চিন্তার পর্যালোচনা

মালেক বিন নাবী
সাম্রাজ্যবাদের মনস্তত্ত্ব: 'ওরিয়েন্ট' নিয়ে মালেক বিন নাবীর চিন্তা - প্রথম পর্ব
পর্যালোচনা করেছেন শাহাদাৎ তৈয়ব
২৭ ডিসেম্বর ২০১৫

ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্ত হওয়াকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলাফল বলা হলেও তাতে পুরা সত্য বলা হয় না। আসলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শর্ত তৈরি হওয়ার ক্ষেত্রে উপনিবেশিতদের ক্রমাগত আন্দোলন সংগ্রামের চূড়ান্ত পরিণতি হিসাবে উপনিবেশমুক্তির শর্ত যেমন রয়েছে তেমনি তার মধ্যে আমেরিকা কেন্দ্রিক নয়া বিশ্বশক্তির ক্ষমতার যুগ শুরু হওয়ার ব্যাপারটি আরো বেশি শক্তিশালী ছিল।

 

এরকম পরিস্থিতিতে দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধ শেষ হওয়ার এক দশক পর ঔপনিবেশিক শাসন থেকে নতুন মুক্তি পাওয়া আফ্রিকা এবং এশিয়ার ছাব্বিশটি স্বাধীন রাষ্ট্র তাদের অর্থনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতি এবং নৈতিক অবস্থানকে নয়া উপনিবেশবাদ কিংবা সাম্রাজ্যবাদের দখলদার শক্তিদেয়াল থেকে স্বতন্ত্র এবং শক্তিশালী করার জন্য বানদুং সম্মেলনের আয়োজন করে। ১৯৫৫ এর এপ্রিলে অনুষ্ঠিত হওয়া বানদুং সম্মেলনের পরের বছরই মালিক বিন নাবী আফ্রোএশিয়ান চিন্তা: বানদুং সম্মেলনকে সামনে রেখে বইটি লেখেন। এটি ছিল তারই একটা পর্যালোচনামূলক লেখা।

 

সম্মেলনের মর্ম, চিন্তা, রাজনৈতিক অবস্থান, উদ্দেশ্য ও ফলাফল নিয়া এই বই। সম্মেলনে যে রাজনৈতিক এবং ক্ষমতার প্রশ্নে নৈতিক অবস্থান ছিল সদ্য স্বাধীন হওয়া আফ্রিকা এবং এশিয়ার রাষ্ট্রগুলার সাথে মালিক বিন নাবীর একমত হওয়ার কোন কারণ নাই। বরং বইটা লেখার পেছনে তার নিদারুণ ইচ্ছা ছিল একটি বক্তব্য পরিস্কার করে তোলার, সেটা হলো যে রাজনৈতিক বাসনা নিয়া এই সম্মেলনের আয়োজন তার সর্বসাকুল্য পরিণতি কোনো না কোনোভাবে নতুন বিশ্ব শক্তি আমেরিকা কিংবা পুরনো সোভিয়েত রাশিয়ার পক্ষেই যাবে। তার কারণ হিসাবে তিনি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন- দীর্ঘকাল ধরে উপনিবিশিত হওয়ার মধ্য দিয়া যে উপনিবেশবাদী সাংস্কৃতিক এবং মনোস্তাত্ত্বিক রূপান্তর ঘটেছে আফ্রোএশিয়ার জনগোষ্ঠীর জীবন যাপনে, তার কোনো রাজনৈতিক পর্যালোচনা না করে সচেতন জায়গায় যায় নাই এই জাতিগুলো। এতে দেখা গেল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে ঔপনিবেশিক প্রক্রিয়ার ধারাবাহিক বিকাশে নতুন বিশ্বশক্তি-সাম্রাজ্যবাদের কালপর্বের গোড়াতেই নিজের মোকাবেলা হাজির করতে না পারার কারণে এশিয়া ও আফ্রিকার জাতিগুলো পরোক্ষভাবে পশ্চিমের রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক দাসানুদাসের জগতে ঢুকে পড়ে। গোড়ার দিকে যে ইতিবাচক সম্ভাবনাগুলো ছিল সেটা পরে আর থাকল না। কিন্তু মালিক বিন নাবী ঔপনিবেশবাদী সংস্কৃতি ও মনোস্তত্ত্বের মোকাবেলায় যে প্রস্তাবনা হাজির করেছেন আফ্রোশিয়ার চিন্তার ভিতরে থেকে সেটাও শেষতক আসলে মানুষকে আলাদা করে ফেলে। জগতকে দুইভাগে বিভক্ত করার প্রস্তাব। একদিকে পশ্চিম আরেক দিকে আফ্রো এশিয়া। একদিকে পশ্চিমা জগত আরেক দিকে মুসলিম জগত। মালিক বিন নাবীর সাথে এইসব মতপার্থক্যের জায়গাকে আমলে নিয়াই বইটাকে গুরুত্ব দিয়েছি। কারণ এখনো পর্যন্ত সাম্রাজ্যবাদের মনোস্তাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক দাসত্ব ক্রমাগত শক্তিশালী। এ অবস্থা পুঁজির ক্ষমতা বিস্তারের পথকে আরো নির্বিঘ্ন করে তুলছে। যাতে পুঁজি ও সাম্রাজ্যবাদের পন্থা অভিন্ন হয়ে উঠছে।

 

মালেক বিন নাবী

মালেক বিন নাবীর জন্ম ১৯০৫ সালে কনস্ট্যান্টাইন নগরীর এক দরিদ্র পরিবারে; পড়ালেখা করেছেন এমন এক স্কুলে যাকে ঠিক কারাগার বলা যায়। সেখান থেকে বেরিয়ে আসেন ১৯২৫ সালে। এরপর তিনি তার এক বন্ধুর সাথে ফ্রান্স গমন করেন। সেখানে এ্যাপোলো কোর্টে কাজ করেন। ১৯৩০ সালে তিনি ওরিয়েন্টাল স্টাডিজ ইনস্টিটিউটে ভর্তি হবার চেষ্টা করেন। কিন্তু তাকে অনুমতি দেয়া হয় না। শেষ পর্যন্ত তিনি রেডিও স্টাডিজে ভর্তি হোন এবং সেখানেই সহযোগী প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করেন। এরপর বিয়ে করে সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। আরবীভাষী হলেও লেখালেখি করেছেন ফরাসী ভাষায়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৬৩ সালে তিনি নিজ ভূমি আলজিরিয়ায় ফিরে আসেন। ১৯৭৩ সালের ৩১ অক্টোবরে মালেক বিন নাবী মৃত্যুবরণ করেন।

 

বানদুং সম্মেলন

আফ্রিকা এবং এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোর প্রথম বৃহত্তর পর্যায়ের এই সম্মেলন। এটাকে আফ্রোএশিয়ান কনফারেন্স বলা হলেও বানদুং কনফারেন্স নামেই সাধারণভাবে বিখ্যাত। মূলত সম্মেলনটি সংগঠিত হয় বৃটিশ ও ফরাসী-জার্মানী উপনিবেশ থেকে সদ্য স্বাধীন হওয়া আফ্রিকা এবং এশিয়ার বিভিন্ন রাষ্ট্রগুলোর মাধ্যমে। সম্মেলনটি ১৯৫৫ সালের ১৮ থেকে ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত ছয়দিন ব্যাপী ইন্দোনেশিয়ার বানদুং শহরে অনুষ্ঠিত হয়। আয়োজক রাষ্ট্র ছিল ইন্দোনেশিয়া, বার্মা, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, এবং ইনডিয়া। সম্মেলনের সমন্বয়ক ছিলেন ইন্দোনেশিয়ার বিদেশ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মহাসচিব রুশলান আবদুল গনি। সম্মেলনে ২৬ টি রাষ্ট্র অংশগ্রহণ করে। সম্মেলনের উদ্দেশ্য ছিল আফ্রোএশিয়ার রাষ্ট্রগুলোর পরস্পরের অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং ঔপনিবেশবাদ কিংবা যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন কর্তৃক নয়া ঔপনিবেশবাদ অথবা যে কোনো সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্র ও জাতির বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। এই সম্মেলনের নগদ ফলাফল ছিল ঘড়হ-অষরমহবফ গড়াবসবহঃ কে নতুন করে শুরু করা।]   

 

এক.

পশ্চিমা বুদ্ধি চর্চার মধ্যে যুদ্ধ একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য। যুদ্ধ আর জ্ঞান সেখানে নিবিড়ভাবে জড়ানো। ফলে তার সাথে যেমন রাজনীতি যুক্ত তেমনি জ্ঞান-বিজ্ঞানও যুক্ত। বিজ্ঞানের মধ্যে তার রাজনীতি থাকে, রণকৌশলগত মনস্তত্ত্ব কাজ করে। যে কারণে তার জ্ঞান, বুদ্ধি ও দর্শনকে রাজনীতি থেকে আলাদা করে দেখা সম্ভব না। কিন্তু তার আরো এক গভীরতর দিক আছে যেখান থেকে তার সবকিছু জারিত হয়। সেই গোড়ার জায়গাটা হলো তার বেপরোয়া মনোজগত। বর্তমানে সভ্যতা ও সংস্কৃতির দিক থেকে যদি কোনো সমস্যা বুঝতে হয় তাহলে তার আগে বুঝতে হবে মানব সংকটের চূড়ান্ত অনিবার্যতা রাজনৈতিক এবং তার অসিলাগুলার সাথে সম্পর্কিত মানুষের মন আর মনস্তাত্ত্বিকতা।

 

ইউরোপীয় সংস্কৃতি ও রাজনীতির ভাষা এবং কর্তৃত্ব আর সমস্ত বিশ্বকে পদানত করে রেখেছে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে। এই বাস্তবতা কেউ মালুম করতে পারছে, আর কেউ পারছে না। যারা বুঝতে পারে তাদের মধ্যে আবার দুই রকমের প্রকাশ দেখা যায়। কেউ এই তৎপরতাকে প্রশ্ন করার চেষ্টা করছে, প্রতিরোধ করার চেষ্টা করছে। আর কেউ জেনে বুঝে তার মধ্যে মিশে যাচ্ছে। মোটকথা পশ্চিমের এই অবস্থাবলয় থেকে কেউই বের হতে পারছে না।

 

এই আলোচনার উদ্দেশ্য হলো, সাম্রাজ্যবাদের ঘেরাটোপ থেকে, ভয়ংকর দেয়ালবলয় থেকে বেরিয়ে আসার পথ কি হতে পারে সেটা বুঝতে পারার চেষ্টা করা। সেক্ষেত্রে রাজনৈতিক হাল হকিকতের সাথে সাথে চিন্তা ও মনস্তত্ত্বের বিপদটা কি সেটা ধরার জন্য কাজ করা। মূলত আফ্রোএশিয়ান উপনিবেশের সন্তান এবং তাদের মাস্টার প্রভুর মধ্যকার সম্পর্ক এবং সেটা বুঝার মধ্য দিয়ে আসল সংকট চিহ্নিত করার চেষ্টা করাই হলো এই মুহূর্তের লক্ষ্য।

 africa

 

ঔপনিবেশিক প্রভুর প্রতি উপনিবেশিতের দিক থেকে সম্পর্কটাই মুখ্য। ঔপনিবেশিক প্রভুর কোনো সম্পর্কই সেখানে আসল না। মাস্টার বা প্রভু যেভাবে সম্পর্কিত হন সেখানে শুধু এই মাস্টারকেই দেখা যায়। আর কিছুই দেখা যায় না। মাস্টার প্রভুর এই দৃশ্যমান হয়ে ওঠার জন্য প্রজা বা দাস অপরিহার্য। ফলে দেখা যায় যারা উপনিবেশিত তাদের চোখ সারাক্ষণই প্রভুর জগতে বাস করে। প্রভুর জগতই তাদের আরাধ্যভূমি। প্রভুর ইচ্ছা অনিচ্ছাই তার জীবন যাপনের শেষ কথা। এর বাইরে আর কোনো কল্পনাই তার মধ্যে জাগে না। সেও একজন মাস্টার হতে পারে, মুক্ত মানুষ হতে পারে, কর্তা হতে পারে এই সাধারণ বোধটুকুও তার মনোজগতে কাজ করে না।

অবাক ব্যাপার হলো, সে নিজেই তার জগত ভাগ করে ফেলে। এই অবস্থায় যাওয়ার কারণ ও শর্ত সে নিজেই প্রতিমুহূর্তে পয়দা করে। দাসকরণের ক্ষেত্রে প্রভুর ভূমিকার চেয়ে দাসের ভূমিকা বড় হয়ে ওঠে সেখানে। কারণ দেখা যায় দাস নিজেই দাস হয়ে ওঠছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো এই দাস তো দাস ছিল না তাহলে তার মনোজগতে এই দাসমনোবৃত্তি জাহের হলো কেন? এই কেনর উত্তর খোঁজাই গুরুত্বপূর্ণ। আফ্রিকার জনৈক কবির লেখা, এক ছেঁড়া পঙক্তি “তার চোখ সারাক্ষণ প্রভুর জগতের অপরাধীকে ডাকে।” এই অপরাধী কে? কারা সেই জালেম, নিপীড়নকারী? তার এক ইতিহাস আছে। সে এক অতি বেদনাদায়ক ইতিহাস। তার দাস হয়ে ওঠার এক রক্তাক্ত অধ্যায় আছে। এই ইতিহাস এখন পৃথিবীর সবার কাছে পৌঁছে গেছে। ইতিহাস বলার চেয়ে তার কারণ বলাই এখন বড় ব্যাপার হয়ে ওঠেছে। তা না হলে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটবে। আর একই ঘটনা যখন আবার ফিরে আসে সেটা আরো ভয়ংকর হয়ে আসে।

 

এই ইতিহাস গড়ে ওঠার বড় কারণ একটাই, সভ্য এবং অসভ্য দুনিয়ার চিন্তার ভেদাভেদ ও ইগোইজম। এর মধ্য দিয়েই বেড়ে উঠেছে আফ্রোএশিয়া। অর্থাৎ আমেরিকা এবং ইউরোপের বাইরে যে চিন্তা বা জগত সেটাই হলো আফ্রোএশিয়ান চিন্তা। কিন্তু আফ্রোএশিয়া বাইরের হয়ে উঠলো কী করে? অথবা আফ্রোএশিয়া চিন্তা আসলো কী করে? পশ্চিমা চিন্তা যখন নিজেকে কর্তা ভাবা শুরু করলো, একইসাথে কর্তা ভাবার তাৎক্ষণিক অর্থই হলো, তার একটা বিধেয় আছে, কর্ম আছে। এই ভাবাভাবির মধ্য দিয়ে সে অনিবার্যভাবে ধরে নিয়েছে, তার একটা অপর আছে, 'আদার' আছে। এই আদি মর্মের জায়গা শুধু দার্শনিকই নয় তারও আগে পশ্চিমের এই অবস্থান মনস্তাত্ত্বিক। তবে কর্তা আর বিধেয়ের কিংবা আমি আর অপরের দ্বন্দ্ব ও বিভাজন শুধু পশ্চিমের একার ব্যাপারই না, এটা দুনিয়া ব্যাপী সাধারণ দার্শনিক এবং রাজনৈতিক প্রশ্ন। এর মীমাংসার জন্য কারোরই কোনো মাথা ব্যথা নাই। না প্রাচ্যের না পশ্চিমের। ফলে মানব জগত এখনো দ্বিভাগ হয়েই থাকছে। এখান থেকে বাইর হবার কোনো তৎপরতা এখনো দেখা যাচ্ছে না। 

 

আফ্রোএশিয়া আসলে এক চিন্তা এবং মনস্তাত্ত্বিক সংকট। গত এক শতকেরও বেশি সময়কাল ধরে পশ্চিমা জগত এই চিন্তার ভেদাভেদ ঘটিয়ে এই জনগোষ্ঠীর চিন্তার স্বাধীন বিকাশকে নিয়ন্ত্রণ করেছে।

 

পুরা বিশ শতক জুড়ে এই চিন্তার বিকাশ। রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক উভয় দিক থেকে। চিন্তাটির উৎপত্তিকালটা ছিল খুবই জটিল এক মুহূর্ত। সেটা ছিল ১৯১৪ সাল। এটা ছিল এমন এক ঐতিহাসিক ক্ষণ, যেখানে মানুষের প্রকৃতি ও অধিবিদ্যার যাবতীয় উপাদান আর সহজ মনস্তাত্ত্বিক শর্তগুলো দুপায়ে দলে গেছে এই চিন্তা।  প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পটভূমি থেকে শুরু করে বিশশতকের আশির দশক এই বিশাল কালপর্ব জুড়ে পৃথিবীর আর অঞ্চলগুলো হয়ত জানেই নাই মানব সভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে কঠিন ও অমানবিক পরিস্থিতির নিষ্ঠুরতম কর্তৃত্ব ছিল। এই ট্রাজেডিক সময়ের মধ্যেই আসলো ১৯৩৯ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অভিজ্ঞতা আরো সতেজ, আরো ব্যাপক হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে। আগের ফলাফলগুলা মোটেও শুকিয়ে যায় নাই। কারণ প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যে দ্বিবিভাজন ছিল পৃথিবীর, চিন্তা ও রাজনীতির দিক থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তাই হলো।

 

একদিকে নতুন সভ্য দুনিয়া আমেরিকা-ইউরোপ, আরদিকে অসভ্য দুনিয়া আফ্রোএশিয়া। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী মার্কিন নীতি আসলো, পুরা জগতকে ভূরাজনৈতিকভাবে ভাগ করে ফেলতে হবে। এই ভাগ একইসাথে সাংস্কৃতিক তো বটেই। নৈতিকও বটে। এই নৈতিকতা বর্ণবাদী মতাদর্শের। একদিকে থাকবে মানুষ। আরদিকে থাকবে মূর্খ, অশিক্ষিত। জানোয়ার। তাদের জগতে অমানুষদের কোনো প্রবেশ নাই। তবে প্রবেশ তখনই হবে যখন কেউ তার মতো হয়ে যাবে। তার মতো হলেই সে মানুষ হবে। এই প্রবেশ পশ্চিমে গিয়ে হতে হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নাই। চিন্তা ও মনের মিলই এই প্রবেশের সার। অর্থাৎ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আগের বাস্তবতা থেকে পশ্চিমা দুনিয়া আরেকটা পর্যায়ে চলে আসলো। সেটা তাদের দিক থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আগে যারা উপনিবেশিত ছিল, এখন সেইসব ঔপনিবেশিক গোলামরা নতুন আকার লাভ করল। প্রভুরা তাদেরকে নতুন রূপে হাজির করলো। আসলে তাদেরকে নতুন রূপে হাজির করা হয় নাই। বরং প্রভুরা নিজেদেরকে নতুন শক্তিতে বিশ্বব্যাপী জাহির করলো। শুধু সম্পর্কের ধরনে পরিবর্তন হলো।

 

১৯৪৫ ছিল এই পরিবর্তনের ঐতিহাসিক ক্ষণ।  এই পরিবর্তন আদতে বিকৃতির ধারাবাহিক বিকাশ। মানব প্রকৃতির বিকৃতির ইতিহাসে এটা আরেক স্তর মাত্র। বিকৃতি বললে নৈতিক জায়গা থেকে বলা বুঝায়। তাতে পুরা বিষয়টা বুঝা যায় না। গোড়ার জায়গাটা হলো সংস্কৃতি, রাজনীতি, আইন ও ক্ষমতা প্রয়োগের নতুন স্থানান্তর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আধুনিক সভ্যতার বিশ্ব কর্তাশ্রেণী যে প্রকল্পগুলো গ্রহণ করেছে গোটা দুনিয়ায় নতুন নীতি ও কৌশল বাস্তবায়নের জন্য তার মধ্যে অন্যতম ছিল আটলান্টা চুক্তি। একইভাবে উনিশ শ পয়ঁতাল্লিশ সাল থেকে তারা আগের পৃথিবীতে নেয়া নীতি ও কৌশলের ধ্বংসাবশেষের উপর নয়া দুনিয়ার ভিত্তি স্থাপন করল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ফলাফল হিসাবে যে চুক্তি গ্রহণ করা হয় তাতে স্বাধীনতা, শ্রম ও শান্তির কথা নীতি আকারে ছিল। এগুলা আটলান্টায় ছিল। তাতে উইলসনের প্রধান ভূমিকা ছিল। উনিশ  শ উনিশ সনে উইলসন যে নীতি ও কৌশল ঠিক করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সে নীতি ও কৌশলই ব্যাপক আকারে নির্ধারিত হয়। উদ্দেশ্যের দিক থেকে কোনো পরিবর্তন হয় নাই। শুধু কাজের জায়গায় কৌশলগত ও কাঠামোগত পরিবর্তন হয়েছে। নীতি বা মতাদর্শগত দিক থেকে কোনো পরিবর্তন হয় নাই। এ দিক থেকে জাতিপুঞ্জ জাতিসংঘেরই দ্বিতীয় সংস্করণ। যেখানে পার্থক্যের মধ্যে শুধু ক্ষমতাকাঠামোর এককেন্দ্রিক চেহারা বিশ্বপ্রধান হয়ে ওঠে। আমেরিকা সেখানে একক বিশ্বশক্তি হয়ে ওঠার প্রাথমিক ও আসল সুযোগ এই জাতিসংঘ গঠনের মধ্য দিয়ে হাসিল করে। ফলে দেখা গেল, উইলসনের দেখানো পথেই রুজভেল্ট অনেক দূর আগায়ে গেল। রুজভেল্ট উইলসনেরই নতুন পরিণতি। তাতে শুধু তার ক্ষমতা বেহাত হল। ব্রিটেন থেকে আমেরিকা।

 

কিন্তু এই আলোচনার সাথে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, আফ্রোএশিয়া অঞ্চলে কী ধরনের প্রভাব ফেললো এই পরিবর্তন। মূলত আমেরিকার যাবতীয় পরিবর্তনের ফলাফল উসুল করার জায়গাই হলো আমেরিকার বাইরের পৃথিবী। কাজে কাজেই সেখানে উপনিবেশের বিষয় চলে আসল। সেক্ষেত্রে আমেরিকার দিক থেকে নতুন কী ধরনের পরিবর্তন গ্রহণ করা হয়েছে সেটা দেখার বিষয়। মাগরিব অঞ্চলসহ উত্তর আফ্রিকায় তাদের নীতি আসলো ইউরোপের ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোর সাথে বোঝাপড়ার মধ্যদিয়ে। উনিশ শতকের আরব রেনেসাঁ সহ সর্বশেষ সুইস খালের ইস্যুকে পর্যন্ত প্রভাবিত করেছে উনিশ শ পঁয়তাল্লিশ। মিশর সহ পুরা আল জাজাইরে গুণগত পবিরবর্তন হলো। যেটা আগে হয় নাই। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামোগুলোতে নতুন নতুন পরিবর্তন দেখা গেল। দৃশ্যমান ঘটনা হলো ঔপনিবেশিক আইন বাতিল হয়ে আরবের গণতান্ত্রিক পরিবর্তন। উপনিবেশ থেকে বেরিয়ে এসে তাদের পশ্চিমের দেয়া গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় রূপান্তর ঘটল। এরপর শর্তসাপেক্ষে শাসন কাঠামোতে অংশগ্রহণ করলো জাজিরাতুল আরব। স্থানীয় পরিষদগুলোতে মুসলমানরা অংশ নিল। তবে চূড়ান্ত ক্ষমতা তখনো ইউরোপীয়দের হাতেই থেকে যায়।

 

১৯১৯ সনের ফেব্রুয়ারি আইনের মধ্য (উইলসন) দিয়ে জাজিরাতুল আরবে আরব সত্তার রাজনীতিতে প্রত্যক্ষ অনুপ্রবেশের ঘটনা ঐতিহাসিক। এরপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলাফল আকারে ইউরোপীয় তরিকামুক্ত আরব জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রগঠনের সবক আসলো পশ্চিমের তরফে। রাষ্ট্রগঠনের সাথে সাথে বিপুলভাবে আইনি পরিবর্তন ঘটে। এই কথাগুলো মোটামুটি সবাই জানে, কিন্তু বলার কারণ হলো, যে ইতিহাস এখন বিবদমান তার উৎপত্তির ঐতিহাসিক মুহূর্তগুলো সেসময়টাতে তৈরি হয়। ফলে সে জায়গাগুলার দিকে নুকতা না দেয়া হলে আলোচনা আগায়ে নেয়া যাবে না।

 

তবে উত্তর আফ্রিকার পরিবর্তনটা ভিন্ন রকম। সশস্ত্র নীতি থেকে সরিয়ে আসার প্রক্রিয়া তৈরি হয় সেখানে। সশস্ত্র বলতে সাধারণত সেখানকার ঔপনিবেশ বিরোধী তৎপরতাগুলোকে বুঝানো হয়। আরবীতে তাদেরকে উখয়াতুস সিলাহ বলা হতো। ইউরোপীয়দের প্রধান শর্ত ছিল, সশস্ত্র পথ থেকে বেরিয়ে এসে নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করা। এই শর্ত দেয়ার পেছনের কারণ ছিল, নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিতে অংশগ্রহণের কথা বলে গণমানুষের মধ্যে যেকোনো ধরনের অসন্তোষকে প্রতিরোধ করা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, উইলসনের নীতি সেখানে খুব সুবিধাজনক হয়ে ওঠে নাই। অপরদিকে কোনো ধরনের সশস্ত্র তৎপরতাও সক্রিয় হতে পারে নাই। লীগ অব ন্যাশনসের দিক থেকে উইলসনের অবস্থন যেমনই হোক তবে আফ্রোএশিয়ায় ক্ষমতার কাঠামো ছিল ফরাসিদের হাতে। কিন্তু উনিশ শ উনিশের নীতির উপর ভর করে রুজভেল্ট জাতিসংঘ গঠনের মধ্য দিয়ে উত্তর আফ্রিকায় তার পলিসি আরো জটিল এবং কৌশলগত করে তোলে। সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদ জারি করে সেখানে রাজনৈতিকভাবে প্রবেশ করার পথ পরিস্কার করে তোলে রুজভেল্টের নতুন মার্কিন নীতি ও কৌশল। সাম্রাজ্যবাদের ইতিহাস খুবই দ্রুত সেখানে জায়গা করে নিল। আঠারো-উনিশ শতকের যে দাসকরণের ইতিহাস সেই অমানবিক ইতিহাসের ক্ষত আরো গভীর ও বিস্তারিত হয়ে ওঠে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের যুগে।

 

দুই.

ইতিহাসের চলমানতা কখনো পেছনে যায় না। এমনকি ইতিহাসকে দমিয়েও রাখা যায় না। তাকে তার গতির মধ্যেই মোকাবেলা করতে হয়। তার অনিবার্য প্রবণতাগুলো বুঝে ঠিকঠাক প্রতিরোধ চালাতে হয় বাস্তব মুহূর্তগুলোর মধ্যেই। সেখানে থেমে থাকার কোনো সুযোগ নাই। এমনকি চলতে গিয়ে শুধু নিজের পথটাই তৈরি করতে হয়। কিন্তু কর্তৃত্বশীল শক্তির প্রতিক্রিয়া করে কোনো নতুন রাস্তা গড়ে তোলা যায় না। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে উত্তর আফ্রিকায় যে স্বাধীন চৈতন্য জাহির হতে শুরু করল, সেই মুক্তিকামী তৎপরতাগুলো ইতিহাসের অভিমুখ থেকে সরে গিয়ে বিদ্যমান শক্তির প্রতিক্রিয়াশীল ভূমিকায় নিজেদের রাজনীতি খাড়া করল। সেটা আরেক বেদনাদায়ক ইতিহাস। উল্টা সাম্রাজ্যবাদ সেখানে বর্ণবাদী সংস্কৃতির বাতাবরণে ধ্বংসাত্মক চেহারায় হাজির হয়। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা উত্তপ্ত হয়ে ওঠার নানা উপাদান তৈরি করে দেয় তারা। অর্থাৎ মুক্তিকামী শক্তিগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতার চেয়ে নৈতিক মূল্যবোধ অতিমাত্রায় কাজ করে। এইটা দোষের কিছু ছিল না। কিন্তু সমস্যা হলো কোনটা নৈতিক প্রশ্ন, আর কোনটা রাজনৈতিক প্রশ্ন এই ভেদবিচার তারা করতে পারে নাই। ফলে বাস্তবে দেখা গেল আসল সমস্যাই তাদের প্রতিক্রিয়াশীল লড়াইয়ের (যেটাকে তারা  রাজনৈতিক তৎপরতা দাবি করে) মধ্যে হারিয়ে গেল। অথবা ঢাকা পড়ে গেল। সমাধানের রাস্তাটা তারা ভুল পথে তালাশ করার চেষ্টা করছে। এই অবস্থা সেখানকার সংকট আরো বাড়িয়ে তুলল। এ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির শক্তি এক চ্যালেঞ্জিং জায়গায় চলে যায়। এ অবস্থার মধ্যে দুইটা শক্তির প্রকাশ ঘটলো, একটা, প্রগতিশীল পন্থা, দ্বিতীয় হল, আধুনিকতাবাদী পন্থা। কারো মধ্যেই জাতীয় মুক্তি চেতনার প্রকাশ দেখা গেল না। মূলত পশ্চিমা শক্তির প্রশ্নে প্রতিক্রিয়াশীল পথে সবাই হাঁটতে লাগল। তাতে পুঁজির শক্তি আরো বেড়ে গেল। পুঁজি ক্রমাগত ভবিষ্যতমুখি হতে থাকল।

 

এই ঘটনাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সতর্ক থাকার বিষয় ছিল আফ্রাএশিয়ার জাতিসংঘের স্থানীয় তৎপরতাগুলো বুঝতে না পারার ঘটনা। কারণ এই সংস্থাটির নানা প্রক্রিয়া ব্যবহার করে পশ্চিমের পুঁজির শক্তি সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক একইসাথে অর্থনৈতিক ফায়দাগুলো উসুল করে নিয়েছে। জাতিসংঘ সেখানে ছিল একটা নাট্যমঞ্চ। কিন্তু তার কুশিলবরা ছিল পশ্চিম ও ইউরোপের শক্তি। ফলে উত্তর আফ্রিকার জনগণের মুক্তির বাণী এই দুই শক্তির নাট্যমঞ্চে নানা ডায়ালগের আওয়াজের মধ্যেই হারিয়ে যায়। নানা উন্নয়ন কৌশল আর বর্ণবাদী সংস্কৃতির মধ্যে এই নাটক আরো জীবন্ত ও অমানবিক হয়ে ওঠে। সেই খবর পৃথিবীর কয়জনে রেখেছে কে জানে? কিন্তু জানলেও তাতে কী যায় আসে? তাদের স্বাধীনতার স্বপ্ন শুধু পশ্চিমের নীতির মধ্যে তলিয়ে গেল। কিন্তু শাসিত হলো তারাই। আফ্রিকার জনগণ। স্বাধীনতার প্রশ্ন একটা আপদ হয়ে থাকল। আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে স্বাধীনতার প্রশ্নও চলে আসল। কিন্তু আইনের সাথে নৈতিকতার বিষয় আশয় আর থাকল না। এখানকার মানুষ যে মূল্যবোধ ধারণ করে তার সাথে এর সম্পর্কও তখন আইনি হয়ে  গেল। এটা আরো এক অদ্ভূত ঘটনা। ফলে ইতিহাসের বিকাশ যেখানে মানুষের জন্য কিংবা মানুষের বিকাশই ইতিহাসের বিকাশ সেখানে আফ্রোএশিয়ার চিন্তা ও মনস্তাত্ত্বিকতার মধ্যে মানুষের সম্পর্ক এক বিকার হয়ে ওঠে। ইতিহাস সেখানেই থেমে গেল। স্বাধীনতা পর্যন্ত আর যেতে পারল না।

 

দশ বছরের কাজের নকশা ও কৌশল ঠিক করে জাতিসংঘ সেখানে পৌঁছায়। ইতিমধ্যে পারমাণবিক শক্তি আমেরিকা ও তার মিত্রদের খোরাক আহরণের জায়গা হয়ে ওঠলো এইসব আফ্রোএয়িার রাষ্ট্র। উত্তর আফ্রিকায় তারা যে পরিস্থিতি তৈরি করল, সেখানে তাদের শক্তি বিস্তারের জন্য মানবিক সংকট একটা বড় অসিলা হয়ে ওঠে। এর মধ্যে সেখানে তারা তাদের রণকৌশলগত দিক ঠিক করে আগাতে থাকল। তার মধ্যে শিল্প-প্রযুক্তির বিকাশ ছিল একটা বড় কৌশল। অর্থনৈতিক দিক থেকে এটা একটা দিক। কিন্তু অর্থনীতির উল্লেখযোগ্য কিছুই হয় নাই। দ্বিতীয়ত ছিল নানা সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়া। এর সরাসরি মাধ্যম ছিল বর্ণবাদ। এতে মনোজাগতিক বিকারগ্রস্ততা ছড়িয়ে দেয়া হয়েছিল সেখানে। মিসিসিপি অঞ্চলের ছোট্র এক গ্রামে জানফি যুবক ইমিট টিল এর হত্যাকান্ডে বড় ধরনের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়। এরকম অসংখ্য দাঙ্গার উদাহরণ দেয়া যাবে।

 

কিন্তু দেখার বিষয় হলো, দাঙ্গার প্রশ্ন ও বিতর্কগুলো নৈতিকতার জায়াগা থেকে দেখার চল শুরু করা হল। তাতে করে তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নৈতিকতার তুমুল আবহে ঢাকা পড়ে যায়। রাজনৈতিক ভাবে প্রশ্ন তোলার কোনো সুযোগই দেয়া হলো না। কারণ বিষয়টি নিছক সামাজিক বিষয় হিসাবে হাজির করা হল এবং এর সমাধানও সেভাবেই হবে। অথচ ঘটনাগুলোতে রাজনৈতিক সম্পর্ক কর্তার ভূমিকায় ছিল। কিন্তু রাজনীতি বা আইনের সম্পর্ককে এই ঘটনাগুলো পর্যন্ত গড়াতে না দেয়ার পেছনেই বড় রাজনীতিটা ছিল। রাজনৈতিকভাবে সমাধান করতে গেলে সমাজে আবার রাজনৈতিক সক্রিয়তা এবং কোনো না কোনো শক্তির রাজনৈতিক হয়ে ওঠার শর্তও তৈরি হয়ে যেতে পারে। তাই সামাজিক অস্থিরতা আর ধর্মীয় যে কোনো অসন্তোষকে সেই সমাজ, ঐতিহ্য বা ধর্মের ভেতরকার মূল্যবোধ দিয়ে সমাধান করার নীতি ঠিক করা হল। তাতে সামাজিক অস্থিরতা আরো ভয়ংকর আকার ধারণ করলো।

 

এখানে যে দশ বছরের কথা আগেই বলা হয়েছে, আফ্রিকার ইতিহাসে সেটা ছিল এক রক্তাক্ত অধ্যায়। শতকের পর শতক আফ্রিকা যে গোলামের জিঞ্জিরে আবদ্ধ ছিল এ সময়টা ছিল তার চেয়েও মারাত্মক অত্যাচার, নিপীড়ন ও ইতিহাসের জঘন্যতম মানবতা বিরোধী অপরাধের। ঔপনিবেশিক আমলের হাইতি, ইন্দোনেশিয়া ও মাদাগাসকারের চেয়েও জঘন্য ছিল উত্তর আফ্রিকার পরিস্থিতি।

 

উনিশ শ পঁয়তাল্লিশ ছিল এই পরিস্থিতির গোড়ার কারণ। ফলে বারবার উনিশ শ পঁয়তাল্লিশের কথা ঘুরে ফিরে আসছে। সাম্রাজ্যবাদের এই ধ্বংস লীলা শুরু হয়ে যায় এই পঁয়তাল্লিশ থেকেই। আর জাতিসংঘ হইল তার আইনি চেহারা। দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদের বিস্ফোরণের কথা অনেকে জানলেও উত্তর আফ্রিকার কথা সবাই বেমালুম ভুলে যায়। তার কারণ উত্তর আফ্রিকার ঘটনা অভ্যন্তরীণভাবেই ব্যবস্থা করে ফেলা হয়। তার খবর আর বাইরে আসতে দেয়া হয় না।

এক পর্যায়ে উত্তর আফ্রিকায় মানসিক রোগ মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ে। অতি অল্প সময়ের মধ্যে হঠাৎ করে ব্রেইনজনিত নানা রোগ ব্যাপক বিস্তার লাভ করে সেখানে। ফোর্টে হারের বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ সহ অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। এটা ছিল সেখানকার জাতীয় স্বাস্থ্য অবস্থার চরম অবনতির সময়। এরকম পরিস্থিতির মধ্যে সেখানে সাদা-কালোর বিরোধ চরম আকার ধারণ করে। সাদারা অতিক্ষুদ্র শ্রেণীর হলেও তারা ছিল সেখানকার নীতি নির্ধারক। আমেরিকার তরফে যেকোনো মূল্যে তাদের রক্ষা করা প্রধান ইস্যু হয়ে ওঠে। এটা ছিল তাদের এক কৃত্রিম এবং পরিকল্পিত প্রক্রিয়া। একদিকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দারিদ্র্য আরেক দিকে বর্ণবাদ এইরকম নানা সংকট তৈরি করে পশ্চিমা দুনিয়া এখান থেকে সীমাহীন প্রাকৃতিক সম্পদ লুট করে নিয়ে গেছে।

 

এই ঘটনা বলে শেষ করা যাবে না। কিন্তু পশ্চিমের রাজনীতির জায়গাটা বুঝা অনেক বেশি জরুরি। তার সাথে তার জ্ঞান, ক্ষমতা ও মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা জড়িয়ে আছে। পশ্চিমের মনস্তত্ত্বই আফ্রোএশিয়ার মনস্তত্ত্ব এবং মানসিক অবস্থা, স্বপ্নময়তা, প্রবণতা আবেগ-উত্তেজনা তৈরি করে। বিবদমান ইতিহাসে এই সত্য এখনো কোনো কোনো আকারে টিকে আছে। মাস্টারদের ইচ্ছাই সেখানে তার ইচ্ছা হয়ে ওঠে। সংগত কারণেই প্রভুর ইচ্ছা সর্বময়। সার্বভৌম। এই সরল বোধ কয়েক শতক ধরে লালন করেছে উত্তর আফ্রিকা। তার মনোজগতের প্রকৃতি, স্বভাব সেভাবেই বেড়ে উঠেছে। সেখানকার ঐতিহ্যগত সমাজ কাঠামো কিংবা যে কোনো নৃতাত্ত্বিক শ্রেণীর মধ্যেও এই একই মনোগঠন নানাভাবে কাজ করেছে। এই যে প্রশ্নাতীত খাপ খাইয়ে নেওয়া, নিজেকে অন্যের মধ্যে তলিয়ে দিয়ে বিকৃত করার প্রক্রিয়া এটা করতে পেরেছে কারণ তার মধ্যে নৈতিকতা আছে, মোহ আছে যাতে, বুদ্ধির কুটিলতা ছিল না, জটিলতা ছিল না। শত্রু জ্ঞান ছিল না। মুহূর্তে আপন করে নেয়া ছিল তার স্বভাব। এই মনস্তাত্ত্বিক উপাদান ইউরোপকে তাদের মনোজগতে শাসন কায়েম করার নিবিড় সুযোগ করে দিয়েছিল। এরপর পশ্চিমের আধুনিক মানুষ এবং তার মহা দুনিয়াদারি তাকে কত পথে কত গলিতে নিয়ে গেল যার কোনো ইয়ত্তা নাই। নাই এই কারণে যে, আধুনিকতাও তাদেরকে নির্মাণ করতে পারে নাই। কারণ আসল কাহিনী হলো, তাদেরকে সভ্যতার গলি দেখাতে আসে নাই প্রভুরা। তার ভেতর থেকে ছিনিয়ে নেয়ার মতো কী আছে, সেই মহাপর্যটনে আসে তারা। পর্যটনে এসে তো তারা জায়গীর কায়েম করলো। এরপর নতুন কারবারি শুরু করে দিল। তারপরের আফ্রিকার আর কী ইতিহাস? ইতিহাস ছিল না। শুধু দাস আর দাস। ইতিহাস নাই মানুষ নাই। এখন যে সময় এসেছে, মানে, এই জাতিসংঘের যুগ। কিংবা সাম্রাজ্যবাদের যুগ এটা আগের  চাইতে আরেক ধাপ আগানো। আরো ভয়ংকর। ইতিহাস ছিল না কথাটার মানে হলো, কারণ ইতিহাস সেখানে এক জড় পদার্থ। নৈতিক কিংবা সাংস্কৃতিক সব দিক থেকেই এক স্থবিরতার কালপর্ব মাত্র। আর কিছুই না। তবে তাদের একটা অসাধারণ ইতিহাস আছে, সাম্রাজ্যবাদের অন্ধকার দাগ আর গভীরতা বয়ে নিয়ে তারা যে জীবন্ত হয়ে আছে সেই ইতিহাস। এক বেকার সময়ের মধ্যে তাদের সমস্ত ঘটনা, কর্মকাণ্ড একই জায়গায় ঘুরপাক খায়।

১৯৫২ সালের দিকে সেখানে কিছু উন্নয়ন প্রকল্প যথেষ্ঠ পরিমাণ তৎপর ছিল। ইউরোপ-আমেরিকার শক্তিগুলো সেখানে এই তৎপরতাকে দৃশ্যত এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করলো। তাদের সে সময় শ্লোগান ছিল “সামনে চলো, এগিয়ে যাও, সামনে  চলো, এগিয়ে যাও”। একপর্যায়ে এই এগিয়ে চলার লাগামটাও ঠিক সময় মতো টেনে ধরে তারা। এ সময়টায় তখন আমেরিকা-ইউরোপ ছাড়াও আরবের কোনো কোনো দেশ (সিরিয়া) ব্যাপক পেট্রোল প্রকল্প বাস্তবায়ন করে।

 

আমেরিকার বিশ্বশক্তি হয়ে ওঠার শুরুর পর্বে উত্তর আফ্রিকার হাল হকিকত সম্পর্কে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হল, আমেরিকা-ইউরোপের নির্দেশিত ১৯৪৭ সালের আলজাজায়েরের যে সংবিধান ছিল সেটা স্থগিত হয়ে যায়। ১৯৫৪ সালের নভেম্বরের প্রথম দিকে সেখানে স্বাধীনতা আন্দোলনের মুখে সংবিধান বলবৎ করা সম্ভব হয় নাই। সেসময় জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় বিভিন্ন উপনিবেশের স্বায়ত্বশাসন এবং আগের সংবিধান পরিবর্তন বিষয়ক নানান ঘটনা ঘটতে দেখা যায়।