লেখা

বাংলাদেশের প্রতিবেশি সাত বোনের কান্নাঃ বাংলাদেশকে স্পর্শ করে? (শেষ পর্ব)
বাংলাদেশের প্রতিবেশি সাত বোনের কান্নাঃ বাংলাদেশকে স্পর্শ করে? (শেষ পর্ব)
লিখেছেন শাইখ মাহদী
২৪ অক্টোবর ২০১৫

সেভেন সিস্টার্সের প্রায় প্রতিটি রাজ্যেই বিশেষত আসাম, মনিপুর ও নাগাল্যান্ডে ব্যাপক মানবাধিকার লংঘন ও নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটতে দেখা যায়। এই অপরাধগুলো সামরিক বাহিনী এবং সন্ত্রাসবাদী বিদ্রোহী দল, উভয় পক্ষ থেকেই ঘটে থাকে। পুরো সেভেন সিস্টার্স অঞ্চলটি জাতিগতভাবে ব্যাপক বৈচিত্র্যময় হবার কারণে অনেক ক্ষেত্রেই জাতিগত সহিংসতা ও দাঙ্গা এখানে তীব্র আকার ধারণ করে। কখনো কখনো ধর্মভিত্তিক সহিংসতাও এখানে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। AFSPA এর অপপ্রয়োগের ফলে অনেক ক্ষেত্রেই সামরিক বাহিনী এই ধরণের মানবাধিকার লংঘনের কাজ ঘটিয়েও আইনের আওতার বাইরে থেকে যায়। মনিপুরে আসাম রাইফেলের বিরুদ্ধে নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের অসংখ্য অভিযোগ থাকলেও তার কোন প্রতিকার না পাওয়ায় ২০০৪ সালে এর বিরুদ্ধে জনসমক্ষে নগ্ন হয়ে প্রতিবাদ করেন মানবাধিকার কর্মী ইমা নাংমি, যা আলোড়ন তোলে বিশ্বমিডিয়ায়। এই আন্দোলনের জ্বালাময়ী স্লোগান ছিল “ইন্ডিয়ান আর্মি প্লিজ রেইপ আস”[1]

rp

 

সাত বোন ও বাংলাদেশঃ বিচ্ছিন্নতাবাদী, চোরাচালান ও শরণার্থী সমস্যা

বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্মলগ্ন থেকেই সেভেন সিস্টার্স রাজ্যগুলো ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। এর সর্বপ্রথম আভাস পাওয়া যায় ১৯৬৮ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সহ দেশপ্রেমিক বাঙ্গালী রাজনৈতিক ও সামরিক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আনীত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, যেখানে বলা হয় মুজিব ও কতিপয় বাঙ্গালী ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলায় ভারতীয় গোয়েন্দা বিভাগের সাথে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছেন।[2] পরবর্তীতে এই মামলার অন্যতম আসামী সার্জেন্ট জহুরুল হককে কারাগারে হত্যা করা হলে এর প্রতিবাদে বিক্ষুদ্ধ মানুষেরা সম্পন্ন করে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধেও আগরতলার মেলাঘর হয়ে ওঠে স্বাধীনতাকামী বাঙ্গালী বীর জনতার অন্যতম প্রধান প্রশিক্ষণস্থল, যেখানে খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর টু এর বীরযোদ্ধারা এবং ক্র্যাক প্লাটুনের গেরিলারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

তবে একাত্তরের যুদ্ধকালীন বাঙ্গালী শরণার্থীদের আশ্রয় দিলেও পরবর্তীতে এই শরণার্থীদের কেন্দ্র করে কিছুটা জাতিগত সমস্যা দেখা দেয় সেভেন সিস্টার্সে। ইন্ডিয়া সরকার আশির দশকে অবৈধ অনুপ্রবেশ বন্ধ করতে ইলিগ্যাল মাইগ্র্যান্টস (ডিটারমিনেশন বাই ট্রাইব্যুনাল) অ্যাক্ট, ১৯৮৩ (IMTD 1983)[3] নামক একটি আইন পাস করে। তবে আসামে সংখ্যালঘু মুসলমানেরা যারা বিভিন্ন সময়ে (বিশেষত ১৯৭৯-১৯৮৫ সালে নথিবহির্ভূত বাংলাদেশী ও অন্যান্য অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে পরিচালিত সহিংস আসাম বিক্ষোভ) ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিলেন, তাদের সেফগার্ড হিসেবে আইনটি প্রণয়ণ করা হয়েছিল। অবশ্য ২০০৬ সালে সুপ্রীম কোর্ট এই আইনটিকে বাতিল ঘোষণা করেন।

জাতিগত সংঘাত, অবৈধ অনুপ্রবেশ ও চোরাচালানীর পাশাপাশি বাংলাদেশে সেভেন সিস্টার্সের বিভিন্ন স্বাধীনতাকামী আন্দোলনের নেতাকর্মীরা বিভিন্নভাবে অবস্থান করে থাকে। এদের মধ্যে আসামের শীর্ষসংগঠন উলফা নেতা অনুপ চেটিয়া, পরেশ বড়ুয়া সহ অনেকেই বাংলাদেশ অবস্থানকালে বন্দী হয়েছেন। ইন্ডিয়া বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে করিডর ও ট্র্যানজিট সুবিধা আদায়ের মাধ্যমে আদতে সেভেন সিস্টার্সে তাদের সামরিক ব্যবস্থাপনাই আরও সংহত করতে যাচ্ছে, এমন দৃষ্টিভঙ্গি অনেক বিশ্লেষকের। সব মিলিয়ে, ভারতের আঞ্চলিক রাজনীতি এবং বিদ্রোহ-আন্দোলন দমনের ঝুঁকিপূর্ণ পথে বাংলাদেশকেও হাঁটতে হচ্ছে, ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায়। অরুণাচল সীমান্তে চীনের সরব উপস্থিতিও ভারতের চিন্তার একটি বড় কারণ, যা ক্ষেত্রবিশেষে ভূরাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশকেও কমবেশি প্রভাবিত করছে।

সার্বিকভাবে,  আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি, নিরাপত্তা এবং সাম্প্রতিক মায়ানমার-রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু সমস্যাসহ চট্টগ্রামের গভীর সমুদ্রবন্দর স্থাপনের ফলে উন্মোচিত নতুন সম্ভাবনা এবং সেভেন সিস্টার্সের বিস্ফোরণম্মুখ জাতিগত ও ধর্মীয় বৈচিত্রের পাশাপাশি উপমহাদেশে ধর্মীয় উগ্রবাদের উত্থান বাংলাদেশের জন্য একটি জটিল পরিস্থিতির সূচনা করতে যাচ্ছে। ইন্ডিয়ান ইউনিয়নের ভেতরে এরকম অবিচার কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা মাত্র নয়। একদিকে যেমন সেভেন সিস্টার্সে চলছে জুলুম বিরোধী আন্দোলন সে আন্দোলনে এমনকি ইন্ডিয়ান আর্মি নিয়মিত বিরতিতে মারা পড়ছে, অন্যদিকে ইন্ডিয়ার অন্যান্য সুবিধা বঞ্চিত জনগোষ্ঠী যেমন দলিত বা নিচু বর্ণ হিন্দু সম্প্রদায়, মুসলিম ও খ্রীস্টানরা নানাভাবে অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে নিগৃহীত লাঞ্ছিত হচ্ছেন। ইন্ডিয়া যদি কথিত প্রবৃদ্ধি ও শক্তিশালী রাষ্ট্র হওয়ার পথে হাঁটে, এসব নিপীড়ন চালু রেখে, এক বিরাট জনগোষ্ঠীকে বঞ্চিত রেখে সেটা কিভাবে সে সফল করবে সেটা দেখার বিষয়।  

           

 

[1] http://www.tehelka.com/2013/02/we-stripped-and-shouted-indian-army-rape-me-it-was-the-right-thing-to-do/

[2] http://archive.thedailystar.net/forum/2007/february/feb69.htm

[3] http://www.india-eu-migration.eu/media/legalmodule/Illegal%20Migrants%20Act%201983.pdf