লেখা

কাশ্মীর যে কারনে দুনিয়ার সব প্রতিরোধ সংগ্রামের জন্য প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা -১
কাশ্মীর যে কারনে দুনিয়ার সব প্রতিরোধ সংগ্রামের জন্য প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা -১
লিখেছেন শিহান মির্জা
২৮ অগাস্ট ২০১৬

কাশ্মীরে আযাদীর দাবীতে বিক্ষোভ ধর্মঘট আজ প্রায় দেড়মাসের মত হতে চলল। যদিও বিক্ষোভ আর আন্দোলনের এই ইতিহাস অনেক পুরনো, তবে ক্ষোভের এই অগ্নিকান্ডে নতুন করে স্ফুলিঙ্গ সৃষ্টি করেছে ভারতীয় বাহিনীর সাথে এনকাউন্টারে হিযবুল মুজাহিদীন গ্রুপের তরুণ কমান্ডার বুরহান ওয়ানির শাহাদাত। আধুনিক যুগে অন্যতম দীর্ঘায়িত স্বাধীনতা সংগ্রাম ও সামরিক সংঘর্ষের ইতিহাস হচ্ছে কাশ্মীরকে ঘিরে। উপমহাদেশে ৪৭ এর পর থেকেই ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে যে স্নায়ুযুদ্ধ চলছে, সেটারও প্রধান কারণ হচ্ছে কাশ্মীর সমস্যা। কাশ্মীর সমস্যা বোঝার আগে এর ইতিহাস জানাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যা ভারতীয় উপমহাদেশের অন্য যেকোন অঞ্চলের মতই বৈচিত্র্যপূর্ণ।

 বুরহান

বুরহান ওয়ানী (ডানে)

 

কাশ্মীরের ইতিহাসঃ

খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীতে মৌর সম্রাট অশোকের সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি ছিল একদিকে বাংলা থেকে ডেক্কান,  অন্যদিকে আফগানিস্তান থেকে পাঞ্জাব পর্যন্ত, যার মধ্যে কাশ্মীরও অন্তর্ভুক্ত ছিল। খ্রিষ্টাব্দ প্রথম শতকে চায়নার উত্তর পশ্চিম থেকে আসা কুশনরা কাশ্মীর আক্রমণ করে তাদের সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করতে সক্ষম হয়। চতুর্দশ শতাব্দীতে কাশ্মীর প্রথমবারের মত মুসলিম শাসনের অধীনে আসে যদিও অষ্টম শতাব্দীতে মুসলিমরা প্রথমবারের মত কাশ্মীর জয় করার ব্যর্থ প্রচেষ্টা চালায়। ১৫৮৬ সনে সম্রাট আকবরের শাসনকালে কাশ্মীর সরাসরি মোঘল শাসনের আয়ত্তে আসে। মোঘল আমলের শাসনামলের সূচনাকে কাশ্মীরের আধুনিক ইতিহাসের গোড়া হিসেবে ধরে নেয়া হয়। মোঘল সম্রাটরা কাশ্মীরের নাম দেন ‘পৃথিবীর স্বর্গ’ এবং কাশ্মীরে রাজকীয় বাগান নির্মাণ করেন। সম্রাট আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর কাশ্মীরে মোঘল শাসন দুর্বল হতে শুরু করে।

মুঘাল

শ্রীনগরে মোঘল সম্রাট জাহাঙ্গীর দ্বারা নির্মিত রাজকীয় বাগান ‘শালিমার বাগ’ যা এখনো পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু

১৭৫১ সালে আফগান শাসক আহমেদ শাহ দুররানী কাশ্মীরের উপর কতৃত্ব স্থাপন করেন। ১৮১৯ সালে কাশ্মীর শিখ রাজা রঞ্জিত সিং কাশ্মীর দখল করে নেন। সাতাশ বছরের শিখ শাসনকাল ছিল কাশ্মীরীদের ইতিহাসের একটি কালো অধ্যায়। কাশ্মীরের রাজধানী শ্রীনগরের সবচেয়ে বড় মসজিদটি বন্ধ করে দেয়া হয়। গরু জবাই নিষিদ্ধ করা হয় এবং ভারী করের বোঝার কারণে কাশ্মীরীদের জীবন অসহনীয় হয়ে ওঠে। দারিদ্র্যের সীমাহীন বৃদ্ধির কারণে কাশ্মীর ছেড়ে বহু লোক পাশ্ববর্তী অঞ্চল পাঞ্জাবের বিভিন্ন শহর তথা অমৃতসার, লাহোর এবং রাওয়ালপিন্ডিতে চলে যায়। ১৮৪৬ সালে প্রথম ইংরেজ-শিখ যুদ্ধে রঞ্জিত সিং ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে পরাজিত হলে দুপক্ষের মধ্যে অমৃতসার চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যার ফলে কাশ্মীর ইংরেজদের করতলগত হয়। কিন্তু ইংরেজরা কাশ্মীরকে নিজেদের হাতে না রেখে ইংরেজ-শিখ যুদ্ধে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করার পুরষ্কার স্বরূপ পাশ্ববর্তী জম্মু দোগরা শাসক গুলাব সিং এর কাছে বেঁচে দেয় ৭৫ লক্ষ রুপির বিনিময়ে। আর এভাবেই সৃষ্টি হয় জম্মু এবং কাশ্মীর রাজ্য যা ভারত দখল করে নেয়ার পূর্ব পর্যন্ত দোগরা শাসকদের অধীনস্থ ছিল এবং যা ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের প্রায় ৬০০ অর্ধস্বাধীন রাজ্যের একটি। এই অর্ধস্বাধীন রাজ্যগুলো অফিসিয়ালি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল না, কিন্তু আবার পূর্ণ সার্বভৌমত্বের অধিকারীও ছিল না। বিশেষভাবে, এসব রাজ্যের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ন্ত্রিত হত ব্রিটিশ সাম্রাজ্য কর্তৃক।

 

প্রায় একশ বছরের দোগরা শাসনামল কাশ্মীরের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর জন্য অনেকটা শিখ শাসনের সম্প্রসারণই ছিল। বেগার খাটানো বা বিনামূল্যে বিভিন্ন সরকারী কাজে কাশ্মীরী সাধারণ লোকদের বাধ্যতামূলকভাবে খাটানো ছিল খুবই সাধারণ ব্যাপার। ১৮৯৩ সালে সরকারীভাবে বেগার খাটানোকে নিষিদ্ধ করা হলেও, ১৯৪৭ এর আগ পর্যন্ত কাশ্মীরীর প্রত্যন্ত অঞ্চলে বেগার খাটানোর প্রথা চালু ছিল। জম্মু ও কাশ্মীরের যেসব অঞ্চলে মহারাজা বিস্তৃত জমির অধিকারী ছিলেন সেখানে চাষীদের কাছ থেকে এত বেশী রাজস্ব আদায় করা হত যে, সাধারণ বছরগুলোতেও রাজস্ব আদায় শেষে চাষীদের নিকট কেবল প্রান্তিক পরিমাণ অংশই বাকি থাকতো। আর কোনবছর দুর্ভিক্ষ হলে তো কথাই নেই। ফলে গ্রামাঞ্চলের দিকে ঋণগ্রস্থ এবং সুদী মহাজনদের সংখ্যা বাড়তে থাকে। শিল্প ও বাণিজ্যের উপর উচ্চহারে শুল্ক আরোপ করা হয়। বস্ত্রশিল্পের উপর ৮৫% শুল্ক আরোপ করা হত। রাজ্যের প্রতিটি ক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর প্রতি বৈষম্য করা হত যা থেকে আইন প্রণয়নের খাতটিও বাদ ছিল না। গরু জবাই করা ছিল গুরুদন্ডনীয় অপরাধ যা ১৯৩৪ সাল পর্যন্ত বলবৎ ছিল। এর পর থেকে ৪৭ পর্যন্ত একে লঘুদন্ডের যোগ্য মনে করা হত। প্রশাসনের প্রতিটি পর্যায়ে ছিল কাশ্মীরী ব্রাক্ষণদের আধিপত্য যাদের ছিল  ব্যাপক দুর্নীতিপরায়ণ। কাশ্মীর উপত্যকায় হিন্দুদের আগ্নেয়াস্ত্র রাখার অনুমতি থাকলেও মুসলিমদের ছিল না। মুসলিমদের ধর্মীয় বিভিন্ন ব্যাপারেও সরকার নাক গলাতে দ্বিধাবোধ করত না। 

 

১৯৩০ এর দশকের শুরু থেকে কাশ্মীরের মুসলিমরা এসব অন্যায় এবং বৈষম্যের বিরুদ্ধে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হওয়া শুরু করে। জম্মু ও কাশ্মীরের দোগরা শাসকদের  প্রতি কাশ্মীরের মুসলিমদের মনে যে একটি সাধারণ নাপছন্দী কাজ করত তা সহসাই দোগরা শাসন থেকে মুক্ত হওয়ার সংঘবদ্ধ রাজনৈতিক আন্দোলনের রূপ নেয় ১৯৩১ সালের একটি ঘটনার ফলে। জম্মুতে কয়েকটি জায়গায় প্রশাসনের কর্মকর্তারা মসজিদ ও কোরআন শরীফের অবমাননা করলে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে একটি সমাবেশে উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত থেকে আসা আবদুল কাদির নামে একজন রাজার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ডাক দিলে সাথে সাথে তাকে গ্রেফতার করা হয়। ১৩ জুলাই ১৯৩১-এ শ্রীনগর কেন্দ্রীয় কয়েদখানায় আবদুল কাদিরের মামলার শুনানি ধার্য করা হয়। সেদিন শ্রীনগর কেন্দ্রীয় কয়েদখানার সামনে বিশাল জনসমাবেশের সৃষ্টি হয়। সেখানে পুলিশের সাথে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষে ২২ জন নিহত হয়। ১৩ জুলাইকে এখনো কাশ্মীরে ‘শহীদ দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়।

ন্ন

শ্রীনগর জামে মসজিদের প্রাঙ্গনে ১৩ জুলাই ১৯৩১ এর শহীদদের স্মরণে শোকসভা

 

কাশ্মীরী মুসলিমদের অধিকার আদায়ের এ পর্যায়ের রাজনৈতিক কর্মসূচীগুলোতে দুজন ব্যক্তি সবচেয়ে বেশী প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হন। তারা হলেন শেখ আবদুল্লাহ এবং মীরওয়াইজ মুহাম্মাদ ইউসুফ শাহ। শেখ আবদুল্লাহ আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স এবং মাস্টার্স করেন। তিনি ছিলেন কাশ্মীরের মুসলিমদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষিত প্রথম প্রজন্মের একজন যারা নিজেদের শিক্ষাগত যোগ্যতার বদৌলতে কাশ্মীরের রাজনৈতিক অঙ্গনে সহজেই প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হন। অন্যদিকে মীরওয়াইজ মুহাম্মাদ ইউসুফ শাহ ছিলেন শ্রীনগর জামে মসজিদের খতীব এবং প্রধান ওয়াইজ হওয়ার বদৌলতে কাশ্মীরের মুসলিমদের কাছে নেতাতুল্য হিসেবে বিবেচিত ছিলেন। তিনি ১৯২৪ সালে কাশ্মীর থেকে অন্যান্য বেশ কয়েকজন মুসলিম নেতৃবৃন্দের সাথে ভারতে ব্রিটেনের ভাইসরয় রিডিং এর কাছে দোগরা শাসনের অধীনে মুসলিমদের দুর্দশার কথা তুলে ধরে পিটিশন লিখে পাঠান। শেখ আবদুল্লাহ ছিলেন মীরওয়াইজ ইউসুফ শাহের স্নেহধন্য একজন ব্যক্তি। শ্রীনগর জামে মসজিদের মিম্বার থেকেই মীরওয়াইজ ইউসুফ শাহের মাধ্যমে শেখ আবদুল্লাহর পরিচিতি জনগণের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৩২ সালের অক্টোবরে ‘অল জম্মু এন্ড কাশ্মীর মুসলিম কনফারেন্স’ নামে একটি রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠা করা হয়, যার প্রেসিডেন্ট হন শেখ আবদুল্লাহ এবং সেক্রেটারী করা হয় চৌধুরী গোলাম আব্বাসকে। পরবর্তীতে মীরওয়াইজ ইউসুফ শাহ ও শেখ আবদুল্লাহর মধ্যে ভাঙ্গন ধরে এবং শেখ আবদুল্লাহও ধীরে ধীরে সেক্যুলারিজম এবং বামপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়েন। মীরওয়াইজ ইউসুফ শাহ মুসলিম কনফারেন্স থেকে বের হয়ে পড়েন। একইসাথে কংগ্রেসের জওহরলাল নেহরুর সাথে শেখ আবদুল্লাহর বিশেষ সখ্যতা গড়ে ওঠে। ১৯৩৯ সালে শেখ আবদুল্লাহ ‘মুসলিম কনফারেন্স’ বিলুপ্ত করে এর স্থলে ‘জম্মু এন্ড কাশ্মীর ন্যাশনাল কনফারেন্স’ নামে নতুন দল প্রতিষ্ঠা করেন। 

ম

মীরওয়াইজ মুহাম্মাদ ইউসুফ শাহ 

শেখ আবদুল্লাহর কংগ্রেসঘেষা অবস্থানের কারণে চৌধুরী গোলাম আব্বাস ন্যাশনাল কনফারেন্স থেকে বের হয়ে মীরওয়াইজ মুহাম্মাদ ইউসুফ শাহের সাথে মিলে মুসলিম কনফারেন্সকে আবার পুনরুজ্জীবিত করেন। পরবর্তীতে এই মুসলিম কনফারেন্সেই মুসলিম লীগকে সমর্থন করে এবং জম্মু ও কাশ্মীরকে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্য হিসেবে পাকিস্তানের সাথে যুক্ত করার জন্য প্রচেষ্টা চালায়। ১৯৪৬ সালে শেখ আবদুল্লাহ ‘কাশ্মীর ছাড়ো’ আন্দোলন শুরু করেন যার মাধ্যমে তিনি ১৮৪৬ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্তৃক দোগরা শাসকদের কাছে কাশ্মীর উপত্যকা বিক্রয়কে অবৈধ হিসেবে চিহ্নিত করে অবিলম্বে দোগরা শাসকদের কাশ্মীর উপত্যকা ছেড়ে যাবার দাবী করেন। ফলে শেখ আবদুল্লাহকে গ্রেফতার করা হয়।

 হহগ

 শেখ আবদুল্লাহ 

১২ আগষ্ট ১৯৪৭-এ জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্য পাকিস্তান এবং ভারত উভয়ের সাথে স্ট্যান্ডস্টিল এগ্রিমেন্টে উপনীত হয় যার মাধ্যমে ভারত ও পাকিস্তান যেকোন একটির সাথে এ রাজ্যের যোগ দেয়ার ব্যাপারটি পিছিয়ে যায়। ফলে ১৫ আগষ্টের পরে জম্মু ও কাশ্মীর কার্যত একটি স্বাধীন দেশে পরিণত হয়। যদিও কাশ্মীরসহ যেকোন দেশীয় রাজ্যের ভারত ও পাকিস্তানের সাথে যোগ দেয়ার বদলে স্বাধীন থাকার ব্যাপারটিতে মাউন্টব্যাটেনের অমত ছিল, জম্মু ও কাশ্মীরের রাজা হরিসিং সেসময় জম্মু ও কাশ্মীরকে স্বাধীন রাখার জন্য বিভিন্ন রাজনৈতিক চাল চালতে থাকেন। ঠিক এসময় জম্মু ও কাশ্মীরে সংঘটিত কিছু ঘটনা পুরো ব্যাপারটির মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

 ১৯৪৭ সালের জুনে জম্মু ও কাশ্মীরের পুঁচ নামক জেলায় মুসলিমরা মহারাজাবিরোধী বিক্ষোভের অংশ হিসেবে ‘নো ট্যাক্স’ কর্মসূচী শুরু করে যেটি খুবই অল্প সময়ের মধ্যে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের রূপ নেয়। তার উপর ১৪ ও ১৫ আগষ্ট পুঁচ ও শ্রীনগরে জনগণ পাকিস্তানী পতাকা উত্তোলন এবং জনসমাবেশের মধ্য দিয়ে পাকিস্তান দিবস পালন করার চেষ্টা করে। পুঁচে মার্শাল ল জারী করা হয়। পুঁচবাসী এবং সরকারী হিন্দু ও শিখ বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষে অনেক পুঁচবাসী ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়।

অন্যদিকে জম্মুতে, যেখানে মুসলিমরা সংখ্যালঘু ছিল, সার্বিক পরিস্থিতি সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের দিকে এগোতে থাকে। সশস্ত্র হিন্দু ও শিখরা মহারাজার সরকারী হিন্দু ও শিখবাহিনীর সাথে মিলে মুসলিম গ্রামগুলো আক্রমণ করে বসে এবং মুসলিমদের জম্মু থেকে বিতাড়িত করতে থাকে। জম্মু থেকে প্রায় ৫ লাখ মুসলিমকে ঘরছাড়া করা হয় যার মধ্যে প্রায় ২লাখ মুসলিম লাপাত্তা হয়ে যায়। জম্মুর এই খবর যখন পুঁচে পৌঁছায়, সেখানকার মুসলিমরা খুবই প্রভাবিত হয়। পুঁচে শুরু হয়ে রাজার বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম। তাদের সাথে যোগ দেয় পাকিস্তানের ওপার থেকে উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের পাঠান গোষ্ঠীর লোকজন। অন্যদিকে ফোর্থ জম্মু এন্ড কাশ্মীর ইনফ্যান্ট্রি ব্যাটেলিয়নের মুসলিম সৈনিকরা, যাদের সবাই ছিল পুঁচের বাসিন্দা, পুঁচের বিদ্রোহী মুসলিমদের সমর্থনে ব্যাটেলিয়নের হিন্দু এবং শিখ অফিসারদের হত্যা করে রাজার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। ২৪শে অক্টোবর পুঁচ বিদ্রোহীরা মহারাজার শাসন থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করে আযাদ কাশ্মীরের অস্তিত্ব ঘোষণা করে। স্বাধীনতাকামী যোদ্ধারা জম্মু ও কাশ্মীরের গ্রীষ্মকালীন রাজধানী শ্রীনগরের ৩০ কি.মি. দূরে অবস্থিত মহুরা পাওয়ার স্টেশন পর্যন্ত পৌঁছে যায়। কিন্তু শ্রীনগর এয়ারফিল্ড দখল করতে দেরী করে ফেলে, যা করতে পারলে কাশ্মীরের ইতিহাস আজ ভিন্ন হত। রাজা হরিসিং শ্রীনগর ছেড়ে নিজ পিতৃভূমি জম্মুতে পালিয়ে যান এবং বিদ্রোহ দমনে ভারতের সহযোগিতা কামনা করেন।

ন্নব্ব

রাজা হরি সিং

অবশেষে কাশ্মীরকে ভারতের সাথে সংযুক্তি এবং শেখ আবদুল্লাহর নেতৃত্বে একটি জরুরী অবস্থার সরকার গঠনের শর্তে ভারত রাজা হরিসিংকে সহযোগিতা করতে রাজি হয়। অবশেষে ২৭ অক্টোবর ভারত বিশাল আকারে এয়ারলিফটিং এর মাধ্যমে প্রায় ১০০টি সিভিল এবং মিলিটারী ট্রান্সপোর্ট বিমান ব্যবহার করে দুই ব্যাটেলিয়ন ইনফ্যান্ট্রি ডিভিশন শ্রীনগর এয়ারফিল্ডে অবতরণ করাতে সক্ষম হয়। ২৭ অক্টোবরকে এখনো কাশ্মীরে ‘কালো দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়। ১৯৪৭ এর এদিন থেকেই কাশ্মীরের স্বাধিকারের আন্দোলনটি একরকমভাবে ভারত-পাকিস্তানের দ্বিপাক্ষিক দ্বন্দে রূপান্তরিত হয়।

 

[চলবে]