লেখা

সেকুলার রাষ্ট্র বনাম ধর্ম: তালাক নাকি পরকীয়া
সেকুলার রাষ্ট্র বনাম ধর্ম: তালাক নাকি পরকীয়া
২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৬

রাষ্ট্র বা পলিটির সাথে ধর্ম কিংবা ঈশ্বরের ধারণার একটা অবিচ্ছেদ্য মৌলিক সম্পর্ক একদম শুরুর দিক থেকেই, অর্থাৎ জাতিরাষ্ট্রের জন্মের বহু আগে ছিলই। ঈশ্বরের বিশেষ ধারণা কিংবা ধর্মের বিশেষ গঠনই তখনকার পলিটি কিংবা রাষ্ট্রের বিশেষ ধরণকে ন্যয্যতা প্রদানের চূড়ান্ত হাতিয়ার ছিল। হতে পারে সেটা একত্ববাদী ধর্ম কিংবা বহুত্ববাদী প্যাগান কিংবা মিথিক ধারণার উপর গড়ে উঠা ধর্ম কিংবা ঈশ্বরের ধারণা। অধুনা সময়ের জাতীয়তাবাদী সেকুলার রাষ্ট্র ধারণার আগ পর্যন্ত যে কোন ধরণের পলিটির ক্ষেত্রে এ ব্যাপারটি সত্য। 

 

উদাহরণ স্বরূপ আমরা বলতে পারি, ইতিহাসের সবচাইতে প্রাচীন সভ্যতা মেসোপটেমিয়ো বা মিশরীয় সভ্যতার কথা। এখানে আমরা দেখি রাজারা নিজেদেরকেই ঈশ্বর বা ঈশ্বরের সরাসরি প্রতিনিধি হিসেবে তুলে ধরে। আর এভাবে তাদেরকে ঘিরেই গড়ে উঠত রাজ্য কিংবা সাম্রাজ্য। উপমহাদেশে আর্যদের রাজ্যব্যবস্থার মূল ধারণা ছিল সামাজিক শ্রেণী বিন্যাস। আর এ শ্রেণী বিন্যাসের ন্যায্যতা তারা তাদের বৈদিক ধর্ম বা ঈশ্বরের ধারণার দ্বারা প্রতিষ্ঠা করেছিল। আধুনিক সেকুলার রাষ্ট্রব্যবস্থা তার পূর্বোক্ত যে দুটি সভ্যতার কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি ঋণী তা হল গ্রীক এবং রোমান সভ্যতা। রোমান এবং গ্রীক সভ্যতায় আমরা দেখি ঈশ্বর কিংবা দেবতাদের নিয়ে মিথলজি গড়ে উঠতে। তাদের কোন কোন দেবতা নির্মমতার প্রতীক, কেউ সাহসিকতার প্রতীক, কেউ আবার প্রেমের। এর সাথে কিন্তু তাদের সাম্রাজ্যের প্রকৃতি এবং এর মধ্যে গড়ে ওঠা জীবনাচরণের ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। কারণ সাম্রাজ্য টিকে থাকতে হলে তার উপর মহত্ত্ব বা পবিত্রতা আরোপ করতে হয়। অন্যভাবে বলতে পারি এর জন্য দরকার পড়ে একটা মহান অনটোলজি। ঈশ্বর কিংবা দেবতার সংশ্লিষ্টতা ছাড়া এর চেয়ে ভাল কোন পবিত্র মেটাফিজিকাল ব্যাখ্যা দাঁড় করানো সম্ভব নয়।

 

আধুনিক সময়ে এসে আমরা সম্পূর্ণ ভিন্ন অভিজ্ঞতার মুখোমখি হই। বিশেষত সেকুলার জাতি রাষ্ট্র নামক  ধারণায় সেই ভিন্ন অভিজ্ঞতাটি সরাসরি ধরা পড়ে। পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথমবারের মত সুস্পষ্টভাবে শোনা গেল - ধর্ম কিংবা ঈশ্বরের সাথে রাষ্ট্রের কোন অনিবার্য সম্পর্ক নেই। রাষ্ট্র ধারণাটি পুরোপুরি ধর্ম বা ঈশ্বর নিরপেক্ষ বিষয়। কিন্তু প্রশ্ন হল প্রাচীন সময় থেকে পলিটি কিংবা রাজ্যগুলি ধর্ম বা ঈশ্বর ধারণার মধ্য দিয়ে ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা কিংবা পলিটির উপর পবিত্রতা বা মহত্ত্ব আরোপের যে প্রয়োজন পূরণ করত, আধুনিক সময়ে এসে কি সে প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে? অথবা এ প্রয়োজন পূরণে সেকুলার রাষ্ট্রব্যবস্থা ধর্ম বা ঈশ্বরের বাইরে অধিকতর উন্নত কিন্তু প্রকৃতিগতভাবে ভিন্ন কোন বিকল্প হাজির করতে পারে?

প্রথম প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে - না, ফুরিয়ে যায়নি। কারণ, সেকুলার রাষ্ট্রে কিছু বিষয়কে মহান, এমনকি পবিত্র বলে ঘোষণা এবং পালন করা হয়। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার সাথে সংশ্লিষ্ট কিছু মানুষ এবং কিছু দিবস, এমনকি কখনও কখনও রাষ্ট্রের কিছু গুরুত্বপূর্ণ অংশকে মহান এমনকি পবিত্র গণ্য করা হয়। এখন কথা হচ্ছে রাষ্ট্র এই মহত্ত্ব বা পবিত্রতা প্রতিষ্ঠার প্রকল্পটি কিভাবে বাস্তবায়ন করে। ধরা যাক কোনো জাতির জাতীয় যুদ্ধ বা ঘটনার শহীদদের স্মরনে নির্মিত কোনো স্তম্ভের কথা, এবং সেখানে শ্রদ্ধার্ঘ নিবেদন এর ব্যাপারটা। এই বীরদেরকে ধর্মীয় শব্দ শহীদ হিসাবেই স্মরণ করা হয়। অথচ শহীদ বা মার্টায়ার শব্দগুলার ঐতিহাসিকতা নিঃসন্দেহে ধর্মীয়। মহান কোনো দিবস পালনে যথাযথ ভাবগাম্ভীর্যের সাথে শহীদ বেদিতে, স্তম্ভে, ফলকে বা সৌধে ফুল দেয়া, মোমবাতি বা প্রদীপ প্রজ্জ্বলন কর্মসূচী পালন করা হয়। এরকম স্থান যেহেতু পবিত্র বলে গণ্য তাই জুতা খুলে সেখানে যেতে হয়। বিনম্র অবনত চিত্তে জাতীয় বীরদের স্মরণ করা হয়। রাষ্ট্র কর্তৃক ঘোষিত মহান যে কোন কিছুর ক্ষেত্রেই ধর্মীয় রিচুয়ালের মত করেই কিছু সুডো রিচুয়াল পালন করা হয়। সুতরাং দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তরেও একই ভাবে আমরা বলতে পারি, রাষ্ট্র প্রকৃতিগত ভাবে ভিন্ন কোন বিকল্প হাজির করতে পারেনা। বরং সে তার রাষ্ট্রের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ করে কিছু আচার অনুষ্ঠানের প্রণয়ন যার লক্ষ্য পবিত্রতা আর মহত্ত্বকে চিরস্থায়ী করা। এই কাজটিই একই ভাবে প্রাচীন একটা পলিটি করত তবে সে পুরো বিষয়টিকে একটা ধর্মে রূপ দিত। রাষ্ট্রের জন্মের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে সে হয়ত ঈশ্বরের আসনে বসাত।

 

কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্র যেটা পারেনা সেটা হল, সে তার এই সুডো রিচুয়াল আর পবিত্র বলে গণ্য বলে বিষয় হিসেবে চিহ্নিত বিষয়াবলির পেছনে কোন অনটোলজি কিংবা মেটাফিজিকাল ব্যাখ্যা হাজির করতে পারেনা। কারণ রাষ্ট্র হল ধর্ম কিংবা ঈশ্বর নিরপেক্ষ, এই ঘোষণার মধ্য দিয়েই তার জন্ম। অথচ কোন মেটাফিজিকাল ব্যাখ্যা ছাড়া তার এই সমস্ত পবিত্রতা আরোপ আর সুডো রিচুয়াল পালনের যৌক্তিকতা কি? আপনি যদি সেকুলার রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করেন, আপনি কেন শহীদ ফলকে ফুল দেন? সে উত্তর দিবে, যারা আমাদেরকে জাতীয় জন্মের তরে আত্মত্যাগ করেছে তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা আর শ্রদ্ধা জানাই। এরপরে যদি প্রশ্ন করেন, কিন্তু তারাতো মারা গেছে মৃত ব্যক্তিদের কাছে আপনাদের এই শ্রদ্ধা বা কৃতজ্ঞতা পৌছে কি? এ পর্যায়ে কিন্তু উত্তর দিতে গেলে রাষ্ট্র শাখেঁর করাতে পড়ে যায়।। সে হ্যাঁ কিংবা না কোন উত্তর দিতে সক্ষম নয়। উত্তর যদি হ্যা হয় সেক্ষেত্রে বিষয়টি বিশ্বাসের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। সেক্ষেত্রে পুরো ব্যাপারটি ধর্মে রূপান্তরিত হয়ে যায়। আর উত্তর না হলে পুরো বিষয়টি অর্থহীন কর্মে পরিণত হয়। রাষ্ট্র এক্ষেত্রে একটা চালাকির আশ্রয় নিতে পারে। সে বলতে পারে, শহীদদের নিকট এটা না পৌঁছালেও এর মধ্য দিয়ে জাতি তার করণীয় সম্পর্কে সচেতন হয়, নিজেদের মধ্যে ঐক্য তৈরি হয়। এ পর্যায়ে এসে পুরো ব্যাপারটা একটা প্রতারণায় পরিণত হয়। রাষ্ট্র ঘোষণা করছে সে তার বীর সন্তানদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে চায়। কিন্তু আসলে এটা তার উদ্দেশ্য নয় তার উদ্দেশ্য ভিন্ন। এ রকম অসৎ একটা প্রক্রিয়া রাষ্ট্র কর্তৃক দাবীকৃত পবিত্রতা আর মহত্ত্বের দাবীর সাথে সম্পূর্ণ সংঘর্ষপূর্ণ হয়ে উঠে।

 

এখন প্রশ্ন হল, সেকুলার রাষ্ট্র একেবারে গোড়ার এ সংকটকে কিভাবে মোকাবেলা করে? কারণ উপরোক্ত প্রশ্নের যথাযথ উত্তর প্রদান ব্যতীত রাষ্ট্রের সুডো-রিচুয়ালিস্টিক কর্মকান্ডকে যুক্তিসঙ্গত ভিত্তির উপরে দাঁড় করানো সম্ভব নয়। অথচ সে নিজেকে ধর্ম কিংবা ঈশ্বর নিরপেক্ষ ঘোষণার সময়ে যুক্তিগ্রাহ্য হওয়াটাকে সর্বাগ্রে স্থান দিয়েছে। তাই গোড়ার এ সংকট মোকাবেলায় বেশ কিছু প্রকল্প সে সচেতনভাবে বাস্তবায়ন করে। প্রথমত:জনগণের মধ্যে সংকটের ব্যাপারে প্রশ্ন দানা না বাঁধে সে ব্যবস্থা করতে রাষ্ট্র সদা সচেষ্ট থাকে। এজন্য সে চেষ্টা করে পবিত্র বলে দাবীকৃত বিষয়গুলোকে যত বেশি সম্ভব গুরু গাম্ভীর্যের সাথে উপস্থাপন করতে। চেতনা আর আবেগের সংমিশ্রণে সবাই যাতে ভেসে যায় তার আয়োজন করতে সে উদ্যেগি হয়। পবিত্র বলে গণ্য বিষয়কে আরো পবিত্রতার প্রলেপ দেয়। যাতে পবিত্রতার ছদ্মবেশ ভেঙে রাষ্ট্রের কংকাল চেহারা দিনের আলোয় উদ্ভাসিত না হয়। জনগণ আবেগের তোড়ে আর পবিত্রতার জোয়ারে যুক্তিগ্রাহ্য হওয়া না হওয়ার ব্যাপারটি বেমালুম ভুলে যায়। জনগণের অবচেতনে গাম্ভীর্যের বিষয়টি প্রথিত হয়। অবশেষে, পুরো বিষয়টি প্রশ্ন তোলার উর্ধ্বের এক বিষয়ে পরিণত হয়।

 

দ্বিতীয়ত যে বিষয়টি ঘটে, সেকুলার রাষ্ট্রের সঙ্গে ভোগবাদীতার গভীর মেলবন্ধন তৈরি হয়। জনগণ যত বেশি ভোগবাদী হয়ে ওঠে ততই তারা রাষ্ট্রের অন্তর্গত এ সংকট নিয়ে ভাবতে অক্ষম হয়ে পড়ে। আর সেকুলার ব্যবস্থাও ততই নিজেকে নিরাপদ অনুভব করে। রাষ্ট্র তাই নানারকম উৎসবকে উৎসাহিত করে। এমনকি রাষ্ট্র কর্তৃক পবিত্র ঘোষিত দিনগুলোকেও সে উৎসবের আমেজে পরিণত করে। ভোগবাদীতার এক পর্যায়ে মানুষ ভুলে সে কেন এ দিবস পালন করছে, কি তার ইতিহাস, এর উদ্দেশ্য কি। এভাবেই রাষ্ট্রও অস্তিত্বের সংকট থেকে মুক্তি পায়। আর এ কারণে পুঁজিবাদী অর্থ ব্যবস্থা্র সাথে সেকুলার রাষ্ট্রব্যবস্থার দহরম-মহরম সম্পর্ক। একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে।

সর্বশেষ সে ব্যবহার করে পেশিশক্তি। সেকুলার রাষ্ট্র মুক্তচিন্তার কথা বলে। উদার নৈতিকতা আর পরমত সহিষ্ণুতার কথা বলে, সাংস্কৃতিক বহুত্বকে সে লালন করার কথা বলে। কিন্তু সেকুলার রাষ্ট্রের এই সংকট নিয়ে মুক্ত চিন্তার প্রসঙ্গ হাজির হলে সে পেশিশক্তির দেয়াল দাঁড় করিয়ে দেয়। অবশ্য এটা করার সাথে সাথে তারা একটা তুলনামুলক উপযোগবাদী আবার কখনও বিবর্তনবাদী ব্যাখ্যা হাজির করার চেষ্টা করে। সেটা হল, সেকুলার রাষ্ট্রের যত সংকটই থাকুক সেটা অন্য ব্যবস্থা থেকে ভাল। অথবা ইতিহাসের কাল পরিক্রমায় রাষ্ট্রব্যবস্থা বিবর্তিত হয়ে আজকের আধুনিক এ স্তরে এসে পৌঁছেছে।

 

তবে সেকুলার রাষ্ট্রব্যবস্থা সবচেয়ে বড় হুমকি অনুভব করে ইসলামের কাছ থেকে। গ্রেকো রোমান সভ্যতার যে ধারাবাহিকতায় সেকুলার রাষ্ট্রের জন্ম সে জুডায়ো ক্রিশ্চিয়ান ট্র্যাডিশনকে দেখে আসলেও ইসলামকে তো কখনো ডীল করেনাই। একই কারণে মুসলিমরাও যেকোন সেকুলার রাষ্ট্রব্যবস্থার সাথে একাত্ম হতে গিয়ে হোঁচট খায়। কারণ, ইসলামে শুরুর এ প্রশ্ন উপেক্ষা করার কোন সুযোগ নেই। ইসলাম প্রথম প্রস্তাবেই অন্টোলজিকালি অন্যান্য সার্বভৌমত্বকে নাকচ করে তবেই তাওহীদের একচ্ছত্রতার ঘোষণা দিয়েছে। তাই একজন মুসলিমের পক্ষে অনটোলজির দিক থেকে অন্তসারশূন্য একটা বিষয়ে আপ্লুত হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তাছাড়া ইসলামি অনটোলজির উপর দাঁড়ানো শক্তিশালী সভ্যতা আর পলিটির ইতিহাস একজন প্র্যাকটিসিং মুসলিমের স্মৃতিতে খুবই সজীবভাবে হাজির থাকে। ফলে তার সেকুলার রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যে পরিপূর্ণ আনুগত্যশীলতার সাথে একীভূত হওয়া খুবই কঠিন হয়ে পড়ে। সেকুলার রাষ্ট্রের সাথে তাই ইসলামের  টানাপোড়েন অনেকটা অনিবার্য বাস্তবতা হিসেবে হাজির হয়। ইসলাম প্রশ্নে রাষ্ট্রও তাই নিপীড়ক হয়ে উঠে।