লেখা

রাজনীতিতে ইসলামের প্রস্তাবনা যেমন অর্থনীতিতে কি প্রস্তাবনা তেমনই?
রাজনীতিতে ইসলামের প্রস্তাবনা যেমন অর্থনীতিতে কি প্রস্তাবনা তেমনই?
২২ মার্চ ২০১৬

সমাজের অন্যান্য অঙ্গের ইসলামায়নের চেয়ে অর্থব্যবস্থার ইসলামায়ন বেশি কঠিন। কারণ অর্থব্যবস্থার পরিবর্তনের জন্য ব্যক্তির চিন্তা জগতের বৈপ্লবিক ইসলামপন্থী পরিবর্তন, ব্যক্তির সাথে সমাজের এবং ব্যক্তি ও সমাজের সাথে রাষ্ট্রের লেনদেনের বৈপ্লবিক পরিবর্তন প্রয়োজন। এই পরিবর্তনকে কাঠামোগত পরিবর্তনের কাতারে ফেলা যায়। গণতন্ত্রকে রাজনৈতিক ইসলাম যত সহজে আত্মীকরণ করে নিয়ে ইসলামিক মূল্যবোধের রাজনৈতিক কাঠামো বিনির্মাণ করতে পেরেছে, অর্থব্যবস্থার ক্ষেত্রে ভোগবাদ, পুঁজিবাদ, উপযোগবাদের ন্যায় দাজ্জালরূপী ফেতনাকে গ্রহণ করে কিংবা রূপের আংশিক পরিবর্তন করে সামনে আগানো সম্ভব নয়। কেননা, রাজনৈতিক অবস্থানের ক্ষেত্রে গণতন্ত্রকে গ্রহনের জন্য গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠিত (এবং নিঃসন্দেহে পশ্চিমা) রূপের যতটুকু পরিবর্তন করে “ইসলামিক” ট্যাগ সংযুক্ত করা গেছে অর্থব্যবস্থার ক্ষেত্রে সেটা সম্ভব নয়। কারণ অর্থব্যবস্থা ব্যক্তিজীবনের সাথে আরো বেশি মাত্রায় গভীরভাবে লেপটে আছে এবং বর্তমান গৃহীত অর্থব্যবস্থার উল্লেখিত ভিতসমূহ - ভোগবাদ, উপযোগবাদ এবং পুঁজিবাদ - এর সাথে আমাদের ঈমান আক্বীদার সম্পর্ক সাংঘর্ষিক। এজন্যই অর্থব্যবস্থার পরিবর্তনকে অধিকতর বৈপ্লবিক এবং চ্যালেঞ্জিং বলতে পারি।

যেমন ধরুন, দুই-সন্তান গ্রহণকারী বাবাকে সহজেই “রিজিকের  মালিক আল্লাহ” বলে তার সিদ্ধান্ত থেকে নড়াতে পারবেন না। পুঁজির মালিককে (বিনা সুদে) কর্জে হাসানার দিকে উদ্বুদ্ধ করতে পারবেন না, এমনকি আখিরাতে উত্তম প্রতিদানের কথা বলেও! তাই এক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের পূর্বে ব্যক্তির আক্বিদা ঝালাইয়ের কাজে নামতে হবে- যেটি কিনা আবার যতটুকু না অর্থনৈতিক তার চেয়ে অধিকমাত্রায় “দাওয়াহ” নির্ভর। “দাওয়াহ”কে ভিত্তি করে কোন সমাজ ব্যবস্থার মূলে পরিবর্তন আনতে হলে আমাদেরকে নিরন্তর কাজ করে কয়েক যুগ চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে, অন্ততঃপক্ষে। এখানে রাষ্ট্রের ভূমিকার আগে “মুসলিম” সমাজের ভূমিকাটা চলে আসে; রাষ্ট্রের কাজটা এখানে সহায়ক ভূমিকার কাতারে - অন্তত ব্যক্তির “আকিদা শুদ্ধিকরণ” ধাপ পর্যন্ত।

অর্থব্যবস্থার ক্রমবিকাশ সমাজ তথা ব্যাপক অর্থে রাষ্ট্রের অন্যান্য অঙ্গের চেয়ে ভিন্ন চেহারায় হয়ে সাধারণের অবোধগম্য জটিল রুপ নিয়েছে। সহজ কথায় সমাজের মনস্তাত্ত্বিক বিকাশের ধারায় সংস্কৃতির নতুন চেহারা এবং এর তাৎপর্য একটু মাথা খাটালেই বুঝে আসে। আন্তর্জাতিক রাজনীতির যে জটিল হিসেব সেই সূত্রে ডিপ্লোম্যাসি আমাদের সহজে হজম হবেনা। এর চেয়ে জটিল রূপ নিয়েছে আজকের অর্থনীতি। মানুষের প্রয়োজনের তাড়নায় আর বাজার অর্থনীতির কল্যাণে মানুষের প্রত্যেক কাজের অর্থনৈতিক প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ হয়েছে। অর্থাৎ মানুষের মনস্তাত্ত্বিক ক্রিয়াকে বিশ্লেষণ করে তার অনুভূতি থেকে শুরু করে সকল বাহ্যিক কর্মকাণ্ডের অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ রয়েছে এবং সেই বিশ্লেষণের আবার বাজারে প্রয়োগ রয়েছে।

 

আধুনিক বিশ্বসভ্যতা এখন পর্যন্ত তিন ধরণের মৌলিক অর্থব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করেছে। সমাজতন্ত্রের পতনের পর পুঁজিবাদকে বলতে গেলে সারাবিশ্ব গ্রহণ করে নিয়েছে - যেখানে ব্যক্তির যেকোনো উপায়ে পুঁজি গঠনের স্বাধীনতা রয়েছে। অন্যদিকে অল্পকিছু দেশ পুঁজিবাদের ক্ষেত্রে যে মারাত্মক আকারের অর্থনৈতিক বৈষম্য তৈরি হয় সেটাকে এড়াতে “কল্যাণ অর্থনীতি”কে গ্রহণ করেছে। কল্যাণ অর্থনীতিতে ব্যক্তির প্রয়োজন মেটানোর নিজস্ব অক্ষমতাকে রাষ্ট্র নিজের দায়িত্বে মেটানোর দায় নিয়েছে।

উপরের তিন ধরণের অর্থব্যবস্থায় “তাওহীদ” বা একেশ্বর ভিত্তিক মূল্যবোধকে ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়নি, বলতে গেলে সেকুলার দৃষ্টিভঙ্গিই এখানে আসল। এই কারণে প্রচলিত অর্থব্যবস্থাগুলো চলার পথে যে ধরণের উপাদান এবং মনস্তাত্ত্বিক কাঠামো তৈরি করেছে তা অনেক ক্ষেত্রেই মুসলিমের আকিদার সাথে সাংঘর্ষিক। উপরের তিন অর্থব্যবস্থাতেই “সম্পদ সীমিত” বাস্তবতাকে মূল অনুমান হিসেবে ধরে সমস্যা সমাধানের ভিন্ন ভিন্ন পথের অনুসরণ করা হয়েছে। পুঁজিবাদে ডারউইনের “লড়াইয়ে সর্বোৎকৃষ্টের বিজয়”কে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ব্যক্তির সম্পদ এবং পুঁজির বাধাহীন বিকাশকে উৎসাহিত করা হয়েছে। যার সম্পদ নেই তার সম্পদের বিকাশও নেই, যার অঢেল আছে তার জন্য অঢেল থেকে অঢেল করার ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং ক্লাসিক্যাল অর্থনীতির ধারাকে গ্রহণ করে বলা হয়েছে “অদৃশ্য হাত” এর কেরামতিতে ধনী-গরীব নির্বিশেষে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয় পক্ষই একটা “লাভ-লাভ” অবস্থানে পৌঁছাবে (বিষয়টি আংশিক সত্য)। তারপরেও দেখা যায় যে ধনী এবং গরীবের সম্পদের ফারাক অযুত থেকে নিযুত হচ্ছে। কিন্তু সমালোচকদের সমালোচনার জবাবে পুঁজিবাদের সমর্থকেরা বলেন “ধনীর ধন বাড়লে গরীবও তা থেকে উপকৃত হবে”। একে “চুইয়ে পড়া প্রভাব” নাম দেওয়া হয়েছে। পুঁজিবাদের অর্থনৈতিক মন্দা এবং অধিক হারের বেকারত্ব বাজার অর্থব্যবস্থার অকার্যকারিতাকে নির্দেশ করে। এর কারণে বাজারকে সংশোধনের জন্য সরকারের হস্তক্ষেপের প্রয়োজন দেখা দেয় এবং কল্যাণ অর্থনীতির পক্ষের আওয়াজ আরো জোরালো হয়। আর সমাজতন্ত্রে ব্যক্তির পুঁজি গঠনের স্বাধীনতা রাখা হয়নি।  

 

তিন অর্থব্যবস্থার কোনটাতে একজন বিশ্বাসী মানুষের বিশ্বাসের সংরক্ষণের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়নি। অনৈতিক বিজ্ঞাপন এবং ব্যক্তি জীবনে অপচয়ের আধিক্য, ভোগবাদ এবং নিজের প্রবৃত্তিকে প্রভু হিসেবে গ্রহণ, উপযোগবাদ এবং বঞ্চিতদের বঞ্চিতকরণ - সবগুলোই প্রচলিত অর্থব্যবস্থাগুলো থেকে এসেছে। এর সবগুলোকেই অর্থব্যবস্থাগুলো কম-বেশি উৎসাহিত করেছে। ব্যক্তি চাইলেও বাঁধহীন স্রোতে তার একত্ববাদের অবস্থানকে টিকিয়ে রাখতে ব্যর্থ হয়, অন্ততপক্ষে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়।

বর্তমান পর্যন্ত এসে ব্যক্তির মনস্তত্ত্ব যে রূপ নিয়েছে, আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার যে অর্থব্যবস্থা প্রয়োজন সেই রূপে ফেরত যেতে আমাদেরকে ব্যক্তি এবং সমাজ জীবনে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে পরিবর্তন এবং সংশোধনের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রশ্ন হল, তাহলে এই পরিবর্তনের জন্য রাষ্ট্রের ভূমিকাটা কি হবে? উপরের কাজগুলোর গতিশীলতা এবং কার্যকারিতা নির্ভর করবে রাষ্ট্রের পলিসি প্রণয়ন এবং নিয়তের উপর। অধিকতর অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে রাষ্ট্রকে তার কর্মকৌশল নির্ধারণ করতে হবে এবং তার প্রয়োগে থাকবে চিন্তার ছাপ এবং শৃঙ্খলা। ইসলামপ্রিয় গোষ্ঠী রাষ্ট্র ক্ষমতায় চলে গেলে রাতারাতি অর্থব্যবস্থার পরিবর্তন হবে না, যেমনিভাবে রাতারাতি মানুষ সকলের আক্বিদার পরিবর্তন হয়না। ব্যক্তির অর্থনৈতিক জীবনে খামচি দিলে তার প্রভাব ক্ষণিকের মাঝে ব্যক্তি উপলব্ধি করতে পারে এবং তার প্রতিক্রিয়াও হয় তড়িৎ; বাকস্বাধীনতা হারালে কিন্তু ব্যক্তি তেমনটি করে না। ভুলেও রাতারাতি পরিবর্তনের “বৈপ্লবিক” মানসিকতা রাখা যাবে না। কাঙ্খিত পরিবর্তনে পৌঁছানোর জন্য প্রয়োজন একদল প্রশিক্ষিত নিবেদিত 'দায়ী’র এবং দক্ষতাসম্পন্ন কিছু অর্থনীতিতে বিশেষজ্ঞ প্রতিজ্ঞাবদ্ধ মানুষ।

 

*** লেখাটির তাত্ত্বিক বিনির্মাণের পিছনে ড. উমার চাপড়ার “ইসলাম ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ” বই এর ভূমিকা রয়েছে।