বই পর্যালোচনা

বই পর্যালোচনা করেছেনঃ মনোয়ার শামসী সাখাওয়াত

 

উনিশ শতকের শেষে ও বিশ শতকে আধুনিক কালে যে মুসলিম ব্যক্তিত্বেরা পশ্চিমা ঔপনিবেশিক ও সাম্রাজ্যবাদী বিপর্যয় থেকে মুসলিমদের আজাদী ও পুনর্জাগরণী আন্দোলনে বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব দিয়েছেন তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন দক্ষিণ এশীয় উপমহাদেশের সৈয়দ আহমদ খান, সৈয়দ আমীর আলী, আল্লামা শিবলী নুমানী, মওলানা মুহম্মদ আলী জওহর, মওলানা আকরম খাঁ, আল্লামা মুহম্মদ ইকবাল, মওলানা আবুল কালাম আজাদ, মওলানা আবুল আলা মওদূদী, আবুল হাশিম, আবুল মনসুর আহমদ, ফররুখ আহমদ, মওলানা মুহাম্মাদ আবদুর রহীম প্রমুখ। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে একই সময়ে একইভাবে পশ্চিমা আধুনিকতাকে মোকাবেলা করেছেন জামালউদ্দিন আফগানি, মুফতি মুহম্মদ আবদুহু, রশিদ রিদা, হাসান আল বান্না, সাইয়িদ কুতুব, সৈয়দ বদিউজ্জামান নূরসি, আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনী প্রমুখ।

ফাহমিদ-উর-রহমান তাঁর 'উত্তর আধুনিক মুসলিম মন' গ্রন্থে এই বিষয়ে আলোকপাত করেছেন। আধুনিকতার মোকাবেলায় যেসব মুসলিম চিন্তাবিদ বুদ্ধিবৃত্তিক অবদান রেখেছেন তাঁদের মধ্য থেকে ২৫ জনকে লেখক ফাহমিদ-উর-রহমান বেছে নিয়েছেন। এই ২৫ জনের বাইরেও আরো বেশ কয়েকজন মননশীল ব্যক্তিত্ত্ব আছেন বটে, কিন্তু লেখক তাঁর ভূমিকায় এ প্রসঙ্গে কোনো ব্যাখ্যা দেন নি যে কেনো তিনি কাউকে কাউকে তাঁর এই বইতে অন্তর্ভুক্ত করেন নি। অবশ্য পরবর্তী খন্ডে আরো অনেকে যুক্ত হবেন বলে জানতে পেরেছি।

আরেকটি প্রশ্ন মনে জাগতে পারে যে কেন লেখক বইটিকে 'উত্তর আধুনিক মুসলিম মন' নাম দিয়েছেন? 'আধুনিক মুসলিম মন' কেন নয়? এর কারণ হিশাবে তিনি লিখেছেনঃ "এদেরকে উত্তর আধুনিক বলা হয়েছে এই কারণে যে, এরা প্রত্যেকেই নিজের নিজের মত করে আধুনিকতাকে অতিক্রম করতে চেয়েছেন অথবা ইসলামকে ভিত্তি করে আধুনিকতার বিকল্প এক নবচেতনাবাহী জ্ঞানতত্ত্বের কাঠামো খাড়া করেছেন।" তাহলে বলা যায় লেখক এই বইতে চেতনার দিক থেকে মুসলিম মনকে উত্তর আধুনিক বলেছেন, সময়কালের বিচারে নয়, কারণ আমরা জানি বিশ শতকের শেষে আশির দশক থেকে উত্তর আধুনিক কালের শুরু ধরা হয়। সেইসঙ্গে এটাও বলা যায় যে উত্তর আধুনিকতা যেহেতু আরেকটি পশ্চিমা ধারণা তাই লেখক যদি বইটির নাম 'উত্তর আধুনিক কালে মুসলিম মন' দিতেন তাহলে হয়তো আরো যথোপযুক্ত হত। কারণ এইসব মহান লেখকদেরকে "আধুনিক" বা "উত্তর আধুনিক" বলা সঠিক নয় কারণ তাঁরা কেউ পশ্চিমা জ্ঞানকাণ্ডে অবস্থান করেন নি যদিও তাঁদের সময়কাল আধুনিক বা উত্তর আধুনিক কালের সমসাময়িক। অর্থাৎ এইসব লেখকেরা সময়কালের বিচারে হয়তো "আধুনিক" বা "উত্তর আধুনিক" কিন্তু চেতনাগত বিচারে কখনোই "আধুনিক" বা "উত্তর আধুনিক" নন।

লেখক অবশ্যই পাঠকদের ধন্যবাদ পেতে পারেন কারণ তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ৩৬০ পৃষ্ঠার একটি খন্ডের মধ্যে ২৫ জন মুসলিম মনীষাকে ধারণ করেছেন। এই ২৫ জন চিন্তক মুসলিম বিশ্বের ও এর বাইরে অবস্থিত বিভিন্ন অঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব করছেন। আবার এদের মধ্যে রয়েছে চিন্তাপ্রণালীরও বৈচিত্র্য। সবাই উনিশ বা বিশ শতকের চিন্তাবিদ হলেও এবং সকলেই পশ্চিমা আধুনিকতা, ঔপনিবেশিকতা ও সাম্রাজ্যবাদকে মোকাবেলা করলেও প্রত্যেকের রয়েছে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য। অর্থাৎ এদের মধ্যে যেমন রয়েছে অনেক মিল, তেমনি রয়েছে অনেক অমিল। মৌলিক বিশ্বাস ও প্রত্যয়ে ঐকমত্য থাকলেও অনেক অমৌলিক বিষয়ে এদের মধ্যে চিন্তার বৈচিত্র্য আছে বৈকি। এটাই স্বাভাবিক এবং এটার সুযোগ ইসলামের পরিসরে যথেষ্ট পরিমাণে রয়েছে।

লেখক ফাহমিদ-উর-রহমান পেশাগত পরিচয়ে একজন চিকিৎসক। তিনি মনোরোগবিদ্যায় উচ্চতর শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। তাঁর পেশাগত বিষয়ে লেখা বইও রয়েছে। কিন্তু এর পাশাপাশি তিনি একজন সমাজ, রাষ্ট্র, জাতিগত, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় আত্মপরিচয় বিষয়ক চিন্তক, প্রাবন্ধিক, লেখক ও কলামিস্ট। এদিক থেকে তাঁকে মুসলিম বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসে যেসব মহান পলিম্যাথ বা সব্যসাচী চিকিৎসাবিদ চিন্তক ও লেখকদের (যেমন ইবনে সিনা অথবা আল রাজী) দেখা যায় তাঁদের ঐতিহ্যের অনুসারী বলা যেতে পারে।

'উত্তর আধুনিক মুসলিম মন' ও তাঁর অন্যান্য প্রকাশিত বইয়ের মাধ্যমে ফাহমিদ-উর-রহমান নিজেকে একজন বাঙালি মুসলিম জাতিসত্তার ভাষ্যকার হিশেবে উপস্থাপন করেছেন। এই আত্মপরিচয়কে তাঁর বিভিন্ন বইতে তথ্য, তত্ত্ব ও সাক্ষ্য-প্রমাণ সহকারে প্রতিষ্ঠা করতে তিনি সচেষ্ট হয়েছেন। এই উদ্দেশ্যে তিনি বাঙালি জাতিবাদের আড়ালে থাকা ভারতীয় সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদ উন্মোচনে যথেষ্ট মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন। এমনকি ভৌগোলিক সীমাভিত্তিক বাংলাদেশি জাতিবাদের অপর্যাপ্ততা এবং সীমাবদ্ধতাকেও তিনি আমাদের সামনে নিয়ে এসেছেন। এসবের বিকল্প হিশেবে তিনি যে বাঙালি মুসলিম জাতিবাদ পেশ করেছেন তা ভাষা, সংস্কৃতি, ভূগোল, ধর্ম --- সব মাত্রাকেই স্পর্শ করে সম্পূর্ণ হয়ে উঠেছে। এদিক থেকে তিনি বাংলাদেশের স্বাতন্ত্র্যবাদী জাতিসত্তা, কৃষ্টি ও সংস্কৃতির প্রবক্তা ও লেখক আবুল মনসুর আহমদ এবং খন্দকার আবদুল হামিদের যোগ্য উত্তরসূরি হয়ে উঠছেন বললে অত্যুক্তি হবে না। এর সঙ্গে যোগ করা যায় ফাহমিদ-উর-রহমানের আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে উদীয়মান ইসলামি উম্মাহর সঙ্গে সংহতি ও ঐক্য চেতনা। এদিক থেকে তিনি একজন বুদ্ধিবৃত্তিক ইসলামপন্থীও বটে।

আমাদের সৌভাগ্য যে আমরা ফাহমিদ-উর-রহমানের মত চিন্তক ও লেখক পেয়েছি। তিনি কালের স্রোতের নিত্য উত্থান ও পতন থেকে নিজেকে সরিয়ে রেখে তাঁর মনীষা দিয়ে যে সত্য উদ্ঘাটন করেছেন সেই সত্যের প্রতি অবিচল রয়েছেন। এই বৈরী সময়ে তিনি যে তাঁর চিন্তা ও প্রত্যয়ের প্রতি নিবেদিত থাকতে পারছেন এর শিক্ষা ও অনুপ্রেরণা তিনি তাঁর পরিবার বিশেষ করে তাঁর পিতার কাছ থেকেই পেয়েছেন। এছাড়া চরম বৈরী পরিবেশে মুসলিম আত্মপরিচয়কে যাঁরা গুরুত্ব দিয়েছেন তেমন কয়েকজন বাংলাভাষী মুসলিম বুদ্ধিজীবি ও শিক্ষাবিদের স্নেহধন্য সাহচর্যে তিনি দীক্ষিত ও আত্মপ্রত্যয়ী হয়েছেন।

যেসব পাঠকেরা একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিশেবে বাংলাদেশকে দেখতে চান, যেসব পাঠকেরা বাংলাদেশের কৃষ্টি ও সংস্কৃতিকে ভারতীয় আধিপত্যবাদমুক্ত দেখতে চান তাদের কাজ হবে ফাহমিদ-উর-রহমানের মত চিন্তক ও লেখকের চিন্তা ও রচনাকে পর্যালোচনা করা, অনুসরণ করা এবং কার্যক্ষেত্রে প্রয়োগ করা।

অর্গ্যানিক বুদ্ধিজীবিদেরকে যদি আমরা চিনতে ভুল করি এবং অবজ্ঞা করি তাহলে আমরা আমাদের অধঃপতনকে কোনভাবেই প্রতিহত করতে পারব না।

পাঠচক্র ডেস্ক