লেখা

লিবারেলিজমঃ মুসলমানদের শাঁখের আর শখের করাত
লিবারেলিজমঃ মুসলমানদের শাঁখের আর শখের করাত
০৭ সেপ্টেম্বর ২০১৫

রিচার্ড ডাইয়ার তার বই ‘হোয়াইট’ -এ দারুণ উস্কানীমূলক একটা কথা বলেছেন। তিনি লিখেছেন, সাদা হওয়ার বড়াই (whiteness) এর আসল শক্তি লুকিয়ে আছে এর অদৃশ্যমান হওয়ার মধ্যে। আপনি হিসপ্যানিক, এশিয়ান, ব্ল্যাক বা অন্য যা কিছুই হোন না কেন একটা বর্ণের লোক হিসাবে আপনি চিহ্নিত হচ্ছেন, কিন্তু হোয়াইটরা হচ্ছেন স্রেফ মানুষ! ফলে তাদের বয়ান চলে যাচ্ছে ধরা ছোঁয়া, পর্যালোচনা, সমালোচনার বাইরে, কেননা তারা নিজেদের বয়ান হাজির করেছেন এমনভাবে যেন এটা সকল মতলবী পক্ষপাত, ঐতিহাসিক, আদর্শিক বা সাংস্কৃতিক সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্ত। এই ব্যাপারটা সাদা চামড়ার লোকদেরকে গোটা ‘মানবতা’র হয়ে কথা বলার একটা জায়গা বা বৈধতা দিয়ে দেয়। আর অন্যান্য বর্ণের লোকেরা যেন শুধুই তাদের নিজ নিজ ‘বর্ণ’ বা  ‘সংস্কৃতি’র হয়ে কথা বলার যোগ্য। লিবারেলিজম এর সর্বব্যাপী ক্ষমতার গোপন রহস্য হচ্ছে তার এই সুগভীর ও অনতিক্রম্য অদৃশ্যমানতা। স্বাধীনতা (freedom), সাম্য (equality), যুক্তি (reason), সহনশীলতা (tolerance) এইধরনের শব্দগুলা হামেশা ব্যবহার হচ্ছে অথচ কেউ বিন্দুমাত্র টেরই পাচ্ছেনা যে এই শব্দগুলোর ব্যবহারকারীরা যখন এইসব কথা বলেন তখন তারা আসলে লিবারেল ফ্রিডম, লিবারেল ইকুয়ালিটি, লিবারেল রিজন আর লিবারেল টলারেন্স এর কথাই বলছেন। মুসলিমরা যখন এসব শব্দের মোকাবিলা করেন তারা যেন একটা ইতিমধ্যে হেরে যাওয়া বাজিতে অংশ নেন, যেন হাতজোড় করে ক্ষমা চাওয়ার চেষ্টায় তারা উদগ্র। মুসলিমরা তাদের প্রত্যেকটি সম্ভ্যাব্য জবাবের মধ্যে দিয়ে যেন প্রশ্নকারীদের অভিযোগকেই হতাশ হয়ে আরো শক্তপোক্ত করছেন ঠিক বিখ্যাত সেই প্রশ্নের মত যেখানে একজন স্বামীকে জিজ্ঞাসা করা হয় যে সে কি বউ পিটানো বন্ধ করেছে কিনা। 

 

নিঃসন্দেহে লিবারেলিজম একটা বৈচিত্রময় ও পরিবর্তনশীল প্রস্তাবনা। ঢালাওভাবে যেকোনো পর্যালোচনা/সমালোচনা করা হলে সেটা অতীসরলীকরনের দোষে দুষ্ট হবে। তবে লিবারেলিজম এর সবচাইতে জনপ্রিয় ভার্শন এর সারাংশটা এরকমঃ মানব সত্ত্বা (অথবা মন) সকল সুনির্দিষ্ট সংস্কৃতি ও ইতিহাস এর বাইরে দাঁড়াতে সক্ষম এবং সেখান থেকে একটা সার্বজনীন বা বৈশ্বিক নৈতিক প্রস্তাবনা খাঁড়া করাতে সক্ষম যা সকল মানব ও সমাজের জন্য উপযুক্ত। সংক্ষেপে কোনো মঞ্চ থেকে কথা না বলার ফলে সব জায়গাতে বা সবার হয়ে কথা বলার যোগ্যতা অর্জন করাই লিবারেলিজমের ডিএনএর মূলসূত্র। লিবারেল সত্ত্বা হচ্ছে অন্য সকল সত্ত্বার সমান কারন অন্যদের থেকে লিবারেল সত্ত্বাকে পৃথক করার কোনো উপায় নাই। লিবারেল রিজন, কাজেই যেন সার্বজনীন রিজন আর যেসব নৈতিক দর্শন সে হাজির করে সেগুলা যেন সার্বজনীন দর্শন। ব্যাক্তিকে ট্র্যাডিশন এবং নিজের নফস/খায়েশ ব্যাতীত অন্য সকল কর্তৃত্বের এর শিকল থেকে মুক্ত করার মধ্যে লিবারেলিজম এর পত্তন নিহীত।

 

 

লিবারেলিজমের জন্ম এমন এক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে যেখানে মানবিক স্বাধীনতা, সাম্য, সহনশীলতা এমনকি যুক্তিবুদ্ধির জন্য সবচাইতে বড় হুমকি ছিল ধর্ম। এটা শুধুমাত্র ইউরোপের তথাকথিত “ধর্মযুদ্ধ”-ই ছিলনা বরং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলার অতি মাত্রার খবরদারীর ব্যাপার ও এতে ছিল। এজন্যই জন লক জনপরিমন্ডল এর তর্ক বিতর্ক থেকে ধর্মকে তাড়ানোর প্রস্তাব করেছিলেন যাতে সিভিক মাতব্বরেরা ধর্মের উপর খবরদারী করতে না পারে। অন্যদিকে ইমানুয়েল কান্ট এনলাইটেনমেন্ট কে সংজ্ঞায়িত করেছেন মানব-মানবীকে ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের শিষ্যত্ব-মুরীদি থেকে বের করে নিয়ে আসার একটা প্রক্রিয়া হিসাবেঃ “নিজের যুক্তি ব্যবহারের ঔদ্ধত্য তৈরী করুন...আলসেমী আর কাপুরুষতার কারণেই এত বিরাট সংখ্যক মানুষ...সারাজীবন বুদ্ধিবৃত্তিক মুরীদ হিসাবে পার করে দেয় এবং এজন্যই খুব সহজেই অন্যদেরকে তারা নিজেদের অভিভাবক বানিয়ে নিতে পারে”। লক আর কান্ট দুইজনই খ্রিস্টান ছিলেন, কিন্তু পরের ইতিহাস দেখাবে কিভাবে ধর্ম কে সরকারের কাছ থেকে রক্ষা করার যে তাগিদ তা উলটে সরকারকে ধর্ম থেকে রক্ষা করার ব্যাতিব্যস্ততায় পরিনত হয়েছিল। যেসব মুসলিম নিজেদের প্রি-মডার্ন ইতিহাস জানে তারা সম্ভবত এই ধরনের ইতিহাসের সাথে নিজেদের ইতিহাসের একটা ফারাক খুঁজে পাবে। কিন্তু আজকের দুনিয়ায় প্রায় নিশ্চিত ভাবেই ইউরোপিয়ান অতীত, মুসলিমদের স্বৈরাচারী ও দূর্নীতিপরায়ন রাজনীতি, আর বর্তমান আর ভবিষ্যতের খ্রিস্টান ডানপন্থার হুমকিই লিবারেলিজম এর শক্তিমত্তা আর প্রাসংগিকতা ধরে রাখছে।

 

 

লিবারেলিজম সম্পর্কে যে থাম্বনেইল আলোচনা করা হল সেটা এতক্ষণে একটা খুবই নেতিবাচক ধারনা হয়ত তৈরী করে ফেলেছে। কিন্তু লিবারেলিজম এর বহু উপকার স্বীকার করে নেওয়া ভাল।কূপমন্ডুকতা, কুসংস্কার, উদাসীনতা, অন্ধ অনুকরণ এসবের অচলায়তন ভেঙ্গে ফেলার ক্ষেত্রে লিবারেলিজমের অনস্বীকার্য ভূমিকা রয়েছে। লিবারেলিজম যেভাবে আমাদের সামাজিক রাজনৈতিক স্পর্শকাতরতা ও অনুভূতির রুপায়ন ঘটিয়েছে, যেভাবে আমাদের জীবন ও জগৎ সম্পর্কিত বিশ্লেষণ পদ্ধতির পত্তন ঘটিয়েছে, যেসব সম্ভাবনার অমিত দ্বার উন্মোচন করেছে সেসব লিবারেলিজম না থাকলে আজ কোন পর্যায়ে পরে থাকত সেটা চিন্তার সীমা পরিসীমারও বাইরে।       

 

এত কিছুর পরেও, ধর্মের ব্যাপারে যে অভিযোগ খাঁড়া করিয়ে লিবারেলিজম এর জন্ম সেই একই পৌত্তলিকতার দ্বারা  লিবারেলিজম আষ্টেপৃষ্টে বন্দী। কোনো নীতি বা নৈতিক প্রস্তাবনাকে নিরঙ্কুশ ও চূড়ান্ত ঠাওরানো, নিজেদের মতবাদ কে এমন চরমপন্থায় উপনীত করা যাতে করার ফলে যে বুদ্ধিবৃত্তিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর কথা লিবারেলিজম বলেছে সেটার মধ্যে সে নিজেই সেঁধিয়ে গেছে। লিবারেলিজম এর সবচাইতে জনপ্রিয় ভার্শন –রাজনৈতিক উদারনৈতিক মতবাদ মানুষের কাছে এই দাবীই করে বসে যে, মানুষ যেন সকল পাবলিক ডিবেটে লিবারেল রিজন কে গ্রহণযোগ্যতার মানদন্ড বানায়। বলা হয়, এই পাবলিক রিজন কারো নির্দিষ্ট ধর্মীয়, আদর্শিক বা ঐতিহাসিকতাকে রক্ষার জন্য কাজ করেনা, এ যেন ‘কারোর ই না’ ফলে এ ‘সকলেরই’। কিন্তু ঠিক এই জায়গাতেই আমরা লিবারেলিজমের ধাপ্পাবাজির শিকার এ পরিনত হই। একটা পাবলিক রিজন যেটার উপর আমাদের সকলের সমান দখল আছে –এরকম কল্পনা করার মধ্য দিয়ে আমরা আরো মনে মনে কলা খাই যে, এমন কোনো পাবলিক স্পেস যেন আছে যা নিরপেক্ষ। অথচ নিজ নিজ বোধ, বুদ্ধি, বিবেচনার সাথে সাথে সুনিশ্চিতভাবেই আমাদের ইতিহাস এবং অন্যান্য স্বকীয় বৈশিষ্ট্য কাঁধে বয়েই কিন্তু আমরা পাবলিক স্পেসে আসি। যার উপর ঐতিহাসিকভাবে খবরদারী করা হয়েছে, যাকে এক কোণায় ঠেলে রাখা হয়েছে, যাকে ভয়ভীতির মধ্যে থাকতে হয়েছে বহু বহু দিন, কিভাবে সে ঐতিহাসিক ভাবে খবরদারী করা দন্ডমুন্ডের কর্তাদের সমান হবে? আবার এই সমান হয়ে ওঠা মাত্রই কি কর্তৃত্বের কবল থেকে মুক্তি নিশ্চিত হয়? যদি লিবারেল টলারেন্স আমার ব্যাক্তিগত বা সামষ্টিক স্বকীয়তাকে বিলীন বা খোঁজা বা অনুভূতিহীন করে দেয়, এই টলারেন্স কি আসলে আমার হয়ে কথা বলে নাকি যে আমাকে ‘সহ্য’ করে তার কথা বলে?  

যেখানে আমি ‘মুক্ত’ হওয়ার মাধ্যমে কী অর্জন করলে আমার ভাল হবে সেটা নির্ধারন করার একচ্ছত্র সর্বময় ক্ষমতা এমন গোষ্ঠীর হাতে যারা হচ্ছে আমার জন্য সাংস্কৃতিক, ঐতিহাসিক বা সভ্যতার দিক থেকে অচেনা-অপর (civilizational Others), তাহলে এই ‘মুক্ত’ হওয়ার ফলে কি আসলে আমার লাভ বেশি হয় নাকি আমার আগের ‘শৃংখলিত’ অবস্থাই এর চাইতে ভাল ছিল? লিবারেল স্পর্শকাতরতা জনিত পুলকিত আজকের আধুনিকী বা পশ্চিমী ‘আলোকিত’ সমাজে এইসব যুক্তি বিনির্মাণ করা সহজ কাজ না। তবে হয়ত ইন্ডিয়ান পন্ডিত আশীষ নন্দীর বক্তব্যে সান্তনা খোঁজে পাওয়া সম্ভবঃ “একজন শক্তিশালী, সিরিয়াস আর সমমনা প্রতিপক্ষ হওয়ার চাইতে অগুরুত্বপূর্ন অনুল্লেখ্যযোগ্য ভিন্নমতাবলম্বী হওয়াই বেহতর”।              

স্ট্যানলি ফিশ খুব জোড়ালোভাবে বলেছেন, লিবারেলিজম পরস্পরের সাথে সঙ্গতিহীন আবদ্ধ চিন্তাভাবনা জোড়া লাগানো সম্ভব না এই কথা বলে কথা শুরু করলেও এরপরে একসময় সে বলে ওঠে যে এসব বিরোধী মত এর মিথষ্ক্রীয়ার মাধ্যমে একটা কমন গ্রাউন্ড বা ঐক্যমতে পৌঁছানো সম্ভব। কিন্তু এই ঐক্যমতে পৌঁছানোর যে কৌশল লিবারেলিজম ব্যবহার করে সেটা শুরুতেই নিজেকে এমন এক জায়গায় তুলে রাখে যে পুরা প্রক্রিয়াটার মূল উদ্দেশ্যই ধূলিস্যাৎ হয়ে যায়। কাগজে কলমে যাই হোক, আসল ঘটনা যেটা হরহামেশা ঘটে সেটা হচ্ছে কোনো একটা শক্তিশালী মতকে “কমন সেন্স” বলে চালিয়ে নেওয়া হয়। এরপর বলা হয় যারা এই মত এর বিরোধিতা করবে, এর খন্ডনের চেষ্টা করবে অথবা এই মত যে কত বিরাট কামেল জিনিশ সেইটা বুঝতে ব্যার্থ হবে তারা আসলে যুক্তিবোধহীন, আদিম মানসিকতার অথবা নৈতিকভাবে দুশ্চরিত্র এমনকি সমাজের প্রতি একটা হুমকি।

 

যেমন ধরা যাক, নিষ্ঠাবান মুসলিমরা পরকীয়ামূলক ব্যাভিচারকে অনাচার-পাপাচার হিসাবে দৃঢ় প্রত্যয় পোষন করেন কিন্তু সেটা এজন্য নয় যে সেটা একটা ‘প্রতারণা’ মাত্র, বরং সেটা এজন্য যে আল্লাহ এটাকে পাপ হিসাবে নির্ধারণ করেছেন এবং যে ধরনের আচার একজন পরহেযগার মুসলিম গড়ে তোলার জন্য আবশ্যকীয় ব্যাভিচার তার পরিপন্থী। এখন লিবারেলিজম যদি দাবী করে বসে যে মুসলিমদের উচিত তাদের এই নিষ্ঠাকে একটা র‍্যাশনাল যুক্তিগ্রাহ্য উপায়ে ডিফেন্ড করতে হবে, তখন সমাজে প্রভাবশালী লিবারেল সংস্কৃতি তুলনামূলকভাবে অভিজাততর ঐতিহ্য লালন করে শুধু এই কারনেই কি এইটা প্রমান হয় যে মুসলিমদের এই নিষ্ঠা নৈতিকভাবে নিচু অথবা ফাতরা একটা ব্যাপার?  

 

তাহলে এই ‘যুক্তিবাদীতা’(rationality) তে মুসলিমদের কতটুকু শ্রম বা সময় বিনিয়োগ করা উচিত? এমনকি হওয়া সম্ভব না যে, আরেকটা সম্পূর্ন সাযুজ্যপূর্ণ যুক্তির দাবী হচ্ছে যে লিবারেলিজমের চোখ ধাঁধানো বৈশ্বিক কল্যান করার দাবীর উপরে ইসলাম যে কল্যাণ এর কথা বলে সেটা অর্জন করার দিকে মনযোগী হওয়াই মুসলিমদের জন্য বেশি যুক্তিগ্রাহ্য? যদি কেউ একদিকে লিবারেলিজম এর নামে ব্যাভিচার করার স্বাধীনতা চায়, সকল বৃহৎ ধর্ম ব্যাভিচারের ব্যাপারে যে নেতিবাচক দৃষ্টিভংগি পোষণ করে সেগুলোকে শৃঙ্খল জ্ঞান করে সেই শৃঙ্খল থেকে ‘স্বাধীনতা’ চায়; আর অন্য কেউ যদি সকল অচেনা আজনবী সেকুলার মানদন্ডকে থোড়াই কেয়ার করে খোদার সন্তুষ্টি অর্জন করার স্বাধীনতা চায়, তাহলে দ্বিতীয়টা কিভাবে কোনো অংশে কম ‘শৃঙ্খল মুক্তি’, কম লিবার্টি হয়?

 

 

এই ধরনের বক্তব্য বহু মুসলিমকে মারাত্মকভাবে নার্ভাস করে ফেলে। তারা মনে করে এই সুরে কথা বললে ইসলামবিদ্বেষী (Islamophobe) আর কট্টরপন্থীদের হাতে একটা মোক্ষম অস্ত্রই তুলে দেওয়া হল, এরা ইসলামের বিরুদ্ধে পশ্চিমা অভিযোগ প্রমাণেই এসব কথা ব্যবহার করবে। কিন্তু লিবারেল কল্যাণ ( যুক্তিবাদিতা, স্বাধীনতা ইত্যাদি) যদি প্রকৃত প্রস্তাবেই বৈশ্বিক হয় তাহলে এটা কিভাবে সম্ভব হল যে বিলিয়ন খানেক মানব সন্তান তার সার্বজনীনতা বুঝতেই পারল না? ঘটনা হল নানান গালগপ্পো আর নিশ্চয়তার প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও লিবারেলিজম কারো বাঁধনে না জড়ানোর আর সবার হয়ে কথা বলার যে দাবী করে সেটা আসলে বাস্তবে কখনওই ঘটেনা- ঘটা সম্ভব না।লিবারেলরা অন্য যেকারো মতই ঠিক সমান ভাবেই সংস্কৃতি, ইতিহাস আরে সামাজিক-রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ দ্বারা আকন্ঠ নিমজ্জিত আর প্রভাবিত। স্বাধীনতা, সাম্য, যুক্তিবাদিতা এগুলা নিছকই বিভিন্ন দৃষ্টিভংগি আর প্রায়োগিক অবস্থার প্রেক্ষিতে বিভিন্ন রঙ আর রুপ ধারন করে। আজকের যুগে লিবারেল দৃষ্টিভঙ্গি মোটাদাগে একটা হোয়াইট, পশ্চিমা, সেকুলার (অথবা খ্রিস্টানোত্তর) এবং অনেক নারীবাদীর মতে পুরুষালি একটা দৃষ্টিভঙ্গি মাত্র।      

 

 

এইখানে এসে মুসলমানদের উভয় সঙ্কটের শুরু হয়, বিশেষত পশ্চিম ও পশ্চিমা প্রভাবিত সমাজে। যেসব নীতি বা দর্শন দিয়ে আমরা আধুনিক জীবন এর সাথে দেনা পাওনার দফারফা (স্বাধীনতা, সাম্য, টলারেন্স, যুক্তিবাদিতা) করি সেগুলোর উপরে পশ্চিমারা একচ্ছত্র একচেটিয়া খবরদারী কায়েম করেছে, যখন মুসলিমদের এ সংক্রান্ত দর্শন পশ্চিমের বেঁধে দেওয়া ছকের  সাথে মিলে যায় একমাত্র তখনই তারা এসবের সাথে একাত্ততা ঘোষনা করতে সক্ষম হয়। আর যখন এই ছকের সাথ ওহীর বক্তব্য বা মুসলিম ঐতিহ্যবাহী ব্যাখ্যাপদ্ধতির মুখোমুখি সংঘর্ষ ঘটে তখন মুসলিমদের অবস্থা হয় জর্জ অরওয়েল এর উইন্সটন[1] এর মতঃ নিজের হাতের আঙ্গুল কয়টা সেটা অন্যকে জিজ্ঞেস করা লাগেঃ “আমার হাতে আমি কয়টা আঙ্গুল ধরে রেখেছি, বলতো উইন্সটন”? এরপর তারা দুঃখজনক আর বিকৃত যুক্তির আশ্রয় নেয় এবং ইসলামের প্রত্যকেটা দিককে প্রভাবশালী লিবারেলিজমের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। এরকম পরিস্থিতির মধ্যে মুসলিমরা –বিশেষত মুসলিম বাচ্চারা-কখনওই আত্নবিশ্বাসী হয়ে বড় হতে পারেনা। বরং তাদেরকে গলা ধাক্কা দিয়ে একটা অন্ধকার, পঁচনধরা, একাকিত্বময় ঘাবড়ে যাওয়া এক মিথ্যা-অলীক মন মানসিকতায় অভ্যস্ত করা হয়। এর পেছনের কারন হচ্ছে তারা নিজেদের স্বকীয় পরিচয় থেকে প্রতিশ্রুতি সবকিছুকেই প্রথমে নিজেরাই নিজেদের কাছে আর পরে বাকি দুনিয়ার কাছে র‍্যাশনাল মানদন্ড ব্যবহার করে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে বাধ্য হয়। আর এই র‍্যাশনাল মানদন্ডের উপরে কিন্তু সবসময় খবরদারী বজায় থাকে অন্যদের। আর যেই বয়ান সবসময় মুসলিমদেরকে মানবকল্যাণের জন্য সবচাইতে বড় হুমকি হিসাবে হাজির করে সেটাই মুসলিমদের অনেকে খুশিমনে হজম করে নেন ও পুনরুৎপাদন ঘটান।                       

 

তাহলে লিবারেল সমাজে মুসলিমদের অবস্থান কী হবে সেটা নিয়ে একটা বিরাট জিজ্ঞাসাবোধক প্রশ্ন এসে হাজির হচ্ছে। ইস্যুটা অনেক বিরাট কিন্তু কোথাও থেকে তো শুরু করতে হবে।

প্রথম কথা হচ্ছে, গনতন্ত্র এক জিনিশ আর লিবারেলিজম আরেকটা ভিন্ন ব্যাপার। আমাদের সমাজ গনতান্ত্রিক থাকুক। কতটুকু লিবারেলিজম আমরা গিলব সেটা সমঝোতার ব্যাপার।

 

দ্বিতীয়ত, উপরে যেসব সমস্যার কথা আলাপ করা হয়েছে সেগুলোকে লিবারেলিজম এর একক উত্তারাধিকার হিসাবে একঘরে করার দরকার নাই এবং ইসলামের মুখোমুখি দাঁড় করায় দেওয়ার ও জরুরত নাই। কেননা সেক্ষেত্রে ইসলামের ভিতরের যেসব বৈশিষ্ট্য লিবারেলিজম এর সাথে মিলে যায় সেগুলাকেও বাতিল করা হয়। সহনশীলতা (tolerance) এর প্রতি লিবারেলিজম এর যে প্রতিশ্রুতিবদ্ধতা সেটার দাবি হচ্ছে মৌলিকভাবে ভিন্নমত পোষনকারীদের অধিকার সংরক্ষণেও সে সচেষ্ট। ইসলাম কখনওই খ্রিস্টবাদ, ইহুদিমত, জুরাথ্রুস্টবাদ এগুলোর সাথে একমত হয়নাই। কিন্তু ইসলাম, সমাজে তাদের অবস্থান অথবা যেসব ব্যাপার ইসলাম তীব্রভাবে সমালোচনা করে সেগুলো চর্চা করার অধিকার সবসময় উপরে তুলে রেখেছে।

 

এবং তৃতীয়ত, লিবারেলিজম –যেটাকে মুসলিমরা সবসময় হুমকি মনে করে এবং করবে, সেটার তুলনায়, অন্যদেরকে জায়গা দেওয়ার ক্ষেত্রে ইসলামের নিজের ভেতরকার যে ঐতিহ্য ও পদ্ধতি রয়েছে সেটা ভিন্নমতাবলম্বীদের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে অনেক বেশি শক্তিশালী, স্থায়ী ও ফলপ্রসু হবে।

 

তাহলে ভবিষ্যত কর্মপন্থা কী হওয়া উচিত? লিবারেলিজম এর ব্যাপারে অতি প্রতিক্রিয়াশীলতা বা মুসলিম ঐতিহ্যের ব্যাপারে অতিরিক্ত ভাবালু হয়ে যাওয়া কোনোটারই দরকার নাই। মুসলিম ইন্টেলেকচুয়ালদের এই ক্ষেত্রে অনেক বড় কাজ করতে হবে। আজকে ব্যাভিচার অথবা কালকে মদ খাওয়া যা-ই ইস্যু হোকনা কেন, মুসলিমদের এইটা মেনে নিতেই হবে যে আজ হোক, কাল হোক তাদের নৈতিকতা ও দর্শনের সাথে জনগনের বিবেক বা পাবলিক রিজন এর দোহাই এর উপর গড়ে ওঠা লিবারেলিজম এর অনেক কিছুই মিলবেনা- বিরোধ লাগবে। লিবারেলিজম এর বিরুদ্ধে ইসলাম না শুধু সব ধর্মের এবং আরো অনেক মতবাদের বড় মতপার্থক্য থাকবে, কাজেই ইসলাম একাই শুধু ‘হুমকি’ না। আর আজকে লিবারেলিজম এর বিরোধিতা করার ফলে লিবারেলিজম এর জন্মের আগের যামানায় ইসলাম যতটুকু সত্য ছিল তা থেকে কিছুমাত্র এর সত্যতা কমে যায়না...আল্লাহ সবচাইতে ভাল জানেন। 

 

 

মূলঃ “Liberalism and the American Muslim Predicament” by Sherman Jackson, the King Faisal Chair in Islamic Thought and Culture and Professor of Religion and American Studies and Ethnicity at the University of Southern California.

তরজমা, সম্পাদনা, সংক্ষেপন ও পরিমার্জনঃ নাজমুস সাকিব নির্ঝর

 

[1] https://en.wikipedia.org/wiki/Winston_Smith

২টি মন্তব্য

মাসউদুল আলম
১২ সেপ্টেম্বর ২০১৫

পড়তে পড়তে ভাবছিলাম, ফিনিশিং কী হবে...? ওয়ে আউট বাস্তবসম্মত হয়েছে :)

আপনার শব্দচয়ন, বাক্যবিন্যাস খুবই catchy। পড়ার সময় অনুবাদের ফ্লেবার পাইনি, এইটাই অনুবাদকের স্বার্থকতা :)

শাহিদুল হক
১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৫

বেশ গুরুত্বপূর্ণ লিখা। চমত্কার অনুবাদ।

অনেকগুলা পয়েন্ট।

প্রফেসর মুক্তিদার খান "যুক্তিবাদিতার (rationality)" ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে একবার স্বয়ং যুক্তিবাদিতাকে ক্লাশ অফ সিভিলাইজেশনের স্টাইলে ইসলাম বনাম পশ্চিমের মধ্যে ভাগাভাগি করে বলেছিলেন, "পশ্চিমে কোনো বয়ান ধর্মে সর্মথন করলে, তারা এর উপরে একটা "যুক্তিবাদী (rational)" বয়ানের আবরণ তৈরী করে এবং তার উপর ভর করে, নিজেদের ধর্মীয় বয়ান কার্যকর করে। যেমন - বুশ ইরাক দখল করতে চায় কারণ ডানপন্থী খ্রিস্টানদের দীর্ঘমেয়াদী এজেন্ডা বাস্তবায়নে মুসলিম বিশ্বের একটি শক্তিশালী দেশ খতম করে দিতে চায়। কিন্তু বয়ান হিসেবে হাজির করে ইরাকে স্বৈরতন্ত্রের বিলোপ এবং গনতন্র প্রতিষ্ঠা। অন্যদিকে মুসলিম সমাজে কোনো কোনো কিছুর বয়ানের বৈধ্যতা শুধুমাত্র যুক্তিবাদি পয়েন্ট থেকে বৈধ হলেই চলে না, বরং উল্টো যুক্তিবাদি পয়েন্টকে ইসলামের বয়ান দিয়ে হাজির করতে হয়। অন্যথায় সমাজের বৈধতা পাওয়া প্রায় অসম্ভব। মুসলিমরা বরং পশ্চিমের এই একের ভিতরে আরেক বয়ান অগোচরে রেখে পপুলার বয়ান দিয়ে পাবলিক ডিসকোর্সের নিয়ন্ত্রণকে "ডাবল স্ট্যান্ডার্ড (ভাওতাভাজি)" মনে করে।   

তবে এইভাবে যুক্তিবাদিতাকে পশ্চিম বনাম ইসলামে বিভক্তি করে দেখানোর প্রয়াসটি আপাত গ্রহণযোগ্য মনে হতে পারে। কিন্তু এর মধ্যে আত্মসমালোচনার অংশটি থাকে না।

আমার ধারণা, মুসলিম বিশ্বে লিবারেলিজমের উত্পত্তি ও বিস্তৃতিটা পশ্চিম থেকে অনেকটাই ভিন্ন। পশ্চিমে লিবারেলিজমের উত্পত্তির সাথে অনেকটাই রেনেসার কাধে কাধ মিলিয়ে পথচলা। পরবর্তীতে লিবারেলিজম, ইউরোপিয়ান উপনিবেশী অস্ত্র (জারেড ডায়মন্ডের মতে, বন্দুক, জীবানু আর স্টিল), স্যেকুলার ধর্মহীনতা আর কর্পোরেট মিডিয়ার সাথে একাকার হয়ে একটা ভাওতাভাজি আদর্শে পরিনত হয়েছে, যার উদ্দেশ্য শুধু পশ্চিমের ইন্টারেস্ট সার্ভ করা।

অন্যদিকে, মুসলিম বিশ্বে লিবারেলিজমের উত্পত্তিটাই হয়েছে, লিবারেলিজমের গৌরবউজ্জল অংশটুকুকে বাদ দিয়ে "ভাওতাভাজি" অংশটিকে আমদানী করে। মুসলিম বিশ্বে কলোনিয়াল শক্তির চাপিয়ে দেয়া স্যেকুলার বয়ানের বাম পাশের পাঁজর থেকে তার জন্ম। নিজেদের স্বতন্ত্র বয়ানের অভাব আর পশ্চিমের বয়ানকে কোনো ছয়-নয় দিয়ে সমাজকে বুঝিয়ে দিয়ে চোর-বাটপারদের ক্ষমতা সংহত করার চমত্কার উপকরণ, লিবারেলিজম।

যেমন - মুসলিম সমাজে মদ্যপান খারাপ। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজের প্রায় প্রত্যেকটি দেশ প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে দুর্বল। চাইলেই সরকার মদ্যপানের বৈধতা সবাইকে দিয়ে দিতে পারে। কিন্তু মদ্যপান বৈধতা দেয়ার ফলে সোশাল অর্ডার নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য যে যে শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি তা তার নেই, আর থাকলেও সরকারের অন্য হাজারো অগ্রাধিকার দিতে হয়। তাই মদ্যপানকে খারাপ করার জন্য বয়ান হতে পারে যে, "আমরা পারছি না কারণ অধিকার দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবো না। তাই মদ্যপান খারাপ"। কিন্তু সেটা না করে চরমপন্থী স্যেকুলাররাও মুসলিম বিশ্বে মদ্যপানের অবৈধ্যতার বয়ান হাজির করে, "মদ হারাম। তাই সরকার ইসলামবিরোধী কিছু করতে চায় না।"

এই বয়ানটি ইসলামের বয়ান নয় বরং মুসলিম বিশ্বে লিবারেলদের নিজেদের মতো করে বয়ান হাজির করার অক্ষমতার বয়ান।

যাইহোক, একটা অফ টপিক। খুব সম্ভবত, আমাদের দেশের প্রথম লিবারেল রাজনৈতিক দলটি ছিলো, ৫ বছর বিএনপি আমলের সকল সুযোগ সুবিধা ভোগ করে, ক্ষমতার শেষ দিন কিছু চোর-বাটপারের একসাথে হয়ে গঠন করা এলডিপি (লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি)!