লেখা

‘বাঙালি’ আবরণে ঢাকা স্বাধীনতা : প্রসঙ্গ চৌধুরী সাহেব
‘বাঙালি’ আবরণে ঢাকা স্বাধীনতা : প্রসঙ্গ চৌধুরী সাহেব
২৬ অক্টোবর ২০১৫

‘বাঙালি’ শব্দটি নানান অর্থে ব্যবহৃত হয়। এর একটি ব্যবহার হোলো সুনির্দিষ্ট একটি রাজনৈতিক দলের কর্মী হওয়া। কোনো জনগোষ্ঠী বাংলা ভাষায় কথা বলা সত্ত্বেও যখন তাকে কেউ বলে, তোমাদের ‘বাঙালি’ হয়ে যেতে হবে; তার মানে তোমাদেরকে ঐ-নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের কর্মী হয়ে যেতে হবে। কোনো মানুষকে কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মী হবার জন্যে বাধ্য করা যায় না; এটি অগণতান্ত্রিক, স্বাধীনতার হরণ এবং মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী। কিন্তু বাংলাদেশী বুদ্ধিজীবীরা বৈচিত্রপূর্ণ চিন্তা-চেতনার মানুষগুলোকে একই ব্র্যান্ডের ‘বাঙালি’ হবার বাধ্যবাধকতা আরোপ করেন।

 

পৃথিবীর সব গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ভাষা, বর্ণ, গোত্র ও ধর্মের বৈচিত্র্যকে টিকিয়ে রাখার জন্যে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হয়। কিন্তু বাংলাদেশ এর ব্যতিক্রম। এখানে ‘বাঙালি’ পরিচয়ের আবরণে গণতন্ত্রকে ধ্বংস করা হয়; মানুষের স্বাধীনতা ও মৌলিক অধিকার হরণ করা হয়। বুদ্ধিজীবী থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র রাজনৈতিক কর্মী পর্যন্ত সবাই ‘বাঙালি’ শব্দের আবরণে বাংলাদেশ ভূখণ্ডে বসবাসকারী অপরাপর জনগোষ্ঠীগুলো স্বাধীনতা হরণ করার একটি অসাংবিধানিক ‘বৈধতা’ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। তার একটি উদাহরণ আবদুল গাফফার চৌধুরী। বেশ কিছুদিন আগে, তিনি নিউইয়র্কের বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনে একটি বক্তৃতা করেন। তার বক্তৃতার প্রতিবাদে পত্রিকা, ব্লগ ও ফেইসবুকে তখন ঝড় উঠেছিল। দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদ মিছিল হয়েছিল। আজকের আলোচনায় আমরা আব্দুল গাফফার চৌধুরিকে উদাহরণ হিসাবে পেশ করছি। দু’একজন বাদে বাংলাদেশের প্রায় বুদ্ধিজীবীর চরিত্র একই। সবার চিন্তা-ভাবনা জুড়ে আছে বাঙ্গালিকরণ প্রক্রিয়া।


আবদুল গাফফার চৌধুরী এমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ লোক না যে তার বিরুদ্ধে মানুষ সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝাঁপিয়ে পড়বে। কিংবা তিনি কোথায় কি বলেছেন, তা বাংলাদেশের মানুষকে শুনতে হবে। তাকে নিয়ে কখনো বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কোনোই আগ্রহ ছিল না। কিন্তু তিনি যখন আল্লাহ তায়ালা, রাসূল (স) এবং ইসলাম নিয়ে কটূক্তি করলেন, তখন তার বিরুদ্ধে মানুষ ব্যাপকহারে প্রতিবাদ শুরু করলো। কেনো তখন মানুষ এমন প্রতিবাদ করলো তা বোঝার জন্যেই আবদুল গাফফারের বক্তব্যটা আমরা আমলে নিচ্ছি। তার বক্তব্যে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভয়ংকর পরিণতি সহজে অনুমান করা যায়। বুদ্ধিজীবীরা যখন বাংলাদেশের মানুষকে ‘বাঙালি’ হবার পরামর্শ দেন, তখন তারা আসলে কি করতে চান; তা চৌধুরী সাহেবের বক্তব্য থেকে একেবারে পষ্ট হওয়া যায়। এবং একজন বাঙালি যখন পূর্ণরূপে তার আত্মপ্রকাশ করেন, তখন সে কি কি চরিত্র ধারণ করে; তা-ও চৌধুরী সাহেবের বক্তব্য থেকে প্রকাশ পায়।


লেখক হিসাবে আবদুল গাফফার চৌধুরী কতটা সফল তা নিয়ে বিতর্ক আছে। কিন্তু বাঙালি জাতীয়তাবাদের একজন একনিষ্ঠ প্রচারক হিসাবে তিনি যে শতভাগ সফল, তাতে কেউ আপত্তি করেন না। বাঙালী জাতীয়তাবাদের যাবতীয় কর্মসূচীকে লিখিতরূপে প্রচার-প্রচারণা ও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের দায়িত্ব তার কাঁধে-ই বেশি। বিভিন্ন সময় যুক্তি-পরামর্শ দিয়ে সব মানুষের গায়ে জোরকরে বাঙালি জাতীয়তাবাদের চিহ্ন লাগিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা প্রচুর। সুতরাং তিনি যখন কোনো কথা বলেন, তা কেবল একজন লেখক হিসাবে বলেন না; বাঙালি জাতীয়তাবাদের একজন একনিষ্ঠ ভক্ত হিসাবে বলেন। সে কারনে চৌধুরী সাহেব ব্যক্তি হিসাবে গুরুত্বপূর্ণ না হলেও তার কথার একটি রাজনৈতিক মূল্য আছে। ‘বাঙালি’ শব্দটির রাজনৈতিক মানে কি; তা আবদুল গাফফার চৌধুরী কাছ থেকেই সবচেয়ে বেশি স্পষ্ট হওয়া সম্ভব।


চৌধুরী সাহেব বর্তমান সময়ের একজন আদর্শ বাঙালি। যে-কোনো বাঙালি যখন পরিপূর্ণরূপে তার আত্মপ্রকাশ করে তখন সে আবদুল গাফফার চৌধুরী হয়ে যায়। তখন সে অ-বাঙালিদের স্বাধীনতা ও মৌলিক অধিকার হরণ করতে চায়। এ অপকর্মে আবদুল গাফফার-ই প্রথম না; তার আগেও অনেকে এভাবে ‘পূর্ণ-বাঙালি’ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছিল। কিছু দিন আগে, লতিফ সিদ্দিকী নামে একজন ব্যাক্তিও ‘পূর্ণ-বাঙালি’ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন। যার সম্পর্কে চৌধুরী সাহেব বলেছেন, “লতিফ সিদ্দিকী কী এমন বলেছিল? তাকে বিপদে পড়তে হয়েছে। তার জন্য আজকে দেশে আন্দোলন হচ্ছে”। চৌধুরী সাহেব বোধ হয় জানেন না, পৃথিবীর যেখানে যখন সাধারণ মানুষের স্বাধীনতা ও মৌলিক অধিকার হরণ করা হয়, সেখানেই মানুষ আন্দোলনে জেগে উঠে। একাত্তরের আগে পাঞ্জাবীরা যেমন ‘মুসলিম’ সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে পূর্ব পাকিস্তানীদের অধিকার হরণ করেছিল, এখন তেমনি বাঙালী বুদ্ধিজীবীরা ‘বাঙালি’ ব্যানারের আবরণে বাংলাদেশি মানুষের স্বাধীনতা ও মৌলিক অধিকার হরণ করছে। তখন যেমন সাধারণ মানুষ স্বাধীনতা ও মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করার জন্যে আন্দোলন করেছিল; এখনো সাধারণ মানুষ সেভাবেই আন্দোলন-প্রতিবাদ করছে। লতিফ সিদ্দিকী কিংবা আবদুল গাফফার চৌধুরীর বিরুদ্ধে বাংলাদেশে যে আন্দোলন-প্রতিবাদ হয়েছে, তা মানুষের স্বাধীনতা রক্ষা করার আন্দোলন। মানুষ নিজেদের ইচ্ছানুযায়ী ধর্ম পালন করতে কিংবা কথা বলার স্বাধীনতা লাভ করতে চায়।


একাত্তরের আগে পাঞ্জাবীরা যেমন পূর্ব পাকিস্তানীদের সাথে বৈষম্যপূর্ণ আচরণ করেছে; একাত্তরের পর আজ ‘বাঙালিরা’ বাংলাদেশের অন্য ভাষা-ভাষী ও সংস্কৃতির মানুষের সাথে একই আচরণ করছে। “বাংলাদেশে বাঙালিরা ব্যতীত অন্য কোনো ভাষাভাষী কিংবা ভিন্ন গোত্রীয় কোনো মানুষের বসবাসের অধিকার নাই”—একথা বাঙালি বুদ্ধিজীবীরা প্রায় বলে থাকেন। তারা চায়, এ দেশের সবাই বাঙালিদের মত কথা বলতে হবে, বাঙালিদের মত খেতে হবে, বাঙালিদের মত পোশাক পরতে হবে – সবকিছুই বাঙালিদের মত হতে হবে। এখানে অন্যদের কোনো স্বাধীনতা নেই। বাংলাদেশে থাকতে হলে কেমন পোশাক পরতে হবে, কিভাবে চলতে হবে – সবই বাঙালি বুদ্ধিজীবীরা ঠিক করে দিবেন। এ কারণে চৌধুরী সাহেব মুসলিম পুরুষদের পোশাকের ব্যাপারে বলেন, “পুরো দেশ এখন দাড়ি-টুপিতে ছেঁয়ে গেছে। সরকারি অফিসসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে টুপি আর দাড়ির সমাহার।” এবং নারীদের ব্যাপারে বলেন, “ক্লাস টু’য়ের মেয়েরাও হিজাব-বোরকা পড়বে! এটা আমাদের ধর্ম শিক্ষা হতে পারে? এসব ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।” ঠিক এমনই একটি কথা ক’দিন আগে কানাডার সবচেয়ে রক্ষণশীল প্রধানমন্ত্রী স্টিফেন হার্পার বলেছিলেন। কানাডার সেই প্রধানমন্ত্রীর কথা শুনে সে-দেশের নাগরিকরা এতটাই রাগান্বিত হয়েছিলেন যে, গত ১৯ অক্টোবরের নির্বাচনে স্টিফেন হার্পারকে লজ্জাজনক পরাজয় বরণ করে নিতে হয়েছে। যাই হোক, চৌধুরী সাহেব ভুলে গেছেন, পৃথিবীতে এক মানুষ অন্য মানুষের নিয়ম মেনে থাকতে চায় না। সে জন্মগতভাবে স্বাধীন। মানুষকে অধীন করে রাখার বিপদ এ জাতি বহুবার দেখেছে। যে মানুষের ইচ্ছা তিনি টুপি-পাঞ্জাবি পরবেন বা হিজাব পরবেন, যার ইচ্ছা তিনি পরবেন না। কিন্তু কেউ টুপি-পাঞ্জাবি বা হিজাব পরার স্বাধীনতা পাবে না;—এ কথার অর্থ কি?


বাংলাদেশের সাধারন মানুষ আবদুল গাফফার চৌধুরীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক আন্দোলন করেছিলো। এর মানে এই নয় যে, তারা কেবল কোনো নাস্তিকের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিলো। বাংলাদেশে অনেকেই নাস্তিকতার চর্চা করে, কিন্তু মানুষ তাদের বিরুদ্ধে সাধারণত আন্দোলন-সংগ্রাম করে না। যখনি কেবল ‘বাঙালি’ জাতীয়তার নামে কোনো ধর্মকে আঘাত করে কথা বলা হয়, ধর্মীয় আচার-আচরণের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়, তখনি মানুষ আন্দোলনে-ক্ষোভে ফেটে পড়ে। এটা পৃথিবীর নিয়ম। মানুষকে অবদমিত করতে চাইলে তারা জেগে ওঠে এবং আন্দোলন শুরু করে। আবদুল গাফফার চৌধুরীর বিরুদ্ধে বাংলাদেশের গণমানুষ কিছুদিন আগে যে-ক্ষোভ দেখিয়েছিল, তা কেবল নাস্তিকতার সমস্যা না। এটি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে একই ব্রান্ডের ‘বাঙালি’ বানিয়ে ফেলার সমস্যা। চৌধুরী সাহেব যখন বলেন, “আমরা আগে বাঙালি তারপরে মুসলমান। আমরা ধর্ম পরিবর্তন করতে পারি, কিন্তু বাঙালিত্ব নয়”; তখন তিনি আসলে সবাইকে ‘বাঙালি’ হয়ে যেতে বাধ্য করেন। আবদুল গাফফারের মত এই ফ্যাসিস্ট ইচ্ছা সকল ‘বাঙালি’ বুদ্ধিজীবীর মধ্যেই কমবেশি আছে। কিন্তু ইতিহাস আমাদেরকে বারবার চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছে, এ ধরণের ফ্যাসিস্ট ইচ্ছা যে কোনো জাতি ধ্বংসের একমাত্র কারণ। বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের এখনি সতর্ক হতে হবে। নচেৎ আর ক’দিন পরে তাদের কারনেই যদি বাংলাদেশের মানুষ ৭১-এর মত আবার ডাক দিয়ে বসে- ‘আমরা স্বাধীন হতে চাই’; তখন আর কিছু করার থাকবে না।