লেখা

চাইনিজ বিশ্বব্যাংকের যাত্রা, বিশ্বমোড়লের দ্বিধা এবং দক্ষিণের ভবিষ্যত
চাইনিজ বিশ্বব্যাংকের যাত্রা, বিশ্বমোড়লের দ্বিধা এবং দক্ষিণের ভবিষ্যত
লিখেছেন নাজমুস সাদাত
২২ ডিসেম্বর ২০১৫

চীন নতুন এক ‘বিশ্বব্যাঙ্ক’ গড়ার কাজ শুরু করেছে। যে ব্যাংকটি এশিয়ার দরিদ্র দেশগুলোর অবকাঠামোগত উন্নয়ন যেমন রাস্তাঘাট ও রেলপথের সম্প্রসারণ, এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ বৃদ্ধিতে বিনিয়োগ করবে। আর এর মাধ্যমেই চীনের নেতৃত্বে এশিয়ার এই অঞ্চল বিশ্ব অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠবে, এমনটাই চীনের ভাষ্য। 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চিন্তায় আছে যে চীন নিজের মত করে এই ব্যাংকের অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণ করবে যাতে তারা হয়ত পরিবেশ সুরক্ষা, মানবাধিকার, দুর্নীতি দমন এবং অন্যান্য প্রশাসনিক সংস্কারের ক্ষেত্রে অতটা জোর দিবে না। চীনের অস্থিতিশীল সরকারকে ঋণ প্রদান, অপ্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়ন বিনিয়োগ এবং পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ দেয়া ছাড়াই গ্রামবাসিদের উচ্ছেদের দিকে আমেরিকা ইঙ্গিত করছে।

গত জুন মাসে বেইজিংয়ে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা ‘এশিয়ান অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক’ স্থাপন শীর্ষক চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। সাতান্নটি দেশ এই ব্যাংকের সদস্য। ওবামা প্রশাসন কূটনৈতিক পরাজয় বরণ করে গত বসন্তে যখন তার কাছের মিত্র দেশগুলো যেমন ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি আর দক্ষিন কোরিয়া এই ব্যাঙ্কে যোগ দেয়। জাপান ও আমেরিকাকে ফেলে সব মিলিয়ে ৫৭টা দেশ এতে যোগ দিয়েছে।

এখানে যোগ দেয়ার হিসাবটা সহজ। চায়না’র আছে প্রচুর সম্পদ যা দিয়ে সে আমেরিকার সাথে অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। যার একটা প্রমান হল সম্প্রতি আইএমএফ চাইনিজ মুদ্রাকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

যোগ দেয়া দেশগুলো মনে করছে চায়না’র সাথে সুসম্পর্ক আর নতুন ব্যাঙ্কে যোগ দেয়ার মাধ্যমে তারা আর্থিকভাবে লাভবান হবে। যদিও এই ব্যাপারে কারো কারো সন্দেহ আছে। তারপরও এতে যোগ দেয়ার মাধ্যমে তারা মনে করছে এই সংস্থায় তারা প্রভাব ফেলতে পারবে। 

“নতুন এই ব্যাংকের মাধ্যমে চীন তার মিত্রদের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা বাড়াবে এবং রুলস অফ দা গেইমস পরিবর্তন করার মাধ্যমে তার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধি করবে। আর এটা বর্তমান প্রতিষ্ঠানগুলোকে একটি বড় ধাক্কা।“ বললেন আইএমএফ এর চীন বিষয়ক সাবেক প্রধান ও কর্নেল ইউনিভার্সিটির প্রফেসর ঈশ্বর প্রসাদ।

চীনের নেতৃত্বাধীন এই ব্যাংক বর্তমানে তার প্রাথমিক প্রজেক্টগুলো বাছাই করছে। কিছুদিনের মধ্যেই এগুলো আলোর মুখ দেখবে। আর এর প্রকৃতি অনুযায়ী বুঝা যাবে চীন কিভাবে তার প্রভাব ব্যবহার করছে এর কার্যক্রমে।

এশিয়ার উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় সাহায্য করার মাধ্যমে চীন আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে নেতৃত্ব দিতে চাচ্ছে অথবা এই ব্যাংক তার উচ্চাকাঙ্ক্ষা অর্জনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হবে। এই নতুন ব্যাংকের মাধ্যমে “এক অঞ্চল, এক রাস্তা” স্লোগান শীর্ষক প্রোগ্রাম নিয়ে চীন এগিয়ে যাচ্ছে। পুরনো ‘সিল্ক রোড’ ধরে জালের মত বিস্তৃত নানা রাস্তার মিলনমেলা হয়ে এই রাস্তা মধ্য এশিয়া হয়ে ইউরোপে পৌঁছবে। আর সামুদ্রিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে দক্ষিণপূর্ব এশিয়া থেকে পূর্ব আফ্রিকা হয়ে ভূমধ্যসাগরের সাথে সংযোগ স্থাপন হবে।

এখন পর্যন্ত চীন ২টি বিপরীত পথ অবলম্বন করছে। সমালোচনা এড়ানোর জন্য বোর্ড গঠন, প্রোজেক্ট দেখভাল ও এসেট সংগ্রহের ব্যাপারে ছাড় দিচ্ছে। অন্যদিকে ব্যাংকের উপরে নিয়ন্ত্রণ ছাড়তে নারাজ চীন। সে ক্ষেত্রে জলবায়ু পরিবর্তন ও শ্রম অধিকার ইত্যাদি বিষয়ে ব্যাংকের অবস্থান কি হবে তা নিয়ে চিন্তা থেকেই যাচ্ছে। কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে ব্যাংকটি বিনিয়োগ করবে কিনা তা এখনো সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়।

চীন বর্তমান উন্নয়ন সংস্থাগুলোকে ছাড়িয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। বিশেষ করে ব্রেটন উডস সংস্থাগুলো যা আমেরিকার নেতৃত্বে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গঠিত হয়েছিল মুদ্রা ব্যবস্থা ও উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করার জন্য।

চীনা কর্মকর্তারা বলছেন তারা বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংকের চেয়েও তড়িৎ পদক্ষেপ নেবেন। নতুন ব্যাংকটি তদারকির ক্ষেত্রে ব্যর্থ হবে না বলে চীন আশ্বস্ত করছে।

চীনের নেতৃত্বে এই ব্যাংকের মুল লক্ষ্য হল অবকাঠামো খাতে উন্নয়ন। চীনের মতে বিশ্বব্যাংক ও এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংক বড় বড় প্রোজেক্টে বিনিয়োগ করতে ব্যর্থ হয়েছে যেগুলো এশিয়ার এই অঞ্চলকে পরিবর্তন করে দিত। এই অঞ্চলের রেল, বন্দর ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের খাতগুলোতে ৮ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ চাহিদা আছে।

 “আভ্যন্তরীণ রাজনীতির নানা সমস্যায় জড়িয়ে পড়ে ইউএসএ তার আন্তর্জাতিক প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছে” ব্যাংকটির চাইনিজ প্রেসিডেন্ট, জিন লিকুন তার নতুন বই “Bretton Woods: The Next 70 Years.” এ কথা লিখেছেন। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ইঙ্গিত করে আরো লিখেছেন, “ইতিহাসে কোন সাম্রাজ্য চিরকাল পৃথিবী শাসন করেছে বলে কোন নজির নাই।“

অনেকগুলো দেশ, এমনকি ইরান ও ইসরায়েল, রাশিয়া ও পোল্যান্ড এবং আমেরিকার অনেক বন্ধুরাষ্ট্র এতে যোগ দিয়েছে। ১০০ বিলিয়ন ডলারের মূলধন নিয়ে ব্যাংকটি কাজ শুরু করবে যা প্রাথমিকভাবে হিসাব করা পরিমাণের দ্বিগুণ।

প্রথম দিকে যথাযথ গুরুত্ব না দিলেও আমেরিকার অবস্থান এখন কিছুটা নমনীয়। বিলটি সইয়ের তিন মাস পর জনাব জি প্রেসিডেন্ট ওবামার সাথে হোয়াইট হাউসে সাক্ষাৎ করেন। আর এটি ছিল চীনের নতুন নেতার প্রথম আমেরিকা ভ্রমণ। বৈঠকে ওবামা বিদ্যমান ব্যাংকগুলোকে নতুন ব্যাংককে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান। যদিও আমেরিকা এখনো এতে যোগ দেয়নি।

প্রতিষ্ঠা কথা

চাইনিজ কম্যুনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় নীতি নির্ধারণ কমিটির একজন প্রভাবশালী কর্মকর্তা ঝেং জিনলি ২০০৭ সালে লাওসের মেকং নদীর তীরবর্তী দূর গ্রাম পরিদর্শনে যান। তিনি লক্ষ করেন গ্রামের ঘরগুলো জরাজীর্ণ আর জমিতে ফসল উৎপাদন খুবই কম। কারণ হিসেবে জানলেন ফসল বিক্রি করা একটি দুরহ ব্যাপার কেননা কৃষকগণ বাজার থেকে অনেকদুরে বাস করেন আর পরিবহন ব্যবস্থা অপ্রতুল।

জনাব ঝেং উপলদ্ধি করেন যে এই সমস্যাটি চীনের অবকাঠামোগত সমস্যার সাথে মিলে যায়। আর এতে চীনের অবদান রাখার সুযোগ আছে। জনাব ঝেং, যাকে এই ব্যাংকটির স্বপ্নদ্রষ্টা বলা হয় বলেন ‘অর্থনৈতিকভাবে এটি চীনের সাথে দারুণভাবে সঙ্গতিপূর্ণ’।

তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হু জিন্তাও এর উপদেষ্টাদের সাথে তিনি এই ব্যাংকটির পরিকল্পনা প্রদান করলে তারা এই ব্যাপারে উৎসাহ দেখালেন না।

২০১৩ সালে যখন জি জিনপিং প্রেসিডেন্ট হন, জনাব ঝেং তার পরিকল্পনাটিকে বাস্তবায়ন করার একটি সুযোগ পান।

চীন মনে করছে, আমেরিকা এতো বছর যাবত চীনের সাথে বিমাতাসুলভ আচরন করেছে। প্রেসিডেন্ট ওবামা চীনকে Trans-Pacific Partnership বাণিজ্য চুক্তিতে ডাকে নাই এই বলে যে চীনের একবিংশ শতাব্দীর বাণিজ্য চুক্তির নীতি লিখার যোগ্যতা নেই।

২০০৮ সালের অর্থনৈতিক মন্দার সময় যখন আমেরিকার অর্থনীতি ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হয়েছিল তখনও চীনের অর্থনীতি ভাল অবস্থানে ছিল যা বিশ্ব অর্থনীতির ভারসাম্য বজায় রেখেছিল। তারপরও মার্কিন কংগ্রেস আইএমএফ এর একটি প্রস্তাব; আমেরিকা ও জাপানের পর তৃতীয় সর্বোচ্চ অর্থ যোগানদাতা দেশ হিসেবে চীনের নাম প্রস্তাব করলে তা প্রত্যাখ্যান করে। 

The China Center এর ইকনমিক স্টাডিজ বিভাগের প্রদান জু হংচাই বলেন, মার্কিন কংগ্রেস আইএমএফ এর সংস্কার প্রস্তাব অনুমোদন দিতে দেরি করছিল কিন্তু আমাদের এই ব্যাপারে ভিন্ন মত আছে। অর্থনীতির খারাপ অবস্থায় আমেরিকা শর্তগুলোর ব্যাপারে রাজি ছিল কিন্তু যেইনা অবস্থার উন্নতি হল তারা এই ব্যাপারে পিছু হটে গেছে।

প্রতিষ্ঠা পথে যাত্রা

অন্যান্য দেশগুলোর মতে চীন জানে যে তাকে পার্টি মনোনীত কর্মকর্তা ছাড়াও আরো বাইরে নজর দিতে হবে। তাই দেশটি মি. জিনকে কাজে লাগালেন। তিনি ইংরেজিতে ভাল একজন অর্থনীতিবিদ যিনি ৮০’র দশকে বিশ্বব্যাংকে কাজ করেছেন এবং তিনি ছিলেন এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংকে চীনের প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট। চীনের সার্বভৌম ওয়েলথ ফান্ড এর চেয়ারম্যান মি. জিন শেক্সপিয়ার ও অস্ট্রেলিয়ার ঔপন্যাসিক প্যাট্রিক হোয়াইট এর সাহিত্যের প্রবল অনুরাগী।

চীনের পক্ষে এশিয়ান বন্ধুদেরকে কাছে টানা ছিল সহজ কাজ আর ছোট দেশগুলো যেমন, সিঙ্গাপুর এমনিতেই সদস্য হবে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ উন্নত দেশগুলো ছিল কিছুটা অনাগ্রহী।

২০১৪ সালের মে মাসে ব্রিটিশ ও ইউরোপিয়ান শিল্পপতিগণ জড়ো হন লন্ডনে। যেখানে মি. জিন অনেক পুঁজিপতিদের সাথে বা তাদের প্রতিনিধিদের সাথে কথা বলেন। জনাব জিন G-7 এর সদস্য জাপানকেও দলে টানতে চেয়েছিলেন, যাতে করে এরপর ইউরোপিয়ানদেরও দলে টানা যায়। কিন্তু জাপানের প্রধান মন্ত্রি শিনজো এবে’র নিজস্ব উন্নয়ন পরিকল্পনা ছিল। বিফল হয়ে জনাব জিন ওয়াশিংটনকে রাজি করানোর সিদ্ধান্ত নেন।

সংশয়ে ওয়াশিংটন

২০১৪-সালের সেপ্টেম্বারে জিন ওয়াশিংটন গিয়েছিলেন কিন্তু ততদিনে মার্কিন প্রশাসন ব্যাংকটির ব্যাপারে উদ্বিগ্ন হয়ে গেছে।

যদিও আমেরিকা ব্যাংকটিকে স্বীকৃতি দিয়েছে তারপরও কারা এর সদস্য হবে সেই ব্যাপারে তারা ভুমিকা রাখার চেষ্টা করেছে। গুরুত্বপূর্ণ মিত্ররাষ্ট্র অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়াকে সদস্য না হতে বলা হয়েছিল। আর জি-৭ দেশগুলোকে বলা হয়েছিল আমরা একসাথে এর মোকাবেলায় থাকব।

চীনের মুল লক্ষ্য নিয়েও সন্দেহ রয়ে গেছে। যেভাবে চীনের অর্থনৈতিক শক্তি ও প্রভাব বৃদ্ধি পাচ্ছে তাতে এটি হয়ত ব্যাংকটিকে তার প্রভাব বৃদ্ধির আরেকটি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করবে।

The China Development Bank এবং The Export-Import Bank of China এশিয়া ও আফ্রিকার অনেক বড় বড় প্রোজেক্টে বিনিয়োগ করেছে। এই দুই ব্যাংকের মিলিত বিদেশী বিনিয়োগ ৫০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বিশ্বব্যাংক ও এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংকের মিলিত মূলধনের চেয়েও বেশি।

ওয়াশিংটন সফরে মি জিন আমেরিকার অভিযোগগুলো দূর করার চেষ্টা করেন। তিনি পরামর্শ দেন যে, চূড়ান্ত মুল্লায়ন করার পূর্বে ব্যাংকটি কিভাবে তার মান নির্ধারণ করে তার জন্য অপেক্ষা করা উচিত।

মার্কিন প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা বলেন, মি জিন আমাদেরকে এই ব্যাপারে ইতিবাচক হতে বলেন। এমনকি তিনি ইউএসএ কে ন্যায়পাল হিসেবে থাকার কথাও বলেছেন। যাতে করে দেশটি ব্যাংকের মান পর্যালোচনা করতে পারে ও ফলাফল প্রকাশ করতে পারে। কিন্তু মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল এই ব্যাপারে অনড় অবস্থান নিয়েছে।

মিত্র খুঁজে পাওয়ার সঙ্কট

সদস্য হওয়ার সময়সীমা মার্চ ৩১ যতই ঘনিয়ে আসা শুরু করে মি জিন জি-৭ এর দেশগুলো বিশেষ করে ব্রিটেনকে দলে টানার চেষ্টা করেন। তিনি এই দেশকে জানেন ও পসন্দ করেন আর সেখানে London School of Economics এ তার মেয়ে একজন এসিস্টেন্ট প্রফেসর।

ব্রিটেনের অর্থমন্ত্রী জর্জ অসবর্ণ লন্ডনকে রেন্মিনবি (চীনের ইউনিট কারেন্সি) ভিত্তিক বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসেবে দেখতে চান। তিনি মনে করেন এটা তার দেশের অর্থনীতির জন্য সহায়ক।

পিকিং ইউনিভার্সিটিতে ২০১৩ সালে এক বক্তব্যে অসবর্ণ বলেন চীনের উত্থানে অনেক দেশ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে। আমি এ ধরনের নিরাশাবাদী চিন্তার নিকুচি করছি।

ব্রিটেন নিরবে সদস্যপদের দরকষাকষি চালিয়ে গেছে। মার্চ মাসে এই ব্যাংকে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে মাত্র ২৪ ঘণ্টার নোটিশ দেয় ওয়াশিংটনকে, জানিয়েছেন একজন সিনিয়র কর্মকর্তা।

আমেরিকার জন্য এটি ছিল একটি বড় ধাক্কা। ব্রিটেন ছিল আমেরিকার সবচেয়ে বড় মিত্র কিন্তু এখন তারা চীনের পাশে চলে গেছে। কিছুদিনের মাঝে অন্যান্য ইউরোপিয়ান দেশগুলোও যোগ দেয়। আর এর অনুসরন করে অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়া।

চীনের সাথে সম্পর্কের উপকার ব্রিটেন পাওয়া শুরু করেছে। অক্টোবর মাসে চার দিনের ব্রিটেন সফরে মি জিন দেশটির সাথে ৪০ বিলিয়ন পাউন্ড এর কিছু চুক্তি স্বাক্ষর করেন। যার মধ্যে ব্রিটিশ নিউক্লিয়ার ইন্ডাস্ট্রির একটি চুক্তি আছে। জনাব অসবর্ণ বলেন, জিন এর এই সফর দুই দেশের সম্পর্কের সোনালি যুগ শুরু হয়েছে।

ব্যাংকটিতে ব্রিটেনের সদস্যপদ গ্রহন চীনের জন্য একটি বড় প্রাপ্তি। সংবাদটি শুনে মি জিন হয়ত শেক্সপিয়ার এর Cymbeline নাটকটির মিল খুঁজে পান।

নাটকটির পটভূমি ছিল তৎকালীন রোম শাসিত ব্রিটেনের অবস্থা নিয়ে। ব্রিটেন রোমকে নজরানা পেশ করতে অস্বীকার করে। নাটকে ক্লটান রোমের দূতকে বলছে “ ব্রিটেন নিজেই সর্বেসর্বা। আমরা কাউকে কোন কিছুই দিবো না”।

জনাব জিন ভাবছেন, যেভাবে আগেকার ব্রিটেন রোমকে গোনায় ধরতে অস্বীকার করেছে তেমনি বর্তমান ব্রিটেনও আমেরিকাকে থোড়াইকেয়ার করে চীনা ব্যাংকে যোগ দিয়েছে।

চীনের ভিশন

জনাব জিন এখন চীনের ভিশন আর সমালোচকদের উদ্বেগ এর মাঝে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছেন।

প্রোজেক্ট অনুমোদনে সময় কমানোর চীনের প্রস্তাব ছিল, সদস্য দেশগুলোর বোর্ড নয় বরং একদল বিশেষজ্ঞ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিবেন। কিন্তু ব্রিটেন এই পদ্ধতি স্বচ্ছ নয় বলে এতে রাজি হয়নি।

আমেরিকা মনে করেছিল চীন হয়ত ৫০-শতাংশ ভোট পাওয়ার নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখবে। কিন্তু শেষে দেখা গেল চীন মাত্র ২৬-শতাংশ ভোট পাওয়ার নিজের কাছে রেখেছে। প্রতিদিনকার কাজে চীন তার ভেটো পাওয়ার ব্যবহার করবে না। তবে সদস্যপদ ও প্রেসিডেন্ট পদে নিয়োগের সিদ্ধান্তে চীন তার পাওয়ার খাটাতে পারবে।

চীন প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে যে ব্যাংকটি হবে পরিচ্ছন্ন, বুরোক্রেটিক সমস্যা মুক্ত এবং পরিবেশের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। দুর্নীতির সাথে এটি হবে আপোষহীন।  তারপরও উদ্বেগ থেকেই যায় যে, মারাত্মকভাবে পরিবেশ দূষণ করে এমন কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন প্ল্যান্টে ব্যাংকটি বিনিয়োগ করবে কী না, যে খাতগুলোতে বিশ্বব্যাংক ও এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংক বিনিয়োগ করা বন্ধ করে দিয়েছে।

ওয়াশিংটন চীনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে আর্থিক অর্থায়নের জন্য ব্রেটন উডস প্রতিষ্ঠানগুলোকে উত্সাহ দেয়া শুরু করেছে। আবার এদিকে চীন বিশ্ব ব্যাংকে তাদের অবদান বৃদ্ধি’র অঙ্গীকার করেছে, যা বিদ্যমান সিস্টেমের প্রতি সমর্থন অব্যাহত থাকবে এমন একটি প্রয়াস।এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ইতোমধ্যে চীনা নেতৃত্বাধীন ব্যাংকের সাথে একাধিক প্রকল্পে অর্থায়নে সম্মত হয়েছে। অক্টোবরে ওয়াশিংটন সফরে জনাব জীন বিশ্বব্যাংকের সাথে অনুরূপ একটি চুক্তি করেন।

শেষকথা 

দক্ষিণের দেশগুলো যার মধ্যে মুসলিম দেশগুলোও রয়েছে, তাদের জন্য ব্রেটন উডস সংস্থাগুলোর বাইরে দাঁড়িয়ে পাওয়ার মত কোনো কিছু আদৌ এই নতুন “চীনা বিশ্বব্যাংক”এ আছে কিনা সেটা সময়ই হয়ত বলবে। আর যে অন্যায্য বিশ্ব অর্থব্যবস্থা জারি রেখে প্রতিদিন সহস্র বনী আদম অনাহারে মারা যায় সেটার সমাধানে একটা আপাদমস্তক পরিবর্তিত সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যভিত্তিক অর্থব্যবস্থার যে স্বপ্ন সেটার বাস্তবায়ন অন্য কেউ এসে করে দেবে এটা ভাবাটাও নির্বুদ্ধিতার নামান্তর। তবে, পরিবর্তনের শুরুটা হয় জানাশোনা থেকে। দুনিয়া চালাতে হলে দুনিয়া সম্পর্কে জানাটা জরুরী।

 

নিউ ইয়র্ক টাইমস অবলম্বনে