অনুবাদ

আরব বসন্তের সমাপ্তি, দায়েশ/ISIL এর উত্থান ও আগামীদিনের ইসলামের রাজনীতি (২য় পর্ব)
আরব বসন্তের সমাপ্তি, দায়েশ/ISIL এর উত্থান ও আগামীদিনের ইসলামের রাজনীতি (২য় পর্ব)
অনুবাদ করেছেন পাঠচক্র ডেস্ক
২৪ ডিসেম্বর ২০১৫

পড়ুনঃ প্রথম পর্ব

প্রফেসর খালেদ আবু আল ফাদল

(ড খালেদ আবু আল ফাদল উমার ও আজমেরালডা আলফি ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর অফ ইসলামিক ল, ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া লস এঞ্জেলস স্কুল অফ ল। তিনি  ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া লস এঞ্জেলস এর ইসলামিক স্টাডিজ ডিপার্টমেন্ট এর ও চেয়ার। )

ক্ষমতাকে কুক্ষিগত রাখতে ও বৈধতা দিতে ইসলাম, ইসলামী বিধিবিধান, এবং ইসলামী পরিভাষাগুলো আরব রাষ্ট্রসমূহে খুব ভালোভাবেই ব্যবহার করা হয়। এ উদ্দেশ্যেই রক্ষনশীল অভিজাত শোষকশ্রেণি প্রতিনিয়তই ধর্মের যথেচ্ছ ব্যবহার করে আসছে। তাদের এ অবস্থানকে বৈধতা দেয়ার জন্য রক্ষাকবচ হিসেবে কিছু ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব ও প্রতিষ্ঠানকে তারা সযত্নে লালন করে থাকে। এই উদ্ভট ধার্মিকতা ও বিকৃত ইসলামের লেবাসধারী আরব জাতীয়তাবাদের খোলস থেকে প্রায়শই উগ্র জাতিবিদ্ধেষ ও গোঁড়ামি প্রকাশ পায়। এখানে সামাজিক ও রাজনৈতিক বৈষম্য, কট্টর পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থা, নির্লজ্জ রাজনৈতিক অনাচার ও স্বৈরাচারিতা- সবই ধর্মের দোহাই দিয়ে জায়েজ করে ফেলা হয়েছে। অপরদিকে এরাই ধর্ম ও ধর্মীয় মূল্যবোধকে সতর্কতার সাথে সংজ্ঞায়িত করছে, নিয়ন্ত্রন করছে এবং পরিচালনা করছে। এমনকি সিসির মতো ধর্মনিরপেক্ষতার ধ্বজাধারীও এই কাজ করছেন। আলেম উলামারা কোন ধরণের বক্তব্য দিতে পারবেন তা রাষ্ট্র নির্ধারণ করে দিচ্ছে । এক্ষেত্রে রাষ্ট্রকে সহায়তা করছে আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের বেতনভূক আলেমরা। এসব আলেম সিসির সব কাজের বৈধতা দিচ্ছে এবং সরকারের সব রকমের বিরোধিতা ধর্মীয়ভাবে প্রতিহত করছে। এরই ধারাবাহিকতায় মিশরে বিদ্যমান দাতব্য সঙস্থাগুলো পর্যন্ত রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়েছে এবং দুর্নীতি আর স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে লুটেরাদের কবলে পড়ে গেছে। রাবা’ আল আদাওইয়া মসজিদে সেনাবাহিনী কতৃক ধ্বংসযজ্ঞ (যেখানে প্রায় ৭০০ ব্রাদারহুডের অনুসারীকে একসাথে হত্যা করা হয়) পরিচালনার পূর্বেও সিসি তার পোষা আলেমদেরকে দিয়ে বক্তব্য প্রচার করিয়েছিলেন যে, গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করা ইসলামের নির্দেশ এবং এই লড়াইয়ে তারা যতই হত্যা করুক কিংবা নিজেরা নিহত হোক উভয়ক্ষেত্রেই তারা আল্লাহ্‌র নিকট সম্মানিত হবে।

এসব টাকায় কেনা আলেমদের আরো হাস্যকর কান্ডকীর্তিও আমরা দেখতে পাই। ২০১৪ সালের জুলাই মাসে আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রয়াত সৌদী বাদশাহ আব্দুল্লাহ বিন আব্দুল আজীজকে ‘ইসলামী ধর্মতত্ত্ব ও আইন’ বিষয়ে সম্মানজনক ডক্টরেট ডিগ্রী প্রদান করা হয়। এই আল আজহার হলো সবচেয়ে প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয় যাকে বিবেচনা করা হয় ইসলামের নেতৃত্বদানকারী ধর্মতাত্ত্বিক প্রতিষ্ঠান। সৌদি আরবের স্বনামধন্য মদীনা বিশ্ববিদ্যালয়ও প্রয়াত বাদশাহকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে সম্মানজনক ডক্টরেট ডিগ্রী প্রদান করে। মজার ব্যপার হলো, এই বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের কোন বিভাগই নেই এবং এখান থেকে কখনোই এ বিষয়ে ডিগ্রী প্রদান করা হয়না। সৌদী বাদশাহ ইসলামী ধর্মতত্ত্ব ও আইনে কী এমন বিশাল অবদান রাখলেন যার জন্য এসব সম্মানজনক ডিগ্রী? তিনি কি ইসলামী নৈতিকতা, উদারতা ও ন্যায়পরায়ণতার অনবদ্য দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী কেউ? মোটেই নয়, বরঞ্চ এটি ছিল ধর্মীয় মূল্যবোধ ও নৈতিক শক্তিকে রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন করারই প্রয়াস। সৌদী বাদশাহকে সম্মানজনক ডিগ্রী প্রদান ছিল সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত । এটি ইসলামের অপব্যবহার করে রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির ন্যক্কারজনক দৃষ্টান্ত ছাড়া আর কিছুই নয়।

উপরন্তু সিসি নিজেকে ভাবতে শুরু করেছেন ভিন্ন ধারার এক মুসলিম সংস্কারক। এই নৈরাজ্যকর পরিস্থিতিতে তার তথাকথিত সংস্কারমূলক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য তিনি পাশে পাচ্ছেন বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে কোমায় থাকা আল আজহারের পদলেহী কর্তাব্যক্তিদেরকে। ২০১৫ সালের জানুয়ারীতে আল আজহারে সিসি তার ভাষণে ফক্স নিউজ এবং অন্যান্য সুপরিচিত ইসলামবিদ্ধেষী ভাবগুরুদের বয়ানই আওড়ে গেছেন। তিনি বলেছেন- ১৬০ কোটি মুসলমানের বিশ্বের দুর্দশার উৎস হিসেবে অবস্থান করা থেকে বিরত থাকার এটিই উপযুক্ত সময়। এমন বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি শুধুমাত্র মূলধারার মুসলমানদেরই মর্মেই আঘাত করেননি, বরং এর মাধ্যমে তিনি সাম্রাজ্যবাদী প্রভুদের খাটি দেশীয় এজেন্টের ভূমিকাও পালন করেছেন যার বয়ান ও মূল্যবোধ সম্পূর্ণরূপে গোঁড়া ও জাতিবিদ্ধেষপূর্ণ। এমন করেই তিনি কতৃত্ববাদী শক্তির দাসত্বের বিরুদ্ধে নিজের কোন অবস্থান ব্যক্ত না করে দীর্ঘদিনের প্রভুদের তাবেদারীই বেছে নিলেন। একই বক্তব্যে তিনি তার অনুগত আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তাব্যক্তিদেরকে আহবান করলেন ‘মডারেট ইসলাম’কে সংজ্ঞায়িত করার জন্য। কিন্তু কেমন হবে এই মডারেট ইসলামের রূপ? এর জ্ঞানগত ও দার্শনিক ভিত্তিই বা কী? সম্ভবত পশ্চিমা সামরিক শক্তি ও তেল বণিক শেখতন্ত্রের বিরোধী সব ধরনের ইসলামী আচার-নীতির বহিপ্রকাশকেই ‘রাজনৈতিক ইসলাম’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হবে। সৌদী বাদশাহকে ডিগ্রী প্রদান থেকে শুরু করে সিসির দমন-পীড়নমূলক সমস্ত কার্যক্রম এই বার্তাই কিন্তু দিয়ে যাচ্ছে। দুবাই, সৌদী আরব কিংবা সিসি নিয়ন্ত্রিত আজকের মিশর যে সমাজ বাস্তবতার দৃষ্টান্ত পেশ করছে তা আধুনিক সময়ের নিকৃষ্টতম পুলিশী রাষ্ট্রেই শুধু সম্ভব।

এসব থেকে সহজেই অনুমান করা যায়, তাদের কাংখিত ‘মডারেট ইসলাম’ এর স্বরূপ কী, এর মূলসূত্র কী? সম্ভবত এর মূলসূত্র হলো, রাষ্ট্র পরিচালিত এবং রাষ্ট্র কতৃক সংজ্ঞায়িত ইসলাম এবং সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক স্বার্থে রূপায়িত ইসলাম। ওহাবী নিয়ন্ত্রিত ধর্মরাষ্ট্রও হতে পারে মডারেট ইসলামের একটি রূপ, যা পুরোপুরিই স্বৈরাচারী, কতৃত্বপরায়ন, শোষনকারী, অত্যাচারী, কট্টর পুরুষতান্ত্রিক, অসহিষ্ণু ও স্বেচ্ছাচারী। আর এসব রাষ্ট্রের রাজনীতি মূলত পশ্চিমা প্রেসক্রিপশানে পরিচালিত যেখানে স্বদেশী জনগনই সমস্ত ভোগান্তির শিকার। মডারেট ইসলাম এর এহেন অস্পষ্ট ও অনিশ্চিত সংজ্ঞায়ন যদি কাউকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে আক্রমণ করার জন্যই হয় তবে ‘রাজনৈতিক ইসলাম’ এর মতবাদ ও এর তথাকথিত হুমকির বিরুদ্ধে এই ‘মডারেট ইসলাম’ এর আচরণ কেমন হবে তা সহজেই অনুমেয়ে।

সিসি, আল-আজহার, সৌদি আরব ও তাদের মিত্রদের নিকট গ্রহনযোগ্য ‘রাজনৈতিক ইসলাম’ অনুসারে রাষ্ট্রই হলো খোদা। এখানে রাষ্ট্রই জনসাধারণের জন্য ধর্মের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নিয়ে নেয়। এরা ভালো ধার্মিকতা নির্ণয় করে দেয় আর বিরোধীতা করে খারাপ ধার্মিকতার। খোদা কী চান এবং কী চান না -এরাই আমাদেরকে পরিবেশন করে। সুতরাং রাষ্ট্রের অনুগত থাকা নৈতিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব এবং রাষ্ট্রের ইচ্ছার কাছে নিজেকে সঁপে দেয়া বিরাট মহত্ত্ব। আর হ্যা, এসব কথা শুধুমাত্র তাদের মতো দেশগুলোর জন্যই প্রযোজ্য। শিয়া অধ্যূষিত, ইরানের অনুগত, ইসরাঈল বিরোধী কিংবা পশ্চিমা স্বার্থবিরোধী কোন দেশের ক্ষেত্রে হলে অবাধ্যতা ও বিদ্রোহই হলো নৈতিক দায়িত্ব ও গুণ।

‘রাজনৈতিক ইসলাম’ এসব রাষ্ট্রে সঠিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত হলেও তা হয়ে যায় সন্ত্রাসবাদ কিংবা নৈরাজ্য সৃষ্টির পায়তারা। আবার ভ্রান্ত মানুষ দ্বারা ভুল উদ্দেশ্যে পরিচালিত হলে তা হয়ে যায় আইনবিরুদ্ধ এবং নীরিহ জনসাধারণের সাথে সহিংসতার মতো অনৈতিক আচরণ। তাই বলা চলে পশ্চিমা সামরিক শক্তি ও তেল ব্যবসায়ী শেখতন্ত্রের বিরোধী সব ধরনের ইসলামী আচার-নীতির বহিপ্রকাশই ‘রাজনৈতিক ইসলাম’। আরেকটু সরাসরি যদি বলা হয়, ‘রাজনৈতিক ইসলাম’ হলো সেই ঘোষণা ও কার্যক্রম যা ক্ষমতার মসনদ আকড়ে ধরা লোকগুলো ও তাদের অধিকৃত অবৈধ সুযোগ সুবিধাদির বিরুদ্ধে লড়াই করে। আমরা যদি সততার সাথে বিবেচনা করি একথা স্বীকৃতি দিতে সবাই বাধ্য যে ‘রাজনৈতিক ইসলাম’ এর ধারণাটিই সম্পূর্ণরূপে ইসলামের সাথে অসংগতিপূর্ণ এবং অযৌক্তিক**। মানব সভ্যতা-সংস্কৃতি বিনির্মাণের প্রাথমিক উপাদানই হলো এমন তত্ত্ব ও বয়ান যার মাঝে সততা সুসম্বন্ধভাবে গ্রথিত। কিন্তু সমস্যা হলো ‘রাজনৈতিক ইসলাম’ হিসাবে চিহ্নিতকরণ প্রক্রিয়াটি চূড়ান্তরূপে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচেষ্টা এবং অধিকাংশক্ষেত্রেই মিথ্যে প্রহেলিকার নাম ।

**(মানুষের সার্বিক কল্যাণের নিমিত্তে সর্বোত্তম ঐশী ব্যবস্থাপনার সামগ্রিক রূপের নামই ইসলাম। সুতরাং ‘রাজনৈতিক ইসলাম’ বলে আলাদা কিছুর অস্তিত্ব প্রমাণ করার কোন সারবত্তা নেই।-অনুবাদক)

 

পাঠচক্র ডেস্ক