লেখা

বাংলাদেশের প্রতিবেশি সাত বোনের কান্নাঃ বাংলাদেশকে স্পর্শ করে?
বাংলাদেশের প্রতিবেশি সাত বোনের কান্নাঃ বাংলাদেশকে স্পর্শ করে?
লিখেছেন শাইখ মাহদী
১৬ অক্টোবর ২০১৫

সাত বোন – অর্থাৎ সেভেন সিস্টার্স। মেঘালয়, আসাম, ত্রিপুরা, মনিপুর, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড এবং অরুণাচল।

                                                            

বাহাত্তর সালে এক রেডিও টক-শোতে ত্রিপুরার সাংবাদিক জ্যোতি প্রসাদ সাইকিয়া যখন ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় এই  রাজ্যগুলোকে একসূত্রে বলবার জন্য এই টার্মটা প্রথম ব্যবহার করেন, তখন সম্ভবত তিনি ধারণাও করতে পারেননি, কত শক্তিশালী এবং গুরুত্বপূর্ণ একটি কথা তিনি বলে ফেলেছেন। জিওপলিটিক্যাল অবস্থান, প্রাকৃতিক সম্পদ এবং বৈচিত্র্যময় সামাজিক কাঠামো, সব কিছু মিলিয়ে সারা বিশ্বে এই সাত বোনের তুলনা খুঁজে পাওয়া ভার। একই সাথে, এই সাত বোনের সংগ্রাম, নির্যাতন এবং প্রতিরোধের তুলনাও খুব একটা পাওয়া যাবে না। ভৌগলিক ভাবে বাংলাদেশের ঘরের কাছের এই সাতবোনি রাজ্য সম্পর্কে আমাদের জানাশোনা কতটুকু? ইন্ডিয়ার অন্যান্য বহু রাজ্য, বহু গ্ল্যামারের খবরাখবর আমাদের নখদর্পনে থাকলেও এই সাতবোন যেন কোনো এক অজানা কারনে আমাদের চোখের অন্তরালে থেকে যায়। অথচ এসব বোনের কান্না কি প্রতিবেশী হিসাবে আমাদেরও স্পর্শ করার কথা ছিল না?         

 

irom chanu

ছবিতে অনশনরত অসুস্থ ইরম চানু শর্মীলা এবং কিছু ইন্ডিয়ান পুলিশকে দেখা যাচ্ছে 

 

উত্তর-পূর্বাঞ্চলঃ শোষণ ও সংগ্রামের ঐতিহাসিক পটভূমি

সেভেন সিস্টার্স রাজ্যগুলো ঐতিহাসিকভাবে কখনোই আজকের ইন্ডিয়ান ইউনিয়নের অন্তর্ভূক্ত ছিল না। আর্য সম্প্রদায় সমগ্র ইন্ডিয়া দখল করলেও ব্রক্ষ্মপুত্রের পূবপাশের এই উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে আসতে পারেনি। বরং এখানে গারো, খাসিয়া, বোরো, মিজো বা এইধরণের অনার্য আদিবাসী রাজাদের শাসন ছিল সবসময়ই।   

এই অঞ্চলে প্রথম স্বাধিকারের দাবী তুলে নাগাল্যান্ড তথা নাগা’রা। ভারতের স্বাধীনতার ঠিক আগের দিন ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট নাগারা নিজেদের স্বাধীনতা ঘোষণা করে, কিন্তু তাতে কাজ হয় নি। এরপর তাদের নাগাল্যান্ডের স্বাধীনতাকামী সংগঠন নাগা ন্যাশনাল কাউন্সিলের (NNC) উদ্যোগে ১৯৫১ সালের মে মাসে নাগাল্যান্ডে একটি স্বতঃস্ফূর্ত গণভোট অনুষ্ঠিত হয়, যার  মাধ্যমে নাগারা স্বাধীনতার পক্ষে সম্পূর্ণ সমর্থন জানায়। কেন্দ্রিয় সরকার তাদের দাবী প্রত্যাখ্যান করে, এবং ১৯৬৩ সালে আসাম থেকে আলাদা করে ভারতের ১৬তম রাজ্য হিসেবে গঠিত হয় নাগাল্যান্ড।[1]

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে বার্মা মনিপুর আক্রমণ করতে পারে, এই আশংকা থেকে এখানকার দূর্বল মনিপুরী রাজা ব্রিটিশ ভারতের সাহায্য চায়। ব্রিটিশ শাসনের দেড়শ বছর পর প্রথমবারের মত ব্রিটিশরা মনিপুর ‘দখল’ করে নেয় ত্রিশের দশকে সালে। ইন্টরেস্টিং বিষয় হলো, পোলো খেলাটি ইউরোপীয়রা এই মনিপুর রাজ্য থেকেই গ্রহণ করেন। একটা মৈত্রি চুক্তির মাধ্যমে এরা ব্রিটিশ ভারতের অন্তর্ভূক্ত হলেও স্বায়ত্বশাসিত ছিলো। ১৯৪৯ সালে মনিপুরের রাজা বুধচন্দ্র ভারতীয় ইউনিয়নে মনিপুরকেও শামিল করে নেন।

এখানকার সবচেয়ে পুরনো, বড় এবং বিখ্যাত রাজ্য হচ্ছে আসাম। ১৮৩০ সালে আসামে চায়ের (Camellia sinensis) আবিস্কার এবং কয়েক বছরের মধ্যেই লন্ডনের বাজারে এর তুমুল জনপ্রিয়তা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে আসামের গুরুত্ব অনেকাংশে বাড়িয়ে তোলে। ১৮৭৪ সালে আসাম আলাদা করলেও ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গে সেটিকে আবার বাংলার অন্তর্ভুক্ত করা হয়, এবং ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদের পর তা আবার নর্থ-ইস্ট ফ্রন্টিয়ারের অংশ হয়ে যায়। ইন্ডিয়া স্বাধীন হবার পর এখান থেকে নাগাল্যান্ড, মিজোরাম এবং মেঘালয় আলাদা করে নেয়া হয়। 

১৯৪৭ এর স্বাধীনতার পরঃ

১৯৪২ সালে সমগ্র ইন্ডিয়া জুড়ে কুইট ইন্ডিয়া আন্দোলন শুরু হবার পরপরই ব্রিটিশ রাজ ভারতের বেশ কিছু জায়গাকে ‘অশান্ত বা বিক্ষুব্ধ অঞ্চল’ হিসেবে চিহ্নিত করে সেখানে আর্মড ফোর্সেস (স্পেশ্যাল পাওয়ারস) অ্যাক্ট নামে একটি কুখ্যাত আইন জারি করে, যার বলে সামরিক বাহিনীকে অবাধ ক্ষমতা দেয়া হয়েছিল।

ইন্ডিয়া স্বাধীন হয়ে যাবার পর নাগাল্যান্ডে যখন স্বাধিকারের প্রশ্নে গণভোট হয়ে গেল, তখন তা দমনের জন্য আসাম সরকার প্রথমত আসাম মেইন্টেনেন্স অফ পাবলিক অর্ডার আইন ১৯৫২ জারি করে, এবং এর মাধ্যমে পুলিশী তৎপরতা বৃদ্ধি করে। পরিস্থিতির ক্রমাবনতির কারণে ১৯৫৫ সালে নাগা হিলস এবং আসামের অন্যান্য এলাকায় আসাম রাইফেলস নামক একটি প্যারামিলিটারী বাহিনী মোতায়েন করে। কিন্তু এতেও পরিস্থিতির কোন উন্নয়ন না হওয়ায় (এমনকি ১৯৫৬ সালে নাগা ন্যাশনাল কাউন্সিল NNC তাদের স্বাধীন সরকারও গঠন করে ফেলে) ১৯৫৮ সালে তৎকালীন ভারতীয় রাষ্ট্রপতি ডঃ রাজেন্দ্র প্রসাদ জারি করেন আর্মড ফোর্সেস (স্পেশ্যাল পাওয়ারস) অ্যাক্ট, ১৯৫৮ যা AFSPA নামেই পরিচিত। সেই থেকে এখন পর্যন্ত সেভেন সিস্টার্স রাজ্যগুলোতে এই আইন কার্যকর রয়েছে। তবে অল্প কিছুদিন আগে ত্রিপুরা রাজ্যে এই আইন রহিত করে নেয়া হয়।

এই আইনটিতে সামরিক বাহিনীকে অভূতপূর্ব ক্ষমতা দেওয়া হয়, যার মধ্যে রয়েছে ওয়ারেন্ট ছাড়া যেকোন ‘সন্দেহভাজন’ ব্যক্তিকে গ্রেফতার, কোন বাসাবাড়ীতে তল্লাসী, ‘যথাযথ’ ওয়ার্নিং দেবার পর গুলি করবার ক্ষমতা। এছাড়াও সামরিক বাহিনীর সদস্যদের ইমিউনিটি দেওয়া হয়েছে, এবং সরল বিশ্বাসে কৃত কোন কাজের জন্য আইনগত ব্যবস্থা নেয়া যাবে না।[2]

জাতিসংঘ, অ্যামনেস্টি ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা তীব্রভাবে এই আইনটির নিন্দা করে আসছে। এই আইনটি বাতিল করবার দাবীতে ইরম চানু শর্মীলা নামক একজন মানবাধিকার কর্মী যিনি মনিপুরের লৌহমানবী হিসেবে পরিচিত, তিনি ২০০০ সালের নভেম্বর থেকে আজ পর্যন্ত অনশন করছেন।[3] (তিনি বিশ্বের দীর্ঘতম অনশন প্রতিবাদকারী)।

সাম্প্রতিক সময়ে উইকিলীকসের ফাঁস করা কিছু তারবার্তায় সেভেন সিস্টার্সের প্রতি ভারতীয় প্রশাসনের মনোভাবের কিছু বহিঃপ্রকাশ দেখতে পাওয়া গেছে, যেখানে তারা এই অঞ্চলকে (বিশেষত মনিপুর) অঙ্গরাজ্যের বদলে উপনিবেশ হিসেবে মূল্যায়ন করে থাকেন।[4] এছাড়া সেখানে নিয়মিত মানবাধিকার লংঘনের ঘটনা এবং এইসব ঘটনায় সামরিক বাহিনী বিশেষত আসাম রাইফেলস এর সংশ্লিষ্টতা বার বার উঠে আসে। [5]

অব্যাহত গুপ্তহত্যা, এনকাউন্টার এবং মানবাধিকার লংঘনের ঘটনার অভিযোগ খতিয়ে দেখতে ভারতীয় সুপ্রীম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি সন্তোষ হেজের নেতৃত্বে ২০১৩ সালে গঠিত হয় সন্তোষ হেজ কমিশন; এই কমিশন ৬টি এনকাউন্টারের ঘটনা তদন্ত করে দেখতে পায়, নিহত ছয়জনের কারো বিরুদ্ধেই কোন ধরণের অভিযোগ ছিল না। এই কমিশন প্রচলিত AFSPA কে আরও জনবান্ধব করে তুলতে এবং সামরিক বাহিনীর সদস্যদের দায়মুক্তির সুযোগ আরও কমিয়ে আনবার সুপারিশ করেছেন।[6]      

 (চলবে...) 

[1] http://www.istishon.com/node/3671

[2] http://www.thehindu.com/nic/afa/afa-part-ii.pdf

[3] http://www.wsj.com/articles/indian-activist-presses-14-year-hunger-strike-to-protest-abuses-1420604056

[4] http://www.thehindu.com/news/the-india-cables/article1556697.ece

[5] http://www.thehindu.com/news/the-india-cables/the-cables/article1556742.ece

[6] articles.timesofindia.indiatimes.com/2013-04-04/india/38277575_1_apex-court-ibobi-singh-government-manipur