অনুবাদ

ইন্তিফাদার প্রথম পাঠ
ইন্তিফাদার প্রথম পাঠ
অনুবাদ করেছেন উদয় তাসমির
১১ সেপ্টেম্বর ২০১৫

ইন্তিফাদা একটি আরবি শব্দ।যার শাব্দিক অর্থ ‘প্রকম্পিত করা’, ‘জেগে ওঠা’ বা ‘বিদ্রোহ করা’।তবে ব্যবহারিক অর্থে ইন্তিফাদা বলতে বুঝায় প্যালেস্টাইনের পশ্চিম তীর ও গাজা উপত্যকায় ইসরাইলী দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে দুটি বৃহৎ বেসামরিক গণবিদ্রোহকে।

প্রথম ইন্তিফাদাটি সংগঠিত হয় ১৯৮৭ সালের শেষের দিকে।গাজা উপত্যকায় কাজ শেষে ফিরে যাওয়ার জন্য অপেক্ষমাণ প্যালেস্টাইনি শ্রমিকদের বহনকারী এক সারি গাড়ির সাথে ইসরাইলী বাহিনীর একটি লরির সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে চার প্যালেসটাইনি শ্রমিকের নির্মম মৃত্যু ঘটে।উপস্থিত সবাই সংঘর্ষের ক্ষিপ্রতা ও ভয়াবহতা প্রত্যক্ষ করে,হয় প্রথম ইন্তিফাদার সূত্রপাত।দ্বিতীয় ইন্তিফাদাটি সংগঠিত হয় ২০০০ সালের সেপ্টেম্বরে, ইসরাইলী প্রধানমন্ত্রী এরিয়েল শ্যারন কর্তৃক একহাজার পুলিশ সদস্য নিয়ে আল-আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণে উস্কানিমুলক উপস্থিতির মাধ্যমে।

প্রথম ইন্তিফাদাঃ

আরবি শব্দ ইন্তিফাদার অর্থ হলো গণবিদ্রোহ বা বেসামরিক বিদ্রোহ যার আক্ষরিক অর্থ করলে দাড়ায় ‘প্রকম্পিত করা’।

প্রথম ইন্তিফাদাটি ছিল পশ্চিম তীর,গাজা উপত্যকা ও পূর্ব জেরুজালেম এ ইসরাইলী দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে একটি অরাজনৈতিক বেসামরিক গণবিদ্রোহ।এটি শুরু হয় ৯ই ডিসেম্বর ১৯৮৭ সালে গাজা উপত্যকায় জাবালিয়া শরণার্থী শিবির থেকে, ইসরাইলী লরি ও প্যালেস্টাইনি শ্রমিক বহনকারী গাড়ির সংঘর্ষের ঘটনায় চার নিহত হওয়ার প্রতিবাদে।ঘটনাটি ইসরাইল কর্তৃক দখলকৃত এলাকাগুলোতে বিদ্রোহের স্ফুলিঙ্গ ছড়াতে ব্যাপক ভূমিকা রাখে।কোন ব্যক্তি বা সংগঠন এই ‘গণ বিদ্রোহ’ সংগঠনে ভূমিকা রাখেনি।এমনকি পিএলও(প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন) পর্যন্ত ঘটনাটিতে বিস্মিত হয়ে যায়।ইসরাইল কর্তৃক দখলকৃত এলাকাগুলোতে তাদের নিপীড়নমূলক নীতিতে ত্যক্ত-বিরক্ত প্যালেস্টাইনি যুব সমাজ ইন্তিফাদা আরম্ভ করে।পরবর্তীতে অবশ্য তাদের বিদ্রোহটি পরিচালিত হয় ঐক্যবদ্ধ জাতীয় নেতৃবৃন্দের মাধ্যমে।যা গঠিত হয় পশ্চিম তীর ও গাজা উপত্যকায় সক্রিয় থাকা পিএলও এর চারটি প্রধান দল;ফাতাহ,দ্যা পপুলার ফ্রন্ট ফর দ্যা লিবারেশন অফ প্যালেস্টাইন(পিএফএলপি),দ্যা ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট ফর দ্যা লিবারেশন অফ প্যালেস্টাইন(ডিএফএলপি)এবং দ্যা প্যালেস্টাইন পিপলস পার্টি এর সমন্বয়ে।ইন্তিফাদার লক্ষ্যবস্তু ছিল ইসরাইলী দখলদারিত্বের অবসান এবং প্যালেস্টাইনের স্বাধীনতা।ইসরাইলীদের উত্তরোত্তর নিপীড়নমূলক ও ঔপনিবেশিক নীতির কারণে প্যালেস্টাইনিরা ক্রমেই ক্ষুব্ধ ও হতাশ হয়ে পড়ছিল। প্যালেস্টাইনিদের জোরপূর্বক বাধ্য করা হতো ইসরাইলীদের ট্যাক্স পরিশোধ করার জন্য,ইসরাইলী আর্মি কর্তৃক অভিযানের সময় সাধারণ প্যালেসটাইনিদের নির্বিচারে আটক করা হতো এমনকি নুন্যতম মৌলিক মানবাধিকার থেকেও তাদের বঞ্চিত করা হতো।প্যালেস্টাইনিদের নিজেদের একটি রাষ্ট্রগঠনের আকাঙ্ক্ষাকে প্রতিনিয়ত পদদলিত করা হতো।এই অবিচারগুলো সংগঠিত হয়েছে পূর্ব জেরুজালেমকে ইসরাইলের সাথে সংযুক্তকরণ এবং পশ্চিম তীরে ইসরাইলের অবৈধ বসতি স্থাপনকে কেন্দ্র করে। দীর্ঘদিন ধরে হতাশাগ্রস্ত প্যালেস্টাইনিরা ফুঁসে উঠছিল তার উপর ১৯৮৭ সালের ৯ই ডিসেম্বর গাজায় প্যালেস্টাইনি শ্রমিকদের মৃত্যু! তাদের মদ্ধকার প্রচণ্ড ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটায়।প্রায় লক্ষাধিক প্যালেস্টাইনি বিভিন্ন গণ-প্রতিবাদে অংশ নেয় তার মদ্ধে ধর্মঘট,বিক্ষোভ প্রদর্শন,ট্যাক্স পরিশোধে অস্বীকৃতি ও ইসরাইলী পণ্যবর্জন ছিল উল্লেখযোগ্য।ইসরাইলও বেশ নিষ্ঠুরতার সাথে প্রতিবাদগুলোর জবাব দেয়।তারা প্যালেস্টাইনি স্কুলগুলো বন্ধ করে দেয়,নির্বিচারে গণগ্রেফতার চালায়, অবরোধ আরোপ ও কারফিউ জারি সহ বিক্ষোভ দমনের নৃশংস হাতিয়ার বেছে নেয় ইসরাইলী বাহিনী।১৯৯০ সালে ইসরাইলের সাবেক প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ইটজ্যাক রাবিন(পরবর্তীতে পিএলও এর সাথে ‘অসলো’ চুক্তি স্বাক্ষরকারী) ইসরাইলী বাহিনীকে বিক্ষোভ প্রদর্শনকারীদের বিরুদ্ধে কুখ্যাত ‘হাড় ভেঙ্গে দাও’নীতিতে চলার নির্দেশ প্রদান করে।১৯৮৭ সাল থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত একহাজার একশ এরও বেশী প্যালেস্টাইনিকে হত্যা করে বর্বর ইসরাইলী বাহিনী, যার বেশীর ভাগই ছিল শিশু।এবং দশ হাজারেরও বেশী মানুষ ইসরাইলী বর্বরতায় আহত হয়।‘ইন্তিফাদা’আন্তর্জাতিক অঙ্গনের দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হয়।ইন্তিফাদার প্রথম সপ্তাহেই বিশাল সংখ্যক প্যালেস্টাইনিকে হত্যা করে জেনেভা কনভেনশন ভঙ্গ করার দায়ে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ ইসরাইলের বিরুদ্ধে নিন্দা প্রস্তাব পাশ করেন।গণ বিদ্রোহের সংবাদ প্রচার করার সময়, ইসরাইলী স্বসস্ত্র বাহিনীর সম্মুখে দাড়িয়ে তাদের প্রতি পাথর নিক্ষেপকারী প্যালেস্টাইনি এক কিশোরের ছবি প্রকাশের পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্যালেস্টাইনিদের প্রতি ব্যাপক সহমর্মিতা বৃদ্ধি পায় এবং বিশ্ববাসী প্যালেস্টাইনিদের বৈধ জাতিগত আবেগের জায়গাটি বুঝতে সক্ষম হয়।পরবর্তীতে ইসরায়েল ও পিএলও এর মধ্যকার ভবিষ্যৎ অস্বস্তিকর অবস্থার অবসান ঘটানোর উদ্দেশ্যে ‘অসলো’ চুক্তিটি সংঘটিত হয়।

itifada 2

 

দ্বিতীয় ইন্তিফাদাঃ

দ্বিতীয় ইন্তিফাদাকে সাধারণত আল-আকসা ইন্তিফাদা বা দ্বিতীয় গণবিদ্রোহ হিসেবেও অভিহিত করা হয়।এটি শুরু হয় ২০০০ সালের শেষের দিকে।দ্বিতীয় ইন্তিফাদাটি ছিল ইসরাইলী দখলদারি নীতির ফল।ইসরাইলের দখলদারি নীতি শুধুমাত্র আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শনই ছিল না এটি ছিল প্যালেস্টাইনের জনগণকে তাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করার চরম হঠকারী নীতি।২৮শে সেপ্টেম্বর ২০০০ সালে এরিয়েল শ্যারন(তৎকালীন ইসরাইলী প্রধানমন্ত্রী)প্রায় একহাজার ইসরাইলী পুলিশের বহর নিয়ে মসজিদ আল-আকসা প্রাঙ্গণে উপস্থিত হয়।১৯৬৭ সালের ৬ দিন ব্যাপী যুদ্ধে ইসরাইলী দখলদার বাহিনী পূর্ব জেরুজালেম দখল করার পর বলেছিল ‘টেম্পল মাউন্ট(শীর্ষ চুড়া)’এখন আমাদের হাতে!২০০০ সালেও এরিয়েল শ্যারন, প্যালেস্টাইনিদের উস্কে দিতে নির্লজ্জের মত ঠিক একই শব্দদ্বয় চিৎকার উচ্চারণ করলো,‘টেম্পল মাউন্ট(শীর্ষ চুড়া)’এখন আমাদের হাতে। ঘোষণাটিকে,ইসলামের তৃতীয় পবিত্র স্থান আল-আকসার প্রতি হুমকি হিসেবে নিয়ে প্যালেস্টানিয়ানরা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখাল।এবারে ইসরাইলী দখলদার বাহিনী ধারাবাহিক ভাবে বৃহৎ পরিসরে সামরিক হামলা পরিচালনা করলো এবং বিদ্রোহী প্যালেস্টানিয়ানদের শাস্তি প্রদানের জন্য সমন্বিত প্রশাসনিক নীতি গ্রহণ করলো।ইসরাইল,প্যালেস্টাইনের জনগণদের উপর মাত্রাতিরিক্ত শক্তি ব্যবহার করছে এ মর্মে জাতিসংঘ একটি রেজ্যুলেশন প্রকাশ করলো।কিন্তু রেজ্যুলেশন এসেছিল হামলা শুরু হবার তিন সপ্তাহ পর।তত দিনে শতশত প্যালেস্টানিয়ান নিহত হয় তার থেকেও বেশী মারাত্মক হতাহত হয়। প্যালেস্টানিয়ান সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস এর মতে দ্বিতীয় ইন্তিফাদায় কমপক্ষে ৪,৯৭৩ জন বেসামরিক ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়।তাদের মদ্ধে ১,২৬২ জন শিশু,২৭৪ জন নারী এবং ৩২ জন মেডিক্যাল কর্মী যারা আহত বেসামরিকদের চিকিৎসার্থে নিয়োজিত ছিলেন। শিশু অধিকার রক্ষায় নিয়োজিত সুইস ভিত্তিক একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ‘ডিফেন্স ফর চিলড্রেন ইন্টারন্যাশনাল’ এর রিপোর্ট অনুযায়ী গত পাঁচ বছরের(দ্বিতীয় ইন্তিফাদা চলাকালীন) সহিংসতায় দশহাজারেরও বেশী শিশু মারাত্মক আহত হয়।

 

intifada 1

গাজা উপত্যকায় বেশীর ভাগ মৃত্যু এবং হতাহতের ঘটনা ঘটেছে ইসরাইলী বিমান হামলার ফলে।এবং পশ্চিম তীরের বিভিন্ন শহর,গ্রাম ও শরণার্থী শিবিরে করা হয়েছে স্থল হামলা।দ্বিতীয় ইন্তিফাদা চলাকালীন ইসরাইলী বাহিনী পুরো প্যালেস্টাইন জুড়ে অবৈধ নিপীড়ন মূলক অবরোধ আরোপ করেছিল।প্রথম দিকে ইসরায়েল প্যালেস্টানিয়ানদের সাধারণ চলাফেরার উপর কিছু কঠিন বাধ্যবাধকতা আরোপ করেছিল। ইসরাইলী মানবাধিকার সংস্থা ‘বি টি সেলেম’তাদের একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, ইসরায়েল, প্যালেস্টানিয়ান বিভিন্ন গ্রাম ও শহরের প্রবেশমুখে কংক্রিট পাথর দিয়ে,মাটির স্তূপ দিয়ে,গভীর গর্ত খুড়ে এবং বিভিন্ন জায়গায় চেকপয়েন্ট দিয়ে চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে রেখেছে। প্যালেস্টানিয়ানরা যেন ঘর থেকে বের হয়ে তাদের গন্তব্য স্থলে যেতে না পারে সেজন্য ইসরাইলীরা দিন-রাত কারফিউ জারী করে রেখেছে। ১৬ই জুন ২০০২ সালে ইসরায়েল মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী আরও একটি অবরোধ আরোপ করে প্যালেস্টাইন পৃথকীকরণের দেয়াল নির্মাণের মাধ্যমে। বেশীর ভাগ দেয়ালই নির্মাণ করা হয় প্যালেস্টাইনি ভূখণ্ডের উপর। দেয়াল নির্মাণের দুই বছর পর আন্তর্জাতিক আদালত নির্মিত দেয়ালকে  অবৈধ বলে রুলিং প্রদান করেন এবং দেয়াল সরিয়ে ফেলার নির্দেশ প্রদান করলেও ইসরায়েল এখন পর্যন্ত সেই নির্দেশাবলী পালন করেনি।

দ্বিতীয় ইন্তিফাদার সমাপ্তিকাল নিয়ে কিছু দ্বিধাদ্বন্দ্ব থাকলেও বেশীর ভাগ সুত্রের মতে বিদ্রোহ প্রশমিত হওয়ার মাধ্যমে ২০০৫ সালে এর সমাপ্তি ঘটেছে।

প্যালেস্টানিয়ান সেন্টার ফর হিউম্যান এর মতে হাজার খানেক মৃত্যু ও হতাহতের ঘটনার পাশাপাশি ইসরাইলী দখলদার বাহিনী,প্যালেস্টানিয়ানদের পাঁচ হাজার বসতবাড়ি ধ্বংস স্তূপে পরিণত করে তাছাড়া আরও প্রায় ছয় হাজার পাঁচশত বসতবাড়ি এমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে যেগুলো মেরামতের অযোগ্য হয়ে পড়ে।

 

আমেরিকান মুসলিমস ফর প্যালেস্টাইন এর ওয়েব থেকে অনুবাদ

উদয় তাসমির