লেখা

সামাজিক সমস্যার ইসলামীকরণঃ সাম্প্রদায়িক সংঘাত ও ইসলামবিদ্বেষ প্রসঙ্গ
সামাজিক সমস্যার ইসলামীকরণঃ সাম্প্রদায়িক সংঘাত ও ইসলামবিদ্বেষ প্রসঙ্গ
লিখেছেন মাহমুদ নাঈম
২৪ নভেম্বর ২০১৭

"সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ" (War on Terror) পরবর্তী সময়ে ইসলামবিদ্বেষী প্রচারণা (Islamophobic propaganda) সর্বব্যাপী যে ভয়ংকর হারে বেড়ে চলেছে, তার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দিক নিয়ে আমাদের মাঝে আলোচনা থাকলেও সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে এর অবস্থান বিশ্লেষণ করার খুব একটা প্রয়াস আমাদের চোখে পড়েনা। ইসলামবিদ্বেষ, সন্ত্রাসবাদকে ইসলামের সম্পত্তি বানিয়ে ফেলার পাশাপাশি ইসলামের একটা নেতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করার যে প্রবণতা- তা যে কেবল পশ্চিমাদের রাজনৈতিক প্রচারণা (পুর্বের জন্য পশ্চিমের নির্ধারণ করে দেয়া পলিটিকাল ভ্যালুজকেও এর অন্তর্ভুক্ত ধরতে পারি) এবং মিডিয়ার চোখে ইসলামকে দেখা অমুসলিম সমাজগুলোতেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এই প্রবণতা যে মুসলিম সমাজের ভেতরেও ধীরে ধীরে গড়ে ওঠছে তা স্পষ্টতই আরো ভয়ংকর। কারণ এই প্রবণতা ম্যানিপুউলেশনের (Manipulation) অংশ হয়ে যাওয়াটা সমাজ বা ব্যক্তির অবচেতনেই ঘটে থাকে, যেখানে সে সমাজ বা ব্যক্তি একই সাথে নিজের মুসলিম পরিচয়ও ধরে রাখে, আবার কোন সমস্যাকে ইসলামীকরণের মাধ্যমে প্রচার করে একটা আপাত “মডারেট”, “মানবিক” ইসলামের দাবি করে বসে।

 

এই ম্যানিপুলেশনের অন্যতম বড় একটা উদাহরণ সম্ভবত- যে কোন সামাজিক সমস্যার ইসলামীকরণ। যেমন, “হুজুর হালাল হারাম নিয়া বয়ান করেন। আবার মাঝেমাঝে নারীর শরীরও দখল করেন। এইখানে কোন হালাল হারাম নাই। হুজুরদের ইসলাম এমনই।” কিংবা “অমুক ভাই মসজিদ আর মাহফিলের জন্য চাঁদা তোলেন। যাকাত দেন, বড় কুরবানি দেন। আবার অন্যের জমি দখল করেন। এইটাও সওয়াবের কাজ।”- এই ধরনের কথাবার্তা। এইখানে ঘটনাকে কেবল সাদা-কালো অবস্থান থেকে দেখা হচ্ছে, অপরাধীর কেবল মুসলিম পরিচয় থাকার ফলে অপরাধটাকেই ইসলামের সাথে জড়ানো হচ্ছে। এখানে ব্যক্তির সামাজিক অবস্থানকে বিশ্লেষণ করার প্রয়োজন বোধ করেন না কেউ। ইসলাম হালাল-হারামের স্পষ্ট সীমারেখা টেনে দিয়েছে, বিধান মেনে চলার স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছে, সেই সাথে নিষেধাজ্ঞাগুলোও স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করে দিয়েছে। এক্ষেত্রে কেউ যদি ইসলামের এক অংশ মেনে আরেক অংশ না মানে সেটা ইসলামের সমস্যা না। এখানে “হুজুর” কি ইসলামের নাম নিয়ে নারীর শরীর দখল করে, না “অমুক ভাই” অন্যের জমি দখল করাকে ইসলামের বিধান বলে চালিয়ে দিয়েছে? নাহ। তাহলে আমরা কেন এভাবে ভাবতে পারিনা যে, ওই “হুজুর” হয়তো তার পাপকাজগুলো ধামাচাপা দেওয়ার জন্যই হুজুরের মুখোশ পড়ে আছেন। কিংবা “অমুক ভাই” হয়তো শুধুমাত্র নিজের সামাজিক অবস্থান বজায় রাখতেই ইসলামের কিছু আচার পালন করেন। আর জমি দখল করাটাই হয়তো  তার আসল চরিত্র।

এই ধরনের ম্যানিপুলেশনের আরেকটা বড় উদারহরণ হচ্ছে, সাম্প্রদায়িকতা। কিভাবে কিভাবে যেন আমাদের দেশে গত কয়েক বছরে ‘সাম্প্রদায়িকতা’ শব্দটা ধর্মের সাথে বিশেষত ইসলামের সম্পৃক্ত হয়ে পড়লো! আমরা টেরও পেলাম না অথচ সাম্প্রদায়িকতা কিভাবে যেন “আমাদের” সম্পত্তি হয়ে গেলো। অথচ এই সাম্প্রদায়িকতার প্রায়োগিক ধারণা মানুষের সৃষ্টির শুরু থেকেই বিদ্যমান। পরিবার, গোত্র, সমাজ এবং হাল আমলের জাতীয়তা- এই ধারণাগুলোর অন্যতম একটা ভিত্তি হলো সাম্প্রদায়িকতা। মানুষ তার পরিবারকে ভালোবাসে, তাদের জন্য এক ধরনের টান অনুভব করে। পরিবারের পর বন্ধুবান্ধবের জন্য, যে সম্প্রদায়ে তার বসবাস তার জন্য এবং বৃহৎ মাপকাঠিতে একটা নিজস্ব জাতীয়তা কিংবা ধর্মের জন্য ভালোবাসা বোধ করে। এই যে একটা নির্দিষ্ট গ্রুপের প্রতি (কিংবা নিজস্ব গ্রুপ) মানুষের যে ভালোবাসা, টান কিংবা মিলেমিশে থাকার প্রবণতা সেটাই হলো সাম্প্রদায়িকতা। এই সাম্প্রদায়কিতা হতে পারে সামাজিক কোন গ্রুপ কেন্দ্রিক, অফিসকেন্দ্রিক, শহরকেন্দ্রিক, এমনকি আপনি যে গণ-যানবাহনে চড়ছেন সেটা কেন্দ্রিক। এইজন্যই প্রায়শই দেখা যায় যে, রাস্তায় রিকশাচালকদের মাঝে কোন ঝামেলা হলে যাত্রীরা নিজেদের রিকশাচালকের পক্ষাবলম্বন করে অন্য রিকশাচালককে দোষারোপ করেন। এটা In-group bias, মানুষ কোন ঘটনাকে বিশ্লেষণ করার সময় কিংবা কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছার আগে এই ধরনের বিভিন্ন Cognitive bias দ্বারা প্রভাবিত হয়। এটাকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। সুতরাং, এই সাম্প্রদায়িকতা যতক্ষণ না ‘অন্য’ কোন গ্রুপের অস্তিত্বের প্রতি হুমকি না হয়ে দাঁড়ায় ততক্ষণ তাকে নেতিবাচক হিসেবে তুলে ধরা কিংবা তারচেয়েও নোংরাভাবে ধর্মীয় সন্ত্রাস (Religious terrorism) কিংবা জঙ্গিবাদের সমার্থক হিসেবে প্রচার করাটা ক্ষতিকর।

 

 

আমরা এখানে সামাজিক মনোবিজ্ঞানের (Social Psychology) কিছু পরীক্ষা (Experiment) ও তত্ত্ব আলোচনা করবো যা আমাদের পরবর্তী কিছু ঘটনাকে ব্যখ্যা করতে সাহায্য করবে-

 

ক. সোশ্যাল সাইকোলজির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটা এক্সপেরিমেন্ট হচ্ছে ১৯৭১ এ আমেরিকান সোশ্যাল সাইকোলজিস্ট Philip ZIMBARDO কর্তৃক পরিচালিত Stanford Prison Experiment. যেখানে তিনি ২৪ জন কলেজ ছাত্রকে ২ সপ্তাহের এই এক্সপেরিমেন্টের জন্য নির্বাচিত করেন। তাদের মধ্যে থেকে অর্ধেককে প্রিজনার এবং বাকি অর্ধেককে গার্ড হিসেবে নির্বাচিত করা হয়। এক্সপেরিমেন্টের রেজাল্টকে যথাসম্ভব নিঁখুত করার জন্য এক্সপেরিমেন্ট শুরুর দিন প্রত্যেক প্রিজনারকে তাদের বাসা থেকে বাস্তবিক আসামীদের মতো এরেস্ট করে নিয়ে আসা হয় এবং সকল ধরনের আইনি প্রক্রিয়ার (Legal procedure) মধ্য দিয়ে তাদেরকে যেতে হয়, যদিও পুরো ব্যাপারটাই ছিলো সাজানো। অন্যদিকে গার্ডদের কোন প্রশিক্ষণ দেয়া হয়নি, তারা একজন ওয়ার্ডেনের সুপারভিশনে দায়িত্বপালন করতে শুরু করেন, ফলে তারা প্রিজনারদের নিয়ন্ত্রণ করার জন্য নিজেদের মতো করে নিয়ম (Rules) তৈরি করতে থাকেন। যিম্বার্ডো ও নিয়োগকৃত কয়েকজন পরামর্শক (Consultant) ক্যামেরার মাধ্যমে পাশের রুম থেকে ঘটনা পর্যবেক্ষণ করেন। কিন্তু এক্সপেরিমেন্টটি যিম্বার্ডো ছয়দিনের মাথায় বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন। কারণ প্রথমদিন থেকেই গার্ডরা প্রিজনারদের এত বেশি শারীরিক এবং মানসিক অত্যাচার, খারাপ ব্যবহার শুরু করে যে প্রিজনাররা গুরুতর মানসিক অচলাবস্থার (Mental breakdown) শিকার হন। এমনকি ৩৬ ঘন্টা পর একজন প্রিজনারকে মুক্তি দিতে বাধ্য হন তারা। এক রাতে প্রিজনারদের মধ্যে জেল ভেঙে পালিয়ে যাওয়ার গুঞ্জন ওঠে। অন্যদিকে গার্ডদের আচরণ প্রতিদিন আরো বেশি এগ্রেসিভ হতে থাকে, প্রিজনারদের শাস্তি দেয়ার নতুন নতুন উপায় তারা বের করতে থাকে, বিশেষ করে রাতের বেলায় যখন গার্ডরা মনে করেন যে তাদেরকে এখন আর লক্ষ্য করা হচ্ছে না। এমনকি এক্সপেরিমেন্ট বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর গার্ডরা খুব রেগে গিয়েছিলো। 

এই এক্সপেরিমেন্ট ছিলো আসলে Psychology of Evil- ক্ষমতা, পরিবেশ ও জবাবদিহিতার অভাব যে মানুষের মধ্যে ‘খারাপ সত্ত্বা’কে জাগ্রত করে দেয় এবং তাকে হিংস্র, অমানবিক করে তোলে- তার একটা চিত্রায়ন।

যিম্বার্ডো তার The Lucifer Effect এ বলেছেন যে, মানুষের মধ্যে ভালো এবং খারাপ পাশাপাশি বাস করে। একটা 'Bad Barrel' (যা দিয়ে তিনি সমাজ কিংবা প্রশাসন বা যে কোন কর্তৃত্বকে বুঝিয়েছেন) যে কোন মানুষকে খুব সহজেই একজন ‘ডেভিল’-এ রুপান্তরিত করতে পারে।

 

খ. মানুষের উপর আনুগত্যের প্রভাবকে ব্যাখ্যা করার জন্য আরেকজন আমেরিকান সোশ্যাল সাইকোলজিস্ট Stanley MILGRAM, ১৯৬১-৬৪ সালে কিছু এক্সপেরিমেন্ট করেন। যদিও তার এই এক্সপেরিমেন্টের উদ্দেশ্য ছিলো দ্বিতীয় বিশ্বযযুদ্ধে নাযি সেনবাহিনীদের দ্বারা পরিচালিত হত্যাযজ্ঞকে ব্যাখ্যা করা। মিলগ্রাম প্রথমে ২০-৫০ বছর বয়সী বিভিন্ন শ্রেণী পেশার ৪০ মানুষকে নিয়ে এই পরীক্ষাটা করেন। যেখানে দুজন অংশ্রহণকারী মধ্য থেকে একজন শিক্ষক আর আরেকজন ছাত্রের ভূমিকা পালন করবেন। ছাত্রকে কিছু টাস্ক দেয়া হয় যেগুলো তিনি মুখস্ত করবেন, তারপর শিক্ষক প্রশ্ন করলে তার উত্তর দিবেন। এবং প্রতিটা ভুল উত্তরের জন্য শিক্ষক ছাত্রকে বৈদ্যুতিক শক (Electric shock) দিবেন। শকের মাত্রা হচ্ছে মৃদু মাত্রার ১৫ ভোল্ট থেকে মারাত্মক বিপজ্জনক ৪৫০ মাত্রার শক। প্রতিটা ভুল উত্তরের সাথে শকের মাত্রা বাড়তে থাকবে, ১৫ থেকে শুরু হয়ে ৪৫০ পর্যন্ত। শিক্ষক এবং ছাত্র দুজন আলাদা দুটি রুমে অবস্থান করবেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী মিলগ্রামের একজন সহকারী সবসময় শিক্ষকের ভূমিকা পালন করেন এবং ভুল উত্তর দিতে থাকেন। আর ক্ষতি রোধ করার জন্য শকের ব্যাপারটিও ছিলো লোকদেখানো। যদিও শিক্ষকের ভূমিকায় অংশ নেওয়া লোকগুলো এ কথা জানতেন না। তো এক্সপেরিমেন্ট শেষে দেখা গেলো যে, ৬৩% মানুষ বিপদজনক জানার পরেও ভুলের জন্য তার ছাত্রকে সর্বোচ্চ ৪৫০ ভোল্টের শক দিয়ে টেস্ট শেষ করেছেন, এবং প্রত্যেকেই অন্তত ৩০০ ভোল্ট পর্যন্ত গিয়েছেন। প্রথমে অনেকে শক দিতে ইতস্তত করলেও, পরীক্ষকের (Experimenter) আদেশে তারা প্রত্যেকেই শাস্তি দেয়া চালিয়ে গেছেন। পরীক্ষক শুধুমাত্র তার কথার মাধ্যমে তাদেরকে আদেশ মানতে বাধ্য করেছেন। কিন্তু তাদের কেউই পরীক্ষাশেষে ছাত্রের অবস্থা কিংবা তার কতটুকু ক্ষতি হলো সেটা জানতে চাননি। এবং পরীক্ষাশেষে অংশগ্রহনকারীদের ইন্টারভিউ নেয়া হলে অধিকাংশই এটাকে উভভোগ করেছেন বলে মত দেন, কেবল গুটিকয়েক মানুষ বলছেন যে, তারা এর অংশ হতে না পারলে খুশি হতেন।

মিলগ্রাম পরবর্তীতে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে আনুগত্যের মাত্রা কি রকম হয় তা দেখার জন্য বিভিন্ন চলক (Variable) প্ররিবর্তন করে প্রায় ছয় শতাধিক মানুষের উপর পরীক্ষা চালিয়েছেন। এতে উনি দেখিয়েছেন যে, আদেশদাতা খুব উঁচু অবস্থানের কেউ হলে কিংবা কর্মের জবাবদিহিতা না থাকলে মানুষের আনুগত্যের মাত্রা বেড়ে যায়, সেই আদেশ অন্যের জন্য যতই ক্ষতিকর হোক না কেন। আবার নিজের কাজের জবাবদিহিতার ভয় থাকলে অন্যায়ের আনুগত্যের হার কমে যায়।

 

গ. Conformity বা সামাজিক কোন গ্রুপ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তাদের অনুসরণ করা- সোশ্যাল সাইকোলজির গুরুত্বপূর্ণ থিওরি। পোলিশ সাইকোলজিস্ট Solomon ASH এর এক্সপেরিমেন্ট এ ধারনাকে সমর্থন করে। এখানে প্রতিবার পরীক্ষার সময় ৫ জন করে অংশগ্রহণকারীকে একত্রিত করা হয়, যাদের মধ্যে প্রথম চারজন আসলে পরীক্ষকের নির্দেশে অভিনয় করে থাকেন- যেটা পঞ্চম অংশগ্রহণকারী জানেন না। পরীক্ষক তাদের a, b, c তিনটি সরলরেখা দেখান, যেখানে ধরে নিই b স্পষ্টতই অন্য দুটি রেখা থেকে বড়। তাদেরকে জিজ্ঞাসা করা হয় যে, কোন রেখাটি বড়? প্রথম চারজন ইচ্ছাকৃতভাবেই ভুল করেন এবং a কে বড় রেখা বলে উত্তর দেন। তো পঞ্চমজনের চোখে b কে স্পষ্ট বড় রেখা মনে হলেও অন্য সবাই a কে বড় রেখা বলেছে বলে সেও তাদের সাথে দ্বিমত করার সাহস না করে a কেই সঠিক উত্তর হিসেবে বেছে নেন।

এ ব্যাপারটাকে Bandwagon effect দিয়েও ব্যাখ্যা করা যায়। অধিকাংশ মানুষই আসলে এর দ্বারা প্রভাবিত হন। মানুষ কখনো কখনো কোন বিষয়ে সঠিক জ্ঞান রাখার পরেও সমাজের বা গ্রুপের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকেন।

 

 

একটা সামাজিক-রাজনৈতিক সমস্যাকে ধর্মের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়ার আরেকটা উদাহরণ হচ্ছে- সাম্প্রতিক সময়ের “হিন্দু-মুসলিম সংঘাত” বা সংখ্যালঘুদের উপর হামলার মতো ঘটনাগুলো। এই ঘটনাগুলোকে আবার রাজনীতিকরনের মাধ্যমের ধর্মীয় অর্থ্যাৎ “ইসলামী সাম্প্রদায়িকতা” কিংবা “জঙ্গিবাদ” হিসেবে প্রচার করা হয়। কিন্তু আসলে এই ঘটনাগুলোকে কেবল সাদা-কালোর মতো মুসলিম-অমুসলিম দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করাটা হাস্যকর। বরং ঘটনাগুলোর ধর্মীয় বিশ্লেষণের পাশাপাশি সামাজিক, রাজনৈতিক ও প্রাশাসনিক দিকগুলোও সামনে নিয়ে আসা দরকার।

এই ঘটনাগুলোকে আমি ধর্মীয় দ্বন্দ্বের বদলে একটা সমাজের আভ্যন্তরীন দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখি। এই আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বগুলো বুঝতে হলে সে সমাজের বিদ্যমান সামাজিক ক্ষমতার বিন্যাস (Social power structure), অর্থনৈতিক অবস্থা, সামাজিক আচার-প্রথা, এবং সেখানকার প্রাশাসনিক অবস্থা সম্পর্কে ভালো ধারনা দরকার। কারণ দ্বন্দ্বগুলো ধর্মীয় পরিচয়ে শুরু হলেও সংঘাত পর্যায়ে যখন চলে যায় তখন সেটা নিছক আর ধর্মীয় কারণ থাকেনা। তবে এখানে সংখ্যালঘু আর সংখ্যাগুরু দৃষ্টিভঙ্গিটা যৌক্তিক।

 

একটা সমাজে (সেটা একটা গ্রাম, মহল্লা, এলাকা কিংবা কোন প্রতিষ্ঠান) একটা গ্রুপের হাতে ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ থাকে, যারা আসলে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে ওই সমাজের সামাজিক আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করে, (ক্ষেত্রবিশেষে একাধিক গ্রুপের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্যও থাকতে পারে)। আবার একটা সোসাইটিতে ক্ষেত্রভেদে মানুষ বহুমূখী পরিচয় ধারণ করে। যেমন, একজন ব্যক্তি প্রথমত বাংলাদেশি। আরেকটু ক্ষুদ্র পরিসরে সে চিটাগং এর বাসিন্দা। আরেকটু ক্ষুদ্র পরিসরে তার পরিচয় হতে পারে সে চিটাগং এর পটিয়ার মানুষ। এভাবে সে কখনো একটি গ্রামের, কখনো কেবল একটা পাড়ার এমনকি একটি পরিবারের পরিচয় ধারণ করতে পারে। আর এভাবেই মানুষ বিভিন্ন গ্রুপের প্রতিনিধি হয়ে সাম্প্রদায়িকতার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পর্যায়ে বিভক্ত হতে পারে।

বাংলাদেশের কোন গ্রাম বা শহরে, যেখানে অমুসলিম সম্প্রদায়ের বসবাস আছে, সাধারণত সে এলাকায় মুসলিমরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ হয় এবং এই সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণেই সেই এলাকার একটা কর্তৃত্বশীল গ্রুপের ভূমিকা তাদের হাতেই থাকে। কিন্তু এখানে ধর্মের আসলে কোন ভূমিকা নেই, বরং ভূমিকা হচ্ছে জনসংখ্যার। আবার সেই সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের কিছু নির্দিষ্ট ব্যক্তির হাতেই সেই ক্ষমতার রশি থাকে। এক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে রাজনৈতিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক অবস্থান। এই অল্পকিছু মানুষই আসলে পুরো গ্রুপটাকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে; আনুগত্য, ‘Conformity’ এর সাহায্যে কিংবা ‘Bad barrel’ অথবা ‘Good barrel’ হয়ে।

এখন, কোন সংখ্যালঘু সম্প্রদায় যদি কখনো সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের কোন বিশ্বাস কিংবা আচার নিয়ে নিয়ে কটূক্তি করে বা উস্কানি দেয়, সেই বিশ্বাস ধর্মীয় হোক বা না হোক, সেটা সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের ক্ষমতার কেন্দ্রে বসে থাকা মানুষদের জন্য অস্বস্তিকর, তার ক্ষমতা কিংবা প্রভাব টিকিয়ে রাখার জন্য। এটা তার কাছে কেবল ধর্মীয় বিশ্বাসের অবমাননা না, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেটা হয়ে দাঁড়ায় ‘ক্ষমতাসীনদের’ বিশ্বাস ও ক্ষমতার অবমাননা। এর প্রতিক্রিয়ায় সংখ্যাগরিষ্ঠ গ্রুপ ক্ষমতার প্রতিফলন দেখাতে ব্যস্ত হয়ে ওঠে, শুধুমাত্র নিজেদের প্রভাব টিকিয়ে রাখতে। আর অনেকক্ষেত্রেই সেটা সংঘাত এবং অত্যাচারে রুপ নেয়।

ক্ষমতাসীনরা দুইটা কারণে সেই সংঘাতের সৃষ্টি করে, হোক সচেতনভাবে কিংবা অবচেতনে। এক, নিজেদের প্রভাব বজায় রাখতে। দ্বিতীয়ত, যিম্বার্ডোর ব্যখ্যা অনুযায়ী, মানুষ যখন ক্ষমতা পায় তখন সে সেটা প্রয়োগ করতে মরিয়া হয়ে ওঠে, সেটা অন্যদের জন্য যতই ক্ষতিকর হোক না কেন। বরং এক্ষেত্রে অন্যের দুর্দশা তারা উপভোগ করে।

 

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, “ধর্মপ্রাণ” সাধারণ মানুষেরা কেন সংঘাতগুলোতে অংশগ্রহণ করে? প্রথমত, যেহেতু এদেরকে ঢালাওভাবে ধর্মপ্রাণ পরিচয় (Tag) দেওয়া হচ্ছে সুতরাং এটা স্বাভবিক যে, ধর্মের প্রতি তাদের প্রচন্ড আবেগ, ভালোবাসা আছে। তারা তাদের বিশ্বাসের অবমাননাকে নিজেদের অবমাননা হিসেবেই দেখে। যার ফলে তাদের মধ্যে প্রচন্ড ক্ষোভ তৈরি হওয়াটাই স্বাভাবিক। দ্বিতীয়ত, মিলগ্রামের এর ব্যাখ্যা অনুযায়ী মানুষ সাধারণত উর্ধ্বতনদের যেকোন আদেশকে মেনে নেয়। আবার ‘Conformity’ এবং ‘Bandwagon effect’ তত্ত্ব অনুযায়ী মানুষ সমাজের বৃহৎ অংশের দ্বারা প্রভাবিত হয়। এক্ষেত্রে, ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখতে মরিয়া প্রভাবশালী গ্রুপ সাধারণ “ধর্মপ্রাণ” মানুষদেরকে ব্যবহার করে থাকে। তারপর গুটিকয়েক মানুষ কিংবা একটা গোষ্ঠী রাজনৈতিক ফায়দা লাভ করে।

এখন সংখ্যালঘু আর প্রাশাসনের ব্যাপারটাকে আমরা কিভাবে দেখবো? সংখ্যালঘুরা কি দায়ের উর্ধ্বে? অবশ্যই না, বরং একটা সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজের বিদ্যমান বিশ্বাস কিংবা আচারের বিরুদ্ধে কটূক্তি করা, উস্কানি দেওয়ার ফলে এই সংঘাতের জন্য প্রথমত এবং প্রধাণত দায় তাদের উপরই বর্তায়। অথচ এটা নিয়ে আমরা “সুশীলে”রা প্রশ্ন তুলিনা। দ্বিতীয়ত, প্রশাসন এখানে ‘Bad barrel’ এর ভূমিকা পালন করে। তারা ঘটনাকে ঘটতে দেয় যাতে একটা শ্রেণী রাজনৈতিক ফায়দা লাভ করতে পারে এবং ঘটনা শেষেও তাদের রক্ষা করে।

 

দিনশেষে ঘটনাগুলো আসলে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা কিংবা জঙ্গিবাদের সাথে সম্পৃক্ত না। বরং সমস্যাগুলো সামাজিক, রাজনৈতিক। এইটা আমাদের সমাজের নৈতিক এবং সাংগঠনিক পঁচনের প্রমাণ বহন করে।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই সামাজিক-রাজনৈতিক রাজনৈতিক সমস্যার দায় আর কতদিন ইসলামকে টানতে হবে? আমরা বিষয়গুলো কে তার সামাজিক, রাজনৈতিক অবস্থান থেকে বিশ্লেষণ করতে শিখবো কবে থেকে? আর এই সংঘাতগুলো সমাধানে ইসলামের ভূমিকা-ই বা কেমন হবে?

 

 

সামাজের নৈতিক পঁচন, আর প্রশাসনের ‘Bad barrel’ হয়ে ওঠার আরেকটা উদাহরণ হচ্ছে, ধর্ষণ, যৌন হয়রানি, গুম, খুনের ঘটনাগুলোর অস্বাভিক বৃদ্ধি পাওয়া। ধর্ষণ, যৌন হয়রানি প্রতিরোধে "অনেকে"ই নারীর ক্ষমতায়ন, সমানাধিকার, প্রশাসনের সার্বিক উন্নতির কথা বলেন। পশ্চিমে “উন্নত” দেশগুলোর গল্প শোনান। কিন্তু আসলেই কি কেবল নারীর ক্ষমতায়ন, সমানাধিকার কিংবা শক্তিশালী প্রশাসন এইসব সামাজিক ব্যাধিগুলোকে দূর করতে পারে?

অথচ পরিসংখ্যান বলে, “উন্নত” দেশগুলোর মধ্যে প্রথম অবস্থানে থাকা যুক্তরাষ্ট্র, যেখানে নারীর ক্ষমতায়ন, সমানাধিকার, শক্তিশালী প্রশাসন বিদ্যমান, সেখানে প্রতিদিন গড়ে ৫৭০ জনেরও অধিক মানুষ যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন!

আসলে কি কেবল ‘বস্তগত’ উৎকর্ষতা একটা সমাজকে সারিয়ে তুলতে পারে? কখনোই না। কারণ ভালো এবং খারাপ মানুষের মধ্যে পাশাপাশি বসবাস করে। সুযোগ, পরিবেশ কিংবা প্রয়োজন মানুষকে চূড়ান্ত খারাপ মানুষে পরিণত করতে পারে। একটা কার্যকরী প্রশাসন, বিচার ব্যবস্থা হয়তো আইন প্রয়োগ করে দৃশ্যমান অপরাধ কমিয়ে আনতে পারে। কিন্তু সৃষ্টির ক্ষুদ্রতার অনুভূতি, পরম-চিরন্তন জবাবদিহিতার বাধ্যবাধকতা এবং আত্মার উৎকর্ষ ছাড়া মানুষের ভেতরের অপরাধ প্রবণতাকে কমিয়ে আনা সম্ভব নয়। কেবল এ দুইয়ের সমন্বয়েই অন্যায়-অপরাধকে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে নিয়ে আসা যায়।

 

Lucifer effect অর্থ্যাৎ মানুষ পাপ করবে, মানুষের এই ফিতরাহকে ইসলাম অস্বীকার করেনা। তবে ইসলাম মানুষকে পাপ ফিরে আসতে নির্দেশ দেয়, উৎসাহিত করে এবং পথও বাতলে দেয়। আর তারচেয়েও বড় কথা, পাপকে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখার জন্য একটা সুস্থ সমাজ (Good barrel) নির্মাণের প্রতি গুরুত্ব দেয়। পঁচনধরা সমাজকে (Bad barrel) সুস্থ অবস্থায় ফিরে আসার পথ বাতলে দেয়।

এই সমাজ বিনির্মাণের প্রক্রিয়ায় ইসলাম দুটি ক্রমধারা অনুসরণ করে। যার প্রথম পর্যায় হলো ব্যক্তিগত স্তর। এ পর্যায়ে ইসলাম শুধুমাত্র ব্যক্তিকে নিয়ে কাজ করে, ব্যক্তির বিশ্বাস ও চিন্তা-ভাবনার ভিত তৈরি করে, ব্যক্তির জন্য করণীয়-বর্জনীয় নির্ধারণ করে। এ পর্যায়ে ব্যক্তির আত্মার পরিচর্যা করা হয়। ব্যক্তির ফিতরাহ, ইচ্ছা, ক্ষমতা ইত্যাদি আত্মাধিক ব্যাপারগুলোকে যেমন নির্দিষ্ট সীমারেখার ভেতরে নিয়ন্ত্রণ করা হয়, তেমনি বিভিন্ন বস্তগত বিষয়ের সাথে ব্যক্তির সীমা কি হবে, কাজের ধরণ কি হবে তা ভালো-মন্দ, হালাল-হারাম ইত্যাদি সীমারেখার মাধ্যমে নির্ধারণ করে দেয়। এ স্তরে মূলত ব্যক্তির পাপ বা অপরাধ প্রবণতাকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়।

এই বিনির্মাণ প্রক্রিয়ার দ্বিতীয় পর্যায় হলো সামাজিক স্তর, যা ধীরে ধীরে রাজনৈতিক স্তরে উন্নীত হয়। এ পর্যায়ে পুরো সমাজ কেমন হবে, কিভাবে নিয়ন্ত্রিত হবে, সে সমাজের ভেতর ব্যক্তির কর্তব্য, আচরণ কেমন হবে- ইসলাম সেগুলো নির্ধারণ করে। ইসলাম একটা সামাজ/রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ে তোলে, যেখানে রাষ্ট্র ব্যক্তির সামাজিক জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করবে। এখানে সামাজিক পর্যায়ে ব্যক্তির করনীয়-বর্জনীয় (আইন) ঠিক হয় এবং সেটাকে প্রশাসনের মাধ্যমে প্রয়োগ করা হয়। এ পর্যায়ে সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়, ব্যক্তির সামাজিক পর্যায়ের (দৃশ্যমান) অপরাধগুলোকে সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করা হয়। তবে এই ব্যবস্থা শুধুমাত্র 'ব্যক্তি' মানুষকেই নিয়ন্ত্রণ করেনা, সেই সাথে রাষ্ট্র পরিচালনার সাথে সম্পৃক্ত ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, প্রশাসনকেও আইন মেনে চলতে বাধ্য করে এবং জবাবদিহিতার মুখোমুখি করে। এই বিচার ব্যবস্থাকেও আইনের আওতায়  জবাবদিহিতার মুখোমুখি হতে হয় বলে সোশ্যাল কনফর্মিটি, অবাধ আনুগত্য কিংবা "সাম্প্রদায়িকতা"র মতো প্রভাবগুলোও সমাজে নিয়ন্ত্রিত হয়।

উল্লেখ্য যে, এ দুটি পর্যায়-ই পরকালের চূড়ান্ত বিচার ও কর্মফলের ধারণা ধারা পরিবেষ্টিত। যার পরে মানুষের ব্যক্তিগত পর্যায়ের (অদৃশ্য বা দৃশ্যমান) ভালো-মন্দ সকল কাজের (মূলত `ইবাদাহ) জন্য সে পরকালে জবাবদিহিতার মুখোমুখি হবে। তেমনিভাবে সামাজিক পর্যায়ে ব্যক্তির (সমাজ বা রাষ্ট্রের পরিচালনায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিগণেরও) কর্ম ও আচরণ (মূলত মু`আমালাহ) চূড়ান্ত বিচারের মুখোমুখি হবে। আর এ বিচার শেষে সকলই পুরস্কার-শাস্তি প্রাপ্ত হবে। আর এ বিশ্বাসের ফলেই ইসলামের জন্য ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে সামাজিক পর্যায়ে সব জায়গায় অপরাধকে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নিয়ন্ত্রিত সহজ হয়ে ওঠে।

 

ধর্মের কাছে অন্যান্য বস্তবাদী আদর্শগুলো (Ideology) এখানেই হেরে যায়। বস্তবাদী আদর্শ কেবল একটা সামাজিক/রাজনৈতিক ব্যবস্থাই নির্মাণ করতে পারে (যে গঠনতন্ত্র আবার আত্মিক উৎকর্ষতার অভাবে কেবল সমাজের উচ্চশ্রেণীর (Elite) দাসে পরিণত হয়।), যেখানে মানুষের ‘ব্যক্তি’ ধারণাটা খুবই অস্পষ্ট। যার ফলে এ সিস্টেম বাহ্যিকভাবে কেবল অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, কিন্তু মানুষের অপরাধ প্রবণতাকে দূর করতে পারেনা। অন্যদিকে ইসলাম বস্তগত উৎকর্ষতা- যা একটা সামাজিক/ রাজনৈতিক ব্যবস্থার (system) ফলাফল হিসেবে আসে- এর পাশাপাশি সকল কর্মের পরকালীন জবাবদিহিতা ও আত্মার উৎকর্ষতা নিশ্চিত করে মানুষের ভেতরের অপরাধ প্রবণতা এবং অপরাধ- দুটোকেই নিয়ন্ত্রণ করে। আর এভাবেই ইসলাম একটা কল্যাণকর, সুস্থ ও স্থিতিশীল সমাজ বিনির্মাণ করতে সক্ষম হয়।