লেখা

শাপলায় শিকড়ের বোধিমূল
শাপলায় শিকড়ের বোধিমূল
০৪ মে ২০১৬

আজকাল আমার হৃদয়ে কেমন আচ্ছন্নতার মেঘ জমে থাকে

আমার কবিতায়  যেন আমি আজ পথ হাঁটি ,পথ হাঁটি আমার স্বপ্নের পাদদেশে

আমি আদমের পদচিহ্ন থেকে আজরাইলের আগমনের সাক্ষী হতে চাই

বখতিয়ারের ঘোড়ার খুরের শব্দে আমার পথ চলার শুরু

তার পর শত সহস্র মুহূর্ত পেরিয়ে আজও আমি এই জনপদে নিজেকে অন্বেষণ করি

তিতাসের বিদীর্ণ বুক হতে পদ্মার রুগ্ন স্তন হয়ে আমার পথচলা

আমার পথচলা এই মাটির শীতল স্কন্ধে শিশুর মতন কোমল অবলীলায়

আমি বঙ্গোপসাগরের রূহ থেকে ভেসে আসা আদ্র সুবাসের খোঁজ করছি

খোঁজ করছি সেসব অজস্র ধবল মানুষদের ,

যাদের গায়ে সে সুবাস লেগে গেছে অবচেতনায়

 

যারা ভেসে এসেছিলো জনপদের প্রত্যেক ঘর থেকে

যারা ভেসে এসেছিলো প্রত্যন্ত কুটির থেকে ইমারতের শহরে

যারা এসেছিল ধবল বকের মত নিরীহ চাহনিতে

নিষণ্ণ কোন এক স্বপ্নিল সুবাসের টানে


আমি তাদের খুঁজতে খুঁজতে বাংলাদেশের হৃদয়ে প্রবেশ করি

তারা আসছিল পাখিদের মতন সারি বেঁধে

একই স্বপ্ন, বিশ্বাসের কাকলিতে মুখর করে শাপলার প্রশস্ত চত্বরে

 

আমি তাদের পদচিহ্ন অনুসরণে সেই পথে এগিয়ে যাই

আমি যখন মতিঝিলের পথ দিয়ে উদাস হয়ে হাঁটতে থাকি

উপরে তপ্ত সূর্য আর বুকছেঁড়া কান্নার ধ্বনি ভেসে আসে

তির্যক বর্শার মত কি যেন আমার অভ্যন্তর ছিন্ন ভিন্ন করে দেয়

আমি আমার পরিচয় খুঁজতে খুঁজতে শাপলার চত্বরের পাদদেশে যাই

হাতড়ে হাতড়ে বিষম শ্রান্তিতে আমি আমার শিকড়ের বোধিমূল খুঁজতে যাই

কেমন একটা বারুদের গন্ধ, দেয়ালে বুলেটের আর গ্রেনেডের দাগ

আমার চোখে কেমন নেশাতুর একটা বিভ্রম খেলা করে

 

আমি কি তবে ভুল পথের যাত্রী হয়ে এলাম ??

আমি কি ভুল জনপদের পথিক হয়ে নিজেকে অন্বেষণ করছি !!

আমি কি অচেনা সুবাসের খোঁজে মাথা কুঁড়ে মরছি এই বিধ্বস্ত উপত্যাকায়  

নয়তো এই পথটাকে আমার এতো বিধ্বস্ত মনে হবে কেন

রাস্তাটাকে রণক্ষেত্র আর চতুর্দিকে লাল রক্তে বিশ্বাসী পাখিদের ছড়ানো লাশ

 

ওইতো রাইফেল হাতে কারা আমার বুক ছিদ্র করতে এগিয়ে আসছে

রাস্তার প্রতিটি মানুষকে আমার আজ পদাতিক  সৈন্য  মনে হয়

গাড়ি গুলোকে যেনো সাঁজোয়া যান

ওরা এগিয়ে আসছে দানবীয় যান্ত্রিক চালে

বন্দুকের নল তাক করে যেন তারা এগিয়ে আসছে আমার বুকের পাঁজরে

তাদের চোখে কেন রক্ত-হোলির উদ্দাম

তারা কেন আমার বুকে বন্দুক হানতে এগিয়ে আসছে

তারাতো গতকালও আমার ভাই ছিল

 

যে রক্ত ইলিয়াস শাহ থেকে  কালাপাহাড়ের বংশধরের শরীরে প্রবহমান

যে রক্ত বখতিয়ার থেকে ঈশা খাঁর বাহুতে রক্তিম

যে রক্ত সিরাজউদ্দোলার শিরায় শিরায় স্রোতের মতন তুমুল উচ্ছরিত

সে রক্তকে মীরজাফরের মত কারা অস্বীকার করে     

কারা নিজ ভাইয়ের বুককে বিদীর্ণ করে সীমাহীন নিষ্ঠুরতায়


আমার শাপলার পাথুরে পাপড়িতে হাত বোলাই

এই দেয়ালে বুঝি প্রত্নসম্পদের মত শহীদের রক্ত লেগে গেছে

আমার বিশ্বাসের ইতিকথা,আমার মাটির পরিচয়

এই খানেই বুঝি শাহ মখদুম আজান দিয়েছিলেন

খান জাহান আলি ভালবেসে ঘর বেঁধেছিলেন

এই খানেই বুঝি বখতিয়ার মাত্র সতের অশ্বারোহী নিয়ে

অত্যাচারীকে পরাজিত করেছিলেন ।

 


আমি আমার ভাইয়ের লাশের দিকে দৃষ্টিপাত করি

তারা যেন শুয়ে আছে সুবহে সাদিকের দৃপ্তি মেখে

বেহেশতের ফুলের মত বিক্ষিপ্ত বাগানের মাঝে

তাদের প্রত্যেকের বুকের মাঝে সহস্র সুগন্ধি ছিদ্রপথ

তার মাঝখান থেকে ভেসে আসছে এক কমনীয় বেহেশতি সুবাস

সে হিরন্ময় সুবাস যেনো আমার হৃদয় ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়ছে-

আকাশচুম্বী ইমারতের জানালায়, ছড়িয়ে পড়ছে জনপদের আনাচে কানাচে

পড়ন্ত কুটির থেকে সমস্ত শহুরে বাতাসে

পথ থেকে প্রান্তরে, ঘর থেকে অন্তরে সে সুবাস যেনো বাসা বাঁধছে

সমস্ত প্রান্তরে, সমস্ত জনপদে, সমস্ত বাংলাদেশে !!