লেখা

রক্ষণশীলতা আর উদারীকরনঃ ইসলাম কী বলে?
রক্ষণশীলতা আর উদারীকরনঃ ইসলাম কী বলে?
লিখেছেন মীর্যা গালিব
১১ সেপ্টেম্বর ২০১৫

আল কুরআন

 

পর্ব ১ - ইসলামের রক্ষনশীলতার সীমানা ও নীতি

(The conservative principles of Islam and its limits)

 

"We progressive Muslims feel there are contradictions between the sublime principles on which Islam was built and the conservative interpretations that continue to dominate current discourse. .... When we do denounce it (the conservative interpretations), we do so by accepting and relying on alternative interpretations of the scripture, demonstrating that we can use our mental and moral judgement to declare an interpretation as outdated, in spite of so-called irrefutable authority." 

(Akmal Ahmed Safwat, an Egyptian-Danish physician who is an advocate of progressive understanding of Islam)1

 

"My response to those who wish to alter Islam to the degree that it loses its total meaning and purpose is very simple. If you want to be a Muslim you must be prepared to submit to Qur'an and the teachings of the blessed Prophet. I am afraid there is no half way house in Islam - you either submit or you don't."

-Ajmal Mashroor, A Bangladeshi-British Imam and Liberal Democratic Party politician1

 

ইসলাম কি একটি 'কনজারভেটিভ' (রক্ষণশীল) ধর্ম? কনজারভেটিভ এই অর্থে যে, ইসলাম কি তার নিজের বাইরে বাকী সব কিছুকেই জাহেলিয়াত মনে করে? এবং তার সাথে আদান-প্রদানে কোনো তাড়না অনুভব করে না? ইসলাম কি তার আশপাশের জগৎকে কেবল বাইনারী যুক্তির দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই দেখে? হয় তুমি ইসলামে আছ, না হয় জাহেলিয়াতে। অথবা সাদা-কালোর মাঝখানে এমন কোনো মধ্যবর্তী অবস্থানের অবকাশ কি আছে যেখানে একোমোডেশান বা সমন্বয় সম্ভব?   

এই প্রশ্নগুলো ইসলামকে ধর্ম হিসাবে বুঝার ক্ষেত্রে জরূরী এবং ইসলামের আলোকে কোনো সমাজ বিনির্মানের পদ্ধতি কি হবে, সেই প্রশ্নের উত্তর খোজায় প্রাসঙ্গিক। একই সাথে একক মুসলিম ব্যক্তি হিসাবে  দৈনন্দিন জীবনে ইসলাম পালনের ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয়। প্রতিদিনকার ইসলাম সম্মত জীবন যাপনের চেষ্টায় এই প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় আমাদের নানান ভাবে। আমরা যে সমাজ এবং সময়ে এখন বসবাস করছি, তা রাসুল (স) ও সাহাবাদের (রা) এর সময়ের তুলনায় অনেক বেশী জাহেলিয়াতের উপাদানে ভরপুর। এইরকম একটি সমাজের একজন হিসাবে  জাহেলিয়াত বিযুক্ত মুসলিম জীবন যাপনের মানে কি বিদ্যমান অন্যান্য সকল 'আইডেন্টিটি' থেকে দূরে চলে যাওয়া এবং অবশ্যম্ভাবী বিচ্ছিন্নতা? নাকি সমকালীন সমাজের মধ্যেই লিবারাল সহাবস্থান সম্ভব?  

ইসলামের জীবন ও জগৎ সংক্রান্ত নিজস্ব বক্তব্য আছে, আছে কর্ম ও ইবাদতের স্পষ্ট কর্মসুচী ও সীমানা। ফলে স্বভাবতই অন্যান্য মতবাদ ও সংস্কৃতির সাথে ইসলামের বিরোধের জায়গা আছে। আবার, ইসলাম বাইরের জগতের সাথে তার আলাপ-আলোচনার দরজা শর্তহীনভাবে সম্পুর্ন বন্ধ করে দেয় নাই কখনোই। কুরআন ইহুদী এবং খ্রীষ্টা  নদের সাথে আলাপ আলোচনায় তাওরাত আর ইঞ্জীল কে রেফারেন্স হিসাবে  মর্যাদা দিয়ে আলোচনাকে সহজ ও গ্রহনযোগ্য করতে চেয়েছে। বহু অমুসলিম গোত্রের সাথে চুক্তিভিত্তিক সহাবস্থানে ছিলেন রাসুল (স) নিজেই। সমন্বয়ের সম্ভাবনা তাই ইসলামের তাত্বিক মতবাদ ও সালাফদের (রাসুল (সা) এর সাহাবা এবং তাদের পরবর্তী দুই জেনারেশান, যারা সামষ্টিকভাবে সত্যের উপর অধিক প্রতিষ্ঠিত ছিলেন বলে মুসলিম উম্মাহ ঐক্যমত) কার্যক্রমেরই অংশ। উরফ (প্রথা) কে ক্লাসিকাল ফিকাহ শর্তসাপেক্ষে সম্মান করেছে। সমকালীন সমাজের সাথে কোনো রকম সমন্বয় ব্যতিরেকে যে কারো পক্ষেই টিকে থাকা কঠিন। প্রাগমাটিক কারনেও তাই ইসলামের ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে সমন্বয় এর প্রবনতা এবং ফিকহী অবস্থান লক্ষ্য করা যায়।

রাসুল (সা) ঐতিহ্যবাহী কুরাইশ বংশের লোক হিসাবে সম্মান বোধ করতেন। হুনায়নের যুদ্ধে পলায়নপর মুসলিম বাহিনীর প্রতি তার আহবান ছিল "আমি সত্য নবী, মিথ্যা নই, আমি আবদুল মুত্তালিবের সন্তান"। আবার ইসলাম পূর্ব জাহেলিয়াতের গোত্রবাদী মানসিকতা কে ইসলাম দ্ব্যর্থহীন ভাবে নাকচ করেছে। কাজেই চোখ বন্ধ করে বিদ্যমান সমাজের সবকিছু ইসলাম বাতিল করে নাই। আবার সমাজের অনেক প্রথার খোলনলচে সম্পুর্ন বদলে দিতেও ইসলাম দ্বিধা করে নাই। কাজেই ইসলাম না পরিপূর্ন বাইনারী, না পরিপূর্ন একোমোডেটিভ। বরং, একটি নির্দিষ্ট নীতিমালার অধীনে মধ্যপন্থী।  

বিদ্যমান সমাজ থেকে কোনো কিছু গ্রহন বা বর্জনের ক্ষেত্রে ইসলাম তাহলে কী নীতিমালা অনুসরন করে? সেই নীতিমালার আওতায় আমরা কেমন করে আমাদের সময়ের প্রশ্নগুলোর ঠিকঠাক উত্তর বের করবো? যেহেতু বর্জনের নীতিমালা গ্রহনের নীতিমালার চাইতে অধিক নির্দিষ্ট , কাজেই ইসলামের বাইনারী আচরনের সীমানা বোঝার চেষ্টা করাই আমাদের প্রথম কাজ। ঈমান, ইবাদত, ও মুয়ামেলাতের কিছু ক্ষেত্রে ইসলাম তার পারিপার্শ্বিকের সাথে বাইনারী দৃস্টিভঙ্গী অনুসরন করে। এই বাইনারী প্রপজিশানের বাইরে বাকী ক্ষেত্রে ইসলাম মুলত একোমোডেটিভ। এটি নেগেটিভ-পজিটিভ এপ্রোচ, অর্থাৎ, অঅনুমোদিত বিষয় চিহ্নিত ও নির্দিষ্ট  (finite and specific), এর বাইরে বাকী সব অনুমোদিত। হালাল হারামের ক্ষেত্রেও ইসলা্মের সাধারন নীতিমালা একই এপ্রোচ অনুসরন করে। হারাম চিহ্নিত ও নির্দিষ্ট  (finite and specific), হারামের বাইরে বাকী সব কিছু হালাল।    

১। বিশ্বাসঃ  জীবন, জগৎ এবং নীতিবোধ সংক্রান্ত ইসলামের বক্তব্য ও বিধি-বিধান যদি "কাতঈ"  (অর্থাৎ সন্দেহাতীত ভাবে নিশ্চিত) হয়, তাহলে কেবল ঐশী বক্তব্যই একমাত্র নির্ভরযোগ্য সূত্র। ওহীর বক্তব্যের বিপরীতে "এমপিরিকাল এভিডেন্স" বা "র‍্যাশনাল আন্ডারষ্টান্ডিং" গ্রহনযোগ্য নয়। "এমপিরিকাল এভিডেন্স" বা "র‍্যাশনাল আন্ডারষ্টান্ডিং" আমাদের মানবিক সীমানার মধ্যে সবচেয়ে সম্ভাব্য সত্য। তবে তা "এবসলুট" সত্য কিনা, তা পরিমাপ করার কোনো "এবসলুট" মানদন্ড আমাদের কাছে নেই। ইসলামের দিক থেকে তাই গুরুত্বপুর্ন ইস্যু হচ্ছে অথেন্টিসিটি অর্থাৎ এই সংক্রান্ত কোনো বক্তব্য সত্যিই ঐশী কিনা। সনদের দিক থেকে এবং অর্থ অনুধাবনের দিক থেকে। অর্থ অনুধাবনের ক্ষেত্রে রাসুল (স) সুন্নাহ, এবং সাহাবাদের (আ) সুন্নাহ মৌলিক রেফারেন্স। কুরআন সনদের দিক থেকে সর্বত কাতঈ। অর্থের দিক থেকে কুরআনের অধিকাংশ পাঠ কাতঈ। তবে কুরআনের সব আয়াত অর্থের দিক থেকে কাতঈ নয়। এই অর্থে যে অনেক আয়াতের ব্যাখ্যায় সাহাবাদের মধ্যে মতভেদ হয়েছে, পরের সালাফদের মধ্যেও অনেক ক্ষেত্রে একই বিষয়ের ভিন্ন ভিন্ন উপলবব্ধি ছিল। যে সকল বিষয়ে সনদ এবং অর্থ অনুধাবন উভয় ক্ষেত্রে কোনো ইখতিলাফ (মতপার্থক্য) নেই, সে সকল ক্ষেত্র মানবিক যুক্তি/বিবেচনার শর্তাধীন নয়। সেকুলার জায়গা থেকে এই এপ্রোচকে আপাত ইর‍্যাশনাল  বলে মনে হতে পারে, তবে ইসলামের দিক থেকে এটি একটি দার্শনিক অবস্থান যার নিজস্ব যৈক্তিকতা আছে। এটি মূলত মানবিক জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা থেকে মুখ ফিরায়ে আল্লাহ সুবহানাহু তায়লার নিশ্চিত জ্ঞানের দিকে প্রত্যাবর্তন। সমগ্র মহাবিশ্বের একজন স্রষ্টা আছেন এবং তিনি মানুষকে পরিচালিত করার জন্য জ্ঞান শিক্ষা দেন, এই বক্তব্য বিশ্বাস করার পর তার শিখানো জ্ঞান ত্রুটিপূর্ন বলে ধারনা করার কোনো অনুধাবনযোগ্য কারন থাকতে পারে না।

বাংলাদেশে ইসলামের সুফিবাদী চর্চার ঐতিহ্য আছে। এখন সুফিবাদী চর্চাই ইসলামের সবচেয়ে সহীহ চর্চা কিনা এই প্রশ্নের উত্তরে সুফিবাদের "ঐতিহাসিক উপস্থিতি" ততখানি গুরুত্বপুর্ন ইস্যু নয়। বরং গুরত্বপুর্ন হছে সুফিবাদি ধারার মুল বক্তব্য ও প্রাক্টিস কতখানি অথেন্টিক। অর্থাৎ কুরআন ও সহীহ হাদিস এর মুল বক্তব্য এবং রাসুল (স), সাহাবা (আ) ও সালাফদের প্রাক্টিস এর সাথে তা কতটা সামঞ্জস্যপুর্ন। সুফিবাদী চর্চা ভাল না খারাপ সেটি আমাদের প্রশ্ন না এইখানে। বরং প্রশ্ন হচ্ছে ভাল না খারাপ এটি নির্ধারনের মানদন্ড বা পদ্ধতি কি? কেউ যদি পুর্বপুরুষদের প্রাক্টিস কে ভালো খারাপ নির্ধারনের মানদন্ড হিসাবে  গ্রহন করে তবে তা ইসলামের দিক থেকে গ্রহনযোগ্য নয়। বরং, মানদন্ড হচ্ছে অথেন্টিসিটি, অর্থাৎ সুফিবাদের বক্তব্য, ওহীর বক্তব্য এবং রাসুল (সা) এর সুন্নাহর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা।

ইসলাম ইচ্ছাকৃত হত্যার শাস্তি হিসাবে মৃত্যুদন্ড অনুমোদন করেছে। নিহত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীই কেবল অপরাধীকে ক্ষমা করতে পারেন। ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং সামাজিক শৃংখলা রক্ষা করা ইসলামের এই আইনের উদ্দেশ্য ("কিসাসের মধ্যে জীবন নিহিত")। সমাজ বিজ্ঞানের জায়গায় দাঁড়িয়ে আমরা এই বিতর্ক তুলতে পারি এবং এই বিতর্ক এই সময়ে বিদ্যমানও আছে যে, শাস্তি হিসাবে  মৃত্যুদন্ড থাকা উচিত কি না। কিন্তু, মৃত্যুদন্ড সংক্রান্ত ইসলামী বিধান যেহেতু স্পষ্ট, সেহেতু "মৃত্যুদন্ডকে হারাম (নিষিদ্ধ) ঘোষনা করা উচিত কি না" মুসলিমদের জন্য এই তর্কের কোনো অবকাশ নেই। বরং যেহেতু স্ব্য়ং আল্লাহ সুবহানু তায়লা এই বিধান দিয়েছেন, সেহেতু এই বিধান কে মানুষের জন্য কল্যানকর এবং প্রয়োজনীয় বলে মনে করাই ইসলামের সীমারেখা। একজন মুসলিম তাই এই সীমারেখা মেনে নিয়ে ইসলামী বিধানের প্রায়োগিক উপযোগিতা বুঝার চেষ্টা করেন। নিশ্চিত জ্ঞানের উপস্থিতিতে অনিশ্চিত জ্ঞানের মাধ্যমে সিধান্ত গ্রহন ইসলামী পদ্বতি নয়। ইসলাম মানবিক সীমাবদ্ধতার এই সীমারেখা স্মরণ করিয়ে দিতে চায় যে, যে সমস্ত যুক্তি ও এভিডেন্সের উপর ভর করে সমাজ বিজ্ঞানে এইসব তর্ক চলমান, তার কোনো কিছুই নিশ্চিত ভাবে এর ভাল-মন্দ পরিমাপ (quantitative measurement) করতে সক্ষম নয়।

২। ইবাদত ও মুয়ামেলাতঃ ইসলামের যেমন একটি দার্শনিক বক্তব্য আছে, তেমনি সুনির্দিষ্ট ইবাদত প্রক্রিয়া (নামায, রোযা, যাকাত ইত্যাদি) এবং দৈনন্দিন জীবন-যাপনে স্পষ্ট  নিষেধাজ্ঞার সীমানা (হুদুদ) আছে। ঈমান ও ইসলাম এজন্যই বিশ্বাস এবং কর্মের দ্বৈত সহাবস্থান। বিশ্বাসের মত ইবাদত এবং মুয়ামেলাতের ক্ষেত্রেও ইসলামের সংরক্ষনশীল এপ্রোচ আছে। ইবাদতের ক্ষেত্রে কোনোকিছু সুনিশ্চিত সুন্নাহ হিসাবে  প্রমানিত না হলে তা অগ্রহনযোগ্য, আর মুয়ামেলাতের ক্ষেত্রে কোনো কিছু হারাম হিসাবে  প্রমানিত না হলে তা গ্রহনযোগ্য। রাসুল (সা) ইবাদত হিসাবে  যা করেন নাই, তা ইবাদত হিসাবে  করা আমাদের জন্য বৈধ নয়। অর্থাৎ সহীহ সনদে সুন্নাহ হিসাবে  যা আমাদের কাছে পৌছায় নাই, তা পরিত্যাজ্য। কাজেই, ইসলাম ব্যতিরেকে অন্যান্য ধর্মের এবাদত প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহন করা মুসলিমদের জন্য অনুমোদিত নয়। একইসাথে, অন্যান্য ধর্মের ধর্মীয় পোশাক, ধর্মীয় চিহ্ন এবং ধর্মীয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও মুসলিমদের জন্য নিষিদ্ধ। যেমন, হিন্দুদের ধর্মীয় উৎসব বিধায় দূর্গাপুজা সংশ্লিষ্ট  সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মুসলিমদের অংশগ্রহন গ্রহনযোগ্য নয়। কাজেই, একজন নিষ্ঠাবান মুসলিম হিন্দু সম্প্রদায়কে তার নিজস্ব ধর্ম পালনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করবে কিন্তু নিজে সেই অনুষ্ঠানে শরীক হবে না। যে জাতীয় লিবারাল চিন্তা  থেকে আমাদের সময়কার অনেকে পারস্পরিক সৌহার্দ বৃদ্ধির জন্য এই জাতীয় অনুষ্ঠানে মুসলমানদের অংশগ্রহন কে আকাঙ্খিত মনে করেন, তার উৎসমুল ইসলামের নীতি, দর্শন এবং ঐতিহ্যের বাইরে। তবে, ধর্মীয় ইবাদতের বাইরে অন্যান্য স্থানীয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, প্রথা ইত্যাদি মুসলিমদের জন্য সাধারনত নিষিদ্ধ নয় (শরীয়ার পরিভাষায় যা মুবাহ পর্যায়ের) যদি তা কুফর, শিরক এবং হারাম মুক্ত হয়। 

ইবাদতের বাইরে অন্যান্য বিষয়ে কোনো কিছু বৈধ হবার জন্য সুন্নাহ হওয়া জরুরী নয়, বরং নিষেধাজ্ঞা না থাকলেই হবে। যেমন, বিভিন্ন আধুনিক প্রযুক্তি আমাদের জন্য হারাম নয় যদিও রাসুল (স) এর সময়ে তা ব্যবহার করা হয় নাই।

ইবাদতের ক্ষেত্রে ইসলামের এই রক্ষনশীল অবস্থানের কারন প্রধানত দুটো। এক, আল্লাহ ব্যতিরেকে অন্য কারো উদ্দ্যশ্যে এবং আল্লাহর প্রদর্শিত পদ্ধতি ব্যতিরেকে অন্য কোনো উপায়ে ইবাদত ইসলামের তাওহীদের চেতনার পরিপন্থি। যেহেতু, ইসলামের শুরুই তাওহীদের ধারনায় এবং আল্লাহর প্রতি বান্দার নিঃশর্ত আত্মসমর্পনের মধ্য দিয়ে, সেহেতু এমন কোনো কিছুই ইসলামে গ্রহনযোগ্য নয় যা তাওহীদকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। দুই, দ্বীন হিসাবে  ইসলামকে তার মৌলিকত্বে সংরক্ষণ করার জন্য। অন্যান্য ধর্মের সাথে নিয়ন্ত্রনহীন মিথস্ক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ইসলামের মূল শিক্ষা থেকে বিচ্যুত হবার সম্ভাবনা থাকে। আমাদের পুর্ববর্তী বহু তৌহিদবাদী ধর্ম কালক্রমে পৌত্বলিকতার সাথে মিশে গেছে এই মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে। এমন কি ইসলামও বিভিন্ন ভূখন্ডে অনাকাঙ্খিত ভাবে বহু স্থানিক অনৈসলামিক সংস্কার কে বিদাত হিসাবেক আত্বীকরন করেছে।

৩।দ্বীনঃ ইসলামই একমাত্র দ্বীন। দ্বীন মানে জীবন ব্যবস্থা। ইসলামকে জীবন ব্যবস্থা হিসাবে  মেনে নেয়ার অর্থ হছে জীবনের সকল ক্ষেত্রে ইসলামের দিক নির্দেশনা অনুসরন করা। ব্যক্তিগত, সামষ্টিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক -সকল জায়গায় ইসলামের বক্তব্যের বিপরীতে কোন কিছু গ্রহন করা বৈধ নয়। ইসলাম ব্যতিরেকে অন্য কোনো কিছুকে তাই দ্বীনের মর্যাদা দেয়া গ্রহনযোগ্য নয়। আল্লাহ একমাত্র ইলাহ, আল্লাহ ব্যতিরেকে কাউকে ইলাহর মর্যাদা দেয়া বৈধ নয়। রাসুলগন ব্যতিরেকে আর কাউকে রাসুলের মর্যাদা দেয়া বৈধ নয়। আল্লাহ যা হারাম করেছেন তা আর কেউ হালাল করতে পারে না। আর আল্লাহ যা হালাল করেছেন তা আর কেউ হারাম করতে পারে না। আল্লাহ এবং রাসুলের চাইতে আর কাউকে অধিক ভালবাসা বৈধ নয়। আল্লাহ এবং রাসুলের প্রতি যারা ইমান আনে নাই, তাদের ধর্মীয় স্বাধীনতা ইসলাম ক্ষুন্ন করে নাই। তাদের সাথে ব্যক্তিগত বন্ধুত্ব ও সামাজিক সুসম্পর্ক রাখাও বৈধ। কিন্তু যারা আল্লাহ এবং রাসুল (সা) এর ব্যপারে ঘৃনা চর্চা করে, মুসলিমদের প্রতি বর্নবাদী  আচরন করে, তাদের ব্যপারে অন্ততপক্ষে অন্তরের অসন্তুষ্টি বিদ্যমান থাকা এবং তাদের এই সংস্কৃতির সাথে দূরত্ব রাখা অত্যাবশকীয়।

ইসলাম মূর্তিপুজাকে হারাম করেছে। মূর্তির মত দৃশ্যমান নয় এমন অবস্তুগত কোন কিছু যদি পুজিত হওয়ার পর্যায়ে উন্নীত হয় তবে তাও হারাম। আমরা আধুনিক রাস্ট্রের নাগরিক। নাগরিক হিসাবে  চুক্তির আওতায় এই রাস্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন আমাদের দ্বীনেরও অংশ। কিন্তু, কেউ যদি আধুনিক রাস্ট্রকে দ্বীনের মর্যাদা দেয়, তবে তা নিশ্চিতভাবেই সীমালংঘন। একই নীতি ভাষা ভিত্বিক জাতীয়তাবাদী সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। বাঙালী হিসাবে  এমন বহু কিছু আমাদের জীবনের অংশ (যেমন - নববর্ষ পালনের সাংস্কৃতিক উপাদান মঙ্গল শোভাযাত্রা ও অন্যান্য) যার উৎসমুল ইসলাম নয়। ইসলামের নীতির সাথে সাংঘর্ষিক না হলে এবং উদযাপনের পদ্ধতির মধ্যে অনৈসলামিক কিছু না থাকলে তা অবশ্যম্ভাবী বর্জনীয় নয়। তবে, বাঙালী সাংস্কৃতিক উৎসব যদি কারো দ্বীনে পরিনত হয়, তবে তা অগ্রহনযোগ্য। দুইভাবে তা দ্বীনে পরিনত হতে পারে। এক, কেউ যদি তার ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক জীবনে ইসলামের চাইতে একে বেশী প্রায়োরিটি প্রদান করে। দুই, কেউ যদি শরীয়ার সীমারেখা লঙ্ঘন করে হলেও তাকে পালন করা নিজের কর্তব্য বলে মনে করে। শরীয়ার দৃষ্টিতে মুবাহ, এমন অনেক কিছুর সাথেই আমরা গভীর সম্পর্ক রাখতে পারি। তবে বাইরে থেকে আমদানী করা কোনো কিছুকেই আমরা শরীয়ার সমপর্যায়ের গুরুত্ব ও মর্যাদা দিতে পারি না এবং শরীয়ার নিষেধাজ্ঞা আছে এমন কোনো কিছুকেই আমরা বৈধতা দিতে পারি না।

 

"দিবে আর নিবে, মিলাবে মিলিবে" ইসলাম তার মূলনীতির ক্ষেত্রে এমন প্রস্তাবে বিশ্বাসী নয়। দেয়া নেয়ার পারস্পরিক মেলবন্ধনের জায়গা ইসলামেও আছে, তবে তা আল্লাহ প্রদত্ত্ব সুনির্দিষ্ট  নীতির আওতায় সুনিয়ন্ত্রিত। আল্লাহ সুবহানাহু তায়লার সুগভীর প্রজ্ঞায় এবং ইচ্ছায় মানুষের জন্য যে কর্তব্যের সীমারেখা নির্ধারিত তার বাইনারী সীমারেখা এবসলুট; সময়, কাল কিংবা অন্য কোন শক্তি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নয়। আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পনের মানে হচ্ছে এই বাইনারি সীমারেখা মেনে নিয়ে, এই নীতির আলোকে বাইরের জগতের সাথে মেলবনন্ধনের জায়গা তৈরি করা। কাজেই, কেমন করে আমরা আমাদের সময়ে ইসলামকে বুঝার চেষ্টা   করব, সেই প্রশ্নে যাবার আগে গোড়ার জায়গা হচ্ছে ইসলামের রক্ষনশীলতা কে উপলব্ধি করা এবং তার সীমানাকে চিহ্নিত করা। এই কাজ সঠিক ভাবে করতে পারলে পরে, আমরা ইসলামের ঐতিহ্যের কাঠামোর মধ্যে দাঁড়িয়েই সময় আর কালের সাথে বোঝাপড়ার জায়গা ঠিক করতে পারব।

 

 

 

 

 

রেফারেন্সঃ

 ১। http://www.huffingtonpost.com/nancy-graham-holm/debate-moderate-vs-islam_b_5378000.html

 ২। "উরফ বা প্রথাকে ফিকাহবিদরা আহকাম নির্ধারনের জন্য গ্রহন করেছেন। রাসুল (সা) এর জীবনকালে আরবে প্রচলিত প্রথা যা রদ করা হয় নাই, তা রাসুল (সা) এর স্বীকৃতি হিসাবে সুন্নাহর অন্তর্গত। তবে বর্তমানে মুসলিম বিশ্বে প্রচলিত কোনো প্রথা যদি শরীয়ার সাথে সাংঘর্শিক হয়, তবে তা গ্রহনযোগ্য নয়।" দেখুন, শাহ আবদুল হান্নান (অনুবাদক - ড. ওয়াসিম হক), উসূলুল ফিকহ, ২০১১, ঢাকা, চৌকস প্রিন্টার্স লিঃ।

 ৩। রাসুল (সা) বলেছেন, "মহান আল্লাহ ঈসমাইল (আ) এর আও্লাদের মধ্য থেকে কেনানাকে বিশেষ মর্যাদা দান করেছেন ও কেনানার আওলাদ থেকে কুরাইশকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন, এবং কুরাইশ বংশ থেকে বনি হাশেম কে আর বনি হাশেম থেকে আমাকে সমধিক মর্যাদা দান করেছেন।" সহীহ মুসলিম (বাংলা অনুবাদ), হাদীস নং- ৫৭৭০, সপ্তম খন্ড,  ২০০৩, ঢাকা,  বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার।

 ৪। আর-রাহীকুল মাখতুম( বাংলা অনুবাদ), ২০১৩, ঢাকা, তাওহীদ পাবলিকেশন্স।

 ৫। According to the Oxford Dictionary of Islam, Muamalat is described as " Refers to commercial and civil acts or dealings under Islamic law. Islamic law divides all legal acts into either ibadat or muamalat. Ibadat are acts of ritual worship such as prayer or fasting, and muamalat are acts involving interaction and exchange among people such as sales and sureties. The distinction is important because the principle in all matters involving ibadat is that they are not susceptible to innovations or change (ittiba). In muamalat, however, there is considerably more room to develop and change the law to facilitate human interaction and promote justice. There is disagreement among Muslim jurists on whether certain legal acts, such as marriage or divorce, fall under the category of muamalat or ibadat."

retrieved from http://www.oxfordislamicstudies.com/article/opr/t125/e1564?_hi=0&_pos=4953#

 ৬। "A ruling of the Qur’an may be conveyed in a text which is either unequivocal and clear, or in language that is open to different interpretations. A definitive (qat'i) text is one which is clear and specific; it has only one meaning and admits of no other interpretations. The rulings of the Qur’an on the essentials of the faith such as salah and fasting, the specified shares in inheritance and the prescribed penalties, are all qat’i, their validity may not be disputed by anyone, everyone is bound to follow them, and they are not open to ijtihad. The speculative (zanni) ayat of the Qur’an are, on the other hand, open to interpretation and ijtihad. The best interpretation is that which can be obtained from the Qur’an itself, that is, by looking at the Qur’an as a whole and finding the necessary elaboration elsewhere in a similar or even a different context."

৭। H. Kamali, Principles of Islamic Jurisprudence, retrieved from

http://www.khilafahbooks.com/principle-of-islamic-jurisprudence-by-mohammad-hashim-kamali/

৮। "And there is for you in legal retribution [saving of] life, O you [people] of understanding, that you may become righteous." Sura Bakara, verse- 179, Translation - Sahih international.

৯। http://www.onislam.net/english/ask-the-scholar/morals-and-manners/customs-and-traditions/174414-can-muslims-celebrate-christmas.html?Traditions=

 

http://www.onislam.net/english/ask-the-scholar/ideologies-movements-and-religions/450421-are-muslim-allowed-to-celebrate-christmas.html?Religions=

Top of Form

১০। "Mubah is something that there is no objection to doing it in terms of religion; that is, a person is free to do it or not to do it.; for instance, sitting, eating, drinking, sleeping, etc...

There is no sin for doing them or in abandoning them. What is essential in things is that they are mubah and permissible. It is necessary to have religious evidence in order to say that something is not mubah. As long as there is no evidence abolishing something being mubah, that thing remains to be mubah."

retrieved from  http://www.questionsonislam.com/article/what-mubah

 ১১। http://www.onislam.net/english/ask-the-scholar/international-relations-and-jihad/relations-during-peace/174411-does-islam-forbid-befriending-non-muslims.html

 ১২। "And it has already come down to you in the Book that when you hear the verses of Allah [recited], they are denied [by them] and ridiculed; so do not sit with them until they enter into another conversation. Indeed, you would then be like them. Indeed Allah will gather the hypocrites and disbelievers in Hell all together "

 Sura Nisa , Verse- 140, Translation - Sahih International.

 

৪টি মন্তব্য

শাহিদুল হক
১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৫

বেশ বিশদভাবে লিখেছেন।

"কেউ যদি আধুনিক রাষ্ট্রকে দ্বীনের মর্যাদা দেয়" - আধুনিক রাষ্ট্রকে যদি দ্বীনের মর্যাদা দেয়ার কোনো উপায় থাকে, তাহলে বিশ্বব্যাপী ইসলামপন্থীরা যে আধুনিক রাষ্ট্রকে বির্বর্তিত করে ইসলামী রাষ্ট্রে পরিনত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, সে "ইসলামী রাষ্ট্র" দ্বীনের মর্যাদা পেয়ে যাবে কিনা?

"মূর্তির মত দৃশ্যমান নয় এমন অবস্তুগত কোন কিছু যদি পুজিত হওয়ার পর্যায়ে উন্নীত হয় তবে তাও হারাম" - ঐতিহাসিকভাবে রাসুল (সা.) এর মূর্তি বানানোর বিরুদ্ধে মুসলমান ঐক্যবদ্ধতার জায়গাটির কেন্দ্রবিন্ধু ছিলো দৃশ্যমান ও অতিমানবিক রাসুল (সা.) পুজিত পর্যায়ে চলে যাবে। পূজিত বার্তাবাহকের বার্তা গৌন্ হয়ে বার্তাবাহক মুখ্য হয়ে উঠবে।

সাম্প্রতিক সময়ে রাসুল (সা.) এর জীবনী নিয়ে করা ইরানী চলচ্চিত্র কি সেই "অবস্তুগত" পুজিত হওয়ার পথে চলে যাবে না? যদি বর্তমানে না ও যায়, তাহলে ভবিষ্যতে এই ধরনের প্রজেক্ট কি "অবস্তুগত" "মুর্তিপুজার" অধীনে আলোচনা হবে নাকি "অবস্তুগত" "আধুনিকতার (Modernity)" পুজাপালনে আলোচিত হবে?

আল মামুন উর রশিদ
১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৬

অসাধারণ লিখেছেন। তবে লেখাটা আরও বড় এবং সহজবোধ্য হোলে ভালো হত। 

নাজমুস সাকিব নির্ঝর
১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৬

লেখার শুরুতে দেখতে পাচ্ছি, পর্ব ১, লেখাটা প্রকাশ হয়েছে অনেক দিন হোলো। এর মধ্যে নতুন করে আবার প্রাসংগিক কিছু আলোচনা হলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। দ্বিতীয় পর্ব দেখার অপেক্ষায় রইলাম।

রাফে সালমান রিফাত
০৮ মার্চ ২০১৬

পর্ব-২ এর অপেক্ষায় থাকিলাম... :) 

মীর্যা গালিব