লেখা

গণ পরিসরে নারী নিপীড়ন: নারীবাদীদের বক্তব্য বনাম খাঁজকাটা কুমিরের গল্প
গণ পরিসরে নারী নিপীড়ন: নারীবাদীদের বক্তব্য বনাম খাঁজকাটা কুমিরের গল্প
১১ সেপ্টেম্বর ২০১৫

আমরা যে সময়টাতে বসবাস করছি, কিছু বিষয়কে নিরন্তন লাইমলাইটে দেখে দেখে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। নারী ইস্যু হচ্ছে সেরকম একটা বিষয়। যদিও বিষযটি ইতিবাচক খবরের চেয়ে নেতিবাচক আকারে বেশি হাজির হয়। নারী লাঞ্ছনা, নারী ধর্ষণ, প্রকাশ্যে ইভটিজিং এর শিকার হওয়া প্রভৃতি নানা রকম নেতিবাচক, হৃদয়বিদারক খবরের শিরোনাম হয়ে নারী গণ পরিসরে সামনে আসছে।

নারীর নিগৃহীত হওয়া, অত্যাচারের শিকার হওয়া বোধহয় সব সমাজেই কম-বেশি ছিল এবং আছে। তবে এটা সময়, সমাজ কিংবা সভ্যতা ভেদে এর প্রকার এবং প্রকৃতিতে ভিন্নতা থাকে। এক কথায় নারী নির্যাতনের নানান প্রকৃতি এবং প্রকার আছে। প্রকার এবং প্রকৃতি ভেদে নির্যাতনের কারণও আলাদা হওয়াটা স্বাভাবিক। কিন্তু এখনকার সময়ে যে কোন ধরণের নারী নির্যাতনকে একই কারণের ফসল হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়।আর তা হল পুরুষতান্ত্রিকতা। আবার পুরুষতান্ত্রিকতা বলতে বুঝানো হয় নারীর ব্যাপারে সমাজে বিদ্যমান প্রাচীনপন্থী দৃষ্টিভঙ্গি, ধ্যান-ধারণাকে। সুতরাং তাদের মতে, যে কোন ধরণের নারী নিগৃহের ঘটনাই ঐতিহ্যগত ধ্যান ধারনার ফলশ্রুতি।

কিন্তু খাজঁকাটা কুমিরের গল্পের মত এরকম লিনিয়ার বা এক রৈখিক চিন্তা নারী নির্যাতনের অধুনা পরিলক্ষিত অনেক প্রকরণকে কিন্তু ঠিকভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেনা। বরং বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়-বর্তমান কালের কোন কোন মারাত্মক সমস্যার হাত থেকে পূর্বে নারী নিরাপদ ছিল এই এতিহ্যিক কিংবা প্রাচীন চিন্তা , ধ্যান,ধারণার বদেীলতে। এটা বলার অর্থ এটা না যে, পুরুষতান্ত্রিক ভাবনা চিন্তার সাথে নারী নির্যাতনের কোন সম্পর্ক নেই কিংবা গতানুগতিক কোন ধ্যান-ধারণা নারীর অগ্রগতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। অবশ্যই আমাদের সমাজে নারীর ব্যাপারে অনেক অন্যয্য ধ্যান-ধারণা রয়েছে, যার ফলে নারীকে অনেক বৈষম্যের শিকার হতে হয়। কিন্তু সেই সব বৈষম্য, অত্যাচার থেকে মুক্তি দিতে গিয়ে আমরা অনেক নতুন সমস্যাও তৈরি করছি। আবার সেই সব সমস্যার উৎপত্তি সংশ্লিষ্ট উপাদানের মধ্যে অনুসন্ধান না করে পুরনো কারণকেই দায়ী করা হচ্ছে। আর এভাবেই উদ্ভুত  নতুন সমস্যার উৎপত্তি,প্রকৃতি তিমিরেই থেকে যায়।

 যদি হাল আমলের নারী নিগ্রহের কথা চিন্তা করি তা হলে দেখব, যে ধরণের নারী নিগ্রহের ব্যাপারগুলো আমাদের সবচেয়ে বেশি আলোড়িত করছে তা কিন্তু নতুন ধরণের এবং প্রাচীন কাঠামোর সমাজ ব্যবস্থায় নারী এ সমস্যা থেকে নিরাপদ ছিল। যেমন: রাস্তা-ঘাটে ইভটিজিং এর শিকার হওয়া, গণসম্মুখেই যৌন নিপীড়নের শিকার হওয়া কিংবা পরিচিত মানুষদের দ্বারা ধর্ষণের শিকার হওয়া প্রভৃতি। যাকে এক কথায় বলা যায়, গণ পরিসরে (public sphere) নিপীড়নের শিকার হওয়া। এ ধরণের বিষয় মারাত্মক আকার ধারণ করা কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ের ঘটনা। ঐতিহ্যগত ভাবে আমাদের সমাজে এ সমস্যা কিন্তু প্রকট আকারে কখনও খুঁজে পাওয়া যাবেনা। কিন্তু বাংলাদেশী নারীবাদীদের এর কারণ জিজ্ঞাসা করলে একই উত্তর আসবে: সমাজে বিদ্যমান প্রাচীন পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি, নারীর ক্ষমতায়নের অভাব এসবই এর জন্য দায়ী। কিন্তু এর বিপরীতে স্বাভাবিকভাবে যে প্রশ্নটি চলে আসে-আমাদের সমাজ পূর্বে আরো বেশি পুরুষতান্ত্রিক ছিলো, নারীর ক্ষমতায়ণ তখন আরো কম ছিলো, অতএব, এই সমস্যাও তখন আরো প্রকট হওয়ার কথা ছিলো কিন্তু তা না হয়ে সে সময়ে নারী এ সমস্যা থেকে মুক্ত থাকলো কি করে?

সুতরাং, হাল আমলের নারী নিপীড়নের কারণ কি? এর উত্তর প্রাচীন পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে খুঁজে লাভ আছে বলে মনে হয়না। বরং প্রাচীন দৃষ্টিভঙ্গির একটা দিক এমন-নারী অবলা কিংবা নারী মায়ের জাতি, সুতরাং নারী সম্মান ও সুরক্ষা তার স্বাভাবিক প্রাপ্তি। এমন মান্ধাতার দৃষ্টিভঙ্গি কিন্তু নারীকে নিরাপত্তা দিয়েছিল। পাবলিক প্লেসগুলিতে মানুষ নারীর প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল। এখনও সমাজের বেশিরভাগ মানুষ পাবলিক প্লেসে নারীর নিরাপত্তা প্রদানের ব্যাপারে সচেতন কিন্তু এরকম প্রাচীন দৃষ্টিভঙ্গিথেকেই। যদিও বিকৃত দৃষ্টিভঙ্গির মানুষের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। সুতরাং নতুন করে উদ্ভূত সমস্যা পুরাতন ঐতিহ্যের মধ্যে খোঁজা কোন কাজের কথা নয়। এখনকার সমস্যা যেমন নতুন তেমনি এর পেছনে কার্যরত যে দৃষ্টিভঙ্গি তাও নতুন। এবং নতুন করে গড়ে ওঠা এই সাবকনশাস পাবলিক পারসেপশনের উৎপত্তি পরিবর্তিত সমাজিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক গঠনের সাথেই সম্পৃক্ত।

 

 নারী

 

অতএব, নারীর ব্যাপারে ক্রমে গড়ে ওঠা বিকৃত মানসিকতা কিংবা বিকৃত দৃষ্টিভঙ্গি কেন গড়ে উঠছে এর উত্তর খুজঁতে হবে, পরিবর্তিত সামাজিক ,অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামোর মধ্যে নারী ক্রমাগত কিভাবে উপস্থাপিত হচ্ছে তার মধ্যে। বানিজ্যিক প্রচার-প্রচারণা থেকে শুরু করে সাংস্কৃতিক নানান মাধ্যমে নারী সত্তার ব্যবহার বেশ পরিলক্ষিত হয়। কিন্তু এ সবগুলি ক্ষেত্রেই নারীর উপস্থাপনের একটি বিশেষ ধরণ রয়েছে এবং সেটা হল দৈহিক। নারীকে শারীরিকভাবে আকর্ষণীয়, যৌন আবেদনময়ী আকারেই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে উপস্থাপিত হতে দেখা যায়। পণ্য প্রচারের ক্ষেত্রে নারীর যৌন আবেদনময়ীতাকে নীহিতার্থ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। নারীর এমন ব্যবহারের যে অর্থ দাঁড়ায় তা হল-নারী হল ভোগ্যপণ্যের উৎকৃষ্ট উদাহরণ এবং আমি যে পণ্যটি প্রচার করছি উৎকৃষ্টতার দিক থেকে তা নারীর কাছাকাছি। মূল ধারার সমস্ত সাংস্কৃতিক মাধ্যমেই নারী এভাবেই সার্বজনীন রূপে আবির্ভূত হচ্ছে। এটাকেই আবার তারা নারীর ক্ষমতায়ণ নাম দিচ্ছেন।.যেন নারীর অস্তিত্ব জানান দিতে হলে শারীরিক আবেদনই তার একমাত্র উপায়। নারী সত্তার জন্য এর চেয়ে সম্ভ্রমহীন পরিস্থিতি আসলে কল্পনা করা যায়না। নারীর এমন ক্রমাগত উপস্থাপনা যত বিকৃতই হোকনা কেন, সমাজে কিন্তু এটা ধীরে ধীরে গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে। এর প্রমাণ হল নারীদের একটি বড় অংশ তাদের জীবন-যাপন, পোশাক, পরিচ্ছেদের মধ্যে দিয়ে এভাবেই নিজেদেরকে উপস্থাপন করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন। আর এরকম উপস্থাপনার মধ্যে দিয়ে নারীর ব্যাপারে ভ্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গি, বিকৃত কামনার পক্ষেই কাজ করছেন।

একটা বিষয় স্পষ্ট হওয়া দরকার, দৃষ্টিভঙ্গির এই বিকৃতির জন্য নারীকে দায়ী করা হচ্ছেনা বরং নারীর বিকৃত উপস্থাপনাকে দায়ী করা হচ্ছে। এমন উপস্থাপনা এবং তাকে বিনা চিন্তায় আমাদের অবেচেতন মনোকাঠামোয় গ্রহণের জন্য সামষ্টিকভাবে আমরা সবাই দায়ী। কিন্তু আমরা এমন উপস্হাপনাকে দায়ী করার পরিবর্তে কেউ নারী জাতিকে আবার কেউ পুরুষ জাতির মানসিকতাকে দায়ী করছেন। অথচ যারা এই প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব দান করছেন তাদের থেকে অভিযোগের তীর পাশ কেটে চলে যাচ্ছে।

 

কখনও কখনও আবার যে কোন ধরনের উপস্থাপনকে নারীর স্বাধীনতা বলে চালিয়ে দেয়া হয় এবং সমস্ত সমস্যাকে পুরুষের মানসিকতার উপর চাপিয়ে দেয়া হয়। অথচ অর্থনৈতিক কিংবা সাংস্কৃতিক ইন্ডাষ্ট্রির দানবীয় শক্তির কাছে ব্যক্তি নারী অসহায়। ইন্ডাষ্ট্রির ব্যবসায়িক স্বার্থের বিপরীতে দাঁড়িয়ে নারী তার পছন্দ অপছন্দকে প্রকাশ করছে এমন ভাবনার সামান্যতম ভিত্তি নাই। কেউ কেউ হয়ত বলতে পারেন এসব ইন্ডাষ্ট্রির বাইরে সাধারণ নারীরা যখন  ইন্ডাষ্ট্রির  চিত্রায়ণকে অনুসরণ করে নিজেদেরকে উপস্থাপন করে সেটা তো তারা স্বাধীনভাবেই করছে। এর উত্তরে শুধুই এতটুকুই বলতে পারি, মিডিয়া কিংবা বানিজ্যিক স্বার্থগোষ্ঠির চাওয়ার সাথে সঙ্গতি রেখে নিজেদেরকে রিপ্রেজেন্ট করাকে কিভাবে স্বাধীন পছন্দ (অটোনোমাস চয়েজ) বলা যায় আমার জানা নেই। এটাতো বিরাট শক্তিশালী সাংস্কৃতিক ও বানিজ্যিক স্রোতের সঙ্গে স্রেফ ভেসে যাওয়া। হিন্দি সিরিয়াল দেখে পাখি জামার জন্য ব্যাকুল হওয়া এবং না পাওয়ায় আত্মহত্যা করা আর যাই হোক স্বাধীন পছন্দ হতে পারেনা। 

তবে তাদের যুক্তির সবচেয়ে আকর্ষণীয় অথচ আয়রনিক দিক হল-পুরুষের মানসিকতাকে দায়ী করা এবং এর পরিবর্তন চাওয়া। আমাদের সমাজে পুরুষ জাতির একটা বড় অংশের মধ্যে নারীর মধ্যে যে রকম দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠছে তা অবশ্যই নিন্দনীয়। কিন্তু তারা যখন পুরূষ জাতিকে দায়ী করেন তখন তারা পুরুষ জাতির প্রকৃতিকে দায়ী করেন কিংবা এই দৃষ্টিভঙ্গির পেছনে আমাদের সমাজের অন্তনির্হিত ট্রাডিশনকে দায়ী করেন। এর মধ্যে দিয়ে তারা পুরুষ জাতিকে প্রকৃতগতভাবে খারাপ মনে করছেন এবং দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে ওঠার পেছনের সাম্প্রতিক কালের সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক কিংবা রাজনৈতিক কারণকে সচেতন ভাবে অবজ্ঞা করছেন।অথচ নারী পুরুষ নির্বিশেষে  আমরা সবাই বিদ্যমান সমাজ সংস্কৃতির বিনির্মাণ। আমরা ক্রমাগত পরিবর্তিত হই এবং এই পরিবর্তনের পেছনে ভূমিকা রাখে সমাজ,সংস্কৃতি প্রভৃতির মধ্য দিয়ে আমরা কিভাবে প্রতিনিয়ত নিজেদেরকে পুনরউৎপাদন করছি।তাই নারীবাদীদের এ ব্যাপারগুলোর অবজ্ঞা বা উপেক্ষা দেখে মনে হয়- নারী-পুরুষের সম্পর্ককে তারা একটা যুদ্ধের ময়দানে নিয়ে যেতে চান এবং এটাই কিন্তু ইস্টাবলিশমেন্টের চাওয়া। এর মধ্যে দিয়ে তারা আসলে ইস্টাবলিশমেন্টের পক্ষেই কাজ করেন।

পুরুষ জাতির মানসিকতাকে দায়ী করাকে আয়রনিক বলার কারণ হল, সত্যিকারার্থে তারা কিন্তু পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি কিংবা মানসিকতার পরিবর্তন চাননা। কারণ পুরুষ যদি তাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করে ফেলে সেক্ষেত্রে নারীকে শরীরীয়, আবেদনময়ী উপস্থাপনের সুযোগ থাকবে কি? কারণ সমাজে তো তখন এটার কোন ডিমান্ডই থাকবেনা। সেক্ষেত্রে কালচারাল ইন্ডাষ্ট্রি কিংবা ইকোনোমিক ইন্ডাষ্ট্রির বানিজ্যেরই বা কি হবে? বরং তাদের সমস্ত কর্মকান্ড থেকে এটা একেবারেই স্পষ্ট, তারা চান পুরুষকে আরো কামুক করে গড়ে তোলতে, নারীর প্রতি কামনা বাসনাকে তীব্র থেকে তীব্র করতে। আর এটা করতে নারী সত্তার যে কোন অবমাননা করতে তারা প্রস্তুত। কিন্তু তারা এটার বিপদ সম্পর্কে জানেন। তারা জানেন এর ফলে নারী কি পরিমাণ অনিরাপদ হয়ে উঠবে সমাজে। আর এ জন্যে তারা চান পুরুষের হাত-পা শিকলে বেধে ফেলতে। পুরুষের কামনা থাকবে কিন্তু তা চরিতার্থ করার বৈধ ব্যবস্থা থাকবেনা। ধর্মের সাথে তাদের বিরোধের একটা জায়গা কিন্তু এটাই। ধর্ম মানুষকে সংযম শিক্ষা দেয়। আর সংযমী মানুষেরা তাদের ব্যবসার হাতিয়ার হয়ে ওঠেনা।