অনুবাদ

আজকের দিনে দুনিয়া চালায় কে?
আজকের দিনে দুনিয়া চালায় কে?
২৮ জানুয়ারি ২০১৬

ইব্রাহিম কালিন

(তুর্কি প্রধানমন্ত্রীর সিনিয়র এ্যাডভাইজার ও এ্যাসোসিয়েট ফেলো প্রিন্স আলওয়ালিদ সেন্টার ফর মুসলিম ক্রিশ্চিয়ান আন্ডার্স্ট্যান্ডিং, জর্জটাউন ইউনিভার্সিটি) 

 

নতুন বছরটা বিশ্বের জন্য ভাল কোন বার্তা নিয়ে আসে নি। ২০১৫ সালের বিশ্বব্যাপী হাঙ্গামা এবং আঞ্চলিক বিশৃঙ্খলাগুলো ২০১৬-তেও অব্যাহত থাকতে দেখা যাচ্ছে। বিশ্ব পর্যায় থেকে শুরু করে আঞ্চলিক পর্যায় পর্যন্ত ক্ষমতার একটা নির্দিষ্ট মাত্রার সাম্য অর্জিত না হলে চলমান দ্বন্দ্বগুলোকে আমরা আরও গভীর হতে দেখব এবং সম্ভবত আরও নতুন দ্বন্দ্বের আবির্ভাবও দেখব। বৈশ্বিক এবং আঞ্চলিক ক্ষমতাগুলোর একটা প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে আসন্ন মাসগুলোর ঘটনাচক্র রূপায়ন করা। এবং এটা শুরু হয়েছে সিরিয়ার সংকটের মধ্য দিয়ে।

 

সিরিয়ার অব্যাহত যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্য এবং এর বাইরের অঞ্চলগুলোর শান্তি এবং স্থিতিশীলতার জন্য ভয়াবহ পরিণতি সৃষ্টি করছে। ইউরোপের তীরে পৌঁছে যাওয়া শরণার্থী সংকট নিরসন করা তুর্কী এবং ইউরোপের জন্য কঠিন কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০১৫ সালের ২ সেপ্টেম্বর আয়লান কুর্দীর ডুবে যাওয়ার ঘটনাটি সারা পৃথিবীতে প্রধান শিরোনাম হওয়ার সময় থেকে শতশত সিরিয়ান শরণার্থী এজিয়ান সাগর পেরিয়ে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে তাদের প্রাণ হারিয়েছে। মিডিয়ার প্রতারণা থেমে গিয়েছে কিন্তু এজিয়ান এবং ভূমধ্যসাগরের শীতল পানিতে শরণার্থীদের ডুবে মরা অব্যাহত আছে।

 

সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা কমার কোন লক্ষণ নেই। ক্রিমিন্যাল বাশার আসাদের শাসন টিকিয়ে রাখার জন্য ইরান-সমর্থিত সামরিক গোষ্ঠীর সাথে রাশিয়ান-ইরানি-সিরিয়ান শক্তি ইরাক এবং লেবাননে বিপন্ন অবস্থা সৃষ্টি করে যাচ্ছে। সিরিয়া এবং এর পার্শ্ববর্তী দ্বীপ অঞ্চলগুলোর জন্য এটি সর্বনাশা পরিণতি তৈরি করছে। জেনেভা ১ ও ২ এবং ভিয়েনা আলোচনার কাঠামোর মধ্যে সিরিয়ায় একটি রাজনৈতিক পরিবর্তন আনতে জাতিসংঘ রেজ্যুল্যুশন ২২৫৪-এর জন্য একটি সুযোগ আছে। কিন্তু সিরিয়ায় রাশিয়ান-ইরানি সেনা কার্যক্রম এই অতীব-প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়াটিকে লাইনচ্যুত করতে পারে।

 

সিরিয়ায় শান্তির শেষ আশাটুকু ধ্বংস করা থেকে রাশিয়া এবং ইরানকে প্রতিহত করার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করা উচিৎ। দায়েশের সাথে যুদ্ধ করার ফাঁকা বুলিতে বোকা হওয়া যাবে না, যেহেতু আসলে সিরিয়ার অভ্যন্তরে রাশিয়ান কিংবা ইরানি সামরিক অভিযানের কোনটিই দায়েশকে টার্গেট করে হয় না, বরং লক্ষ্য থাকে সিরিয়ার বিরোধী দল এবং জনসাধারণের উপর।

 

অন্য সবগুলোর মধ্যে সিরিয়ার দ্বন্দ্বটি বর্তমান বৈশ্বিক অবস্থার ভঙ্গুর প্রকৃতির প্রতীক স্বরূপ। এটা এমন একটা বিশৃঙ্খল অবস্থা যা ক্ষমতা, বিচার, এবং বৈধতার সুস্পষ্ট সংজ্ঞার অভাবে ভুগছে। কতখানি ক্ষমতা, কতটা সুষ্ঠু এবং কতটা বৈধ – এসব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন যা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে ক্ষমতার ব্যবহার এবং অপব্যবহারের সীমা নির্ধারণ করে। বর্তমান ক্ষমতার লড়াই বৈধতা, নীতি বা এমনকি বাস্তবধর্মিতাকেও হারিয়ে ফেলেছে।

 

যেমনটা আগে আলোচনা করেছি, “ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ৩০ বছর ব্যাপী চলা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৬৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলার ওয়েস্টফ্যালিয়ান সিস্টেম ছিল দু’টি সাধারণ অথচ গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতির উপর ভিত্তি করে: ইউরোপের সার্বভৌম দেশগুলো একে অন্যের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত থাকবে, এবং সাধারণভাবে গ্রহণযোগ্য ক্ষমতার একটা সাম্যাবস্থা রাষ্ট্রগুলোর মাত্রাতিরিক্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে দমন করবে।”

 

তত্ত্বীয়ভাবে এই দু’টি মূলনীতি যেকোনো সুষ্ঠু এবং স্থিতিশীল বৈশ্বিক শৃঙ্খলার মেরুদণ্ড হওয়া উচিৎ। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। ১৭শ শতক থেকে ইউরোপীয় দেশগুলো এবং রাশিয়া দু’টি বিশ্বযুদ্ধসহ অনেকগুলো রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ করেছে। ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে অটোম্যান সাম্রাজ্যকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে টেনে আনা হয়েছিল, যেখানে কল্পনা প্রসারিত করেও হস্তক্ষেপ না করার মূলনীতি কিংবা ক্ষমতার উচ্চাকাঙ্ক্ষা দমন - কোনটাই লক্ষ্য করা যায় নি।

 

এ ব্যাপারটার মূল হল ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতার প্রশ্ন, অর্থাৎ, এই বোধ যে কিছু দেশের ক্ষমতা আছে মাত্রাতিরিক্ত এবং তারা এর অপব্যবহার করে, এবং অন্যদিকে কিছু দেশের ক্ষমতা খুবই সীমিত এবং প্রক্সি যুদ্ধের মাধ্যমে তারা এর জন্য প্রস্তুত হয়। এই জায়গাতেই কিছু জাতিরাষ্ট্র নিজেদেরকে তাদের প্রভাবের প্রাকৃতিক সীমা অতিক্রম করার মত যথেষ্ট ক্ষমতাশালী হিসেবে দেখে।  

 

কিন্তু সেখানে আরও কিছু ফ্যাক্টর কাজ করে। ইউক্রেন এবং সিরিয়ায় রাশিয়ার মনোভাব একদিকে “আমার সাত খুন মাফ করতে হবে” এমন, এবং অন্যদিকে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি। পরমাণু আলোচনায় সাফল্য এবং সিরিয়া, ইরাক ও লেবাননে অনুগত কর্মীদের উত্থানে সাহসী হয়ে ইরান অনুরূপ আক্রমণাত্মক রূপ দেখাচ্ছে, যেখানে শিয়া সম্প্রদায়ের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে মুসলিম বিশ্বে সে নিজেই তার অবস্থান খুঁজে বেড়াচ্ছে। বলা বাহুল্য, এতে সৌদি আরবের মত অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রের দিক থেকে প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে, যারা ইরানের অনধিকার চর্চাকে বিধ্বংসী এবং অস্থিতিশীল হিসেবে দেখে।   

 

রাশিয়ান-ইরানি-সিরিয়ান এই চক্রটি ওবামা প্রশাসনের “মিশো কিন্তু ঘাঁটিয়ো না” নীতির দ্বারা সৃষ্ট ক্ষমতার শূন্যস্থানকে নিপুণভাবে কাজে লাগাচ্ছে। বিগত বছর সিরিয়ার যুদ্ধ থেকে এর আবির্ভাব হয়েছে কিন্তু এখন এটা সারা মধ্যপ্রাচ্যে গুরুতর ক্ষতি করছে। এই এলাকায় ক্ষমতার একটা ন্যূনতম মাত্রার ভারসাম্যে পৌঁছাতে এই সংকট নিয়ে আরও বহুদূর যেতে হবে।

 

বৈশ্বিক শৃঙ্খলার জন্য ক্ষমতার একটা সুষ্ঠু এবং বৈধ বণ্টন প্রয়োজন যেখানে বিভিন্ন মাত্রার ক্ষমতাসম্পন্ন জাতিরাষ্ট্র কেউ বেপরোয়া হওয়ারও সাহস পাবে না, আবার ঘরে আগুন লাগার মত এতটা নিরাপত্তাহীনতাও অনুভব করবে না। এটা কারো জন্যই কল্যাণ বয়ে আনবে না।

 

 

কাজী রুহুল্লাহ শাহরিয়ার