লেখা

মালয়েশিয়ার ক্ষমতার রাজনীতিঃ ঘৃণার চেতনাকে বর্জন করে দেশের স্বার্থ দেখার অনন্য উদাহরণ
মালয়েশিয়ার ক্ষমতার রাজনীতিঃ ঘৃণার চেতনাকে বর্জন করে দেশের স্বার্থ দেখার অনন্য উদাহরণ
০৭ জুন ২০১৭

মালয়েশিয়ার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা একটু ভিন্ন। কিন্তু এখান থেকে বাংলাদেশের জন্য রয়েছে অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। মূলত মালয়েশিয়ার এডমিনিস্ট্রেশন মালয়দের হাতে, সরকারী অফিস আদালতগুলোতে মালয়দের প্রাধান্য বেশি। সে তুলনায় ইন্ডিয়ান ও চাইনিজদের আধিক্য কম। এটা নিয়ে এখানে বেশ আন্তঃসাম্প্রদায়িক দেনামনা রয়েছে, কিন্তু সেটা কখনও ঘৃণা ভিত্তিক চেতনা তৈরির অপচেষ্টায় কাউকে প্ররোচিত করেনি। এখানে রয়েছে ধর্মভিত্তিক ইসলামী দল, সম্প্রদায় ভিত্তিক দল, বাম পন্থি ও অন্যান্য সেক্যুলার দল। এখানে রাজনৈতিক জোটে বাম ও ইসলামী দলের সংযুক্তিও পরিলক্ষিত হয়।   

মালয়েশিয়ার ক্ষমতার রাজনীতিতে প্রধানত দুইটা জোটের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়। একটি হল বারিসান ন্যাশনাল (BN), যেটি আমনো (UMNO) নামক একটি দলের নেতৃত্বে গঠিত জোট। এ জোটে তেরটি দল রয়েছে। এই দলটি গত কয়েক যুগ ধরে ক্ষমতায় রয়েছে। জোটের আওতায় মাহাথির মুহাম্মদ দেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন দীর্ঘকাল। আনোয়ার ইব্রাহীম ছিলেন তাঁর ডেপুটি প্রাইম মিনিস্টার। পরে আনোয়ারের সাথে মাহাথিরের দ্বন্দ্বের জের ধরে, আনোয়ারকে তার পদ ও দল থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়। এবং আনোয়ারকে সমকামিতার অভিযোগে কারাদণ্ডও দেওয়া হয়। উল্লেখ্য তিনি পরবর্তীতে এই মামলার শাস্তি থেকে অব্যাহতি পান। কিন্তু বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নাজিব তুন রাজ্জাক এমন এক মুহূর্তে আনোয়ারকে আবারও নতুন সমকামিতার মামলায় জেলে পাঠান, যখন আনোয়ারের দল বিরোধী শক্তি হিসেবে বেশ শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠছিল।

 

আনোয়ার ইব্রাহীম (বামে) মাহাথির মুহাম্মদ (ডানে)

 

অন্যদিকে সাবেক ডেপুটি প্রাইম মিনিস্টার, আনোয়ার ইব্রাহীমের নেতৃত্বাধীন PKR, লিম কিত সিয়াং এর নেতৃত্বাধীন চাইনিজ অধ্যুষিত বাম পন্থী DAP ও আব্দুল হাদি আওয়াং এর নেতৃত্বে ইসলামী দল PAS এর সমন্বয়ে রয়েছে বিরোধী জোট। এদের মধ্যে এতদিন PAS ও PKR ছিল অপেক্ষাকৃত জনপ্রিয়। কিন্তু ২০১৩ সালের নির্বাচনে সবাইকে ছাপিয়ে বাম পন্থী দল DAP দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে উপরে উঠে আসে।

তিন দলের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা বিরোধী জোটটি দিন দিন ক্ষমতাসীন জোট BN এর শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠছিল। মনে করা হচ্ছিল, অচিরেই BN থেকে এই জোট ক্ষমতা কেড়ে নিবে। কিন্তু এরই মধ্যে জোটটি ভেঙ্গে যায়। ইসলামী দল PAS কর্তৃক তাদের ক্ষমতাধীন প্রদেশ কেলান্তানে হুদুদ (ইসলামিক ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট) আইন বাস্তবায়নকে কেন্দ্র করে প্রথমে দুই জোট সদস্য দল, বাম পন্থী DAP ও PAS এর মধ্যে টানাপড়েন তৈরি হয়। এদিকে ক্ষমতাসীন জোট (BN) ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী দল হলেও, হুদুদ আইন বাস্তবায়নে PAS কে সমর্থন জানায়। প্রধানমন্ত্রী নাজিব তুন রাজ্জাক হঠাৎ ধার্মিক বক্তৃতা বানে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। কথিত আছে যে, এর মাধ্যমে বিরোধী জোটকে ভেঙ্গে দেয়াই মূল উদ্দেশ্য হিসেবে কাজ করেছে।

এদিকে এই হুদুদ বাস্তবায়ন নিয়ে PAS এর মধ্যেই আন্তঃ-কোন্দল শুরু হয়ে যায়। অবশেষে দলটিই ভেঙ্গে দুই ভাগ হয়ে যায়। PAS দল হিসেবে বিরোধী জোট থেকে বেরিয়ে আসে আর PAS এর অন্য একটি অংশ নতুন দল গঠন করে বিরোধী জোটে থেকে যায়। অন্যদিকে যেসকল প্রদেশে বিরোধী জোটের কোনও দলই একক ভাবে ক্ষমতায় যেতে পারে নাই কিন্তু জোটগতভাবে ক্ষমতায় এসেছে, সে সকল প্রদেশে জোট বহাল আছে বলে বিরোধী জোটের দাবী। বিভক্ত PAS অবশ্য ঘোষণা দিয়েছে যে তারা ক্ষমতাসীন জোটে যোগ দিবে না। কিন্তু দিন শেষে বিরোধী জোট আর অক্ষত থাকেনি। প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী কেন্দ্রিক দুর্নীতি, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর বিলিয়ন ডলার দুর্নীতি, একনায়কতন্ত্র ও অর্থনৈতিক অধঃপতনের দায় কাঁধে নিয়ে গত নির্বাচন থেকেই প্রধানমন্ত্রী নাজিব তুন রাজ্জাকের জনপ্রিয়তা ব্যাপক হারে হ্রাস পাচ্ছে। এই সময় বিরোধী জোট ভাংতে পারা এবং আনোয়ারকে জেলে প্রেরণ নাজিবের জন্য একটা বড় বিজয় হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।

যেই মাহাথির মুহাম্মদ বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নাজিব তুন রাজ্জাককে নিজ হাতে ক্ষমতার আসনে বসিয়েছেন, সেই মাহাথিরই সীমাহীন দুর্নীতি, একনায়কতন্ত্র ও দেশের অর্থনৈতিক দুরবস্থায় অতিষ্ঠ হয়ে নাজিবের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন। শুধু তাই নয়, যেই আনোয়ারকে জোর পূর্বক ডেপুটি প্রাইম মিনিস্ট্রি ও দল থেকে পদত্যাগ করিয়েছিলেন, যাকে কুরুচিপূর্ণ মামলায় জড়িয়ে কলঙ্ক, অপবাদ ও জেল খাটিয়েছেন, সেই আনোয়ারের সাথেই মাহাথির হাত মেলালেন স্বেচ্ছায়। আনোয়ারও তাৎক্ষনিক সে ডাকে সাড়া দিয়েছেন।

 

১৯৯৮ সালের পর প্রথমবারের মতো দুই নেতার সাক্ষাৎ

 

আনোয়ার ইব্রাহীম পুনরায় জেলে যাওয়ায় পরবর্তী নির্বাচনে লড়ার অযোগ্য হয়ে পড়েন। যুক্তি সংগতভাবেই এটা সরকার কর্তৃক পরিকল্পিত বলে জোর বিতর্ক রয়েছে। আনোয়ার ইব্রাহীমের নির্বাচনে লড়াইয়ে বাধা আসার কারণে, অবধারিতভাবেই তার স্ত্রী দলের হাল ধরেন। ২০১৮ সালের আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আনোয়ার পত্নী ওয়ান আজিজাহ বেশ ভালোভাবেই তার দল ও জোটকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। কিন্তু সেই সাথে উঠে এসেছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। প্রশ্ন উঠেছে, যদি বিরোধী জোট বিজয় লাভ করে তাহলে কে হবে প্রধান মন্ত্রী? প্রশ্ন উঠেছে ইসলামী দলের সাথে জোট গড়া ও ভাঙ্গার বিষয়ে। প্রশ্ন উঠেছে যেই মাহাথিরের কুরুচিপূর্ণ কুটচালে আনোয়ার জেল খাটলেন, কলঙ্কের কালো দাগ গায়ে মাখলেন সেই মাহাথিরের সাথে কেন হাত মেলানো হল? আল জাজিরার হেড টু হেট অনুষ্ঠানে সঞ্চালক মাহদী হাসানের সাথে ওয়ান আজিজার সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে চমৎকার এই বিষয়গুলো।

ওয়ান আজিজাহ কে জিজ্ঞাস করা হয়েছিল, কেন তারা সেই লোকের সাথে হাত মিলিয়ে কাজ করছেন, যেই লোক আনোয়ারকে সমকামিতার অপবাদ দিয়ে জেল খাটিয়েছে? তিনি কি প্রকারান্তরে শয়তানের সাথেই হাত মেলান নাই? উত্তরে আনোয়ার পত্নী জাস্ট বললেন "উই হ্যাভটু গো বিয়ন্ড দ্যাট" বললেন ব্যক্তি রেষারেষির ঊর্ধ্বে ওঠার কথা। ঘৃণার বৃত্ত থেকে বেরিয়ে দেশের জন্য চিন্তা করার কথা। তিনি বললেন "মাহাথির কে আমরা ডাকি নাই, বরং সে আমাদের কাছে এসেছে"। এর পরে তিনি যা বললেন তা রাজনীতির বইয়ে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তিনি মাহাথিরের দেয়া অপবাদের প্রসঙ্গে বলেন, "এটা শয়তানের সাথে জোট নয়। যদি আনোয়ার নিজে তাঁকে (মাহাথিরকে) ক্ষমা করতে পারেন, যেটা বলা হয়, মানুষকে ক্ষমা করা হল ঐশ্বরিক ব্যাপার"।

 

আনোয়ার ইব্রাহীম ও তার স্ত্রী ওয়ান আজিজাহ

 

এদিকে আরেকটি নারীবাদী প্রশ্ন উঠে আসলো। আজিজাহ কে বলা হল, আপনি যোগ্য নেত্রী, সফলতার সাথে বিভিন্ন আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন। আনোয়ারের অনুপস্থিতিতে তার দলকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। শ্রুতি আছে যে, যদি আপনার দল জিতে তাহলে আপনি অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী হবেন এবং আনোয়ার জেল থেকে বের হলে তার হাতে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব তুলে দেবেন। কেন আপনি এটা করছেন, বিজয়ের নেতৃত্ব আপনি দিচ্ছেন। বিজয়টা আপনার। অনেক ইয়াং মেয়েরা হয়তো ভাবছে এটা অযৌক্তিক যে, আপনার সফলতা ও যোগ্যতার ফসল আপনার স্বামী নিয়ে নিচ্ছেন? আপনি কেন প্রক্সি দিচ্ছেন? কেন সিট ওয়ার্মার হিসেবে কাজ করছেন? জবাবে ওয়ান আজিজাহ বলেন: প্রাইম মিনিস্টার তিনিই হবেন যাকে জনগণ চাইবে। তবে আমি সততার সাথে বলতে চাই, এটাই প্ল্যান যে আমি অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী থাকবো এবং সাজা থেকে মুক্তি পেলে আনোয়ার দায়িত্ব নেবেন। একাজ করতে আমার কোনও আপত্তি নাই। কারণ আনোয়ার আমার চেয়ে ভালো লিডার। তার আমলাতান্ত্রিক যোগ্যতা আমার চেয়ে বেশি।

ঘুরে ফিরে আসলো হুদুদ আইনের ব্যাপার। জিজ্ঞেস করা হল তারা এই আইন বাস্তবায়ন করবেন কি না। তিনি যা বললেন তার সার কথা হল, একজন মুসলিম হিসেবে আমাকে অবশ্যই কুরআনের আইনকে শ্রদ্ধা করতে হবে, স্বীকার করতে হবে। কিন্তু নিকট অতীতে আমরা এটা বাস্তবায়ন করবো না। আর ভবিষ্যতে করা হলেও সেটার প্রয়োগ হবে সামঞ্জস্যতার ভিত্তিতে। এখানে মাকাসিদ আশ-শারিয়া তথা শরিয়তের উদ্দেশ্য ভিত্তিক ফ্রেমওয়ার্ক এর ভিত্তিতে হুদুদ আইনের প্রয়োগ হবে।

 

দ্রষ্টব্যঃ আনোয়ার ইব্রাহীমের স্ত্রী ওয়ান আজিজাহ'র সাক্ষাতকারটি দেখুন এখানে।