লেখা

গত শুক্রবার ২২শে সেপ্টেম্বর ৮৯ বছর বয়সে প্রিয় রবের সান্নিধ্যে চলে গেলেন ‘ইখওয়ানুল মুসলিমুন’ এর সপ্তম মুর্শিদে আ’ম উস্তায মুহাম্মাদ মাহদী আকিফ (রহঃ)। মাহদী আকিফের (রহঃ) পুরো জীবনটাই ছিল বর্ণাঢ্যময়; যদিও তা প্রচলিত অর্থে বর্ণাঢ্যময় নয় বরং ছিল আল্লাহর বর্ণে বর্ণাঢ্য এক জীবন।

মাহদী আকিফের জন্ম ছিল ইখওয়ানুল মুসলিমুনের প্রতিষ্ঠাকালীন বছরেই; ১৯২৮ সালে, কায়রোর উত্তরে মানসুরা শহরের এক গ্রামে। বেশ স্বচ্ছল পরিবারেই জন্মগ্রহণ করেন, যেখানে দশ ভাই-বোনের সাথে একসাথে বেড়ে উঠেন। প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করেন মানসুরাতেই। এরপরে কায়রোতে চলে যানে, যেখানে ‘ফুয়াদ ১ম মাদ্রাসা’ স্কুলে শেষ করেন মাধ্যমিক শিক্ষা। এরপর উচ্চ শিক্ষা লাভের জন্য প্রথমে ইঞ্জিনিয়ারিং ফ্যাকাল্টিতে ভর্তি হন, কিন্তু পরবর্তীতে ইমাম হাসান আল বান্নার (রহঃ) পরামর্শে ইঞ্জিনিয়ারিং ছেড়ে ‘শারীরিক শিক্ষা’ উচ্চতর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হন। শায়খ হাসান আল বান্নার ইচ্ছা ছিল মিশরের প্রতিটি স্কুলে ও উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি ফ্যাকাল্টিতে ইখওয়ানের উপস্থিতি নিশ্চিত করা; তার ওপর মাহদী আকিফেরও ছিল শারীরিক কসরতের প্রতি আলাদা একটি ভালোবাসা। সব মিলিয়েই হাসান আল বান্না মাহদী আকিফকে এই পরামর্শ দেন।

 

আকিফ ১

চিত্রঃ ছবিতে মধ্যসারিতে ইমাম হাসান আল বান্নার ডানপাশে ্তরুণ মাহদী আকিফ

 

উল্লেখ্য, মাহদী আকিফ ১৯৪০ সালে মাত্র ১২ বছর বয়সে ইখওয়ানে যোগ দেন। মাহদী আকিফ নিজেই ইখওয়ানে যোগ দেয়ার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন, শারীরিক কসরত ও খেলাধুলার ওপর ইখওয়ানে গুরুত্ব প্রদান এবং ইখওয়ানের কর্মীদের সহৃদয় ও মহান আচার ব্যবহার।  ১৯৫০ সালের মে মাসে শারীরিক শিক্ষা বিষয়ে উচ্চশিক্ষা শেষ করেন এবং বেশ কিছুদিন ফুয়াদ ১ম মাদ্রাসাতে শারীরিক শিক্ষার শিক্ষক হিসেবে কাজ করেন।

এরপর ১৯৫১ সালে তিনি ইবরাহীম ইউনিভার্সিটির (বর্তমান নাম আইন শামস ইউনিভার্সিটি) আইন বিভাগে ভর্তি হন উচ্চ শিক্ষা লাভ করার জন্য। মাহদী আকিফ শুরু থেকেই হাসান আল বান্নার খুব কাছের মানুষ ছিলেন এবং মাত্র ১৭ বছর বয়সে ইখওয়ানে বিশেষ শাখায় (تنظيم الخاص) যোগ দেন। ইখওয়ানের এই বিশেষ শাখা ছিল অনেকটা আধা সামরিক সংগঠনের মত, যা গঠিত হয়েছিল মিশরে দখলদার ব্রিটিশ বাহিনী এবং ফিলিস্তিনে দখলদার জায়োনিষ্টদের বিরুদ্ধে স্পেশাল সামরিক অপারেশন চালানোর জন্য। ১৯৪৮ সালে আরব ইসরাইল যুদ্ধে ইখওয়ানের পাঠানো স্বেচ্ছাসেবক মুজাহিদ দলের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন তিনি। এছাড়াও ইখওয়ানের বিশেষ শাখার দায়িত্বের অংশ হিসেবেই ১৯৫২ সালের ফ্রি অফিসার্স মুভমেন্ট কর্তৃক সামরিক ক্যু সংঘটিত হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি ইবরাহীম ইউনিভার্সিটিতে গঠিত সামরিক ক্যাম্পগুলোর নেতৃত্ব দেন, যেগুলো ইংরেজদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নিত। এরপরে তিনি ইখওয়ানের ছাত্রশাখা এবং শারীরিক শিক্ষা বিভাগের প্রধানের দায়িত্বও পালন করেন।

 

আকিফ ২

চিত্রঃ সামরিক ক্যাম্পে তরুণ মাহদী আকিফ

 

১৯৫৪ সালে মিশরের প্রেসিডেন্ট জামাল আবদুন নাসেরের ওপর হত্যা প্রচেষ্টার প্রতিক্রিয়া স্বরূপ  গ্রেফতারকৃত হাজার হাজার ইখওয়ান কর্মীদের একজন ছিলেন মাহদী আকিফ। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল মেজর জেনারেল আবদুল মুনিম আবদুর রউফকে পালাতে সাহায্য করা। এ অভিযোগে তাঁকে মৃত্যুদন্ড প্রদান করা হয়, যদিও পরবর্তীতে এই সাজা সশ্রম যাবজ্জীবন কারাদন্ডে কমিয়ে আনা হয়।

অবশেষে টানা ২০ বছর জেল খাটার পর, প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাতের আমলে তিনি ছাড়া পান। এই সুদীর্ঘ কারাভোগের ও নির্যাতনের পরেও, ছাড়া পেয়েই তিনি নতুন কর্মোদ্দীপনায় দাওয়াতের ময়দানে নেমে পড়েন। ছাড়া পাওয়ার তিন বছর পর তিনি সৌদি আরব চলে যান, যেখানে তিনি ওয়ামিতে (WAMY: World Assembly of Muslim Youth) দায়িত্ব পালন করেন। সেখানে তাঁর দায়িত্ব ছিল বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে মুসলিম যুবকদের জন্য আন্তর্জাতিক ক্যাম্প ও কনফারেন্স আয়োজন করা এবং এ দায়িত্বের ফলস্বরূপ তিনি সৌদিআরব, জর্দান, মালয়েশিয়া, বাংলাদেশ, তুরষ্ক, অষ্ট্রেলিয়া, মালি, কেনিয়া, সাইপ্রাস, জার্মানী, ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্রে ওয়ামীর বড় বড় ক্যাম্পের আয়োজনে অংশগ্রহণ করেন।

১৯৮৩ সালে তিনি ইউরোপের উদ্দেশ্যে রওনা হন এবং জার্মানীর মিউনিখে একটি ইসলামিক সেন্টারের প্রধান হিসেবে কাজ করেন। আর এ সময়েই ইখওয়ানের আন্তর্জাতিক শাখাগুলোর সাথে তাঁর সম্পর্ক আরো গভীর হয়। ১৯৮৬-তে তিনি মিশরে ফিরে আসেন এবং ইখওয়ানের যুবা ও ছাত্র বিভাগের দায়িত্ব নেন। ১৯৮৭ সালে ইখওয়ানের সর্বোচ্চ পরিচালনা পরিষদে (مكتبة الإرشاد) যোগ দেন এবং আমৃত্যু এই দায়িত্ব পালন করেন।

একই বছর তিনি পূর্ব কায়রোর একটি নির্বাচনী আসন থেকে সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন এবং প্রায় তিন বছর ধরে সংসদে ইখওয়ান থেকে নির্বাচিত হওয়া ৩৫জন সংসদ সদস্যের ব্লক ‘পপুলার ব্লক’ (مجلس الشعب) –এর সদস্য ছিলেন। উল্লেখ্য, পার্লামেন্ট নির্বাচনে একক দল হিসেবে লড়াই করার অনুমতি ইখওয়ানের তখন ছিল না। কিন্তু তখন আরেক বিরোধী দল সোশ্যাল লেবার পার্টির সাথে জোট করে বিশেষ ব্যবস্থার মাধ্যমে  ইখওয়ানের প্রার্থীরা পার্লামেন্ট নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। এককভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করেও, ইখওয়ান থেকে ৩৫জন পার্লামেন্ট মেম্বার নির্বাচিত হওয়া ছিল ইখওয়ানের জন্য বিরাট এক সাফল্য। মাহদী আকিফের মতে, ইখওয়ানের এই সাফল্যের কারণ ছিল, “তারা সবসময়ই জনগণের কল্যাণ, পার্লামেন্টের কেন্দ্রীয় দায়িত্ব হিসেবে সরকারকে নিয়ন্ত্রণে রাখা, আইন প্রণয়ন ও বাজেট নির্ধারণে সংলাপ ও যথাসাধ্য নজর রাখার কথা বলত।”

পার্লামেন্টে প্রবেশের পর ইখওয়ান প্রথমবারের মত গণতন্ত্র, মানবাধিকার, নারী অধিকার ও সংখ্যালঘু অধিকারের ব্যাপারে অফিসিয়াল বক্তব্য প্রকাশ করে। আর এতে মাহদী আকিফ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এর মাধ্যমে মিশরের সরকার বিপাকে পড়ে যায় কারণ, যে দলটির উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ বা অন্য যেকোন উপায়ে একে রাজনৈতিক ময়দান থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে চাইছিল, সে দলটিই এসব অফিসিয়াল বক্তব্য প্রকাশের মাধ্যমে নিজেদের সহনশীল ও সংলাপে আগ্রহী চেহারা তুলে ধরছিল।

নব্বইয়ের দশকের মাঝমাঝি এসে ইখওয়ানকে বড় কয়েকটি ধাক্কা সামলাতে হয়। এর একটি ছিল, সাংগঠনিক অন্তর্দ্বন্দে একদল কমবয়সী নেতৃত্বের দলছুট হয়ে যাওয়া। আকিফ নিজেও এ দ্বন্দে জড়িয়ে পড়তে বাধ্য হন। ঘটনার সূচনা এভাবে যে, ইখওয়ানের পরিচালনা পরিষদ একটি নতুন রাজনৈতিক দল খোলার সম্ভাব্যতা যাচাই করে দেখার জন্য মাহদী আকিফের উপর ইখওয়ানের একদল তরুণ জনশক্তিকে তত্ত্বাধায়ন করার দায়িত্ব অর্পণ করে।  এই তরুণ জনশক্তি অবশ্য আগে থেকেই ট্রেড ইউনিয়নের সাথে জড়িত ছিল। আকিফ নিজেও রাজনৈতিক কার্যক্রম চালানোর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে একটি আলাদা রাজনৈতিক দল খোলার পক্ষপাতী ছিলেন, যেখানে ইখওয়ানের মূল দলটি শুধুমাত্র ধর্মীয় ও শিক্ষামূলক মিশনারী কার্যক্রমের দিকে মনোযোগ দিতে পারে। আকিফের তত্ত্বাধায়নাধীন তরুণ দলটি রাজনৈতিক দল খোলার প্রজেক্টের ব্যাপারে অতি উৎসাহী হয়ে, মাঠ তদন্তের রিপোর্ট সংগঠনের নেতৃত্বকে অবহিত না করেই সরাসরি নতুন একটি রাজনৈতিক দল নিবন্ধন করার আবেদন করে বসে। সংগঠনে নেতৃত্ব থেকে এব্যাপারে তাদের অবিলম্বে আবেদন প্রত্যাহারের নির্দেশ দেয়া হয়। মূলত সেসময় সরকারের পক্ষ থেকে যেকোন নতুন রাজনৈতিক দল খোলার উপর নিষেধাজ্ঞা জারী ছিল এবং ইখওয়ান  সরকারের সাথে কোনপ্রকার বিরোধে জড়াতে আগ্রহী ছিল না। তরুণ দলটির রাজনৈতিক দল নিবন্ধন করার আবেদন সরকারের পক্ষ থেকে নাকচ করে দেয়া হয় এবং সরকার ইখওয়ানকে রাজনৈতিক খেল খেলার অভিযোগে অভিযুক্ত করে। অবশেষে সরকার আইনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ইখওয়ানের কার্যক্রমের উপর সীমাবদ্ধতা জারী করার চেষ্টা করে। কিন্তু এতে ফল হয় উলটো। আদালতের রায়ের মাধ্যমে, নতুন রাজনৈতিক দল খোলার বৈধতা জারী হয় এবং তরুণদের দলটি ইখওয়ান থেকে বিচ্ছিন হয়ে ওয়াসাত পার্টি গঠন করে।

৯৬-এ সরকার আরেকবার ইখওয়ানে উপর ধরপাকড় চালায় যাতে আকিফসহ ইখওয়ানের আরো অনেক মধ্য সারির নেতা গ্রেফতার হন। তাদের সামরিক আদালতে হাজির করা হয়, যার কার্যক্রম পাঁচ বছরের বেশী সময় ধরে জারী ছিল। আকিফের উপর ইখওয়ানের আন্তর্জাতিক শাখার দায়িত্ব নেয়ার অভিযোগ এনে তিন বছরের কারাদন্ড প্রদান করা হয়। তিনবছর কারাদন্ড শেষে ১৯৯৯ সালে মাহদী আকিফ ছাড়া পান।

২০০৪ সালের জানুয়ারী মাসে ইখওয়ানের মুর্শিদে আ’ম উস্তায মামুন আল হুদাইবী (রহঃ) ইন্তেকাল করলে, মাহদী আকিফ ইখওয়ানের নতুন মুর্শিদে আ’ম নিযুক্ত হন। ইখওয়ানের মুর্শিদে আ’ম যারা ছিলেন তাদের মধ্যে তিনিই একমাত্র  ব্যক্তি যিনি তাঁর জীবদ্দশাতেই সাবেক মুর্শিদে আ’ম পদবী লাভ করেন। তিনি দ্বিতীয় কার্যকালের জন্য মুর্শিদে আ’ম হতে অস্বীকৃতি জানান এবং বর্তমান মুর্শিদে আ’ম মুহাম্মাদ বাদ’ঈ দ্বারা স্থলাভিষিক্ত হন।

মাহদী আকিফ সবসময়ই ইখওয়ানের নতুন প্রজন্মের জনশক্তির ক্ষমতায়নের কথা বলতেন। তিনি বুঝতেন, ইখওয়ান একটি ক্রমবর্ধমান আন্দোলন যার ভিত্তিমূল গড়ে উঠেছে তরুণ জনশক্তি দিয়ে, কিন্তু যা এখনো পুরনো কর্মপদ্ধতি ও বয়ষ্ক নেতৃত্ব বেড়াজালে সীমাবদ্ধ হয়ে আছে। আর তাঁর এই চিন্তাভাবনার জন্যই তিনি দলের তরুণ জনশক্তির নিকট জনপ্রিয় ছিলেন। ইখওয়ান থেকে যেসব তরুণ দলছুট হয়ে নব্বইয়ের দশকে ওয়াসাত পার্টি গঠন করে, আকিফ তাদের সাথে কঠিনভাবে দ্বিমত করতেন। উনি চাইতেন, দলে কোন পরিবর্তন আনতে হলে ভেতর থেকেই আনা উচিত। এরপরেও তিনি ওয়াসাত পার্টি গঠন করা দলছুটদের সাথে ভালো সম্পর্ক রেখেছেন, যার ফলে পরবর্তীতে ইখওয়ানের সাথে ওয়াসাত পার্টির সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গঠন সম্ভবপর হয়ে ওঠে।

যেহেতু ইখওয়ান অন্তত ভাবধারার দিক থেকে একটি আন্তর্জাতিক আদর্শবাদী দল, তাই স্বভাবতই আন্তর্জাতিক ব্যাপারগুলোতে এর এবং এর মুর্শিদে আ’ম হিসেবে মাহদী আকিফের বক্তব্য থেকেই থাকবে। আর একবিংশ শতাব্দীর একেবারে প্রারম্ভ থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও এর সহযোগীদের দ্বারা শুরু হওয়া ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধ’ (War on Terror) এবং এর নামে আফগানিস্তান ও ইরাক দখল করে নেয়া আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাসমূহের মধ্যে অন্যতম। মাহদী আকিফ মনে করতেন, যে তথাকথিত সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে এ যুদ্ধ, সেই পদাবলী (Term) আমেরিকা ও জায়োনিষ্টদের তৈরী করা, যাতে একে ব্যবহার করে আমেরিকা ও জায়োনিষ্টরা তাদের নোংরা যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারে। গণতন্ত্র বিকাশ ও সন্ত্রাসরোধের নামে যে যুদ্ধ তারা চালাচ্ছে তার মূল কারণ না গণতন্ত্র বিকাশ, না সন্ত্রাসরোধ, বরং এর উদ্দেশ্য দখলদারিত্ব ও দখলকৃত দেশসমূহের প্রাকৃতিক সম্পদ লুটপাট। মাহদী আকিফ বলেন, এই দুই দেশে দখলদারদের সাথে কোনপ্রকার সহযোগিতা গ্রহণযোগ্য নয়, এমনকি দখলকৃত দেশে তাদের প্রতিষ্ঠাকৃত রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে রাজনৈতিক অংশগ্রহণও বৈধ নয় যদিও তা আপাতদৃষ্টিতে রাজনৈতিক প্রতিরোধ মনে হতে পারে। তীব্র সশস্ত্র প্রতিরোধের মাধ্যমে দখলদার বাহিনীকে বিতাড়িত করাই একমাত্র গ্রহণযোগ্য আচরণ হতে পারে। [১]

ফিলিস্তিন ছিল মাহদী আকিফের জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ফিলিস্তিন ছিল তাঁর জীবনের প্রথম উদ্দেশ্য (cause)যার জন্য ইখওয়ানের বিশেষ শাখার একজন হয়ে তিনি ছুটে গিয়েছিলেন ৪৮ এর আরব ইসরাইল যুদ্ধের জিহাদের ময়দানে। মুর্শিদে আ’ম থাকাকালীন সময়ে ফিলিস্তিনের বেশ কয়েকবার বিবৃতি দেন। মনে করতেন, একমাত্র জিহাদ ও শাহাদাতই হচ্ছে আল আক্বসা মুক্ত করার একমাত্র। [২] ২০০৬ এর নির্বাচনে পর ফাতাহ ও হামাস দ্বন্দ দেখা দিলে তিনি মধ্যস্থতার চেষ্টা করেন।

২০১০ সালে তিনি দ্বিতীয় কার্যকালের জন্য ইখওয়ানের মুর্শিদে আ’ম হতে অস্বীকৃতি জানিয়ে মুহাম্মাদ বাদ’ঈর নিকট এই পদ ছেড়ে দেন। ২০১৩ এর ৩ জুলাই মুরসী সরকারের বিরুদ্ধে সামরিক ক্যু সংঘটিত হওয়ার ঘন্টাখানেক পরেই মাহদী আকিফকে আদালত অবমাননার অজুহাতে গ্রেফতার করা হয়। তখন তাঁর বয়স ইতোমধ্যেই ৮৫ বছরে উপনীত হয়েছে। জেল হাসপাতালে তাঁর স্ত্রী বা অন্যান্য আত্মীয়স্বজনকে তাঁর সাথে সাক্ষাৎকারের অনুমতি দেয়া হত না। আইনজীবি ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন থেকে সরকারের কাছে তাঁর ক্রমাবনত স্বাস্থ্যের কারণ দেখিয়ে তাঁকে মুক্তি দেয়ার আহবান জানালেও তা প্রত্যাখ্যাত হয়। বরঞ্চ তিনি ২০১৩ সালের আগষ্টে তাঁর আইনজীবিদের তাঁর বার্ধক্য ও অসুস্থ শরীরের কারণ দেখিয়ে তাঁর জন্য মুক্তির আবেদন করতে নিষেধ করে দিয়ে বলেন, “আমার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগই দায়ের করা হয় নি যে, আমার মুক্তির জন্য আবেদন করতে হবে। বরং জরুরি অবস্থার অধীন আমাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। কোন অমীমাংসিত মামলার কারণে আমি গ্রেফতার নই। বৈধ সরকার ফিরিয়ে আনার জন্য আমি শহীদি মৃত্যু বরণ করতে ইচ্ছুক।” [৩]

 

আকিফ ৩

চিত্রঃ সিসির আদালতে রূগ্ন বয়োঃবৃদ্ধ মাহদী আকিফ

 

অবশেষে গত ২২শে সেপ্টেম্বর শুক্রবার সন্ধ্যায় মাহদী আকিফ তাঁর রফিকে আ’লার কাছে ফিরে যান। সরকার তাঁর পরিবারকে এমনকি জানাযার নামায আয়োজন করারও অনুমতি দেয় নি। সংক্ষিপ্ত দোয়াশেষে তাঁকে রাত দুটোয় দাফন করা হয়। পুরো দাফন কার্যক্রমে এক ডজনেরও কম মানুষ উপস্থিত থাকার অনুমতি দেয়া হয় সরকারের পক্ষ থেকে। উপস্থিতিদের মধ্যে ছিলেন তাঁর স্ত্রী, কন্যা, নাতি এবং আইনজীবি।

তাঁর এই দাফনকালীন অবস্থা অনেকটা শায়খ হাসান আল বান্নার দাফনকার্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। হাসান আল বান্নাকে ব্রিটিশ সমর্থিত মিশরের রাজতন্ত্রের এজেন্ট হত্যা করে। তাঁর দাফনকার্যে তাঁর পিতা ও কয়েকজন ঘনিষ্ঠ মহিলা নিকটাত্মীয় ছাড়া আর কাউকে শরীক হওয়ার অনুমতি দেয়া হয় নি। হাসান আল বান্নার মত মাহদী আকিফও বেঁচে রইবেন উম্মাহর কোটি সদস্যের হৃদয়ের মণিকোঠায়।  

 

তথ্যসূত্রঃ

১। مراجعات | مع مرشد الإخوان: محمد مهدي عاكف - سجلت عام 2008 /ح6 والأخيرة

২। الجهاد والاستشهاد هما طريق العزة والنصر

৩। Aisha Al-Shater cries out: Save Akef from death - MEMO