লেখা

ইসলামী ফ্যাইন্যান্স না হালাল ক্যাপিটালিজম? একটি পলিটিকাল-ইকনমি পর্যালোচনা (প্রথম পর্ব)
ইসলামী ফ্যাইন্যান্স না হালাল ক্যাপিটালিজম? একটি পলিটিকাল-ইকনমি পর্যালোচনা (প্রথম পর্ব)
২৬ জানুয়ারি ২০১৬

ইসলামী অর্থনীতি নিয়ে প্রথম দিকের তত্ত্বগুলো ইসলামের সামাজিক ও অর্থনীতি সম্পর্কিত নীতির আলোকে সামাজিক উন্নয়নের ধারনা দিয়েছিল। বিশ শতকের ষাটের দশকে উদ্ভূত হওয়া আধুনিক ইসলামী অর্থনীতির একমাত্র প্রতিফলন হল ইসলামী ব্যাংকিং এবং অর্থায়ন ইন্ডাস্ট্রি। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, কথিত “ইসলামী ব্যাংকিং এবং অর্থায়ন” প্রচলিত অর্থনীতির সাথে গুলিয়ে গেছে, যা ইসলামের অর্থনীতির আশা আকাংখা প্রতিফলনে ব্যর্থ হয়েছে। 

ইসলামী অর্থনীতির ভিত্তিপ্রদায়ক তাত্ত্বিকেরা ইসলামের সুবিচার, সমতা, ভ্রাতৃত্ব, সহযোগিতা প্রভৃতি মহৎ নীতির আলোকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বপক্ষে লিখেছিলেন। ১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকে হাঁটি হাঁটি পা পা করে সূচিত ইসলামী ব্যাংকিং ও অর্থায়ন পদ্ধতি বর্তমানে মহীরুহের আকার ধারণ করেছে। কিন্তু, ইসলামী অর্থনীতিকে এখন যেন মনে হচ্ছে বৈশ্বিক পুঁজিবাদী অর্থনীতির সহযোগী, অথচ যা বিপরীত হওয়ার কথা ছিল। উপসাগরীয় দেশসমুহ ছাড়া মুসলিম বিশ্বের আর কোথাও সাধারন মুসলিমদের জীবনে এটা কোন ভূমিকা রাখতে পারেনি এবং বৃহত্তর আঙ্গিকে এটার তেমন ইতিবাচক প্রভাব দেখা যায়না। এমনটা কেন হল? ইসলামী অর্থনীতির ঘোষিত নীতি ও বাস্তবতার মধ্যকার ব্যবধান তাই বহুলভাবে খুঁটিয়ে দেখার বিষয়।

গভীরভাবে এই ব্যবধানের কারণ নির্ণয় করতে আমাদের প্রয়োজন ইসলামের আলোকে অর্থনীতি ও তৎসম্পর্কিত বিষয়গুলো সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা। ইসলাম অর্থনৈতিক ক্রিয়াকলাপকে মানুষের জীবনের বৃহত্তর আঙ্গিক থেকে মূল্যায়ন ও নির্দেশ করে। একজন মুসলিমের চূড়ান্ত লক্ষ্য হল আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করে, আল্লাহ আমাদেরকে যেভাবে চান সেভাবেই নিজেদেরকে গড়ে তোলা। ইসলামের বিধিবিধান অনুসরণ করে একজন মুসলিম আত্মিক উন্নয়ন সাধন করবেন, চিন্তা ও কর্মে মহত্তের উচ্চতম আসনে উন্নীত হবেন এবং পরিশেষে পৃথিবীতে সৃষ্টিকর্তার খলীফা(প্রতিনিধি) হিসেবে সর্বোচ্চ দায়িত্ব পালন করবেন। এক্ষেত্রে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডসমুহ পরিচালিত হবে ওই চূড়ান্ত উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই। অর্থাৎ মুসলমানদের জন্য অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিজেই একটি লক্ষ্য নয় (এটি প্রচলিত অর্থনীতির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য), বরং অপর একটি লক্ষ্য (আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন) পূরণের উপায়মাত্র। 

ইসলামী অর্থনীতিবিদরা বেশ কিছু মৌলিক বিষয়ের উপর আলোকপাত করেছেন, যা ইসলামী অর্থনীতির যেকোন ক্ষেত্রে নিয়ামক নীতি হিসেবে বিবেচিত হবে। নিম্নে এমন ছয়টি বিষয়ের উল্লেখ করা হলঃ

১. তাওহিদ (একত্ববাদ): এটা দ্বারা আল্লাহর একত্ব/ অদ্বিতীয়টা/ নিরঙ্কুশ সার্বভৌমত্ব প্রভৃতিকে বুঝানো হয়। একজন মুসলিম তার সমগ্র চিন্তা ও কর্মে এটা প্রধান বিবেচ্য বিষয় হিসেবে গন্য করবেন। 

২. আদল (বিচার/ন্যায় পরায়নতা): ইসলামী শরিয়াতে যাকে যে অধিকার দেয়া হয়েছে তা পুরোপুরি প্রতিপালন করা। নাগরিকদের অধিকার, স্ত্রীর অধিকার, সন্তানের অধিকার, শ্রমিকের অধিকার সবকিছু এর অন্তর্ভুক্ত। 

৩. তাকওয়াহ (আল্লাহভিতি): সবকিছুতেই আল্লাহকে হাজির-নাজির জানা এবং মানবীয় মহৎ গুণাবলী অর্জনে নিয়োজিত থাকা।

৪. উখুওয়াহ (ভ্রাতৃত্ব): আদমের সন্তান হিসেবে মানুষে মানুষে ভ্রাতৃত্ববোধ। ইসলামী সমাজ ঘনিষ্ঠতা, পারস্পরিক সৌহার্দ্যবোধ ও সহযোগিতার নিরিখে গড়ে উঠবে যা আদলের বাস্তবভিত্তিক বহিঃপ্রকাশ। 

৫. খিলাফাহ (আল্লাহ্‌র প্রতিনিধিত্ব): মহান আল্লাহ্‌র প্রতিনিধি হিসেবে এটা হল মানবজাতির সবচেয়ে গুরুভার। পরকালে প্রতিটি মানুষকেই এই দায়িত্বের ব্যাপারে জবাবদিহি করতে হবে। এটা শুধু শাসকদের নয়, বরং সবার জন্যই প্রযোজ্য। 

৬. ইহসান (পরম উৎকর্ষ): তাওহীদ হল ইসলামী জীবনবিধানের ভিত্তি আর তার সর্বশেষ ফলাফল হল একজন মুসলিম তার জীবনে ইহসান অর্জন করবে। ইহসান অর্জনকারী মুসলিমের জীবনাচরণের সর্বত্রই ইসলামের আদর্শের প্রতিফলন ঘটবে এবং ব্যক্তি তার সকল কর্মকাণ্ডের ভিত্তি হিসেবে আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি লাভকেই প্রাধান্য দিবে। 

এই ছয়টি গুণের সাথে আরও বহু গুণাবলী উল্লেখ করার মত আছে যেমন সবর, উবুদিয়াহ, শুকুর, রুবুবিয়াহ, জিহাদ প্রভৃতি। 

যাই হোক, উপরিউক্ত ছয়টি গুণাবলী কিন্তু এমন নয় যে এগুলো একটির পর আরেকটি অর্জন করতে হবে। বরং একটি অর্জিত হলে তা পরবর্তীটি অর্জনে ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে। এভাবে একজন মুসলিম তাওহিদের বিশ্বাস থেকে ইহসানের পথে অগ্রসর হবেন। এই যাত্রা কখনো শেষ হবেনা, বরং ব্যক্তির তিরোধানের আগ নিরবচ্ছিন্ন চলতে থাকবে। 

ইসলামী পরিভাষায়উন্নয়নপ্রত্যয়ের পুনর্বিবেচনা


প্রচলিত অর্থনীতিতে “উন্নয়ন” প্রত্যয়টি জনগণের বস্তুগত প্রয়োজনকেই অধিকতর গুরুত্ব আরোপ করে এবং মানুষের বহুবিধ অর্থনৈতিক সমস্যা মোকাবেলায় আলোকায়ন সময়ের জ্ঞানতাত্ত্বিক কাঠামোর উপর নির্ভর করে। এই অর্থনীতিতে মানুষের বস্তুগত প্রয়োজন মেটানোই হলো উদ্দেশ্য এবং এখানে মানব জীবনের অপরাপর দিকসমূহ আমলে নেয়া হয়না।
ইসলামের পরিভাষায় উন্নয়ন প্রত্যয়টি একেবারেই ভিন্ন অর্থ নির্দেশ করে যেখানে মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকান্ড সমূহ জীবনের বাদবাকি দিকসমূহের সম্মেলনে একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে অগ্রসর হবে। আর তা হল আল্লাহর সন্তুষ্টি সাধন। এখানে মানুষের অর্থনৈতিক প্রয়োজন সমূহ বিবেচনার পাশাপাশি তার নৈতিক, আত্মিক উন্নতি প্রভূত বিষয়সমূহ বিবেচনা করা হয়। অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির উপর গুরত্বারোপের বদলে মানুষের মৌলিক চাহিদা সমূহের দিকটাই এখানে মুখ্য। 

ইসলামী অর্থনীতির লক্ষ্য তাই শুধুমাত্র বস্তুগত চাহিদা পূরণে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা আত্মিক ও নৈতিক উন্নয়নের ব্যাপারেও সমান সজাগ থাকবে। মানুষের অর্থনৈতিক ক্রিয়াকলাপসমূহ কিভাবে জীবনের অন্যান্য দিকসমূহের সাথে সমন্বয় করবে তার নির্দেশনা আসবে আল কুরআন এবং রাসুল (সঃ) এর জীবন অর্থাৎ সুন্নাহ থেকে। আল্লাহর নির্দেশিত পথকে আল কুরআনে সম্বোধন করা হয়েছে আল সিরাত আল মুস্তাকিম বা সোজা পথ হিসেবে। এই সোজা পথ হল আল্লাহ্‌র ইবাদাত বা দাসত্ব করা। এটাই একজন মুসলিমের চূড়ান্ত লক্ষ্য হবে। 

আল্লাহ্‌র একত্ববাদে বিশ্বাস স্থাপন এবং তিনি যা নির্দেশ করেছেন তা পালন করার মধ্যেই নিহিত রয়েছে একজন মুসলিমের সাফল্যের চাবিকাটি। সুতরাং ইসলামী অর্থনীতি বলে যা বর্তমানে ব্যাপকতর প্রচার পেয়েছে সেখানে যদি এমন মূল্যবোধের অভাব বা অনুপস্থিত থাকে তবে তা ইসলামী উন্নয়ন বলে গন্য হবেনা এবং আসল উদ্দেশ্যই ধামাচাপা পড়ে যাবে।

 

Divergence between aspirations and realities of Islamic economics: A political economy approach to bridging the divide by Nazim Zaman and Mehmet Asutay, published in IIUM Journal of Economics and Management 17, no. 1 (2009): 73-96 © 2009 by The International Islamic University Malaysia আর্টিকেল এর একটি পর্যালোচনা।