অনুবাদ

আরব বসন্তের সমাপ্তি, দায়েশ/ISIL এর উত্থান ও আগামীদিনের ইসলামের রাজনীতি (৩য় পর্ব)
আরব বসন্তের সমাপ্তি, দায়েশ/ISIL এর উত্থান ও আগামীদিনের ইসলামের রাজনীতি (৩য় পর্ব)
অনুবাদ করেছেন পাঠচক্র ডেস্ক
২৮ জানুয়ারি ২০১৬

প্রফেসর খালেদ আবু আল ফাদল

(ড খালেদ আবু আল ফাদল উমার ও আজমেরালডা আলফি ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর অফ ইসলামিক ল, ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া লস এঞ্জেলস স্কুল অফ ল। তিনি  ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া লস এঞ্জেলস এর ইসলামিক স্টাডিজ ডিপার্টমেন্ট এর ও চেয়ার।)

আমি যখন প্রথম আমেরিকা ভ্রমণ করি, তখন প্রথম একটি কথার সাথে পরিচিত হই, যা পরবর্তী ৩০ বছর মানুষকে সম্মোহিত করে রাখে। সেই কথাটি ছিলো-  “ইসরায়েলই মধ্যপ্রাচ্যের একমাত্র গনতন্ত্রের উদাহরণ”। ব্যাপারটি আমাকে খুব চমতকৃত করত যে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলই  শুধুমাত্র পশ্চিমা বিশ্বের দ্ব্যার্থহীন সমর্থন পেয়ে আসছে,  অথচ তা পশ্চিমা বিশ্বের বাইরে অবস্থিত, ভিতরে নয়।

ইসরায়েল কিভাবে নিজেকে চিহ্নিত করে কিংবা ইসরায়েলকে  সাদা জুডায়ো-ক্রিশ্চান বা প্রচলিত জুডায়ো-ক্রিশ্চান সভ্যতার অংশ হিসেবে দেখা হলো কিনা এসব কিভাবে পশ্চিমা উদ্বেগ নিরসন করে? অপরদিকে রাজনৈতিক ইসলামই কেমন করে পশ্চিমা বিশ্বের এত উদ্বেগের কারণ হল যে তারা এর মাধ্যমে ইসলামী সভ্যতার আবির্ভাবের  হুমকি অনুভব করছে?

ইসরায়েলে রাজনৈতিক যায়নবাদী প্রসার অব্যহত। ধর্মীয় দল, এমনকি প্রচন্ড উগ্রপন্থী বা চরমপন্থীরাও নির্বাচনে অংশ নেয়, নেসেটে সিট লাভ করে, এমনকি জোটবদ্ধ হয়ে অন্য দলের সাথে সরকারও গঠন করে। এই ধর্মীয় দলগুলোর নিজস্ব পাবলিকেশন আছে, মিডিয়া রয়েছে এবং ইসরায়েলের আইন বিভাগে এদের প্রভাব অনস্বীকার্য। ইসরায়েলের কোন লিখিত সংবিধান নাই, সেক্যুলার ভাবধারার সুপ্রীয় কোর্ট বিচারপতিরাই সংবিধানের ব্যাখ্যা নির্ধারণ করেন। কিন্তু ১৯৪৮ সালের আগে ও পরে, ইসরায়েলের ভেতরে ও বাইরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মাননির্ধারক ভিত্তি ও নৈতিক প্রেষণা হিসেবে কাজ করে।

 

একইভাবে ৫০টিরও বেশী খ্রিস্টান রাজনৈতিক দল কাজ করছে ইউরোপ, আফ্রিকা, সাউথ আমেরিকা এবং এশিয়া। এর মধ্যে কানাডার ক্রিস্টিয়ান হেরিটেজ পার্টি, ইউকের দা ক্রিস্টিয়ান পিউপলস অ্যালায়েন্স, ইউক্রেনের দা ক্রিস্টিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন, ইন্দোনেশিয়ার ক্রিস্টিয়ান ডেমোক্রেটিক পার্টি, আলবেনিয়ার দা আলবেনিয়ান ক্রিস্টিয়ান ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট অন্যতম। অস্ট্রেলিয়ার রয়েছে নিজস্ব ক্রিস্টিয়ান ডেমোক্রেটিক পার্টি। প্রত্যেকটি দলই খ্রিস্ট ও ইহুদী পরিচয় ও তার ব্যাখ্যার উপর ভিত্তি করে গঠিত। কিন্তু তাদের কোন দলই নিজেদেরকে ইহুদীবাদ কিংবা খ্রীষ্টবাদের ধারক দাবি করে কথা বলার সাহস করেনা। অপরদিকে আমরা সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র দেখতে পাই সৌদী আরব, সিসি, আল-আজহার কতৃপক্ষ কিংবা আই.এস.আই.এস ক্ষেত্রে। এদের প্রত্যেকে নিজেদেরকেই ইসলামের একমাত্র ধারক বাহক মনে করে এবং অন্যদেরকে বাতিল ভ্রান্ত বলে ঘোষণা করে।

প্রকৃত ইসলামের বিবাদমান নানান গ্রুপের বক্তব্যকে গ্রহণ না করেই পশ্চিমারা তাদের বিরোধী শক্তির ব্যপারে নিজেদের মনগড়া ভাষ্য তৈরী করেছে। অর্থাৎ ইসলামের ব্যপারে তারা নিজেদের বিচার বুদ্ধি খাটিয়ে যা ভালো মনে করেছে তা-ই বলছে, যা হয়তো ইসলামের বক্তব্যই নয়। হ্যা, এটিই হলো ‘রাজনৈতিক ইসলাম’ এর মতো পরিভাষাগুলো তৈরি হবার নেপথ্য কথা। সন্ত্রাস কিংবা পর্ণোগ্রাফিকে আমরা যেভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারি, ‘রাজনৈতিক ইসলাম’কে আমরা সেই প্রক্রিয়ায় সংজ্ঞায়িত করতে পারিনা। কিন্তু হ্যা, আমরা জানতে পারি এর প্রকাশ ঘটলেই। এজন্যই আমরা তথাকথিত পন্ডিতদেরকে ISIS এর পর্যালোচনা করতে দেখি এবং গোপন স্বস্থির নিঃশ্বাস ফেলে ঘোষণা করতে দেখি- হায়! এ তো রাজনৈতিক ইসলামেরই প্রকৃত রূপ ।

শুধু তাই নয়, এর মাধ্যমে পশ্চিমা উদ্বেগ কিভাবে নানান পরিভাষার উদ্ভবে ভূমিকা রাখে তা সহজেই বোঝা যায়। যেমন রাজনৈতিক ইসলাম, জঙ্গি ইসলাম, মৌলবাদী ইসলাম, জিহাদী ইসলাম এবং উর্ধকমার (‘’) অভ্যন্তরে ঢুকিয়ে ফেলা ইসলামের আরো নানা রূপ। এসবের ফলে আমরাও কেন যেন স্বাচ্ছন্দের সাথে এসব উর্ধকমায় মোড়ানো ইসলাম পছন্দ করি, মুসলিম নয় কিন্তু।

আমাদের একাডেমিক পরিভাষাগুলো থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, ইসলামের ব্যপারে পশ্চিমাদের পূর্ব থেকেই বদ্ধমূল নানা ধারণা, আশংকা ও উদ্বেগের ফলেই এসবের উৎপত্তি। যাইহোক, এ থেকে এটা কিছুতেই বোঝা যায় না যে মুসলিম বিশ্বে সরকারগুলো কেন ‘রাজনৈতিক ইসলাম’ এর মতো পক্ষপাতদুষ্ট বিভিন্ন পরিভাষা আত্তীকরণ করে নিলো। সম্পূর্ণ ভিন্ন সভ্যতার নাগরিক হয়েও তারা যেন নিজেদেরকে পশ্চিমা সভ্যতার অংশ ভাবছে। 

প্রাথমিকভাবে আমাদেরকে এটি স্বীকার করতেই হয় যে উপনিবেশ পরবর্তী অভিজাতগোষ্টী বিদ্যমান সভ্যতার দ্বন্ধকে স্ব স্ব সমাজ সংস্কৃতির প্রেক্ষাপটে বিচার বিশ্লেষণ করেনা বরং তাদের পশ্চিমা অভিভাবক ও রক্ষকদের দৃষ্টিভঙ্গিই অনুসরণ করে থাকে। এবং সে অনুযায়ীই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে যা তাদের জন্য মোটেই অস্বাভাবিক কোন বিষয় নয়। বিশেষ করে  মধ্যপ্রাচ্য ও আরব রাষ্ট্রসমূহের ক্ষেত্রে এ কথা খুবই প্রযোজ্য। নতুনভাবে রাষ্ট্রগঠন প্রক্রিয়া এবং বিগত দুই দশকে নানা ঘটনা পরিক্রমায় আরব দেশগুলো নব্য উপনিবেশবাদী রাষ্ট্র হিসেবেই আবির্ভূত হয়েছে। আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে স্বাধীন হলেও তাদের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বকীয়তা, প্রজ্ঞা কিংবা বিশ্বের নানান বিষয়াবলীর ব্যপারে প্রতিক্রিয়াগুলো অত্যন্ত অগভীর।  অর্থনীতি, প্রযুক্তি, সামরিক শক্তি, পণ্যদ্রব্য, নগরায়ন বিনোদনসহ প্রাত্যাহিক জীবনের সমস্ত অনুষঙ্গের কেন্দ্র হিসেবে অভিজাতগোষ্টীরা তাদের ঔপনিবেশিক শক্তি ও পশ্চিমা বিশ্ব ছাড়া পৃথিবীর অন্য কাউকেই কল্পনা করতে পারেনা।

নিশ্চয়ই আরব দেশসমূহ পশ্চিমা বিশ্বের আবিস্কৃত ও রূপায়িত ‘রাজনৈতিক ইসলাম’ নিয়ে তাদের উদ্বেগের ব্যপারে খুবই সতর্ক। তারা এই পরিভাষাকে আরবীতে ‘আল ইসলাম আস সিয়াসী’ নাম দিয়েছে এবং মুসলিম বিশ্ব প্রসঙ্গে ব্যবহার করছে যেন এটি পরিস্থিতির সাথে খুবই মানানসই ও যথার্থ প্রাসঙ্গিক। যতই ভাবগতভাবে অপূর্ণ ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ  হোক না কেন, আরব বসন্তের আবেগ উদ্দীপনাকে ধুলিস্যাৎ করে দিতে ‘রাজনৈতিক ইসলাম’ শব্দটি ব্যপকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে।

তাহলে ‘রাজনৈতিক ইসলাম’কে প্রতিহত করতে মিশর ও আরব দেশগুলো কি পশ্চিমা প্রভুদের আরোপিত মিথ্যে উদ্বেগ দ্বারা প্ররোচিত হয়েই কাজ করেছে? আমি মনে করি, সোভিয়েত শক্তির পতনের পর এটি অন্যতম একটি পরিস্থিতি যেখানে মিশর ও আরব দেশগুলো পশ্চিমা বিশ্বকে পথ দেখিয়েছে।

খোলাখুলিভাবে বলা যায় ‘আতঙ্কজনক ইসলাম’ পশ্চিমা ভাবধারার অভিজাতগোষ্টীর পক্ষে খুবই কার্যকর ভূমিকা পালন করেছে। বিশেষ করে আমেরিকা ও ব্রিটেনের সাথে দেন দরবারের সময় মিশরের সামরিক শক্তি ও আরব অভিজাত শ্রেণি এই ন্যরেটিভ ভালভাবেই প্রয়োগ করেছে যার ফলে দুটি মন্দের মধ্যে কম মন্দটিকে প্রতিষ্ঠিত ও সহযোগিতা সুপ্রাচীন রাজনৈতিক বাস্তবতাও গুরুত্ব পেয়েছে। তাদের এই অবস্থান আবশ্যকভাবেই এই কথা বলে যে- ‘হ্যা, আমরা খারাপ হতে পারি কিন্তু বিকল্প শক্তিটি আরো জঘন্য’।

কিন্তু পুরোপুরি কার্যকর করার জন্য এবং পশ্চিমা নীতিবোধ, মানবতাবাদী গোষ্ঠীর আদর্শিক চ্যলেঞ্জ ও নাগরিক মূল্যবোধের মোকাবেলায় এই দলটিকে অনেক কাজ করতে হয়েছে। অসভ্য বর্বরগোষ্ঠীর ব্যপারে পশ্চিমাদের পূর্বধারণা, আবেগ-অনুভূতি আর উদ্বেগ-আশংকাকে মাথায় রেখেই এরা কার্যোদ্ধারে লিপ্ত হয়েছে। এরই সাথে এদেরকে সিসি ও সৌদী সরকারের মতো নির্লজ্জ স্বৈরতান্ত্রিক গোষ্ঠীর অবস্থানকে সুসংহত করতে হয়েছে অজানা শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কৌশলগত মৈত্রীর জন্য।

সৌদী ইন্টিলিজেন্স ও তার মিত্রশক্তির পৃষ্টপোষকতায় যে আজকের ISIS এর উত্থান তার প্রমাণাদি দিনদিন আরো সুস্পষ্ট হচ্ছে, যাতে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছেন প্রিন্স সুলতান বিন বন্দর। ২০১১ সালে সৌদী আরবকে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হয়েছে। তাদের স্বৈরতান্ত্রিক মিত্রপক্ষ তিউনিসিয়া ও মিশর ক্ষমতাচ্যূত হলো এবং লিবিয়াতে গাদ্দাফীকে খুন করা হল। ইয়েমেন, বাহরাইন ও সিরিয়াতে স্থবিরতা বিরাজ করছিলো এবং পরবর্তীতে কোন স্বৈরগোষ্ঠীটি চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হবে তা নিয়ে সুনির্দিষ্টভাবে ব্যাপক মতামত ছিল।

বাহরাইনে সেনাবাহিনী ব্যবহার করে জনপ্রিয় আন্দোলনকে প্রতিহত করার পর সৌদী আরব ও তার মিত্রদের হোয়াইট হাউজকে বোঝানো অত্যাবশ্যক হয়ে পড়লো যে, মিশরে পুরনো শাসন ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য সামরিক অভ্যুত্থান খুবই জরুরী। উল্লেখ্য যে, প্রিন্স বন্দরই মধ্যপ্রাচ্যে যথার্থ গুরুত্ববহ হুমকি ও আশংকাজনক পরিস্থিতি তৈরীতে ভূমিকা নিয়েছেন যেন অনাগ্রহী আমেরিকান প্রশাসনকে দুইটি বিষয় ভালোভাবে অবগত করানো যায়। প্রথমত, আরব বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে জনপ্রিয় ইসলামী বিপ্লবের চ্যলেঞ্জ। দ্বিতীয়ত, অত্র অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া বিপ্লবের উদ্দীপনাকে প্রতিহত করতে এবং সৌদী শাসন হুমকীর মুখে পড়লে আমেরিকার সশস্ত্র হস্তক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা।

সৌদী আরব ও তার মিত্ররা ভালোভাবেই জানে যে, আমেরিকার সামরিক শক্তিকে ময়দানে সরাসরি পেতে হলে তাদের শক্তিশালী রাজনৈতিক ও সামাজিক বাধ্যবাধকতা পেরিয়ে আসতে হবে। এবং এই বৈতরণী একমাত্র তবেই পার হওয়া সম্ভব যদি তথাকথিত রাজনৈতিক ইসলামের একটি ভয়াবহ চিত্র উপস্থাপন করা যায় এবং যার ফলশ্রুতিতে অশুভ শক্তিকে হঠিয়ে দেয়ার জন্য সাদা জুডো-খ্রীষ্টান সভ্যতা নিজেদের প্রবাদপ্রতিম সূর্যসন্তানদেরকে অকাতরে উৎসর্গ করবে।

এটি কোন দুর্ঘটনা নয় যে ISIS নেতা আবু বকর বাগদাদীর মতো ভুঁইফোড় এক লোক হলিউডী স্টাইলে নিজেকে খলীফা ঘোষণা করেছে। এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে পশ্চিমাদের কল্পনায় একজন খলীফার অনুগত ঐক্যবদ্ধ মুসলিম গোষ্ঠীকে দৈত্যদানোর মতো উপস্থাপন করে ফায়দা নেয়ার চেয়ে উত্তম কোন উপায় আর নেই। ত্রিশের দশকে ওয়াহাবী-ইখওয়ান আন্দোলনের ফলে ISIS এর জুয়াখেলা উল্টো ফলাফল বয়ে এনেছে। এবং এতে সৌদী আরব ও তার মিত্রশক্তির কাছে নিজেদের তৈরী অপশক্তিটি বড় হুমকী হিসেবে আবির্ভূত হল।

হোয়াইট হাউজ বাস্তব কারণে যদিও ইরাকে হামলা করতে বাধ্য হয়েছিল কিন্তু সৌদী ও তার মিত্রদের জন্য হতাশাজনকভাবে সত্য কথা হলো হোয়াইট হাউজ পুণরায় ইরাকে তাদের সৈন্য প্রেরণ করতে একেবারে অনাগ্রহী। উল্লেখ্য যে, বিমান হামলা শুরু এবং ISIS এর বিরুদ্ধে গোপন অভিযান পরিচালনার প্রত্যুত্তরে প্রিন্স বন্দরকে প্রত্যাহার ও নির্বাসন দেয়া চুক্তির একটি শর্ত ছিলো।

 

 

 

পাঠচক্র ডেস্ক