বই পর্যালোচনা

আ সেকুলার এইজ
আ সেকুলার এইজ বই এর সংক্ষিপ্ত প্রাথমিক পর্যালোচনা
পর্যালোচনা করেছেন শিহান মির্জা
২৫ নভেম্বর ২০১৫

‘ধর্মনিরপেক্ষ’ ও ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ মুসলিম বিশ্বে বিতর্কের অন্যতম উল্লেখযোগ্য বিষয়বস্তু। আর এ বিতর্কের উদ্ভব মুসলিম বিশ্বে ঔপনিবেশিকতাবাদের সময় থেকে। আধুনিক পাশ্চাত্য বিশ্বকে এর বৈশ্বিক ভঙ্গি ও ব্যবহারিক দিক থেকে ধর্মনিরপেক্ষই ধরে নেয়া হয়। মূলত আধুনিক পাশ্চাত্যের বরাতেই বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলোতে ধর্মনিরপেক্ষতার বিস্তার, তা ঔপনিবেশিকতাবাদের দরুণই হোক কিংবা পাশ্চাত্যকে অনুকরণ করার প্রবণতার দরুণই হোক। কিন্তু এ ধর্মনিরপেক্ষতার তাৎপর্য কি?  ধর্মনিরপেক্ষতার তাৎপর্য খোঁজার জন্য এর আধুনিক সূতিকাগার পাশ্চাত্যের ইতিহাসের চেয়ে ভালো উৎস সম্ভবত আর হতে পারে না। প্রাক আধুনিক খ্রিষ্টীয় পাশ্চাত্য কিভাবে আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ পাশ্চাত্যে পরিণত হল? সেই প্রাক আধুনিক পাশ্চাত্যের সাথে বর্তমান পাশ্চাত্যের পার্থক্যই বা কি? এসব প্রশ্নের উত্তরের মধ্যেই ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ ও ‘ধর্মনিরপেক্ষতাকরণ’ এর তাৎপর্য খুঁজে পাওয়া যাবে। 

 

ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটির প্রফেরর এমিরেটাস, বিখ্যাত ক্যানাডিয়ান দার্শনিক চার্লস টেইলর তাঁর ‘A Secular Age’ বইতে সমাজতাত্ত্বিক, ঐতিহাসিক ও দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এর উত্তর খোঁজার প্রয়াস পেয়েছেন। প্রায় ৯০০ পৃষ্ঠার এই বিশাল বইটির উৎপত্তি এডিনবার্গে লেখকের ‘গিফোর্ড’ লেকচার ‘Living in a Secular Age?’ থেকে। এ লেকচারটি মূলত বইটির প্রথম তিনখন্ডকে পরিবৃত করে। পরবর্তীতে বইয়ের বিষয়বস্তু পরিবর্ধিত করে আরো দুটো খন্ড শেষে যোগ করা হয়।

 

লেখক ভূমিকাতেই ধর্মনিরপেক্ষতা কি কি উপাদান দ্বারা বৈশিষ্ট্যমন্ডিত হতে পারে এর একটি বিস্তৃত রূপরেখা দাঁড় করিয়েছেন। লেখকের মতে, দুটো প্রতিযোগিতামূলক মত রয়েছে। প্রথম মতটি সর্বসাধারণ প্রতিষ্ঠান ও রীতিনীতির পরিবর্তনের উপর উপর জোর দেয়। এ প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল রাষ্ট্র যদিও তা একমাত্র নয়। রাষ্ট্র ও চার্চের মধ্যে পৃথকীকরণ ধর্মনিরপেক্ষতার সবচেয়ে বড় প্রতীক হিসেবে গণ্য হয়। প্রাক আধুনিক পাশ্চাত্যে রাজনীতি কোন না কোন ভাবে ঈশ্বরের ধারণা ও তাঁকে অনুসরণের সাথে সংযুক্ত ছিল সেখানে আধুনিক পাশ্চাত্যে কোন ধরনের ধর্মীয় রীতি বা প্রতীক ছাড়াই যে কেউ রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করতে পারে। ব্যাপারটি শুধুমাত্র রাজনীতি নয়, সমাজের প্রতিটি স্তরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, শিক্ষা, বিনোদন, পেশাগত বিভিন্ন ক্ষেত্র এখন ঈশ্বরের সাথে অভিসম্বন্ধিত না করে নিজ নিজ ক্ষেত্রে আভ্যন্তরীণ যৌক্তিকতা দ্বারা পরিচালিত হয়। সোজা কথায়, সার্বজনীন ক্ষেত্রগুলোতে (Public Place) এখন আর ঈশ্বরের বরাত দেয়া হয় না। তবে সর্বসাধারণ ক্ষেত্রগুলোতে (Public Place) ধর্মনিরপেক্ষতা আরোপ কোনভাবেই সংখ্যাগরিষ্ট জনগণের ধর্মে বিশ্বাস ও ধর্মচর্চার সাথে সাংঘর্ষিক মনে করা হয় না।  যুক্তরাষ্ট্র এর সবচেয়ে ভালো উদাহারণ।

 

দ্বিতীয় মত অনুযায়ী, ধর্মনিরপেক্ষতা বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে সাধারণ জনগণের মধ্যে ঈশ্বরে বিশ্বাস ও ধর্মচর্চা হ্রাস পাওয়ার মাধ্যমে। এ অর্থে পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলো সুস্পষ্টভাবেই ধর্মনিরপেক্ষ যদিও এর মধ্যে এমনসব দেশও অন্তর্ভুক্ত যেখানে সর্বসাধারণ ক্ষেত্রগুলোতে (Public Place) অতীত ঐতিহ্য অনুযায়ী ঈশ্বরের নাম নেয়া হয়। 

 

লেখক তৃতীয় আরেকটি মত হিসেবে নিজের মতের প্রস্তাবনা পেশ করেছেন।  তাঁর এই বইটিতে লেখক মূলত এই তৃতীয় মতের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেছেন। এ মত অনুযায়ীঃ ধর্মনিরপেক্ষতার ফলে পাশ্চাত্য এমন একটি সমাজ ব্যবস্থা, যেখানে ঈশ্বরে বিশ্বাস না করা ছিল প্রায় অসম্ভব; ঈশ্বরে বিশ্বাসের বিষয়টি ছিল অপ্রতিদ্বন্দী এবং অসংশয়িত, এখান থেকে এমন একটি সমাজ ব্যবস্থায় পালাবর্তন করেছে যেখানে ঈশ্বরে বিশ্বাস করা অনেকগুলো পছন্দের একটি হতে পারে, কিন্তু কখনোই আগের মত একমাত্র পছন্দ নয়। কোন কোন ক্ষেত্রে তো ঈশ্বরে বিশ্বাস বা নিজের ধর্মবিশ্বাস বজায় রাখার বিষয়টিই কঠিন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে। 

 

প্রাক আধুনিক যুগের মানুষের মনন ও বিশ্বাসের কিছু স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য আছে। তারা, চার্লস টেইলরের ভাষায়, আবেশীভূত জগতে (enchanted world) বসবাস করত। ম্যাক্স ওয়েবার (Max Weber) আধুনিক ইহজাগতিক সমাজ secular society, যেখানে মহাব্রহ্মান্ডের উপর কোন অর্থ আরোপ করা হয় না এরূপ সমাজকে বোঝাতে  যে ‘অনাবেশীভূত জগত’ (disenchanted world) পরিভাষাটি ব্যবহার করেছেন। এর বিপরীত অবস্থা বোঝাতে চার্লস টেইলর অনেকটা বিপরীত পরিভাষা হিসেবে ‘আবেশীভূত জগত’ (enchanted world) পরিভাষাটি ব্যবহার করেছেন। লেখকের ভাষায়, ‘আবেশীভূত জগত’ (enchanted world) এর সময় ছিল আত্মা ও যাদুর সময়।  এ ‘আবেশীভূত জগত’ (enchanted world) – এর সমাজব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে ‘মন’ (Mind) সম্পর্কিত  প্রায়োগিক ধারণা। লেখকের মতে, এ ব্যবস্থায় ‘মন’ এর ধারণা বুঝতে হলে আমাদের আধুনিক ‘অনাবেশীভূত জগত’ (disenchanted world) এ ‘মন’ এর ধারণা বুঝতে হবে। আমাদের আধুনিক জ্ঞানকান্ড অনুযায়ী এ মহাবিশ্বে একমাত্র মানবমন ছাড়া অন্য কোন মনের অস্তিত্ব নেই। আর এই মন হচ্ছে একটি আবদ্ধ জগত। এই মহাবিশ্বে যে অর্থ বিদ্যমান তার অবস্থান মনের মধ্যেই। অর্থাৎ বাইরের ঘটনাবলী বা বস্তু আমাদের মনে যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে সেটাই আমরা অর্থ হিসেবে ধরে নেই। যা কিছুই আমাদের মানবিক সত্ত্বা বা আমাদের মানবিক সত্ত্বার বহিঃপ্রকাশ নয় তা মনের বাইরে অবস্থান করে দুভাবে আমাদের মনের উপর প্রভাব ফেলতে পারেঃ ১) আমরা এসব জিনিসকে পর্যবেক্ষণ করে মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমাদের ধারণা পরিবর্তন করতে পারি বা প্রভাবিত হতে পারি যা অন্যকোনভাবে সম্ভব নয়। ২) যেহেতু আমরা দৈহিক সত্তা হিসেবে আমরা আমাদের চারপাশের পরিবেশের সাথে মিথষ্ক্রিয়ারত এবং আমাদের মানসিক অবস্থা আমাদের দৈহিক অবস্থা দ্বারা প্রভাবিত হয়, আমাদের মানসিক অবস্থা আমাদের চারপাশে যা ঘটে তা দ্বারা প্রভাবিত হয়। কিন্তু এক্ষেত্রেও আমাদের মধ্যে যে প্রতিক্রিয়ার উৎপত্তি হয় তা আমাদের মনের ভেতর থেকেই আসে। [পৃষ্ঠা ৩৩]

 

কিন্তু আবেশীভূত জগতে (enchanted world) মন ও এর চারপাশের জগতের মধ্যে সীমারেখার ধারণাটি ছিল অনেক বেশী অস্পষ্ট।  এজগতে ‘অর্থ’ স্রেফ মনের মধ্যেই অবস্থান করে না, বরং অনেকসময় স্বাধীনভাবে মনের বাইরে চারপাশের বস্তুর মধ্যেও অবস্থান করতে পারে। আর মানুষের মন এসব ‘অর্থ’-এর প্রভাবন সীমারেখার মধ্যে পড়ে মনে করতে পারে এসব অর্থের মধ্যে তাদের সত্তাও অন্তর্ভুক্ত বা এসব অর্থ তাদের মধ্যে অনুপ্রবেশ করছে। এজন্যই লেখক প্রাক আধুনিক মানবীয় সত্তাকে ‘সরন্ধ্র সত্তা’ (porous self) হিসেবে অভিহিত করেছেন যেখানে আধুনিক যুগের  মানবীয় সত্তাকে অভিহিত করেছেন বাফার সত্তা (Buffer Self) হিসেবে। মন্ত্রমুগ্ধকর জগতে (enchanted world) মানব মন ছাড়াও মহাবিশ্বে আরো যেসব মন বিরাজ করে সেগুলো হচ্ছে আত্মাদের (Spirits) মন। এ আত্মাদের মধ্যে ভালো এবং খারাপ উভয়ই বিদ্যমান। ভালো আত্মাদের মধ্যে প্রধানতম হচ্ছেন ঈশ্বর এবং অন্যান্যরা হচ্ছে বিভিন্ন সাধকদের (saint) আত্মা। আর খারাপ আত্মাদের মধ্যে প্রধানতম হচ্ছে শয়তান আর অন্যান্যরা হচ্ছে বিভিন্ন প্রেতাত্মা (Demons)। সেযুগে মানুষ খারাপ আত্মা ও যাদুর প্রভাব থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য এবং ঈশ্বর ও ভালো আত্মাদের আশির্বাদ পাওয়ার জন্য বিভিন্ন ধর্মীয় পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন (relic)-কে প্রার্থনার মধ্যে শামিল করত এবং ঈশ্বর ছাড়াও অন্যান্য মৃত সাধুপুরুষদের আত্মার কাছে অনেকসময় প্রার্থনা করত।

 

এরপর যখন পাশ্চাত্যে প্রথম মার্টিল লুথার কিং এর মাধ্যমে সংস্কারের জোয়ার শুরু হয়, এসব আবেশীভূত জগত প্রভাবিত প্রার্থনার প্রথাকে মূর্তিপূজার সমর্থক হিসেবে গণ্য করা হতে থাকে। এব্যাপারে তাদের প্রধান যুক্তি ছিল, এসব ক্ষেত্রে সরাসরি ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা না করে বিভিন্ন মাধ্যমের কাছে প্রার্থনা করা হচ্ছে যা ঈশ্বরের সাথে শিরক করার শামিল। এব্যাপারগুলোতে প্রটেষ্টেন্ট, ক্যালভিনিষ্টসহ সব সংস্কারক দলগুলোই মোটামুটি একমত ছিল। পরবর্তীতে ক্যাথলিক চার্চের মাধ্যমেও যখন পালটা সংস্কার (Counter Reformation) শুরু হয়, তখন ধীরে ধীরে এসব প্রথাগুলোকে ক্যাথলিক প্রথা থেকে বাদ দেয়া হয়। লেখক চার্লস টেইলরের মতে, রিফর্মেশনই ছিল অনাবেশীকরণ (Disenchantment) এর প্রথম ধাপ এবং সেটা ছিল ধর্মীয়ভাবে অনুপ্রাণিত।

 (অসমাপ্ত, চলবে...)

 

 

 

 

 

 

 

 

 

  

 

শিহান মির্জা