অনুবাদ

ইসলামী শিল্পকলার নির্বাক থিওলজি (প্রথম পর্ব)
ইসলামী শিল্পকলার নির্বাক থিওলজি (প্রথম পর্ব)
অনুবাদ করেছেন ইবনে বাশার
০২ জানুয়ারি ২০১৮
 

মূলঃ অলুদামিনি অগুন্নাইক, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রিলিজিয়াস স্টাডিজ এ পিএইচডি, বর্তমানে কলেজ অফ উইলিয়াম অ্যান্ড ম্যারি তে অধ্যাপনায় রত। অলুদামিনি অগুন্নাইক এর গবেষণার আগ্রহের বিষয় হচ্ছে ইসলামী দর্শন, তাসাউফ, শিল্পকলা এবং আফ্রিকা। 

 

অনেকের কাছে, ইসলামী শিল্পকলা এমনকি লিখিত শব্দের চেয়েও আরো

 গভীরভাবে এবং স্পষ্টভাবে ভাব প্রকাশ করতে পারে। তাহলে কি

 মুসলিমদের জন্য বলার চেয়ে প্রদর্শনী করাই বুদ্ধিমানের কাজ?

 

ইহসানের বিনিময় ইহসান ব্যাতিত আর কী হতে পারে?

-কোরআন ৪১:৫৩

 

আল্লাহ তায়ালা সবকিছুকে সৌন্দর্য দ্বারা সুশোভিত করেছেন।

-আল হাদীস

 

সৌন্দর্য হচ্ছে সত্যের প্রভা।

-প্লেটো

 

মনের কল্পনা কোন তত্ত্ব বা মতবাদের মত আসমানী জগতের সত্য নিয়ে সীমিত পরিসরে হলেও

সঠিক অভিব্যক্তি প্রকাশ করতে পারে।সুতরাং দৃষ্টিগ্রাহ্য আকার (sensible form) এমন এক সত্য

ও বাস্থবতার সন্ধান পায়, যা দৃষ্টি এবং চিন্তার জগতকে অতিক্রম কররে পারে।

-টিটুস বার্খহার্ড

 

 

যারা ইসলাম ও তার সভ্যতার সাথে অপরিচিত, তাদের কাছে 'ইসলাম' পরিচয় করিয়ে দিতে বলা হলে আমি তাদেরকে পরামর্শ দেবনা কোরআনের কোনো অনুবাদ পড়তে; না পরামর্শ দেব ইসলামী আইন, ধর্মতত্ত্ব অথবা দর্শন পড়তে; কিংবা  পাশ্চাত্যে ইসলামকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া জনপ্রিয় বইয়ের কোন একটি পড়ার জন্য। বরং আমি তাদেরকে পরামর্শ দেব ‘আরবি মাকামে’ (এক ধরনের সুর-তাল) কোরআনের তেলাওয়াত শোনার জন্য; অথবা ছুলুছ বা কুফিক ক্যালিগ্রাফি হরফে লেখা কোরআনের সোনালী-রূপালী রঙ্গের ওসমানী মাসহাফ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করতে; অথবা ফেজ শহরের কারাউইয়্যিন, ইস্পাহানের শায়খ লুৎফুল্লাহ বা কায়রোর ইবনে তুলুন মসজিদ দেখতে; অথবা বলব কবি হাফিজ, আমির খসরু কিংবা ইবুনুল ফরিদদের সংগীত শুনার জন্য।

lutfullah

শায়খ লুৎফুল্লাহ মসজিদ

লুতফুল্লাহ২

মসজিদের ছাদ

 

ইসলামী সভ্যতার এইসব সেরা সেরা শিল্পকর্ম ওহির সৌন্দর্য ও সত্য এমন নিগুঢ়ভাবে প্রকাশ করে, সাধারণভাবে যা ইসলাম সম্পর্কিত প্রবন্ধ বা বইয়ের দ্বারা সম্ভব হয়না। পাশ্চাত্যে ইসলামের বিরুদ্ধে বিদ্বেষপূর্ণ প্রচারণা থাকা সত্ত্বেও বর্তমানে ইসলাম নিয়ে একটি আগ্রহের প্রমান হল, পশ্চিমা সমাজ থেকে অনেক মানুষ স্পেনের 'আলহামরা' ও ভারতের 'তাজমহল' এর স্থাপত্যকলা দেখার জন্য; পাশাপাশি ইসলামী ক্যালিগ্রাফি ও অনু-চিত্রকলা দেখে বিমুগ্ধ হতে এবং ট্রাডিশনাল ইসলামী সংগীতের কনসার্ট উপভোগ করতে অগ্রিম টিকেট কিনার জন্য অনেকক্ষণ ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করে। এ ঘটনার পিছনে যে প্যারাডক্স কাজ করে তা হল, ইসলামী শিল্পকলা ইসলামী ট্রাডিশনের সবচেয়ে বেশী হাল-হাকিকত ও বাহ্যিক বিষয়গুলো ভালোভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারে। যার কারনে শিল্পকলা ট্রাডিশনের খুব সূক্ষ্ম এবং ভিতরকার মৌলিক বাস্তবতাগুলো তুলে নিয়ে আসতে পারে। তাহলে দেখা যায়, বলার চেয়ে প্রদর্শনী করাই ভাল মনে হয়।

 

ফাতিমা মাসুমেহ

 ফাতিমা মাসুমেহ, কোম, ইরান

 অনেকের কাছে, ইসলামী শিল্পকলার নির্বাক থিওলজিকাল বয়ান সবচেয়ে চমকপ্রদ প্রবন্ধের চেয়ে আরও গভীরভাবে এবং স্পষ্টভাবে ভাব প্রকাশ করতে পারে এবং এর সৌন্দর্য মজবুত যুক্তির চেয়েও অনেক বেশি স্পষ্ট এবং বিশ্বাসযোগ্য। কোরআন সিলজিসম (syllogism) বা গদ্যময়-যৌক্তিকপ্রমান আকারে  নাযিল হয়নি বরং এমনভাবে নাযিল হয়েছে যাতে তেলাওয়াত করা যায়, যার অনুপম ভাষাগত সৌন্দর্য প্রতীক, কাহিনী রুপক এবং কাব্যিক-ছন্দে পূর্ণ।ফিকহ বা কালাম শাস্ত্রের প্রথমদিকের বই প্রকাশ হওয়ার আগেই প্রথম প্রজন্মের মুসলিমদের সময় ইসলামী স্থাপত্যকলার সেরা সেরা কাজগুলো নির্মিত হয়েছিল। যেমনটি, তিউনিসিয়ার মসজিদে কারাওইন, জেরুজালেমের কুব্বাত আস সাখরা, অভিনব ক্যালিগ্রাফি শিল্প এবং এ সময় পুরা একটি নতুন ধারার সাহিত্যিক স্রোত আরম্ভ হয়। আইন ও ধর্মতত্ত্বের মত যদিও  চিত্রকলা এবং শতাব্দী ধরে গড়ে ওঠা ইসলামী সভ্যতার অনুপম নন্দনতত্ত্ব (aesthetics) ইসলামি ট্র্যাডিশনের জন্য অপরিহার্য ও জরুরী ছিল, কিন্ত দু:খজনক হলেও সত্য বর্তমান সময়ে এঁদের কদর নাই বললে চলে। যদিও এটি মানবজাতির সকলের জন্য এক উল্লেখযোগ্য ক্ষতি, বিশেষ করে এটি মুসলমানদের জন্য দুঃখজনক। যেহেতু হাদিসে আসছে, “আল্লাহ সুন্দর, এবং তিনি সৌন্দর্যকে ভালবাসেন,” তাই সৌন্দর্য থেকে উদাসীন হওয়া আল্লাহর প্রতি উদাসীনতার সমান।

 

অদৃশ্য জগৎকে দুনিয়ায় নিয়ে আসা

 

 ইসলামী ট্রাডিশনে সৌন্দর্য ও উৎকর্ষের অনুভূতি কোরআনের আরবি শব্দ 'ইহসান' দ্বারা পরিব্যাপ্ত। যার কারনে অনুভূতিটা একসাথে নান্দনিক, নৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক এবং আধ্যাত্মিক। ইহসানের ক্লাসিকাল সংজ্ঞাটি হাদীসে জিবরাঈল (আ:) থেকে এসেছে। যেখানে নবী ﷺ বর্ণনা করেন যে, “এমনভাবে তুমি ইবাদত কর যেন তুমি আল্লাহকে দেখতে পাও, আর যদি তুমি আল্লাহকে নাই দেখতে পাও, তবে তিনি তোমাকে দেখেন।” সবচেয়ে সহজভাবে বললে, 'ইহসান' এর ধারনা থেকেই ইসলামি শিল্পকলার বিকাশ ঘটেছিল। কারন হল,জায়নামাজ, জ্যামিতিক নকশা এবং ক্যালিগ্রাফি সুসজ্জিত মসজিদ ও ঘরবাড়ী; পাশাপাশি এইসব ঘরবাড়ি, মসজিদ ও মাদ্রাসা এর স্থাপত্যশৈলী আমাদেরকে ইবাদতে এমন নিকটে নিয়ে যায়, যেন এদের সৌন্দর্যের মধ্য দিয়ে আমরা “আল্লাহকে দেখতে পাই”। কারন “আল্লাহ সুন্দর, তিনি সৌন্দর্যকে ভালবাসেন”। আরবি ভাষায় যখন ‘যেন’ (كان) ব্যবহার হয়, তখন সে দেখাটা imagination (خيال) এর মধ্য দিয়ে হয়। ইসলামের বয়ানে imagination পরিভাষার একটা প্রায়োগিক/টেকনিকাল অর্থ আছে, যা দৈনন্দিন ইংরেজিতে ব্যবহৃত অর্থ থেকে ভিন্ন।

 

ইবনে আরাবী (রহ:) ও অন্যান্য সুফী আলেমদের লেখালেখিতে দেখা যায়, কোন কাল্পনিক বা অবাস্তব জিনিস বোঝানোর পরিবর্তে imagination (خيال) একটা সৃজনশীল ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য আকার (sensible form) প্রতক্ষ করার ফ্যাকাল্টি অর্থে ব্যাবহার হয়। যা সত্য-জ্ঞান ও আধ্যাত্মিক বাস্তবতাগুলাকে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য আকারে নিয়ে আসে এবং তারপর ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য আকারে থাকা জ্ঞানকে প্রত্যক্ষ (perceive) করে। এই ফ্যাকাল্টি  দ্বারাই মানুষ সত্য স্বপ্ন দেখে ও ঐশ্বরিক প্রেরনা লাভ করে এবং তা’বীর করে। যেমন যখন রাসুল ﷺ স্বপ্নে দুধ দেখলেন এবং বুঝতে পেরেছেলিন যে এটা জ্ঞানের  অধি-ইন্দ্রিয় বাস্তবতার (supra-sensible reality) ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য আকার (sensible form)। imagination এর মাধ্যমে আমরা অদৃশ্য জগতকে (invisible world) প্রত্যক্ষ জগতে (visible world) নিয়ে আসতে পারি এবং  ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য কোন কিছুর জন্য তার অদৃশ্য থাকা মূল অর্থের সন্ধান পেতে পারি। সুতরাং, imagination হল দৃশ্য ও অদৃশ্য জগত (عالم الشهادة والغيب), বস্তুগত জগত ও আত্মার জগত এবং ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য আকার (sensory form) ও বুদ্ধিগ্রাহ্য অর্থের (intelligible meanings) মাঝখানে থাকা একটি পর্দা বা বারযাখ। বারযাখ হল এমন একটি মধ্যবর্তী বাস্তবতা যা দুটি বাস্তবতাকে আলাদা করে দেয়, কিন্ত এটি দুটি বাস্তবতার মধ্যে যাওয়া আসা করে।

 

অনেক সুফী আলেমদের কাছে, আল্লাহর অস্তিত্ব ছাড়া অন্য সবকিছু হল imagination এবং এক প্রকার স্বপ্নের মত যার তা'বীর করা সম্ভব। ইবনে আরাবী (রহঃ) লেখছেন যে, “জেনে রাখ তুমি নিজেই একটা imagination মাত্র। এবং যা তুমি কল্পনা কর এবং এমনকি নিজেকে বল যে, এটা আমার কল্পনা না সমস্তকিছুও একটা imagination। সুতরাং তামাম জগৎটার অস্তিত্ব হল imagination এর মধ্যে imagination।” যেভাবে স্বপ্ন আমাদের ব্যাক্তিগত চেতন মনের নানা দিক হাজির করে এবং প্রকাশ করে। তেমনিভাবে আল্লাহকে ছাড়া অনান্য সমস্ত স্বপ্ন (ما سوي الله) আল্লাহর অসীম তাওহীদের নানা হাকিকতসমূহ হাজির করে এবং স্পষ্ট করে তোলে। যদি ও আল্লাহর নিরঙ্কুশ তাওহীদ এর কারনে আল্লাহকে নিয়ে সরাসরি চিন্তা করা অসম্ভব। কারন কোন কিছুকে নিয়ে চিন্তা করতে হলে চিন্তার অবশ্যই কর্তা ও কর্ম উভয়টি থাকতে হয়, যা আল্লাহর খোদ তাওহীদের খেলাপ। তবে, স্বপ্নের মধ্যে দেখা নানা নিদর্শন ও চিহ্নের    (আয়াত) মাধ্যমে অদৃশ্যে জগতে থাকা আল্লাহর একাত্ববাদের নানা দিক নিয়ে চিন্তা, ধ্যান এবং দেখা আমাদের পক্ষে সম্ভব হয়। সেজন্য কোরআনের সমস্ত পঙক্তি (যাকেও আয়াত বলা হয়েছে) আমাদের নিজেদের সহ সৃষ্টির নিদর্শন নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করতে উৎসাহিত করে। আবুল আতাহিয়া (রহঃ) এর বিখ্যাত একটি কথা হল, “প্রতেকটা জিনিসের মধ্য একটা নিদর্শন আছে,যেটা বলে দেয় নিশ্চয় তিনি এক।” কোরআন সুরা ফুসসিলাতে আরো ও স্পষ্ট করে বলে যে, “এখন আমি তাদেরকে আমার নিদর্শনাবলী প্রদর্শন করাব পৃথিবীর দিগন্তে এবং তাদের নিজেদের মধ্যে; যতক্ষণ না তাদের কাছে স্পষ্ট হয়,নিশ্চয় তা সত্য” (৪১:৫৩)।

 

যেহেতু imagination এর মাধ্যমেই সৃষ্টির নিদর্শনাদি দৃষ্টিগোচর হয়, সেহেতু আমরা এর মাধ্যমেই সৃষ্টির মূল উৎস ও অর্থ সন্ধান লাভ করতে পারি এবং আসমানি জগতের প্রকাশিত নানা হাকিকত চিনতে পারি, সেই সাথে imagination এর মাধ্যমে এদের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করতে পারি। ইসলামী শিল্পকলা আমাদের চারপাশের মৌলিক উপাদানগুলাকে (যেমন:আলো, আধার,ছায়া, স্থান, সময়,রং, শব্দ, ঘ্রাণ এবং নিরবতা) জ্যামিতিক ও আদি বাস্তবতায় (কোরআনের ভাষায় তাদের 'মালাকুত' অবস্থায়) ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ইসলামী সভ্যতা এবং তার শিল্পকলা অনেকবেশি জ্যামিতির উপর জোর দেওয়ার কারনে খুব সহজেই আল্লাহর একত্ববাদকে প্রকাশ করতে পারে। 

নাসির উল-মুলক মসজিদ

                               চোখ ধাঁধানো স্বচ্ছ রং মিশ্রিত-কাঁচের জানালা বিশিষ্ট নাসির উল-মুলক মসজিদ

 

অন্যভাবে বললে, ইসালামী শিল্পকলায় কোন জিনিস এমনভাবে মেটাফিজিকাল স্বচ্ছতা পায়, যেন সেগুলো স্বচ্ছ রং মিশ্রিত কাঁচের জানালার (stained glass window) মত হয়ে যায়। যাতে করে শিল্পকর্মের  মধ্যে এবং তার মাধ্যমে আমরা আল্লাহর নুর অবলোকন করতে পারি। imagination (খেয়াল) এর মাধ্যমে ইসলামী শিল্পকলা অদৃশ্য আসমানি জগতকে প্রকাশ করে এবং এর মাধ্যমেই লোকচক্ষুর আড়ালে থাকা আল্লাহর তাওহীদের রহস্য দৃষ্টিগ্রাহ্য আকারে আমরা প্রত্যক্ষণ করতে পারি।

 নাসির

নাসির উল-মুলক মসজিদে নুরের খেলা

Imagination এর সাথে Reason (আরবিতে এর সীমিত অর্থে আকল ব্যবহার হয়) এর ভালো পার্থক্য আছে। যেখানে imagination হয় synthetic সেখানে reason হয় analytic; যেখানে imagination হয় "Both/and"; সেখানে reason হয় "either/or"; যেখানে imagination সম্পর্ক ও সাদৃশ্য দেখায়, সেখানে reason পৃথক করে ও পার্থক্য দেখায়। William Chittick বিষয়টাকে এমনভাবে বিশ্লেষণ করেনঃ

imagination এর বুঝার mode বা ধরন reason এর স্বভাববিরুদ্ধ। imagination হল এমন এক বাস্তবতা, যা আত্মা ও দেহের মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে কাজ করে এবং বিমূর্ত চিন্তা ও আধ্যাত্মিক অস্তিত্বকে দৃষ্টিগ্রাহ্যআকারে প্রত্যক্ষ করে।সেহুতু, imagination হচ্ছে অনির্দিষ্ট, সহজাতভাবে দ্ব্যর্থবোধক, বহুঅর্থ দেয় এবং মোকাশাফার (self-disclosure of god) অভিজ্ঞতা লাভ করতেপারে। ফলে বুঝতে পারে কোন সত্ত্বা আল্লাহর এবং কোন সত্ত্বা আল্লাহর না। আর reason কেবল either/or এর ক্ষেত্রে ঠিক সম্পর্কটি জানতে চায়। কিন্ত imagination যে মোকাশাফার অভিজ্ঞতা প্রত্যক্ষ করে সেটা একদম নির্ভুলভাবে কখনো জানা যায়না, যেহুতু imagination অজানা সত্তাকে প্রকাশ করে।

 চিন্তার এই তরিকায় বললে, reason নয় বরং imagination স্বাচ্ছন্দ্যের সাথে প্রকাশ্য অসংখ্য বাস্তবতার রহস্য ধরতে পারে এবং তাদের মাঝে একত্ববাদের সুর খুজে পায়। imagination আপাতত দৃষ্টিতে পরস্পর বিরোধী বক্তব্য ও ঘটনার মূল উৎস খুজে পায়, যেখানে দেখা যায় তাদের মাঝে কোন বিরোধ থাকেনা। পরস্পর বিরোধী বক্তব্য ও ঘটনার বিরোধ মিটাতে গিয়ে imagination তাদের মধ্যকার ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য আকারে থাকা স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যগুলো হারিয়ে ফেলেনা। imaginal faculty (القوة المتخيلة) একই সত্য ও বাস্তবতাকে বৃক্ষ, জ্যামিতিক আকৃতি, ক্যালিগ্রাফি অথবা কবিতার ছন্দে হাজির ও কল্পনা উভয়টি করতে পারে।যদিও এদের (বৃক্ষ,জ্যামিতিক আকৃতি ইত্যাদির) মধ্যে বাহ্যিক পার্থক্য আছে। সুতরাং,এটা কোন আশ্চর্যের বিষয় নয় যে, ইসলামী শিল্পকলার অবমূল্যায়ন ও চর্চাহীনতার মধ্য দিয়ে সারা মুসলিম বিশ্বে উগ্র অসাম্প্রদায়িকতা ও পরস্পর-ভূল বুঝাবুঝি শুরু হয়েছে। উভয় প্রবণতার কারন হল, ব্যাপকভাবে imaginal faculty কাজে না লাগানো এবং ইসলামের ট্র‍্যাডিশনের সাথে ক্রমশ আলাপ-সালাপ কমিয়ে দেওয়া।

 

ইবনে আরবি (রহ:) ও আল গাযালী (রহ:) সহ অনেক বড় আলেমরা যুক্তি দিয়েছেন যে, reason এবং imagination আল্লাহর কিতাবে থাকা নিদর্শনাদি, সেই সাথে মহাজগতের এবং মানুষের আত্মায় থাকা নিদর্শনাদি সঠিকভাবে বুঝা ও ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে অবশ্যই একসাথে কাজ করে। কোরআনের যে কয়টি পরিষ্কারভাবে নিগূঢ় প্যারাডক্সিকাল আয়াত আছে, তন্মধ্যে একটি আয়াত হল এমন: “কোন কিছুই তাঁর অনুরুপ নয়। তিন সব শুনেন সব দেখেন” (৪২:১১)। আয়াতের প্রথম অংশ স্পষ্টভাবে আল্লাহর সত্ত্বাকে অতুলনীয় এবং transcendence (তানজীহ) হিসেবে ঘোষনা করেছে। ইবনে আরাবী (রহ:)এর মতে, প্রথম অংশটি আমাদের reason এর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আর আয়াতের দ্বিতীয় অংশটি আল্লাহর সত্ত্বাকে তুলনীয় এবং সর্বব্যাপী (আমরা সব শুনি এবং সব দেখি) ঘোষনা করে এবং ইবনে আরাবী (রহ:) এর মতে, দ্বিতীয় অংশটি আমাদের imagination এর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

 

                                “যদি আল্লাহ দর্শন বা কালামের প্রমান হিসেবে কেবল Necessary Being

                                 বা First cause হতেন, তাহলে আল্লাহর প্রতি মানুষের ভালোবাসা বিগ ব্যাং

                                 এর ভালোবাসার চায়ে বেশী হতনা।”

 

চিন্তার এ তরিকায় বললে, reason যুক্তি দ্বারা কেবল এ সিদ্ধান্তে পৌছতে পারে, আমরা যা কিছু প্রত্যক্ষণ করি তার থেকে আল্লাহ অনেক উপরে এবং স্বতন্ত্র।কিন্ত ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য ঘটনায় যে ঐশ্বরিক উপস্থিতি (abstract causative sense এর জায়গা বাদে) আছে, কিংবা আল্লাহর সত্ত্বার পরম অবস্থা reason প্রতক্ষ্য করতে পারেনা। রাসুল ﷺএর উপরে নাযিলকৃত ছন্দোময় ওহী ও তার হাদীসের মাধ্যমে; পাশাপাশি আল্লাহর নিদর্শনাদি চিন্তার জন্য imaginal faculty কাজে লাগানোর মাধ্যমে আমরা আল্লাহর পরম সিফাতসমষ্টি উপলব্ধি করতে পারব। যদি আল্লাহ দর্শন বা কালামের প্রমান হিসেবে কেবল Necessary Being বা First cause হতেন, তাহলে আল্লাহর প্রতি মানুষের ভালোবাসা বিগ ব্যাং এর ভালোবাসার চায়ে বেশী হতনা।

 

ভিন্নভাবে বললে, দ্বীন সবসময় সত্য এবং অস্তিত্বকে একসাথে ধারন করে।অস্তিত্ব ছাড়া সত্য বিমূর্ত এবং অনুপ্রাণিত করেনা। এর উদাহরণ অনেকটা হাইস্কুলে থাকা ভূগোলের আধা-মুখস্থ করা তথ্যের মত। আর সত্য ছাড়া অস্তিত্ব নিষ্প্রাণ এবং অর্থহীন। শিল্পকলার দুটি অসমান্য দৃষ্টান্ত হচ্ছে, আসমানি সত্য এবং ওহীর সত্যকে মানুষের কাছে হাজির ও বাস্তব করে তোলা; সেই সাথে আমাদের চারপাশের বাস্তবতাকে আল্লাহর সৌন্দর্যে রাঙিয়ে দেওয়া। নির্দিষ্ট করে বললে, ‘জালাল’ (আল্লাহর মহিমা বা মহত্ত্ব) সিফাতটি অস্তিত্বের সত্যেকে নির্দেশ করে। আর 'জামাল'(আল্লাহর সৌন্দর্য) সিফাতটি সত্যের অস্তিত্বকে নির্দেশ করে। সত্য ও অস্তিত্ব একে অপরের ছাড়া চলতে পারেনা। সত্য ও অস্তিত্বই থেকেই ভালোবাসার সৃষ্টি হয়। যার উৎস ও পরিসমাপ্তি আল্লাহর কাছে। যে ভালোবাসা আমাদের আত্মা সহ মহাজগতের সবকিছুকে ক্রিয়াশীল করে রাখে।

 

ভালোবাসা, সৌন্দর্য এবং শিল্পকলা

 

কোরাআনে, সাধারণভাবে ইসলামী ট্রাডিশনে এবং আমাদের প্রতিদিনের অভিজ্ঞতায় সৌন্দর্য (ইহসান অথবা জামাল) সবসময় ভালোবাসার সাথে সম্পর্কযুক্ত এবং ভালোবাসা সৌন্দর্যের সাথে সম্পর্কযুক্ত। হাদীসে বলা আছে, “আল্লাহ সুন্দর, তিনি সৌন্দর্যকে ভালোবাসেন।” এবং কোরআন বারবার বলেছে,“নিশ্চয় আল্লাহ সৌন্দর্যের সাথে ইবাদতকারীদেরকে (মুহসিনীন) ভালোবাসেন (২:১৯৫,৩:১৩৪,৩:১৪৮,৫:১৩,৫:৯৩)। ইবনে সিনা(রহঃ)ও আল-গাযালী(রহঃ) এর চিন্তাধারার বাহিরের আলেমরাও ভালোবাসাকে দেখিয়েছেন মধুর, নিখুঁত অথবা সুন্দরের প্রতি অনুরাগ কিংবা আসক্তি হিসেবে। যেমন, ইসলামী শিল্পকলার সৌন্দর্য মানুষ এবং আল্লাহর উভয়ের ভালবাসাকে কাছে নিয়ে আসে। ইস্তাম্বুল অথবা ইস্পাহানের নয়নজুড়ানো মসজিদগুলোতে কেউ যদি নামাজ পড়তে আসে কিংবা কেবল পায়চারি করে, বাহিরের অবস্থা যাই হোক না কেন, তার মনে অবশ্যই ভালবাসা জাগবে, এবং প্রিয়জনকে অনুভব করতে পারবে।অমায়িক সৌন্দর্য এবং ভালোবাসার এ ছোঁয়াতে সাকীনাহ (তাকওয়ার রহমতে বর্ষিত অনাবিল শান্তি) নাযিল হয়। দেখা যায় সকল ট্রাডিশনাল মসজিদগুলোর সবচেয়ে মনোমুগ্ধকর বৈশিষ্ট্যের একটি হচ্ছে সাকিনাহ। স্থাপত্যকলায় জ্যামিতির মিলনের ফলে স্থাপত্যকর্মকে আল্লাহর বরকত ঘিরে রাখে। যা আমাদের আত্মায় সামঞ্জস্য নিয়ে আসে।

 শিরাজ

শিরাজ ইসফাহান, ইসফাহান-নেসফে জাহান (ইসফাহান হল অর্ধেক জাহান)

সাহিত্যিশিল্পের  দিকে গেলে দেখা যায়, ইসলামী সভ্যতাজুড়ে প্রেমচর্চায় যে মশগুল ছিল, তার প্রমান মিলে যুক্তিবিদ্যা, আইনশ্বাস্ত্র,জ্যামিতিশাস্ত্র, ধর্মতত্ত্ব এবং দর্শনের বই-পত্রে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অসংখ্য প্রেমের কবিতা। সমপ্রতি পর্যন্ত, প্রায় সকল ট্রাডিশনাল ইসলামী সাহিত্যধারায় এবং বাস্তবতা বোঝাপড়ায় প্রেমচর্চা ছড়িয়ে গেছে। ইবনে সিনার মত যারা বিজ্ঞানী-দার্শনিক ছিলেন,তাদের মতে, ভালোবাসা স্পষ্টভাবে ফেরেশতা থেকে পাথর পর্যন্ত সবকিছুকে ক্রিয়াশীল করে রাখে।

 

এছাড়া, 'ইহসান' এর উপর আমল করার জন্য ভালোবাসা জরুরি এবং ‘ইখলাস’ এর সাথে ভালোবাসা ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। যেমন হাদিসে এসেছে, “তোমাদের মধ্যে কেউ মুমিন হতে পারবেনা, যতক্ষণ না অন্য সবকিছুর চেয়ে আল্লাহ এবং তার রাসুল প্রিয় হবেন।” নি:স্বার্থ ভালোবাসা ছাড়া, আমাদের পূন্যকর্ম এবং ইবাদতসমূহ হয় রিয়া দ্বারা প্ররোচিত হয়; কিংবা ইহকাল অথবা পরকালে পুরস্কারের আশায় বা শাস্তির ভয়ে স্বার্থপর অভিলাষের দিকে নিয়ে যায়। বরং তার পরিবর্তে আল্লাহকে ভালবাসতে হবে শুধু তার নিজের জন্য; পাশাপাশি অন্যান্য  সকলকেও কেবল তার নিজের জন্য ভালোবাসতে হবে। আর রিয়াকে রাসুল ﷺ বলেছেন ছোট বা গোপন শিরক। রিয়া কিংবা পুরষ্কারের আশা বা শাস্তির ভয়, যেকোন একটির কারনে আমাদের ভালোবাসা সংকীর্ণ হয়ে যায় এবং আমাদেরকে আত্ম-অহম ও অভিলাষের দাস বানিয়ে ফেলে।“ আপনি কি তার প্রতি লক্ষ্য করেছেন, যে তার খেয়াল-খুশীকে স্বীয় উপাস্য স্থির করেছে? আল্লাহ জেনে শুনে তাকে পথভ্রষ্ট করেছেন” (৪৫:২৩)। “কিন্তু যারা আল্লাহর প্রতি ঈমানদার তাদের ভালবাসা ওদের তুলনায় বহুগুণ বেশী”(২:১৬৫)। মহাকবি হাফিজ কোর আনের একটি আয়াতকে প্যারাপ্রেইজ করে লেখেন যে, “প্রেমিকরা ছাড়া আমার চোখে সবাই আত্মধার্মীক রুপে ভন্ড।” কোরআন রাসুল ﷺ কে  তার অনুসরন করার কারন ও পুরস্কার হিসেবে ভালোবসার কথা বলতে নির্দেশ করেছে। আপনি বলুন: “যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবাসতে চাও, তাহলে আমাকে অনুসরন কর, যাতে করে আল্লাহ তোমাদেরকে ভালবাসেন।”

 

                               সব ধরনের সৌন্দর্যের সাথে ভালোবাসা সব সময় জড়িয়ে থাকে। যখন মসজিদ

                               অথবা শিক্ষালয় সুন্দর থাকে, তখন আমরা সেখানে বসে থাকতে ভালবাসি। যখন কারো

                               কথা সুন্দর হয়, তখন তার কথায় মনমুগ্ধ হই। সৌন্দর্য ভালোবাসা জাগিয়ে তোলে,

                               আর ভালোবাসা আমাদের আত্মাকে চালিত করে।

 

যেকোনো কাজের পিছনে ভালোবাসা সবচেয়ে সত্যিকার ও আন্তরিক প্রেরনা দিয়ে থাকে। ভালোবাসার কারনেই আমাদের আত্মা এক পথ ছেড়ে অন্য পথের দিকে চলে যায়। সব ধরনের সৌন্দর্যের সাথে ভালোবাসা সব সময় জড়িয়ে থাকে। যখন মসজিদ অথবা শিক্ষালয় সুন্দর থাকে, তখন আমরা সেখানে বসে থাকতে ভালবাসি। যখন কথা সুন্দর হয় তখন কথায় মনমুগ্ধ হই। সৌন্দর্য ভালোবাসা জাগিয়ে তোলে, আর ভালোবাস আমাদের আত্মাকে চালিত করে। এ কথা অধি-ইন্দ্রিয় (supra-sensible) আসমানি জগতের সৌন্দর্যের জন্য প্রযোজ্য। ইসলামী শিল্পকলা সে আসমানি সৌন্দর্যকে দুনিয়ার জগতে নিয়ে আসার প্রচেষ্টা করে। কিন্ত দু:খজনকভাবে এ কথা জমকালো অথচ রুচিহীন; শপিং মল,অট্টালিকার অসার সৌন্দর্য; অথবা “পার্থিব জিবনের সাজসজ্জা”র (কোরআন:১৮:৪৬) জন্য প্রযোজ্য। যা বাস্তবিক অর্থে প্রকৃত সৌন্দর্যের একটি ছায়া মাত্র কিংবা ভুল প্রদর্শন। তাহলে প্রশ্নটা এসে যায়, ইসলামী শিল্পকলায় যে সৌন্দর্যের মুক্তি মিলে তার সাথে দুনিয়ার বিভ্রান্তকারী ও সম্মোহনকারী সে সৌন্দর্যের ফারাকটা কই? কিভাবে একজন উভয় সৌন্দর্যের মাঝে ফারাক করতে পারবে? এবং কেন ফারাক করাটা জরুরি?

 

ইসলামী শিল্পকলাকে অন্য ধরনের শিল্পকলা হতে আলাদা করতে হলে আমাদেরকে ইসলামী শিল্পকলার সংজ্ঞায়ন(define) করতে হবে, এবং এর সীমা নির্ধারণ (demarcate) করতে হবে। সাংস্কৃতিক এলাকা ভিন্ন হওয়ার পরেও পশ্চিম আফ্রিকা এবং মধ্য এশিয়ার ইসলামী শিল্পকলার একধরনের অভিন্নতা পাওয়া যায়, যদিও তা স্বীকৃতি দিতে পাশ্চাত্য শিল্পকলার ইতিহাসবিদরা গড়িমসি করে। কিন্ত,সাইয়্যেদ হোসাইন নাসের এবং টিটুস বার্খহার্ড এর মত পন্ডিতরা বিভিন্ন এলাকাভেদে একই শিল্পকলার প্রকাশের ভিন্নতার ক্ষেত্রে সার্বজনীন ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গির (universal Islamic approach) কথা জোর দিয়ে বলেছেন। সেটা করতে গিয়ে, উনারা ইসলামি শিল্পকলার সাথে মুসলিমদের ধর্মীয় শিল্পকলা এবং মুসলীমদের তৈরি শিল্পকলার ফারাকটা কই, সেটা দেখিয়েছেন। ট্রাডিশনাল ইসলামী শিল্পকলার ধরন এবং বিষয়বস্তু সরাসরি কোরআনের ওহী থেকে নেয়া এবং তা রাসুলের বরকতের খুশবু ছড়িয়ে দেয়। নতুন ধর্মের বাস্তবতার কল্পনাকে ফুটিয়ে তুলতে ইসলামী শিল্পকলা পাশাপাশি নিজের ভিতরে রোমান, পশ্চিম আফ্রিকা, বাইজেন্টাইন, সাসানী, মধ্য এশিয়া এবং চীনা শিল্পীদের কলাকৌশল ও পদ্ধতিগুলো আত্মস্থ করে নিয়েছে। ইসলামী শিল্পকলার মূল উৎস হচ্ছে  ইসলামের ওহি, ঐতিহাসিক নজির কিংবা প্রভাব নয়। ফলে উৎপত্তিস্থল এক হওয়ার কারনে তা সময় ও স্থান জুড়ে অভিন্ন হয়ে থাকে।

 

 মুসলিমদের তৈরি শিল্পকলা কিংবা মুসলিম সমাজে তৈরি শিল্পকলা হওয়া মানে ইসলামী শিল্পকলা না। প্রয়াত ইরাকি-ব্রিটিশ স্থাপত্যবিদ জাহা হাদীদ অনেকগুলা বিখ্যাত অট্টালিকার নকশা করেন, কিন্ত এদের একটিও ইসলামী স্থাপত্যকলার উদাহরণ না। বিপরীতভাবে, লন্ডনের দ্যা প্রিন্সে’স স্কুল অব ট্রাডিশনাল আর্টস প্রতিষ্ঠানের সকল ধর্মের শিক্ষার্থীরা ট্রাডিশনাল ইসলামী ক্যালিগ্রাফি, পান্ডুলিপির অলঙ্করণ এবং জ্যামিতিক নকশার কাজ করে থাকে।ওহীর কারনেই শিল্পকলার গড়ন পরিবর্তন হয়; শিল্পীর পরিচয়ের কারনে নয়। শিল্পকলার গড়নের কারনেই কোন শিল্পকর্ম ইসলামী শিল্পকর্ম হয়ে উঠে।

 

                                     মক্কা ও মদীনার ছবি সম্বলিত প্রাচীরপত্র অথবা কাবাশোভিত মানুষের

                                    তৈরি জায়নামাজ ধর্মীয় শিল্পকর্ম; কিন্ত ইসলামী শিল্পকর্ম নয়,

                                    যদিও তাতে পবিত্র স্থাপত্য খচিত থাকে।

 

ধর্মীয় মাহাত্ম্যে অথবা ধর্মীয় উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত সামগ্রী ধর্মীয় শিল্পকর্মের কাতারে পড়ে। ধর্মীয় সকল শিল্প ইসলামী শিল্পকর্ম নয়, তবে ইসলামী শিল্পকর্মের অধিকাংশই ধর্মীয় শিল্পকর্ম-যদিও সম্ভবত তা হয়না। সিরিয়ার কাঠে খচিত আলমারি কিংবা টেবিলে যদিও মদ রাখার জন্য ব্যবহৃত হতে পারে, কিন্ত তাদের জ্যামিতিক নকশায় ইসলামী মেটাফিজিক্স এবং সৃষ্টিতত্তের চমৎকার বাস্তবতা ফুটে ওঠে। মক্কা ও মদীনার ছবি সম্বলিত প্রাচীরপত্র অথবা কাবাশোভিত মানুষের তৈরি জায়নামাজ ধর্মীয় শিল্পকর্ম; কিন্ত ইসলামী শিল্পকর্ম নয়, যদিও তাতে পবিত্র স্থাপত্য খচিত থাকে। ঐতিহ্যবাহী মাকামে কোরআন তেলাওয়াত, এমনকি একই মাকাম ও তালে অনুপ্রাণিত হয়ে কবিতার গানও ইসলামি এবং ধর্মীয় শিল্পকর্ম হয় । অন্যদিকে জাস্টিন বিবারের গানের ইসলামী প্যারোডি অথবা অটো টিউনে করা একসাথে চার কন্ঠে গাওয়া (four-part harmony) acapella কাসিদা গান হয়ত ধর্মীয় হতে পরে, কিন্ত নিশ্চিতভাবে ইসলামী কিংবা পবিত্র শিল্পকর্মের (sacred art) কোনটাই না।

 

সুনির্দিষ্ট এবং নিয়মমাফিক ভাবে ইসলামী  শিল্পকলাকে সংজ্ঞায়ন করা কঠিন হলেও, যারা ইসলামী ট্রাডিশনের অন্যান্য দিকের সাথে পরিচিত তারা খুব সহজেই ইসলামী শিল্পকলা চিনতে পারে। ভিজ্যুয়াল কিংবা সুরেলা কন্ঠে হোক, ইসলামী শিল্পকলা একত্ববাদকে (তাওহীদ) ছড়িয়ে দেয়। যা একসাথে অনুবন্ধন, ঐকতান এবং ছন্দোময়, যেন বহুতায় একতার ছাপ। ইসলামী শিল্পকলায় কোন জিনিসের বাহ্যিক অবয়ব অনুকরণের পরিবর্তে তাদের ভিতরকার এবং আদি বাস্তবতাগুলো ফুটিয়ে তোলা হয়। যার কারনে সংখ্যা (জ্যামিতি) এবং বর্ণের (ক্যালিগ্রাফি) উপর জোড় দেওয়া হয়। আর সংখ্যা ও বর্ণ হল আধার/সময় এবং ভাষার মৌলিক উপাদান। ট্রাডিশনাল ক্যালিগ্রাফিতে জ্যামিতিক অনুপাতের কারনে এমনকি বর্ণের আকৃতি এবং আয়তনও পরিবর্তিত হয়। যার ফলে মুদ্রাক্ষর শিল্পে অসাধারণ সঙ্গতি ফুটে ওঠে।

 ede

  এই ক্যালিগ্রাফী সম্পর্কে জানতেঃ https://goo.gl/h3WEJh 

ইসলামী শিল্পকলা তার অর্থ (মা’আনী) ও কাঠামোর (মাবানী) ক্ষেত্রেও কোরআনের ছাপ বহন করে। অনেক প্রবিত্র গ্রন্থের মত কোরআনের বহু সুরা ও আয়াতের chiastic (এক ধনের সাহিত্যশৈলী) structure আছে।যার অন্ত-পর্ব আদি পর্বকে মুকুরিত করে; উপান্ত্য-পর্ব(অন্তপর্বের আগের পর্ব) দ্বিতীয়পর্বকে মুকুরিত করে;এভাবে কেন্দ্র পর্যন্ত চলতে থাকে।আর কেন্দ্রে মূলভাব বা বার্তা সন্নিবেশিত থাকে। এই ধরনের সুশৃঙ্খল ও বহুমাত্রিক কাঠামোয় আবরিত নিদর্শনশৈলী (chiastic structure) পান্ডুলিপি অলঙ্করন শিল্পের জ্যামিতিক নকশার উপর প্রতিফলন হয়েছে, যে নকশা  দ্বারা কোরআনের পাণ্ডুলিপি অলঙ্কৃত হয়; পাশাপাশি প্রতিফলিত হয়েছে মসজিদ, মাদ্রাসা ও ঘরবাড়ীতে খচিত চৌকুপী অংকনের (tessellation) উপর; এমনকি কোরআন তেলায়তের সুরের (মাকাম) উপরে chiastic structure এর গভীর প্রভাব আছে।

 

ইসলামী শিল্পকলা বিজ্ঞানের প্রবিত্র শাখাসমূহ (sacred science) তথা গনিত, জ্যামিতি, সংগীত, সৃষ্টিতত্ত্বের (cosmology) আন্ত:সম্পর্কের এর উপর দাঁড়িয়ে আছে। এর সাথে মধ্যযুগের খ্রিষ্টীয় ধারনার, ars since scientia nihil est (বিজ্ঞান ছাড়া শিল্পকলার অস্তিত্ব নাই) খুব বেশি একটা তফাৎ নাই।বিজ্ঞানের এই শাখাগুলো হাজারো সৃষ্টিকে সৃষ্টিকর্তার একত্ববাদের সাথে মিলাতে পারে এবং সৃষ্টির বহুত্বকে গুনবাচক, প্রতীকী, পাশাপাশি সংখ্যাবাচক আকারে প্রকাশ করে থাকে। এরিস্টটল দর্শনকে তিনভাগে ভাগ করেছেন। যথা:পদার্থবিদ্যা, গণিতশাস্ত্র এবং ধর্মতত্ত্ব (ইলাহিয়্যাহ)। পদার্থবিদ্যা প্রাকৃতিক বা বস্তু নিয়ে কাজ করে। ধর্মতত্ত্ব আল্লাহকে নিয়ে চিন্তা করে। আর গণিতশাস্ত্র আসমানি জগত এবং পার্থিব জগতের মাঝখানে থাকা মধ্যবর্তী, অবচেতন এবং কল্পনার জগত (বারযাখ) নিয়ে চিন্তা করে। গণিতশাস্ত্রের মধ্যে জ্যামিতি ও সংগীত আলোচনা হয়ে থাকে। যেহুতু, জ্যামিতি হল আধারের (space) সংখ্যা, যা সংখ্যাকে চাক্ষুষ আকারে প্রকাশ করে; আর সংগীত হল সময়ের সংখ্যা, যেখানে সংখ্যা সুরের ছন্দে ছন্দে বহিঃপ্রকাশ হয়। ইসলামী শিল্পকলায় বারযাখ বা মধ্যবর্তী জগত নিয়ে আলোচনা করা জ্ঞান চর্চা হওয়ার কারনে, ইসলামী শিল্পকলা পার্থিব জগত থেকে আসমানি জগতে, প্রত্যক্ষ জগত থেকে আধ্যাত্মিক জগতে নিয়ে যাওয়ার সিঁড়ি হিসেবে কাজ করে থাকে। পাশাপাশি বারযাখের জগত নিয়ে আলোচনা করা জ্ঞানের ভিত্তি ইসলামী মেটাফিজিক্স এবং আধ্যাত্মিকতায় থাকার ফলে, শিল্পীরা অতি সহজেই আধ্যাত্মিক  সত্য ও বাস্তবতাকে তাদের শিল্পকর্মে ফুটিয়ে তুলতে পারে।

 oud

মাকাম বা স্কেল শিক্ষার অত্যাবশ্যকীয় অনুষঙ্গ 'উওদ (https://en.wikipedia.org/wiki/Oud)  

প্লেটো সৌন্দর্যকে সত্যের প্রভা হিসেবে তুললা করেছেন। সৌন্দর্য এবং কদর্যতা এর মাঝে ফারাক করতে না পারা; আর সত্য এবং মিথ্যার মাঝে ফারাক করতে না পারা এক জিনিস এবং একে অপরের সহগামী। সুরেলা ধ্বনি এবং জ্যামিতিক আকৃতি আত্মিক প্রশান্তি দান করে এবং আল্লাহর কথা স্মরন করিয়ে দেয়। ফলে সত্য সৌন্দর্য একসাথে নিরবধি এবং অদৃশ্যের সৌন্দর্যকে প্রতিবিম্ব করে। মিথ্যা সৌন্দর্য তথা কদর্যতা ক্ষণস্থায়ী, বেসুরো এবং অসামঞ্জস্য । মিথ্যা সৌন্দর্য বিশৃঙ্খলা, নরক এবং নিচু মন-মানসিকতার প্রতিনিধিত্ব করে, যা ভারসাম্যহীনতা এবং অমনোযোগীতার (গাফলাহ) দিকে ঠেলে দেয়। কদর্যতা সৃষ্টির অস্বচ্ছ বাস্তবতা প্রকাশ করে, যা আসমানি সৌন্দর্যকে অবগুণ্ঠন করে। আর সত্য সৌন্দর্য সৃষ্টির স্বচ্ছ বা প্রতিবিম্ব বাস্তবতা প্রকাশ করে, যার মাধ্যমে সৃষ্টিসমূহ আমাদের সামনে আল্লাহর নিদর্শন হিসেবে প্রকাশিত হয়।

 (চলবে) 

 মূল লেখাঃ https://renovatio.zaytuna.edu/article/the-silent-theology-of-islamic-art 

 প্রাসংগিক ভিডিও লেকচারঃ https://www.youtube.com/watch?v=iA7Z31n0Aag 

https://www.youtube.com/watch?v=qi3jyhYORRc 

১০টি মন্তব্য

নাজমুস সাকিব নির্ঝর
০৩ জানুয়ারি ২০১৮

এরকম একটা লেখার জন্য বসে ছিলাম বহুদিন। শিল্প ও স্থাপত্য মানুষের মনঃজগতে উপনিবেশ তৈরী করতে পারে!

ওবায়দুল্লাহ মনসুর
০৫ জানুয়ারি ২০১৮

 

         অনুবাদকের শ্রমসাধ্য প্রচেষ্টা ও আন্তরিকতাকে শ্রদ্ধা জানিয়েও 'ইসলামী শিল্পকলার নির্বাক থিওলজি'-র মূল লেখকের অভিসন্দর্ভ বা প্রদত্ত ভাষণকে, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত, প্রচন্ড মুর্খতার পরিচয় বলেই মনে হয়েছে। লেখকের রচনার সেটিং, ভিত্তিহীন দলিল-উপস্থাপনা এবং চাকচিক্যময় শৈলী ও তসবির নির্ভর এ অধ্যাস-প্রক্রিয়া পাঠচক্রের মতো ভারসাম্যপূর্ণ আসরে বেমানান।

         তার লেখার প্রথম প্যারাগ্রাফ পড়ে দ্বীনের মৌলিক জ্ঞানের অধিকারী যে-কারো পক্ষে একথা অনুধাবন করতে কোন অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে, লেখক কোরান-সুন্নাহ প্রদর্শিত পদ্ধতিকে দ্বীনের দাওয়াতের জন্য অকার্যকর মনে করার প্রয়াস পেয়েছেন এবং তার স্ব-আবিষ্কৃত পদ্ধতিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। এ থেকে পাঠকমনে প্রশ্ন জাগে লেখক কি মুসলিম পারস্পেক্টিভ থেকে কথা বলছেন, নাকি অমুসলিম পার্স্পেক্টিভ থেকে কথা বলছেন। কি তার পরিচয়?    

 

ওবায়দুল্লাহ মনসুর
০৫ জানুয়ারি ২০১৮

 

         রাসূলুল্লাহ (সাঃ) যেখানে জাঁকজমকপূর্ণ মসজিদ নির্মাণকে কেয়ামতের আলামত হিসেবে বর্ণনা করেছেন, লেখক সেখানে জাঁকজমকপূর্ণ মসজিদসমূহের দেয়ালে অঙ্কিত কারুকাজ সমূহের বিশেষ প্রয়োজনীয়তা প্রমাণ করার প্রয়াস পেয়েছেন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) প্রাণীচিত্রকে সম্পূর্ণ হারাম ঘোষণা করে চিত্রশিল্পীদেরকে ভর্ৎসনা করেছেন। কোরআন পাকে ও হাদীসে অতীতের জাতিসমূহ কিভাবে ললিতকলা চর্চার দ্বারা বুত পূজায় নিমজ্জিত হয়েছিল সেই কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। এজন্যে দ্বীনের আলেমগণ কঠিন বিধি-নিষেধের মাধ্যমে চিত্রশিল্পকে নিরুৎসাহিত করেছেন । যে কারণে চিত্রশিল্পের মাদ্রাসা-ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়নাই। 

 

ওবায়দুল্লাহ মনসুর
০৫ জানুয়ারি ২০১৮

 

অবশেষে তার হাইপোথিসিসের স্বপক্ষে (খোলাফায়ে-রাশেদীন, সলফে-সালেহীন অর্থাৎ রাসূল (সা)কর্তৃক 'সাক্ষ্যপ্রদত্ত কালসীমা'-র মধ্যে কোন যুক্তি খুঁজে না পেয়ে), ১১৬৫ সালে স্পেনে জন্মগ্রহণকারী, মহিউদ্দীন ইবনে আরবীকে দলিল হিসেবে অপব্যবহার করে ললিতকলা ও স্থাপত্যের দ্বারা অদৃশ্য-জগতের (ইমান বিল গায়েব) ঈন্দ্রীয়গ্রাহ্য চিত্রণকে আল্লাহর একত্ব প্রমাণের নিমিত্ত বলার প্রয়াস পেয়েছেন। মহিউদ্দীন ইবনে আরবীর কোটেশনের, “জেনে রাখ তুমি নিজেই একটা imagination মাত্র। এবং যা তুমি কল্পনা কর এবং এমনকি নিজেকে বল যে, এটা আমার কল্পনা না সমস্তকিছুও একটা imagination। 

 

ওবায়দুল্লাহ মনসুর
০৫ জানুয়ারি ২০১৮

সুতরাং তামাম জগৎটার অস্তিত্ব হল imagination এর মধ্যে imagination।” বরাত দিয়ে নিজের লেখার ভিত্তি স্থাপন করেছেন এভাবে - "যেহেতু imagination এর মাধ্যমেই সৃষ্টির নিদর্শনাদি দৃষ্টিগোচর হয়সেহেতু আমরা এর মাধ্যমেই সৃষ্টির মূল উৎস ও অর্থ সন্ধান লাভ করতে পারি এবং আসমানি জগতের প্রকাশিত নানা হাকিকত চিনতে পারিসেই সাথে imagination এর মাধ্যমে এদের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করতে পারি।" 

ওবায়দুল্লাহ মনসুর
০৫ জানুয়ারি ২০১৮

 

উপরোক্ত কথাগুলো বিশ্বমানবতার হেদায়েতের নিমিত্ত প্রেরিত 'সুস্পষ্ট পাঠযোগ্য কেতাব' (কিতাবুম মুবীন) ও রাসূল (সা) প্রদর্শিত পার্থিব ও পরকালীন জগতের শিক্ষার পাশাপাশি কল্পনা-নির্ভর (imagination তথা নফস-নির্ভর) এক প্যারালাল অন্ধকার-সুড়ঙ-পথ উন্মুক্ত করে দেয়, যা অধ্যাসবাদি চিন্তকদের ভ্রষ্টাচার চর্চার ক্ষেত্র সুগম করে মাত্র, তাওহীদ বা 'দ্বীনে হক' এর সমর্থন নয় ( কেননা মহান আল্লাহর কাছে দ্বীন হিসেবে ইসলাম ছাড়া আর কিছু গ্রহণযোগ্য নয়)।

 

ওবায়দুল্লাহ মনসুর
০৫ জানুয়ারি ২০১৮

লিখিত ভাষণের ওয়ায়েযের গুরু মহিউদ্দীন ইবনে আরবীর কথা অনুযায়ী মানুষ নিজেকে এবং তার আবাসস্থল পৃথিবীকে imagination (কল্পনামিথ্যাভুলহিসেবে মেনে নিলে শেষ বিচার-দিবসে পুনরুত্থিত মানুষের ব্যাপারে পৃথিবীর জীবনের কৃত-কর্মের (আমলেরকি হবেযে জীবনের কোন অস্তিত্বই নেইসেই জীবনের উপর ভিত্তি করে কর্মের পাপ-পূণ্য অর্থাৎ শাস্তি ও পুরস্কার (যা আমাদের ঈমানের মৌলিক বিষয়নির্ধারিত হবে কি করে (নাউজুবিল্লাহ)?  

ওবায়দুল্লাহ মনসুর
০৫ জানুয়ারি ২০১৮

অথচ মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেছেন, "অতঃপর যে ব্যক্তি বিন্দু পরিমাণও নেক-আমল করে থাকবে, সে তা দেখতে পাবে। এবং যে ব্যক্তি বিন্দু পরিমাণও বদ আমল করবে, সেও তা দেখতে পাবে।' (সূরা যিলযাল - আয়াত ৭, )

 

ওবায়দুল্লাহ মনসুর
০৫ জানুয়ারি ২০১৮

 

এখানে বলা অপ্রাসঙ্গিক হবেনা যে, মহিউদ্দীন ইবনে আরবী তার 'ফুসুস আল হিকমা' ও 'ফুতুহাত আল মাক্কিয়া' গ্রন্থদ্বয়ে সৃষ্টি জগতকে সৃষ্টি-কর্তার 'অংশ' হিসেবে ব্যক্ত করেছেন। হযরত নুহ (আ)ও হুদ (আ)-এর জাতির প্রতিমা-পূজাকে (যে কারণে তারা আল্লাহর গযবে আপতিত হয়ে ধ্বংস হয়েছিল) শিরক না বলে বরং তা আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের গুরুত্বপূর্ন উপায় হিসেবে চিহ্নিত করার দৃষ্টতা দেখিয়েছেন। দ্বীন-ইসলামের এহেন মৌলিক-আকিদার সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থান এবং বিভ্রান্তিকর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের কারণে মহিউদ্দীন ইবনে আরবীর উপর শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়ার (রহ) 'কাফের' ফতোয়া রয়েছে।

 

 

ওবায়দুল্লাহ মনসুর
০৫ জানুয়ারি ২০১৮

 

ইসলামী শিল্পকলা বিষয়ে, বরং নন-মুসলিম গবেষক, Titus Burckhardt তার 'The Void in Islamic Art' প্রবন্ধে ইসলামের মূলনীতিগুলোকে সুস্পষ্ট করেছেন। Titus Burckhardt -এর রচনায় কোন দুরভিসন্ধির ইঙ্গিত মেলেনা। কিন্তু আলোচ্য রচনায় (ভাষণের) মূল লেখকের বিষয়গত মৌলিকজ্ঞানের অভাব, প্রচার-কার্যে দায়িত্বজ্ঞানহীনতা বা 'ভান' এর কারণে এই প্রকাশনা ইসলামের মূল চেতনার সঙ্গে সকরুণ ভাবে সম্পর্কহীন বিবেচনায় পরিত্যাজ্য হয়েছে।