লেখা

আমি কিংবদন্তির কথা বলছিনা, বলছিনা পূর্বপুরুষের দুর্ভাগ্যের কথা
যা লেখা হয়েছে তার পিঠে, আঁকা হয়েছে দগদগে ক্ষত ভরা মানচিত্র
আমি বলছি ইতিহাসের কথা-একান্তই ব্যক্তিগত উপাখ্যান
তবে সেটা শতাব্দী নয়, সহস্রাব্দের, কিংবা তারো বেশি
আমার এবং তার- প্রেমের, কামের, বিচ্ছেদের আর অবসানের
জীবনানন্দ একা একা এই হাজার বছরের পথ পাড়ি দিয়েছেন
তবে আমরা পাড়ি দিতে চেয়েছি - হাতে হাত রেখে
মালয় সাগর, সিংহল সমুদ্র, ধূসর জগত, বিদর্ভ নগর
আরো পাড়ি দিয়েছি- গ্রীক পুরাণের উপত্যকা, আরব্য রজনীর রূপকথা
আনাতোলিয়ার মালভূমি আর বসফরাসের তীর ধরে হেটেছি আমরা দীর্ঘকাল
পাড়ি দিয়েছি উত্তম মেরুর শুভ্র বরফের পাহাড়, সাহারার গনগনে সূর্য
আমরা শুধু স্থান পাড়ি দেইনি, পাড়ি দিয়েছি সময়- কাল কিংবা মহাকাল
আর আমদের চলার পথের রশদ ছিল- উপচানো প্রেমের দুটি কলস
যা আমাদের উষ্ণ রেখেছিল, এন্টার্কটিকায়, সাইবেরিয়ার বনে
সাহারায় আমরা নদী বইয়ে দিয়েছিলেম সেই কলসে ভরা রারি দিয়ে
 
আমাদের শুরুটা প্লেটোর ইউটোপিয়া দিয়ে- আইডিয়াল
মর্ত্যের জগতে স্বর্গের নিখুঁত ভালবাসার ফ্রেম।
এক সময় প্লেটো মারা গেলেন আর মৃত্যু হল আমাদের প্লেটনিক যাত্রা।
প্লেটোর মৃত্যতে মাতম করতেই ইপিকিউরিয়ানরা হাজির হল
তারপর শুরু হল জৈবিক শিহরণের কাল।
সেটাও প্রেমময় ছিল বটে, প্রতিটি অঙ্গের উন্মাদনা
শরীর স্পর্শে হৃদয় জাগাবার মন্ত্র রপ্ত করেছি আমরা
ঘর্ষণে ঘর্ষণে হৃদয়ের কলসে জাগিয়েছি উষ্ণতা
হঠাৎই একদিন ঠোঁঁটের উত্তাপ হৃদয়ের কলসে প্রবেশ করলনা।
ইপিকিউরিয়ানদের খোঁজ করতেই দেখি তারা সব গত হয়েছেন
আর আমাদের প্রেম পেরিয়ে গেছে আরো সহস্র বছর
 
এরপর ভালবাসার খোঁজে দেকার্তের কাছে হাজির হলাম
বললেন-বিশ্বাস নয়, অনুভূতি নয়, খোঁজ নিশ্চয়তা
নিশ্চয়তার বেদিতেই তোমাদের প্রেম ফিরবে ধ্রুবতারা হয়ে
খোঁজ করতে দেখি- আমাদের মাঝ দিয়ে বয়ে গেছে সীমান্ত রেখা
যা পার হতে পারেনি ফেলানি- ঝুলেছিল কাটাতারে নিথর হয়ে
পজিভিস্টরা বললেন –ফ্যাক্টই শেষ কথা, এভিডেন্স কি তোমাদের ভালবাসার?
ভালবাসার এভিডেন্স শো করতে সীমান্তের কাঁঁটাতার ছিন্ন করেছি
প্রেমের নজরানায় মেতে উঠেছি উন্মাতাল- চুম্বনে, কামে, দলনে মথনে,
স্টেডিয়াম, শপিং মল, টিএসসির মোড়, আইফেল টাওয়ার
বাদ দেইনি আমরা মিছিল, উৎসবের মঞ্চ, রিয়েলিটি শো
রং তুলির ক্যানভাস, নৃত্যের মুদ্রা, আইটেম সং এর মাদকতা
অঙ্গের ভাঁঁজে ভাঁঁজে বিমূর্ত ভালবাসাকে মূর্ত করে তুলেছি আমরা
জনতা হাততালি দিল, বুদ হল প্রেমে, কামে; সাক্ষ্য দিয়ে বলল
তোমাদের প্রেম নিখুঁত- যেমন বিএফসির চিকেন, ম্যাকডোনাল্ডের বার্গার
আমাদের দেখাদেখি- ফ্যাকচুয়াল ভালবাসায় মেতে উঠল প্রেমিক যুগলেরা
অবশেষে সব পাখি ঘরে ফিরল কিন্তু আমাদের হৃদয়ের উত্তাপ ফিরলনা তবু
তবে কি ভালবাসার প্রমাণ মাঠেঘাটে রেখে আমরা ফিরেছি খালি হাতে?
 
দেকার্তকে প্রশ্ন করলে তিনি নিরব- কাঁঁটাতার ছিড়বার উপায় জানা নেই তার
কাঁঁটাতার কনক্রিটের দেয়াল হল- ছিটকে গেলাম আমরা, প্রথম মানব-মানবীর মত
হাইডেগার এসে বললেন – আমি জানি তোমাদেরকে জোড়া লাগাবার উপায়
তোমাদের প্রেম ফিরবে, বিশ্বাস ফিরবে, নিশ্চয়তার কানাগলি থেকে পাবে উদ্ধার
তার কথায় অবশ্য কান দেইনি আমি, সেও না
শুনেছি প্রেমের শত্রু খুনি হিটলারের সাথে তার প্রবল সখ্য
আমি ততক্ষণে প্রেম নয়, খোঁজ করতে শুরু করেছি শান্তির
বনলতা সেন এসে বললেন- আসুন আমি আপনাকে শান্তি দিব, দুদন্ডের শান্তি
শান্তির লোভে আমি তার কুটিরে পা বাড়িয়েছি শতাব্দীকাল।
একদিন বনলতারা যৌবন হারালো- দুদন্ডের শান্তি দিতেও হল অক্ষম
পাখির নীড়ের মত চোখ পলিজমা নদীর মত খড়খড়ে চৌচির হল।
আমারো বেঁচে থাকা হয়ে গেল- ঝরে যাওয়া পাখির পালক
অতঃপর জীবনানন্দ এসে হাজির হলেন, বললেন আমি তোমার গন্তব্য জানি
আমি তার হাত ধরে বললাম চলুন- রেল পথ দিয়ে আজ আমরা হাঁঁটব।