লেখা

এরদোয়ানের ‘পরহেজগার জেনারেশন’ তৈরির শিক্ষাব্যবস্থা
এরদোয়ানের ‘পরহেজগার জেনারেশন’ তৈরির শিক্ষাব্যবস্থা
২৬ এপ্রিল ২০১৬

 

শিক্ষাব্যবস্থাকে কেন্দ্রীয় বা সরকারি তত্ত্বাবধানে নিজেদের মূল্যবোধের ভিত্তিতে ঢেলে সাজানো কীভাবে সম্ভব? একটা শিক্ষাব্যবস্থা মানুষের অজান্তেই তার মনোজগতকে নিয়ন্ত্রণ করে, কোন বিশেষ মতাদর্শকে (ideology) মানুষের মাঝে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। বিভিন্ন উপায়ে মনোজগতে পরিবর্তন (psychological manipulation) আনার এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং। শিক্ষাব্যবস্থাকে হাতিয়ার করে এই প্রক্রিয়ায় সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার একটা বর্তমান ও উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হল তুর্কি।

 

কেন তুর্কিকেই উদাহরণ হিসেবে নেয়া হচ্ছে, তার কারণ হল, গত একশ’ বছরের মধ্যে তুর্কিতে দু’দফায় মতাদর্শের আমূল পরিবর্তন (upside down) ঘটেছে। এবং এই পরিবর্তনগুলোর প্রক্রিয়া স্টাডি করলে আমরা দেখতে পাই, দু’বারই এর পিছনে অন্যতম মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে শিক্ষাব্যবস্থা। 

 

প্রথমে আমরা একশ’ বছর পিছনে ফিরে যেতে চাই। বর্তমান তুর্কির অঞ্চলে তখন চলছিল উসমানীয় খিলাফাত। মুসলিম জাহান বিস্তৃত এই খিলাফাত শুরু হয়েছিল ১২৯৯ সাল থেকে। ছয়শ’ বছরেরও বেশি সময় পর উসমানীয় খিলাফাতের উপর সবচেয়ে বড় আঘাতটা আসে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়। ১৯১৮ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর দেখা গেল, মাঝখানের আনাতোলিয়ান অঞ্চলটুকু ছাড়া মানচিত্রের বাকি অংশটুকু দখল হয়ে গিয়েছে। আনাতোলিয়ান অঞ্চলের নেতৃত্বে ছিল মুস্তাফা কামাল পাশা নামক এক উসমানীয় আর্মি অফিসার। তার সফলতায়ই মূলত ঐ অঞ্চলটুকু টিকে গিয়েছিল।

 

এই কামাল পাশা মনে করতেন, প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তাদের দুর্ভাগ্যের জন্য ইসলামই দায়ী। তার মতে, “আরবদের ধর্ম (ইসলাম) গ্রহণ করার আগে থেকেই তুর্কিরা একটা মহান জাতি হিসাবে হাজির ছিল। আরবদের ধর্ম গ্রহণ করার পর এই ধর্ম আরব, ইরানী, মিশরীদের সাথে তুর্কিদের মিলিয়ে একটা একক জাতি বানিয়ে দিতে পারে নি। বরং এই ধর্মটা তুর্কি জাতির বন্ধনকে শিথিল করেছে আর জাতীয় উদ্দীপনাকে করেছে ভোঁতা। এটাই হওয়ার কথা ছিল। কারণ মুহাম্মাদ যে ধর্ম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সেটার উদ্দেশ্যই ছিল অপরাপর জাতির উপর আরবের জাতীয় রাজনীতি চাপিয়ে দেওয়া।”

[মুস্তাফা কামাল, সভ্যতার কথা (Medenî Bilgiler)]

 

অতএব তিনি ইসলামকে বিদায় করে ইউরোপীয় সংস্কৃতিকে বরণ করে নেয়ার প্রজেক্ট হাতে নিলেন। এই প্রজেক্টের অংশ হিসেবে তিনি যে সকল আইন জারি করেছিলেন, তন্মধ্যে সুদূরপ্রসারী আঘাতটা এসেছিল শিক্ষাব্যবস্থার উপর। সব মাদ্রাসা সহ অন্য সকল ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে সেক্যুলার চিন্তাধারার পড়াশোনা চালু করা, এসব তো ছিলই। তবে সবচেয়ে গুরুতর ছিল তুর্কি বর্ণমালাই বদলে ফেলা। উর্দু ও ফার্সি যেমন আরবি হরফে লেখা হয়, তখন তুর্কি ভাষাও ছিল তেমন। কিন্তু কামাল আরবি হরফ নিষিদ্ধ করে তার পরিবর্তে ল্যাটিন হরফে তুর্কি ভাষার প্রচলন ঘটালেন। ফলে তৎকালীন তরুণ জেনারেশনের কাছে অতীত হয়ে উঠলো দুর্বোধ্য এবং পাঠের অনুপযোগী (unreadable)। এছাড়া আরবি ও ফার্সিসহ অন্যান্য ভাষার শব্দগুলোকে বাদ দিয়ে তুর্কি ভাষাকে ‘বিশুদ্ধ’ করার জন্য একটা কমিশনও গঠন করা হয়েছিল। এই পুরো প্রক্রিয়ার ফলাফল হল এই --- একটা নতুন জেনারেশন আসলো, যাদের চিন্তাধারা হয়ে উঠলো কামালের নিজস্ব চিন্তাধারার কার্বন কপি। অতীত গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস সেই প্রজন্ম জানতে পারলো না, তারা যা জানলো তা ছিল কামালের তৈরি মনগড়া ইতিহাস।

 এরদোগান

 

এবার আমরা বর্তমানে ফিরে আসি। ২০০২ সাল থেকে এই মুহূর্ত পর্যন্ত তুর্কির ক্ষমতায় আছে ‘আদালেত ওয়া কালকিনমা পার্টিসি’ তথা একেপি বা আক পার্টি, ইংরেজিতে বলা হয় ‘জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি’ বা জেডিপি। এরা হচ্ছে সেই বদিউজ্জামান সাঈদ নুরসীর আদর্শের উত্তরসূরি, যার কারণে কামালের যুগের সময়ও তুর্কিতে ইসলামের আলো কখনোই পুরোপুরি নিভে যায় নি। আর এখন আক পার্টির এরদোয়ান, দাউতোগলু, গুল প্রমুখদের হাত ধরে আজ আবারও সেই আলো উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। যদিও কাগজে-কলমে আক পার্টির মূলনীতি ইসলাম নিরপেক্ষ, কিন্তু কর্মক্ষেত্রে তাদের বিভিন্ন উদ্যোগ বিশ্লেষণ করলে অবশ্য অন্য কিছু দেখা যায়। আর তাই একাডেমিশিয়ানরা তাদের মতাদর্শকে (ideology) ‘Neo-Ottomanism’ বা ‘নয়া-উসমানীয়’ মতাদর্শ বলে অভিহিত করেন।

 

এই নয়া-উসমানীরা তুর্কির শিক্ষাব্যবস্থায় কেমন পরিবর্তন এনেছে, তা ব্যাখ্যা করতে হলে আমাদের নজর দিতে হবে ‘ইমাম হাতিপ’ স্কুলের অগ্রযাত্রার দিকে। ইমাম হাতিপ স্কুল মূলত অনেকটা আমাদের দেশের আলিয়া মাদ্রাসা শিক্ষার মত, ক্বওমী মাদ্রাসার মত সম্পূর্ণ আলাদা ধর্মীয় কারিকুলাম নয়। বরং সেখানে অন্য সাধারণ স্কুলে পড়ানো বিষয়গুলো সব একইরকম, শুধু তার সাথে ‘আবশ্যিক’ হিসাবে তিনটি ‘ইসলামী’ কোর্স অতিরিক্ত নিতে হয়। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে এরদোয়ানের ভাষায় একটি ‘পরহেজগার প্রজন্ম’ (religious generation) গড়ে তোলা। 

 

সম্প্রতি এই স্কুলগুলোর সংখ্যা অন্য যেকোনো যুগের চেয়ে অনেক বেড়ে গিয়েছে। ২০১০ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে ইমাম হাতিপ স্কুলের সংখ্যা অন্য সব জুনিয়র হাই স্কুলের তুলনায় ৮.৪ শতাংশ এবং হাই স্কুলের তুলনায় ১০ শতাংশ বেড়েছে। ২০১০-১১ সালে যেখানে ইমাম হাতিপ স্কুলের সংখ্যা ছিল ৪৯৩, সেখানে আজ সংখ্যাটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৫৪। অর্থাৎ এই কয়েক বছরে ইমাম হাতিপ স্কুলের সংখ্যা ৭৩ শতাংশ বেড়েছে, যেখানে ভোকেশনাল স্কুলের সংখ্যা বেড়েছে ২৩ শতাংশ এবং আনাতোলিয়ান স্কুলের সংখ্যা বেড়েছে ৫৭ শতাংশ। ২০১৪ সালে সর্বমোট ৬৪,২০,৮৯৭ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ইমাম হাতিপ স্কুলের শিক্ষার্থী সংখ্যা ৪,৭৪,০৯৬ জন। ২০১০ সালে যেখানে শিক্ষার্থী বৃদ্ধির পরিমাণ ছিল ৫ শতাংশ, ২০১৪ সালে সেটা হয়েছে ৭.৩ শতাংশ।

 

ইমাম হাতিপ স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা সুযোগ-সুবিধাও অন্যদের তুলনায় এখন বেশি পাচ্ছে। যেমন: এই স্কুলের প্রতিটি শিক্ষার্থী এখন ট্যাবলেট কম্পিউটার পায় এবং এখানকার শিক্ষাদান পদ্ধতিও ডিজিটাল, যা সাধারণ স্কুলের চেয়ে অনেক উন্নত। ইমাম হাতিপ স্কুলের বাস ভাড়া অন্য স্কুলের তুলনায় অর্ধেক। চাকরির ক্ষেত্রেও তারা অগ্রাধিকার পাচ্ছে। সব মিলিয়ে এই স্কুলের প্রতি সরকারের যত্ন অন্য স্কুলের তুলনায় বেশি, যা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সাধারণ শিক্ষার্থীদেরকে এই স্কুলের দিকে ঝুঁকে পড়তে উৎসাহিত করছে।

 

বলা বাহুল্য, সেক্যুলার চিন্তাধারার লোকেদের চোখে ইমাম হাতিপ স্কুলের এই উত্থান ভাল লাগার নয়। তারা এর কঠোর সমালোচক। তাদের মতে এতে সাধারণ জনগণের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। ইচ্ছা না থাকলেও নাকি অনেকে বাধ্য হচ্ছে ইমাম হাতিপ স্কুলে পড়তে। তবে এ প্রসঙ্গে সেক্যুলার সমাজতান্ত্রিক এবং আক পার্টির বিরোধী আব্দুল্লাহ দামারের ভারসাম্যপূর্ণ বিশ্লেষণ উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেছেন, “সরকারি কর্তৃপক্ষ যতই এটা নিয়ন্ত্রণ করতে চেষ্টা করুক, ইমাম হাতিপ স্কুলের চাহিদা এত বেশি বাড়ত না, যদি না তৃণমূল পর্যায়েই এর নিখাদ চাহিদা থাকত। জনগণের চাহিদা হল সমাজ বাস্তবতা। এই ভিত্তির উপর যে চাহিদা তৈরি হয়, সেটাই পরিণাম লাভ করে, তা সরকার ইতিবাচক বা নেতিবাচক যতভাবেই চেষ্টা করুক না কেন।” তিনি আরও বলেন, “ইমাম হাতিপ স্কুলের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা এরকম --- তাদের শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছে,  তাদের স্কুলের সংখ্যা বাড়ছে, ইমাম হাতিপ স্কুল এবং অন্যান্য স্কুলের মধ্যে অনুপাতও বাড়ছে। কিন্তু আমরা এই ১০-১১ শতাংশ নিয়ে খুব বেশি জোর দিয়ে কথা বলছি, অথচ বাকি ৯০ শতাংশ স্কুলেও যে অনেকে যাচ্ছে – এই ব্যাপারটা অগ্রাহ্য করছি।”

 

মোটকথা হল, এরদোয়ানরা যে নৈতিক দর্শন ধারণ করে, তা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে অন্য সেক্টরগুলোর পাশাপাশি শিক্ষাব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার (priority) হিসেবে নিয়েছে। এভাবেই ধীরে ধীরে (gradually) তারা সে লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। শিক্ষাব্যবস্থায় এই ধরণের পরিবর্তনের ফলাফল হয়ত তৎক্ষণাৎ খুব গভীরভাবে বোঝা না-ও যেতে পারে, তবে একটা জেনারেশন পেরিয়ে গেলে ভালভাবে বোঝা যায় আসলে এর প্রভাব কত প্রবল। 

কাজী রুহুল্লাহ শাহরিয়ার