লেখা

নারী-ইত্যাদি সামাজিক সমস্যার ইসলামীকরণ
নারী-ইত্যাদি সামাজিক সমস্যার ইসলামীকরণ
লিখেছেন মাহমুদ নাঈম
১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৭

০১.

Dr. Emarson Eggerichs তার ২০০৪ সালে প্রকাশিত “Love and Respect” বইয়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে “Crazy Cycle” নামে একটা নতুন টার্মের কথা বলেছেন। এই Crazy Cycle টা হলো- “স্ত্রী স্বামীর কাছ থেকে ভালোবাসা না পেলে সে স্বামীকে শ্রদ্ধা করেনা, আবার স্বামী তার স্ত্রীর কাছ থেকে শ্রদ্ধা না পেলে সে স্ত্রীকে ভালোবাসেনা”। এখানে তিনি ব্যাখ্যা করেছেন যে, একজন মেয়ের জন্য আরো স্পেসিফিক্যালি বললে একজন স্ত্রীর জন্য তার স্বামীর কাছ থেকে প্রধান চাওয়া হলো, স্বামীর ভালোবাসা। সে সবসময় চায়, স্বামী তাকে ভালোবাসুক, কেয়ার করুক। আবার একজন ছেলের জন্য বা একজন স্বামীর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, স্ত্রীর কাছ থেকে শদ্ধা। সে সবসময় চায় তার স্ত্রী তাকে মেনে চলুক, তার আনুগত্য করুক। এবার যখনই স্ত্রীর কাছ থেকে স্বামী আনুগত্য পায়না, আর স্বামী তার স্ত্রীকে ভালোবাসেনা অথবা পুরো উল্টো সাইকেলটা ঘটে- তখনই ঝামেলাটা সৃষ্টি হয়।

Mark Gungor, যিনি বিবাহ-ফ্যামিলি-সম্পর্ক নিয়ে কাউন্সেলিং করেন, প্রতি বছর আমেরিকাতে এই টপিকের উপর অসংখ্য সেমিনার করেন। লোকটার সেন্স অব হিউমার, মানুষকে হাসানোর ক্ষমতা অস্বাভাবিক রকমের ভালো, ফলে উনার সেমিনারগুলো হাউজফুল হয়ে থাকে। সুন্দর একটা ফ্যামিলি টিকিয়ে রাখার ব্যাপারে উনার পরামর্শগুলোর মূলকথাকে এভাবে ব্যখ্যা করা যায়- উইমেন ব্রেইন আর ম্যান ব্রেইনের চিন্তার পদ্ধতি আলাদা, এদের প্রত্যাশা আর পরিতৃপ্তির প্যারামিটারও আলাদা, সুতরাং এদের পারস্পরিক ব্যবহারের ধরন ও গুরুত্বের ক্ষেত্রে হতে হবে আলাদা। নারীদের ক্ষেত্রে পুরুষদের উচিত কেয়ারিং মনোভাব পোষণ করা, আর পুরুষদের ক্ষেত্রে নারীদের উচিত সরাসরি বিরোধিতা না করা।

উপরের দুজন মানুষই পশ্চিমা জগতের এবং এদের কেউই মুসলিম নন। তাদের এই ব্যাখ্যাগুলোর গ্রহণযোগ্যতাও আছে পশ্চিমা সোসাইটিতে। তাহলে নারী অধিকারের কথা আসলেই মুসলিম প্রগতীবাদীশীলরা যে “পুরুষরা নারীদের উপর ক্ষমতাবান” বা “স্বামীর আনুগত্য স্ত্রীর জন্য ফরজ” টাইপ বিধানগুলোকে নিয়ে নড়েচড়ে বসেন অথবা কেউ কেউ টেক্সটের অর্থ চেইঞ্জ করে ইসলামকে মানবতাবাদী বানানোর হাস্যকর চেষ্টা করেন- সেটা কত কতটা যুক্তিসংগত তা ভেবে দেখার সুযোগ আছে।
নারী-পুরুষের সাইকোলজি ভিন্নভাবে কাজ করে। তাদের চাওয়া আর তৃপ্তির জায়গাটাও আলাদা। এজন্যই ইসলামে এদেরকে কিছু ক্ষেত্রে ভিন্নভাবে ট্রিট করে হয়েছে, তবে সবক্ষত্রেই জাস্টিজটাকে প্রাধ্যান্য দেয়া হয়েছে।

আপনার জ্ঞান দ্বারা ইসলামী বিধানের স্পষ্ট কোন টেক্সটকে কন্টেম্পরারি কালচারের আলোকে যুক্তিসংগত হিসেবে চিহ্নিত করতে না পারলেই সেই টেক্সট পুনর্ব্যাখ্যার দাবি রাখেনা। বরং স্পষ্ট টেক্সটগুলো সার্বজনীন এবং সময়ের উর্ধ্বে। ভিন্ন ভিন্ন সোসাইটিতে অথবা বিভিন্নজনের বোধের আলোকে নতুন নতুন ব্যাখ্যা আসলে অসংখ্য ইসলাম তৈরি করতে হবে, ইসলামকে তার স্বকীয়তা বিলিয়ে দিতে হবে। কিন্তু ইসলাম সার্বজনীন এবং ফাইনাল।

 

 

০২.

নারী অধিকার থেকে শুরু করে ইসলামের সাথে ডীল করা কন্টেম্পরারি অধিকাংশ সমস্যাই পিউর সামাজিক সমস্যা, ধর্মীয় সমস্যা নয়। বউ-শ্বাশুড়ি সমস্যা বা স্বামী-স্ত্রীর সমস্যাগুলোর রুট আসলে আমাদের সোশিও-ইকোনমিক সিস্টেম। ইতিহাসে আমাদের নারীরা নিগৃহীত, অত্যাচারিত হয়ে আসছে এর কারণ এখানকার পুরুষরা মুসলিম বলে নয়। এর কারণ বরং এখানকার সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংকট, ইসলামও এখানে যাকে পুরোপুরি দূর করতে পারেনি।

বউ-শ্বাশুড়ির দ্বন্দ্বে ইসলামের কোন ইন্টারেস্ট নাই, সুতরাং ইসলামকে এই দ্বন্দ্বের মধ্যে টেনে আনার প্রয়োজন নাই। বরং ইসলামের নির্দেশনার আলোকে সোসাইটিকে রিকন্সট্রাক্ট করার চেষ্টাই হওয়া উচিত মূল ফোকাস। যে সোসাইটি ফেমিনিজমের মতো নারী অধিকার নিয়ে কথা বলবে না, বরং প্রত্যেকের ব্যক্তি অধিকার পুরোপুরি রক্ষা করবে।

 

 

০৩.

 

ইসলাম একটি সামগ্রিক ব্যবস্থা এবং এটা সার্বজনীন। মানব জীবন প্রত্যেক স্তর থেকে শুরু করে সমাজ, রাষ্ট্র সবজায়গায়-ই ইসলামের দিকনির্দেশনা আছে। তবে সব স্তরে নির্দেশনা বা নিয়ন্ত্রণের পরিধি আর বাধ্যবাধকতা এক নয়। কিছু বিষয়কে ইসলাম যেমন ছোট্ট পরিধিতে সীমাবদ্ধ করে কঠিক নিয়ম বেঁধে দিয়েছে, তেমনি আবার কিছু ঐচ্ছিক বিষয়কে খুব বড় পরিধিতে সাধারণ কিছু নিয়মের ভেতরে স্বাধীনভাবে ছেড়ে দিয়েছে।

ইসলাম আক্বীদাহ বা থিওলজিক্যাল ক্রীডের ব্যাপারে যতটা স্ট্রিক্ট এবং সিলেক্টিভ, ইবাদাহ বা উপাসনার ক্ষেত্রে ঠিক ততটা স্ট্রিক্ট এবং রেস্ট্রিক্টেড নয়। আবার উপাসনার ক্ষেত্রে যতটা কড়া এবং এর ক্ষেত্র যতটা সীমাবদ্ধ, মু'আমালাহ বা আচার-আচরণেরর ক্ষেত্রে তারচেয়ে বেশি নমনীয়। যেমন, কুর'আন আল্লাহর বাণী- এটা ইসলামের একটা আক্বীদাহ। এই বিশ্বাস সর্বাবস্থায় মাননীয়, এই ক্ষেত্রটা এতটাই স্ট্রিক্ট যে, কোন ওযরের বিনিময়েও এই বিশ্বাসে ছাড় দেয়ার সুযোগ নেই। আর নামায হলো ইবাদাহ। এর ব্যাপারটাতে ইসলামের পরিধিও খুব নির্দিষ্ট এবং পরিস্কার। দিনে ৫ ওয়াক্ত নামাযের বিধান- এটা নির্দিষ্ট। আরব বা আফ্রিফা, শীতকাল বা গরমকাল ভেদে এর পার্থক্য নাই। তবে ওযরের প্রেক্ষিতে এর নিয়ম কখনো বদলাতে পারে। আবার আপনার খাবার মেন্যু বা আপনার ড্রেস-আপ হলো মু'আমালাহ। এখন আপনার খাবারের মেন্যু বা ড্রেস-আপ কি রকমের হবে, সেটা ইসলাম বৃহৎ স্কেলে সাধারন কিছু নিয়মের ভেতরে সবাইকে স্বাধীনতা দিয়েছে। কিছু হারাম খাবার ব্যতীত বাকি হালাল খাবারের ক্ষেত্রে আপনি স্বাধীন, আপনি রুটি খান বা ভাত খান- সেটা আপনার ব্যাপার। অথবা ইসলামী পোষাকের আদবের ভেতরে পরে এরকম যেকোন পোষাক পরাই বৈধ, হোক সেটা লম্বা জুব্বা বা লুঙ্গি-গেঞ্জি। কিছু হারাম খাবার ব্যতীত বাকি হালাল খাবারের ক্ষেত্রে আপনি স্বাধীন, আপনি রুটি খান বা ভাত খান- সেটা আপনার ব্যাপার। অথবা ইসলামী পোষাকের আদবের ভেতরে পরে এরকম যেকোন পোষাক পরাই বৈধ, হোক সেটা লম্বা জুব্বা বা লুঙ্গি-গেঞ্জি।

সমস্যা হলো, আমরা যখন সেই স্বাধীন ক্ষেত্রগুলোতেও সবকিছুকে ইসলামীকরনের চিন্তা করি বা সেসব বিষয়ে ইসলামের নতুন কোন সুক্ষ্ম বয়ান হাজির করা চেষ্টা করি। বিয়ের পর আপনার ফ্যামিলির সামগ্রিক আচরণ, চলাফেরা কেমন হবে সেইটা ইসলাম নির্ধারণ করে দিয়েছে। এখন বিয়ে করে আপনি যৌথ ফ্যামিলিতে থাকবেন না আলাদা হয়ে যাবেন, সে সমস্যাটা পারিবারিক বা সামাজিক। ইসলামকে প্র্যাকটিস যেরকম ফ্যামিলিতেই করতে পারবেন সেটাই ইসলামিক ফ্যামিলি। এখন যৌথ ফ্যামিলি ইসলামিক না কি একক ফ্যামিলি ইসলামিক- এই ধরনের প্রশ্ন বাড়াবাড়ি। এইটা এক্সট্রিমিজমের সমস্যা।

আরেকটা সমস্যা হইলো, ইসলামের সুস্পষ্ট বয়ান থাকার পরেও কনটেক্সট, কালচারের আলোকে ফালাইয়া কনটেম্পরারি কালচারকে এডপ্ট করতে নতুন বয়ান হাজির করার চেষ্টা। ইসলাম নারী-পুরুষের জাস্টিজের কথা বলে বিধায় ‘স্ত্রীদের জন্য স্বামীর আনুগত্যের বিধান’কে কনটেক্সট আর ডিকশনারী ঘেঁটে খারিজ করে দেওয়ার চেষ্টাটা হীনমন্যতা। কিংবা ইসলামী নির্দেশনার আলোকে বাঙালি ‘লুঙ্গি’ বৈধ পোষাক হয়ে গেলো বলে, আঞ্চলিক কালচারের দোহাই দিয়া বৈশাখে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ বা ‘মোমবাতি প্রজ্বলন’কে ইসলামে বৈধ দাবি করাটা হাস্যকর। এইটা প্রগতিবাদের সমস্যা।