” আওতাভুক্ত করা হয়েছে।

রাসুল(সঃ)এর সময়ে যে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সেখানকার যে রাজনৈতিক অর্থনীতি ছিল সেটাই আমাদের বর্তমান সময়কার ইসলামী রাজনৈতিক অর্থনীতির ভিত্তি হিসেবে প্রাণশক্তি যোগাবে, এর অন্যথা হওয়ার কোন সুযোগ নেই। তাহলে এটা খুব সহজেই বোঝা যাচ্ছে, বর্তমান পুঁজিবাদী রাজনৈতিক অর্থনীতির মধ্য থেকে ইসলামী অর্থনীতিকে বিকশিত করার যে প্রচেষ্টা তা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে বাধ্য যদি না ইসলামী রাজনৈতিক অর্থনীতিকে হিসেবে না আনা হয়।

সমাজ-রাষ্ট্রের গভীরে প্রোথিত ক্রিয়াশীল ও প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানসমূহের ইসলামীকীকরন না হলে কেন্দ্র থেকে দূরবর্তী প্রতিষ্ঠানসমূহের যতই উন্নয়ন করা হোক না তা কখনই ইসলামী অর্থনীতির সুফল বয়ে আনবেনা। এছাড়াও পাশাপাশি দরকার ইসলাম কর্তৃক স্বীকৃত, অনুমোদিত এবং উৎসাহিত প্রতিষ্ঠানসমূহের উন্মেষ ঘটানো। এই প্রক্রিয়াটি কোন কিছু “হয়ে” যাওয়ার দিকে অগ্রসর হবেনা, বরং সবসময় “হওয়ার” পর্যায়ে থাকবে।

ইসলামী অর্থনীতি তখনই কাঙ্ক্ষিত সাফল্য বয়ে আনবে যখনই এটি ইসলামের আদর্শে উজ্জীবিত ও পরিচালিত সমাজ –রাষ্ট্র ব্যবস্থার অভ্যন্তরে পরিচালিত হবে।  তাই পুঁজিবাদী সিস্টেমের অন্ধ অনুকরণ ছেড়ে বৃহত্তর আঙ্গিকে ইসলামী  রাজনৈতিক অর্থনীতির বোধগম্যতা ও প্রচার-প্রসার ও সে মোতাবেক ইসলামের আলোকে প্রতিষ্ঠানসমূহের উন্নয়নসাধন ও চলমানতা বজায় রাখা অতীব জরুরী। ইসলামী  রাজনৈতিক অর্থনীতি আল কুরআন ও সুন্নাহের নির্যাস নিয়েই পুষ্ট হবে এবং ইসলামীক ন্যারেটিভ এর আওতাভুক্ত থেকেই আধুনিক চিন্তা ভাবনা সমুহকে আত্মস্থ করবে।

ইসলামী অর্থনীতি নিয়ে গভীরভাবে অধ্যয়ন করে আসুতায় (২০০৭) ইসলামী অর্থনীতির ছয়টি গুরুত্বপুর্ন ও প্রয়োজনীয় উপাদানের কথা বলেছেনঃ

১. কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে কাঠামোগত ধারনাভিত্তি
২. মূল্যবোধ পদ্ধতি
৩. অস্তিত্বগত স্বতঃসিদ্ধ বিষয়
৪. বাস্তবজগতে ক্রিয়াশীল হওয়ার মত মেকানিজম
৫. সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি
৬. ক্রিয়াশীল প্রতিষ্ঠানসমুহ  

 

Divergence between aspirations and realities of Islamic economics: A political economy approach to bridging the divide by Nazim Zaman and Mehmet Asutay, published in IIUM Journal of Economics and Management 17, no. 1 (2009): 73-96 © 2009 by The International Islamic University Malaysia আর্টিকেল এর একটি পর্যালোচনা।