লেখা

কুরবানীর রক্ত, গোশতঃ পশু হত্যার নৃশংসতা বনাম মডার্ন মানুষের অবসন্ন স্পর্শকাতরতা
কুরবানীর রক্ত, গোশতঃ পশু হত্যার নৃশংসতা বনাম মডার্ন মানুষের অবসন্ন স্পর্শকাতরতা
২২ অগাস্ট ২০১৮
পশু কুরবানীর স্পর্শকাতরতা আমাকে বেশ ভুগিয়েছে আগে পরে সবসময়। আমি খুব দুর্বল হৃদয় মানুষ। প্রাণী হত্যার ব্যাপারটা মেনে নিতে আমার খুব কষ্ট হয়। মাদ্রাসায় পড়েছি। আমার বন্ধুদের প্রায় প্রত্যেকে গরু জবাই করতে পারত। কিন্তু আমি পারিনি। বাসায় মুরগী জবাই করতে আম্মু কখনও আমাকে ডাকত না। তিনি বোধ হয় তার এই স্পর্শকাতর ভিতু ছেলেকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে চাইতেন না। আব্বু অবশ্য আমার এইসব স্পর্শকাতরতাকে দুই পয়সার মূল্য দিতেন না। তিনি বলতেন এটা একটা রোগ। আর সে জন্য তিনি সব সময় এটা নিশ্চিত করবার চেষ্টা করতেন নিজেদের গরু যখন কুরবানী হবে তখন আমি যেন অন্তত সামনে থাকি। কারণ নরমালি আমি ঐ সময়টাতে পালিয়ে থাকার চেষ্টা করতাম।
 
ফেসবুকের সুবাদে এখন দেখছি আমার মত এবং তার থেকেও বেশি অনেক বেশি রক্ত স্পর্শকাতর মানুষ যারা পশু কুরবানীর ব্যাপারে মানবিকতা, নৃশংসতার কথা তুলছে। বাবার ভাষা বললে- এই রোগে এখন সমাজের অনেক মানুষ আক্রান্ত। আজকের এই লেখায় তাদেরকে ভীষণ রকম বেনিফিট অব ডাউট দিয়ে লিখতে চাইছি। হতে পারে আমি নিজেই এ সমস্যায় আক্রান্ত এ কারণে। এরপরও তাদেরকে রোগি বলতে হচ্ছে, অন্যথায় হয়ত আরো বেশি কিছু বলতে হত। পরিষ্কার করে বললে- এটা মডার্ন মানুষের জীবনযাপনের পদ্ধতি থেকে উৎপন্নজাত মেন্টাল ডিজিজ। কুরবানীর মধ্য দিয়ে মানুষ এই ডিজিজ মুক্ত হবার রাস্তা খুঁজে পেতে পারত। অন্তত বুঝতে পারত তারা একটা মানসিক রোগে আক্রান্ত। কিন্তু তেতো কুইনাইনকে জ্বর সারাবার ঔষুধ হিসেবে না নিয়ে এটাকে মানবতা বিরোধি নৃশংস ইত্যাদি অভিধায় এটাকে এড়িয়ে যাবার চেষ্টা তারা করছে । অবশ্য এটাই স্বাভাবিক। কারণ মডার্ন মানুষের রোগই হচ্ছে এড়িয়ে চলা। আবার এই এড়িয়ে চলাটাকে সে মানবিকতা মনে করে- যা আসলে এই এড়িয়ে চলাটাকে ভ্যালিডেট করা বা ন্যায্যতা দেয়া। আর মডার্ন জীবন পদ্ধতি এই এড়িয়ে চলাটাকে সম্ভব করে তুলেছে- ডিভিশন অব লেবার আর টেকনলজির বদৌলতে।
 
অথচ ডিভিশন অব লেবার এবং টেকনলজির ফলেই ডিসেন্সিটাইজেসন সম্ভব হচ্ছে- যা আজকের পৃথিবীতে ডিহিউমানাইজেশনের অনেক বড় কারণ। মডার্ন সময়ে ম্যাস কনজাম্পশন পৃথিবীর ইতিহাসের অন্য যে কোন সময়ের থেকে অনেক বেশি। অর্থাৎ প্রাণী হত্যার পরিমাণও অন্য যে কোন সময়ের থেকে বেশি। মডার্ন মানুষ কে এফ সি, ম্যাকডোনাল্ডে বসে দৈনিক লাখ লাখ প্রাণী চিবুচ্ছে কিন্তু তখন তার মাথায় নৃশংসতার প্রশ্ন আসছেনা। ম্যাস প্রোডাকশন করতে গিয়ে প্রাণীদের সাথে যে বিভৎস আচারণ করা হয় সেটা নিয়েও কিন্তু সে একদমই চিন্তিত না । কারণ ডিভিশন অব লেবার এর কারণে সে পুরো প্রসেসের সাথে সম্পৃক্ত না। তার কাছে মুরগি কিংবা গরু আসে আসে সাজানো প্লেটে, আলো ঝলমলে রেস্টুরেন্টে। ফলে সে ডিসেন্সিটাইজড পুরো প্রসেস সম্বন্ধে, ব্যাক গ্রাউন্ডের নৃশংসতা নিয়ে। একইভাবে জেট বিমান দিয়ে কিংবা মিসাইল দিয়ে লাখ লাখ মানুষ হত্যা করা সম্ভব হচ্ছে, আর যিনি করছেন সেই পাইলট কিংবা সৈনিকও নিরুদ্বেগ থাকতে পারছে অনায়াসে কারণ তিনি কেবল জানেন তাকে একটা মিসাইল নিক্ষেপ করতে হবে। কাদেরকে মারছেন কেন মারছেন এটা তার জানার বিষয় না। এটা অন্য সেকশন অব লেবারের কাজ। অর্থাৎ পুরো প্রসেসে সম্পৃক্ততা না থাকতে পারার ফলে, খুব র‍্যাশনাল ক্যালকুলেটিভ ভাবে আমরা প্রাণী মারছি, মানুষ মারছি কিন্তু মানবিকতা নৃশংসতার প্রশ্ন করছিনা। কেবল তখনই এটা নিয়ে উত্তেজিত হয়ে পড়ছি যখন এই পুরো প্রসেসটা আমরা এড়াতে পারছিনা। আর কুরবানী নিয়ে নৃশংসতা, মানবিকতার দাবি তোলার মূলেও এটাই। আমাদের পশু কিনতে হয়। নিজেদের চোখের সামনে পশু কুরবানী করতে হয়। তার রক্ত আমাদের চোখের সামনেই প্রবাহিত হয়। এই যে ভিজিবিলিটি এটাই তার সমস্যা। আর মডার্ন র‍্যাশনালিটির মূলেও ভিজিবল রিয়ালিটি। ইনভিজিবল রিয়ালিটি তার ভাবনার বিষয় না।
 
indus
 ছবিঃ ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজড গোশত উৎপাদন এর ফার্ম
 
অথচ কুরবানী হতে পারত একজন মডার্ন মানুষের জন্য মানবিকতার এক বিরাট শিক্ষা। সে বুঝতে পারত আমাদের বেঁচে থাকবার স্বার্থে একটা প্রাণীকে কিভাবে বিসর্জিত হতে হয়। তার সামনে গরুর মাংস সেভাবে হাজির হয় সেটাই একমাত্র বাস্তবতা নয়। এর পেছনেও অনেক ব্যাপার আছে। গরু কেনা থেকে শুরু করে পুরো প্রসেসে সম্পৃক্ততার কারণে আমাদের বেঁচে থাকবার পেছনে প্রাণীদের অবদান এবং তাদের প্রতি মমত্বশীল হবার গুরুত্ব সে বুঝতে পারত। ভিজিবিলিটির বাইরের নৃশংসতা নিয়ে তার মধ্যে গড়ে উঠতে পারত সচেতনতা। ওভার ইটিং আর অপচয় নিয়েও সে সচেতন হয়ে উঠতে পারত। জীবনের ভঙ্গুরতা এবং মৃত্যুর অনিবার্যতার বোধ তাকে দায়িত্বশীল মানুষ করে তুলতে পারত। কিন্তু না! আমাদের প্রগতিবাদিরা সেদিকে না যেয়ে সামগ্রিক প্রক্রিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা আর চোখ বন্ধ করে রাখাটাকেই মানবিকতা হিসেবে গ্রহণ করেছেন। যত খুশি হত্যা কর কিন্তু সেটা তার চোখের সামনে করা চলবেনা। যত খুশি নৃশংসতা কর কিন্তু তার চোখের সামনে করা চলবেনা। মার্ক্স বলেছিলেন ধর্ম হচ্ছে আফিম। কিন্তু মডার্ন জীবন ব্যবস্থা তার থেকে শতগুণ শক্তিশালি আফিম নয় কি? যা মানুষকে এড়িয়ে চলা কিংবা ডিসেনসেটাইজড থাকটাকেই মানবিকতা গণ্য করতে শেখায়; অন্যদিকে তার এই এড়িয়ে চলবার সু্যোগ নিয়েই ঘটতে থাকে হত্যা আর নৃশংসতা।