লেখা

খিলাফত পুনরুদ্ধারে প্রথম দিকের সংগ্রামঃ সাঈদ পিরান আল কুর্দীর বিপ্লব প্রচেষ্টা
খিলাফত পুনরুদ্ধারে প্রথম দিকের সংগ্রামঃ সাঈদ পিরান আল কুর্দীর বিপ্লব প্রচেষ্টা
লিখেছেন শিহান মির্জা
০৫ মার্চ ২০১৬

এই মাসের গত ৩ তারিখ ছিল ‘খিলাফত’ আনুষ্ঠানিকভাবে বিলোপসাধন করার ৯২তম বার্ষিকী। মোস্তফা কামালের মিলিট্যান্ট সেক্যুলার সরকার দ্বারা তুর্কীর সেক্যুলারাইজেশনের কাহিনীও বোধহয় কমবেশী সবারই জানা। তুরস্ক আর শাইখ সাঈদের নাম আসলে প্রথমে সবার সামনে ভেসে আসে বাদিউজ্জামান শাইখ সাঈদ নূরসীর কথা যিনি সেই কট্টর সেক্যুলার পরিবেশেও তুরস্কে ইসলামের আলো জ্বালিয়ে রেখেছিলেন। তবে আরেকজন শাইখ সাঈদের কথা আমরা তেমন জানি না - মুজাহিদ শাইখ সাঈদ পিরান আল কুর্দী; যিনি খিলাফত পুনরুজ্জীবিত করার দাবীতে মোস্তফা কামালের সেক্যুলার সরকারের বিরুদ্ধে কুর্দীদের এক বিশাল বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেন যা ‘শাইখ সাঈদ বিদ্রোহ’ নামে খ্যাতি লাভ করেছে। আজকে তুরস্কে ইসলামের ধীরলয়ে ফিরে আসার পিছে যদি শাইখ সাঈদ নূরসীর প্রচেষ্টা থাকে, তবে সে প্রচেষ্টায় বরকত এসেছে মুহাম্মাদ আতেফ হোজ্জা, শাইখ সাঈদ পিরানসহ অসংখ্য আলেম এবং অনালেম শহীদদের রক্তের মাধ্যমে।

 

শাইখ সাঈদ উসমানী খিলাফতের ‘লাযা’ প্রদেশের ‘বালো’ নামক শহরে ১৮৬৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর শিক্ষায় হাতেখড়ি হয় তাঁর পিতা শাইখ মাহমুদ আলীর হাতে। অল্প বয়সে তিনি কোরআন হিফয করেন। এরপরে তিনি ফিক্বহ ও শরীয়াহ নিয়ে পড়াশোনা করেন। শিক্ষাজীবন শেষ হওয়ার পরে তিনি আলেম এবং নকশবন্দী তরীকার একজন মুর্শিদ হিসেবে দায়িত্ব পান। তাঁর পিতার ইন্তেকালের পরে ‘বালো’ শহরের দ্বীনি নেতৃত্ব তাঁর উপর এসে পড়ে। ‘বালো’ শহরে নকশবন্দী তরীকার প্রধান মুর্শিদে পরিণত হন। তাঁর অনুসারীদের সংখ্যা প্রায় ১২ হাজারে পৌঁছায়। একইসাথে আরবি, তুর্কী ও ফার্সি ভাষায় পারদর্শী ছিলেন শাইখ সাঈদ।

 

মোস্তফা কামালের তুর্কী জাতীয়তাবাদী ধর্মনিরপেক্ষ সরকার কর্তৃক খিলাফতের বিলোপ সাধন কুর্দীদের বিক্ষুব্ধ করে তোলে। উসমানী খিলাফতের সময় কুর্দীরা নিজস্ব সংস্কৃতি বজায় রাখার যে স্বাধীনতা লাভ করত তা মোস্তফা কামালের তুর্কী জাতীয়তাকরণের ফলে হুমকির মুখে পড়ে। খিলাফতের সময় তুর্কী ও কুর্দী জনগণের মধ্যে যে সুসম্পর্ক ছিল তা প্রথম বিশ্বযুদ্ধে খলিফার জিহাদ ঘোষণার পরে কুর্দীদের দলে দলে সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়ার মাধ্যমেই প্রমাণিত হয়। ১৯২৪ সালে হালবে (বর্তমানে সিরিয়ার অংশ) কুর্দীদের একটি সম্মেলনে সিরিয়ান ও ইরাকী কুর্দীদের পাশাপাশি তুরস্কের অন্তর্ভুক্ত কুর্দীস্তানের প্রতিনিধি হিসেবে শাইখ সাঈদের ছেলে রাজা ইবনে সাঈদ তাঁর বাবার প্রতিনিধি হিসেবে যোগদান করেন। সেখানে কুর্দী জাতিসত্তার অধিকার আদায়ের জন্য ১৯২৫ সালের ২১ মার্চ নওরোজের দিন গণজাগরণ শুরু করার ঘোষণা দেয়া হয়।

 

আসন্ন বিদ্রোহের জন্য লোক সংগ্রহের সময় শাইখ সাঈদ বিভিন্ন কুর্দী গোত্রের মধ্যে বিরোধ ও শত্রুতা মীমাংসা করে একতার ডাক দেন। এসময় তিনি কুর্দী জনগণকে বোঝান যে, ইসলাম বিপদের মুখে আছে এবং তাদেরকে খিলাফত পুনঃস্থাপন করার জিহাদে শামিল হওয়ার আহবান জানান এবং শাহাদাতের জন্য অনুপ্রেরণা যোগান। এ ডাকে সাড়া দিয়ে হাজার হাজার কুর্দী কৃষক সবুজ পতাকা ও কোরআন নিয়ে বেরিয়ে পড়ে।

 

১৯২৫ সালের ৫ই ফেব্রুয়ারী শাইখ সাঈদ ১০০ ঘোড়সওয়ার সাথীসহ ‘পিরান’ নামক গ্রামে আসেন। সেখানে তিনি হুসনী এফেন্দীর নেতৃত্বে তুর্কী সেনাদের একটি দল দেখেন যারা কিছু স্থানীয় কুর্দীদের গ্রেফতারে করতে আসে। শাইখ সাঈদ তাদের অনুরোধ করেন তাঁর উপস্থিতির প্রতি সম্মান দেখিয়ে তখন কাউকে গ্রেফতার না করে তাঁর প্রস্থানের পরে যাকে ইচ্ছা তাকে গ্রেফতার করতে। কিন্তু তুর্কী সেনাবাহিনী অফিসার তা করতে অস্বীকৃতি জানালে তুর্কী সেনাবাহিনী ও শাইখ সাঈদের লোকদের মধ্যে সংঘর্ষ বেধে যায়। সেখানে সেনাবাহিনীর কিছু সদস্য নিহত হন। ৮ই ফ্রেব্রুয়ারী যখন এ সংঘর্ষের খবর ছড়িয়ে পড়ে তখন কুর্দী নেতারা ভেবে বসেন, শাইখ সাঈদ ইতিমধ্যেই বিদ্রোহ ঘোষণা করে দিয়েছেন। তারা তুর্কী সেনাবাহিনীর উপর হামলা চালানো শুরু করে দেন। ১১ ফেব্রুয়ারী থেকে শাইখ সাঈদের ভাই ভাই তাহির পিরান ‘লিজা’ থেকে ‘সির্দী’ পর্যন্ত চেকপোষ্টের উপর হামলা চালাতে চালাতে ‘কিনজু’ পৌঁছান। সেসময় তাঁর সাথে ২০০ যোদ্ধা যোগ দেন। আর এভাবেই পরিকল্পিত সময়ের ৪১ দিন আগেই শুরু হয়ে যায় কুর্দী বিদ্রোহ। ১৪ ফেব্রুয়ারীর মধ্যে কুর্দী বিদ্রোহীগণ ‘কিনজু’ শহরের পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ হাসিল করেন। ‘কিনজু’ কে কুর্দিস্থানের অস্থায়ী রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সমন জারীর মাধ্যমে সকল ট্যাক্স বাতিল করা হয় এবং এর পরিবর্তে অধিবাসীদের বিদ্রোহে সহায়তা করার আহবান জানানো হয়। এরপর কুর্দী বাহিনী ‘লিজা’ এবং ‘খানি’ শহর অবরোধ করে। এসময় কুর্দীস্থানের বিভিন্ন গোত্র ও নেতৃস্থানীয় লোক তাঁর সাথে যোগদান করেন। এসময় বিদ্রোহীদের সংখ্যা প্রায় ২০ হাজারে পৌঁছায়।

 

২মার্চ শাইখ সাঈদ ‘দিয়ার বকর’ শহরের উপর হামলা চালান। কিন্তু তুলনামূলক অধিক প্রশিক্ষিত এবং সংখ্যায় অনেক বেশী থাকা তুর্কী সেনাবাহিনীর সফলভাবে এই আক্রমণ প্রতিহত করতে সক্ষম হয়। পিছু হটতে বাধ্য হয় শাইখ সাঈদ ও তাঁর সেনাবাহিনী। এপ্রিলের মাঝামাঝি ‘কিনজু’ উপত্যকায় তুর্কী সেনাবাহিনী বিদ্রোহীদের মূল সৈন্যদলকে অবরোধ করতে সক্ষম হয়। কুর্দী বিদ্রোহীদল সেখানে চূড়ান্তভাবে পরাজিত হয় এবং ১৫ এপ্রিল গ্রেফতার হন শাইখ সাঈদ, শাইখ আলী, শাইখ গালিব, রাশিদ আগা, মুহাম্মাদ আগা ও তাইমুর আগাসহ বিদ্রোহের নেতৃস্থানীয় বেশ কয়েকজন। ২৯ মে শাইখ সাঈদের বিচার শুরু হয়।

গ্রেফতার হওয়ার পরে শাইখ সাঈদ পিরাণ

গ্রেফতারের পরে শাইখ সাঈদ

 

তুরস্কের সরকার এ বিদ্রোহকে বাইরের ইন্ধনে সংঘটিত কুর্দী জাতীয়তাবাদী আন্দোলন হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করে। প্রথম অভিযোগের ব্যাপারে বলতে হয়, উল্টো খোদ মোস্তফা কামালের সরকার ব্রিটিশ ও ফ্রেঞ্চ শক্তির সাহায্য নেয় বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে। ব্রিটিশ কামান ব্যবহার করে বিদ্রোহীদের বিভিন্ন সামরিক অবস্থানে গোলাবর্ষণ করা হয়। এছাড়া ফ্রেঞ্চ ম্যান্ডেটের মধ্যে দিয়ে দুই দুইবার তুর্কী সেনাবাহিনীকে বিদ্রোহ কবলিত অঞ্চলের মধ্যে পরিবহন করার অনুমতি পায় মোস্তফা কামালের সরকার।

 

পশ্চিমা একাডেমিয়াগুলোতে এ বিদ্রোহকে ধর্মীয় ছদ্মবেশে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। তবে এ বিদ্রোহ যে একটি ইসলামী উত্থান ছিল, স্রেফ কোন জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ছিল না, তা এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, এ বিদ্রোহ শুরু হওয়ার পর পর ২৫ ফেব্রুয়ারী তুরস্কের পার্লামেন্টে সংবিধানে ‘রাষ্ট্রদ্রোহ’ শিরোনামের অধীন ১৯২৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারী প্রণয়িত ৫৫৬ নং ধারায় রদবদল করে যেকোন ধর্মীয় রাজনৈতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করা, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করার উদ্দেশ্যে ধর্মের ব্যবহার এবং এ ধরনের কোন সংগঠনের জড়িত থাকাকে রাষ্ট্রদ্রোহ হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়।

 

তাছাড়া কোর্টে বিচারক যখন শাইখ সাঈদের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন করার অভিযোগে অভিযুক্ত করেন তখন তিনি বলেন, “আল্লাহ সাক্ষী, এই বিদ্রোহ না কোন কুর্দী রাজনীতিকের পরিকল্পনা, না কোন বাইরের শক্তির হস্তক্ষেপের ফলে সংঘটিত।” এরপর তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়, তিনি নিজে খলিফা হতে চান কিনা, প্রত্যুত্তরে তিনি বলেন, “খিলাফতের অস্তিত্ব দ্বীনের মূলনীতিগুলো বাস্তবায়িত করার মৌলিক জামানত।”  তাঁকে যখন জিজ্ঞেস করা হয়, তিনি কি পরিপূর্ণভাবে এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে এখন দেশে শরীয়াহ কায়েম নেই? জবাবে তিনি বলেন, “বর্তমানে যে পরিস্থিতি বিরাজমান এ অবস্থায় কোরআন ও সুন্নাহ শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার উপর জোর দেয়। শরীয়াহর বাস্তবায়ন মানেই তো অবৈধ হত্যাকান্ড, যিনা ও মদপান বন্ধ থাকবে। আমরা তো তুর্কী-কুর্দী নির্বিশেষে সবাই মুসলিম। আমাদের বিশ্বাস মতে, (শরীয়াহর) এসব বিষয়গুলো পরিত্যাগ করা হয়েছে। আমরা এই বিশ্বাস থেকেই কোরআনের বিধান অনুসারে (এ বিদ্রোহে) ছুটে এসেছি।”

পুরো একমাস ধরে চলা এই বিচারে শাইখ সাঈদের ফাঁসির আদেশ দেয়া হয়। ৩০ জুন ‘দিয়ার বকর’ শহরের সবচেয়ে বড় মসজিদের প্রাঙ্গনে এই মুজাহিদের ফাঁসি কার্যকর করা হয়।

ফাঁসির পর সাঈদ পিরাণ

শাইখ সাঈদের দেহ ফাঁসির দড়িতে ঝুলন্ত অবস্থায় 

 

ফাঁসির আগে শাইখ সাঈদ শেষবারের মত বলেন, “জীবন তো এর শেষ প্রান্তের নিকটবর্তী। কিন্তু আমি মোটেই এর জন্য দুঃখিত নই যে, আমার জীবন আল্লাহর রাহে কোরবান হচ্ছে। আমরা তো বরং খুশি এজন্য যে, আমাদের উত্তরসূরীরা শত্রুদের সামনে আমাদের নিয়ে লজ্জিত হবে না।”