চিন্তার পর্যালোচনা

আলঁ বাদিউ
আলাঁ বাদিউ এর বরাতে আধুনিকতা ও আধুনিকদের হিজাব সমস্যা
পর্যালোচনা করেছেন খন্দকার রাক্বীব
০৭ মে ২০১৬

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ডক্টর আজিজুর রহমান মৃত্যু হুমকিতে আছেন। ভয়ানক খবর আর সংস্কৃতি। তবে এই ঘটনার পিছনের খবর হচ্ছে নিজ বিভাগের এক নারী শিক্ষার্থীর মুখের নেকাব না খোলায় বহু দিন ক্লাসে তার হাজিরা নিচ্ছিলেন না এই শিক্ষক। সেদিন প্রতিবাদ হল এই নিয়ে ক্লাসে। সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়ল এই খবর। এইসব শিক্ষকদের সেক্যুলারিজম আর আধুনিকতার মোড়কে হিজাব-নেকাব-ইসলাম নিয়ে পঠন-পাঠনে বিস্মিত না হয়ে পারা যায়না। আধুনিকতার যে সঙ্কট চলছে, এসব শিক্ষকদের চিন্তা সেই সঙ্কটেই আবদ্ধ। মুক্ত চিন্তার নামে এরা একটা বদ্ধ চিন্তায় বসে আছে। 

আমাদের এইখানে নেকাব-পর্দা নিয়ে এরা যা করছে, তাদের চিন্তার কলনিয়াল মাস্টাররাও ঠিক বাইরের কিছু করে নি। যেমন, এইসব শিক্ষকদের উত্তরসূরি ফরাসি সেক্যুলাররা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার জোরে আইন করে হিজাব-নিকাব নিষিদ্ধ করেছিল ২০১০ সালে। তো সেখানকার এক চিন্তাবিদ আলা বাদিউ এনিয়ে Behind the Scarf law, there is fear নামে একখান গুরত্বপুর্ণ লেখা হাজির করেন। বিশেষ করে স্কুলে বালিকাদের মাথায় ওড়না নিষিদ্ধ করার সময় এই লেখাটা বাদিউ লেখেন।

বলা হচ্ছে, পিতা আর ভাইদের কারণেই মুসলিম নারীর বেহাল অবস্থা। বাপ-ভাইদের অত্যাচারের চিহ্ন হিজাব। কাজেই হিজাব নিষিদ্ধ কর। যেহেতু নারী ধর্ষিত সুতরাং তাকে নিরাপত্তার নামে জেলে ঢুকাও। বাদিউ মনে করেন, এই ধরনের যুক্তি দিয়েই ফরাসি শাসকগোষ্ঠী হিজাব নিষিদ্ধ করেছে। না হলে, পিতার অপকর্মের শিকার হয়েও তাকেই দায় গুনতে হচ্ছে। আর যদি স্বেচ্ছায় কেউ হিজাব পরে? তাহলে তো জাতীয় শত্রু, পুরাদস্তুর বিদ্রোহী। এখনই শাস্তি দিতে হবে। আচ্ছা, তাহলে এই মেয়ের কোন বাপ-ভাই থাকার দরকার নাই। নিজেই তো বেয়াড়া। এই বেয়াদব মেয়ে, নিপীড়িত নারী এবং বাপ-ভাইয়ের শ্রেণী পরিচয়ের সন্ধান দিয়েছেন বাদিউ। এককালের ফরাসি উপনিবেশ আলজেরিয়া এবং পৃথিবীর বিভিন্ন স্থান হতে ছুটে আসা এসব মোহাজের মুসলমানরাই ফ্রান্সের প্রান্তিক শ্রেণী। বাদিউর ঘোষণা খুবই পরিস্কার: ইসলাম হল ফ্রান্সে মজলুমের ধর্ম। কিন্তু‘ ধনতন্ত্র বা পুঁজিতন্ত্র তারচে বড় ধর্ম। আর তার চিহ্ন চারপাশে ভুরিভুরি। দ্রব্য, ভোগ্যসামগ্রী? কি দেখি নাই আমরা? সবকিছুই পুঁজিতন্ত্রেরই প্রকাশ। তাই বাদিউর আহবান, ধর্মতাত্ত্বিক চিহ্ন হিশাবে হিজাব নিষিদ্ধ হতে পারলে চিহ্ন হিশাবে পুঁজিতন্ত্রের পণ্য পসরার বিজ্ঞাপনও নিষিদ্ধ হোক।

হিজাবের আড়ালের নারী সম্পর্কে শাসকশ্রেণী এবং নারীপ্রগতিবাদীদের মতের আশ্চর্য মিল পাওয়া যায়। তারা উভয়ই মনে করে মুসলিম নারীরা আসলে সশরীরের অংশ ঢেকে ফেলার মাধ্যমে নিজেরা জনসমক্ষে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আসলে সমাজ বিচ্ছিন্নও বটে। এরকম কোন নীতিমালা অন্তত নারীপ্রগতিবাদী বা প্রজাতন্ত্রীদের নাই, যার মাধ্যমে তারা শরীরের কোন অংশ ঢাকা থাকবে বা উন্মুক্ত রাখবে এই ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্ত দিতে পারে। এখনও কোন স্কুলে স্তনের বোঁটা বা গোপনকেশ প্রদর্শিত হয় না। তা ঢাকাই থাকে। তাহলে এর বিরুদ্ধে কেন অন্যের দৃষ্টি হতে সরায়ে ফেলার অভিযোগ আনা হয় না? বাদিউ আরো বলেন, এখনও ফ্রান্সের সিসিলিতে বিধবারা কালো স্কার্ফ পরে। এতে অবশ্য ইসলামি সন্ত্রাসীদের বিয়ে করার দরকার পড়ে নাই।

হিজাবে নারীপ্রগতিবাদীদের চুলকানি দেখে বাদিউ বেশ আমোদ পান। নারী শরীর ভোগ্যপণ্যের মত বাজারে ছড়ানো ছিটানো, বেচাবিক্রি হচ্ছে। অথচ তারা কিনা ফরাসি রাষ্ট্রপতির কাছে গুটিকয়েক হিজাব ব্যবহারকারীর বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হাতজোড়ে ব্যস্ত। নারীদের যা কিছু সম্বল তাতো অবশ্যই দেখাতে হবে। বেচতে হবে। নিয়ন্ত্রিত বিনিময় না বরং বিস্তৃত সর্বজনীন বাজারই তার ঠিকানা। বাদিউর সিদ্ধান্ত, হিজাব আসলে পুঁজিতান্ত্রিক আইন। লক্ষ্য হল, নারীর শরীর পুঁজির নিজস্ব সূত্রে বাঁধা। নারীকে এমনভাবে সাজাতে হবে যেন, যত দামই হোক তা বিকোয়। সবাই বলে পর্দা নাকি নারীর ওপর অগাধ নিয়ন্ত্রণের প্রতীক। কিন্তু‘ নারীত্ব কি আর কোনভাবেই নিয়ন্ত্রিত হয় না। যা অতিশয় হাস্যকর চিন্তা।

যে সময়ে আমরা বাস করছি এখন, ইতিহাসে নারীর শরীর, যৌনতাকে এত বেশি প্রাধান্য আর কখনোই দেয়া হয় নাই। সে কি খাবে, কিভাবে ঘুমাবে, কি রঙ মাখবে...হেন...তেন... যেন শেষ নাই। মজা মারাটাই এখন ধ্যানজ্ঞান। একটাই কথা, “নারীগণ মজা মার, আরো বেশি মাস্তি কর”। মহাত্মা জাঁক লাকা শরণে বাদিউ বলেন: পুরুষতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ আর যাই হোক, বাণিজ্যিক নিয়ন্ত্রণের মত এত ব্যাপক, চিরায়ত ও নিশ্চিত না। সেকুলারিজম এমন এক জ্ঞানব্যবস্থা যা কিনা শুধুই পশ্চিমা রীতিনীতির ধারক। অন্য ধরনের আদর্শবোধের প্রতি যারপরনাই আক্রমণাত্মক। ওখান থেকে নির্গত হওয়া নারীপ্রগতিবাদও এর বাইরে না। ‘পশ্চিমা’দের ‘অপর’কে কখনোই লেভিনার ‘অপর’র তত্ত্ব দিয়া ব্যাখ্যা করা যায় না। যেখানে অর্থবহ বিশেষকে নাকচ করে এক বিমূর্ত ফরাসি প্রজাতান্ত্রিক সামান্য ধারণার বিকাশ ঘটেছে। সেই ব্যবস্থার অন্তর্গত শিক্ষালয়গুলাতে নাগরিকদের প্রজাতান্ত্রিক মূল্যবোধের চাইতে আর অন্য কিছু শিখানোর কথা ভাবাই যায় না। তো সেখানে প্রজাতন্ত্রের নীতি বৈ অন্য কিছুকে নির্দয়ভাবে নিশ্চিহ্ন করাটাই স্বাভাবিক।

বাদিউর সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হল মৃত্যু সংক্রান্ত। পশ্চিমারা বিশেষ করে ফরাসিরা মরণরে ডরায়। কোন আদর্শের জন্য মানুষ তার জীবনকেও বিকিয়ে দিতে পারে--এটা ভাবা বা কল্পনা করা তাদের সামর্থ্যরে বাইরে। শূন্য ও অর্থহীন মরণই ফরাসিদের সবচে’ গুরুত্বপূর্ণ বাসনা। বহু মানুষ মরণকে ডরানোর কোন কারণ খুঁজে পায় না। এমনকি তাদের কেউ কেউ প্রতিদিন এক আদর্শের জন্য প্রাণ বিসর্জন দিয়ে যাচ্ছে--এটা তথাকথিত ‘সভ্য’দের জন্য ভয়াবহতম আতঙ্ক। ভাইজানেরা, বাদিউর মত আপনিও বুঝবেন, কিভাবে নিবেদিত আদর্শিক মানুষ তার নিজেকে বোমার আধার বানায় আর তার বিপরীতে সারি বেঁধে উড়তে থাকে মনুষ্য শরীরবিহীন ড্রোন বিমান। ড্রোন নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের কোন মানুষটা অমর জানতে ইচ্ছা হয়।

বাদিউ জোর দিয়ে বলেন যে, কেবল ভয়ই ওড়না-আইনে খোলাখুলি প্রকাশিত। কিন্তু‘ কিসের ভয়ে কাতর তারা? ওই একই কথা বর্বর,... ইসলামি জঙ্গি... এসব আর কি।

ডক্টর আজিজুরও ঠিক একই চিন্তায় একই ভয়ের ভিতরে আছেন। দেশে জঙ্গি জঙ্গি খেলা আর জবাই কর,জবাই কর খেলা খেলে তরমুজের মত কেটে দেশকে দুইভাগ করেছেন এনারা। এখন আবার হুমকিভীতিও পাচ্ছেন। হায় সমাজ! হায় সংস্কৃতি!! এরপরও বলি, এই সময়ে নাগরিক হিসেবে আমাদের তাঁর পাশে দাঁড়ানো উচিত। এইসব বিষয়গুলাকেও নতুন করে পর্যালোচনা করা উচিত।

খন্দকার রাক্বীব