অনুবাদ

ইসলামী শিল্পকলার নির্বাক থিওলজি (শেষ পর্ব)
ইসলামী শিল্পকলার নির্বাক থিওলজি (শেষ পর্ব)
অনুবাদ করেছেন তাহসিন বিন বাশার
০৮ জানুয়ারি ২০১৮

 মূলঃ অলুদামিনি অগুন্নাইক, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রিলিজিয়াস স্টাডিজ এ পিএইচডি, বর্তমানে কলেজ অফ উইলিয়াম অ্যান্ড ম্যারি তে অধ্যাপনায় রত। অলুদামিনি অগুন্নাইক এর গবেষণার আগ্রহের বিষয় হচ্ছে ইসলামী দর্শন, তাসাউফ, শিল্পকলা এবং আফ্রিকা। 

প্রথম পর্ব পড়তে ক্লিক করুন এখানে

 

ইসলামী শিল্পকলার দুই স্রোতধারা

 

কবিতার ছন্দ এবং ভাঁজ পড়া চামড়া, এ দুজায়গায় সৌন্দর্যের সন্ধান মিলে।

-আমীর আব্দুল কাদীর আল-জাযারী

 

ইসলামী শিল্পকলা অনেক এবং নানারকমের হলেও মোটামুটি সাহিত্য (The arts of adab) এবং বসবাসের জন্য শিল্পকলা (The arts of ambiance ) এ দুটি পরিসরে ভাগ করা যায়। সাহিত্য হচ্ছে ভাষার শিল্প (The arts of language) আর বসবাসের জন্য শিল্পকলা (The arts of ambiance) মানুষের বসবাসের পরিবেশ তৈরি করে। যেমন:পোষাক, স্থাপত্যকর্ম, নগর নকশা এবং সুগন্ধি। প্রাক উপনিবেশ মুসলিম দুনিয়ায় উভয় পরিসরের শিল্পকলা চর্চা প্রায় সর্বব্যাপী ছিল। উভয় ধরনের শিল্পকলা শুধুমাত্র পন্ডিতদের জন্য নয়, বরং সকল মুসলিমদের শিক্ষার অংশ হিসেবে ছিল। বস্তুত সকল আলেমরা কবিতা পড়তেন, কবিতা থেকে উদ্ধৃতি দিতেন এবং নিজেরাও  লিখতেন। তাদের অনেকেই ছিলেন জ্যামিতি বিশারদ; কেউ ছিলেন স্থপতি; আর বাকীরা ছিলেন আল ফারাবী এবং আমির খসরুর মত বিখ্যাত সঙ্গীত বিশারদ। এমনকি যেসব আলেমরা দক্ষ শিল্পী ছিলেননা, তারা নিজেরা সাহিত্যকলা আদব শিখাতেন এবং চর্চা করতেন। এবং তারা নিজেদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সৌন্দর্যবর্ধন করার জন্য The arts of ambiance শিক্ষা দিতেন। ইসলামী  স্থাপত্যকলা সেরা সেরা স্থাপত্যেকর্মের মধ্যে বেশ কিছু মাদ্রাসা আছে। যেমন:ফেজের বো ইনানিয়া এবং সমরকন্দের উলুগ বেগ। কারন, বলা বাহুল্য যে, স্থাপত্যকলা আত্মাকে পরিচর্যা করে ও পরিপুষ্ট করে, বুদ্ধিশক্তিকে আলোকিত করে এবং অন্যান্য ইসলামী জ্ঞানের বিকাশ ঘটায়। তাছাড়া, The arts of adab এবং ambiance শুধুমাত্র মসজিদ, মাদ্রাসা এবং রাজপ্রাসাদের জন্য সীমাবদ্ধ ছিলনা। বরং শিল্পকলার কারনে শহর এবং বসতবাড়ির রূপ-কাঠামো পরিবর্তন হয়ে যেত। ঘড়ের ব্যবহৃত জিনিশপত্রের কথা নাই বলা হল। পোষাক-পরিচ্ছেদ থেকে শুরু করে, কবিতা, গান এবং এমনকি মুখঃনিসৃত হৃদয়ছোয়া বাগধারাটিও শিল্পকলা দ্বারা নিরূপিত হত। আনন্দ কুমারাস্বামী চিরাচরিত সমাজ নিয়ে মন্তব্য করেন, শুধুমাত্র শিল্পীরাই বিশেষ ধরনের মানুষ ছিলেননা, বরং প্রতেকটা মানুষ একেকজন বিশেষ শিল্পী ছিলেন।

 

‘আদব’ শব্দের অর্থ করাটা অনেক কঠিন কাজ। আদব শব্দের অর্থ একসাথে প্রথা, সংস্কৃতি, শিষ্টাচার, নৈতিকতা, ভদ্রতা, সৌজন্যবোধ এবং সভ্য, পাশাপাশি সাহিত্য। আদব থাকতে হলে কারো সুপণ্ডিত ও শিক্ষিত হতে হবে, আচার-ব্যবহার ভালো হতে হবে, মার্জিত বা রুচিসম্পন্ন হতে হবে এবং সবাইকে তাদের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়ার মত প্রজ্ঞা থাকতে হবে। সাহিত্যের নাম আদব এ জন্য রাখা হয়েছে যাতে করে আদবের বৈশিষ্ট্যগুলো পাঠকদের মধ্যে অনুশীলন হয়। নবীর লালিত্য এবং বাগ্মিতা কায়দায় ট্যাডিশনাল রীতিতে ইসলামী সাহিত্য পড়লে যে কারো আত্মা, বুদ্ধিমত্তা, কথাবার্তা, ব্যবহার নতুন রূপ পায় এবং পরিশুদ্ধ হয়।

 বেন ইউসুফ

আলী বেন ইউসুফ মাদরাসার দেওয়াল

রাসুল এর স্ত্রী হযরত খাদীজা (রাঃ) রাসুলকে ﷺ “জীবন্ত কোরআন” বলতেন। আর The arts of adab  ঠিক এমন চরিত্র গঠনে প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। বস্তুত ইসলামী সকল সাহিত্যকর্ম কোনো না কোনো ভাবে কোরআনের তর্জমা। এমনকি আবু নু’আস কিংবা আল-মুতানাব্বীর অশ্লীল কবিতাগুলোও ভাষা, চিত্রকল্প, বাগধারা এবং ছন্দে ওহীর ছাপ বহন করে। আল-জাহিয, আল-হারীরী, নিজামী এবং সাদী, এদের পরিশীলিত সৃজনশীল সাহিত্য কেবল ভাষাকে শানিত করেনা; পাশাপাশি পাঠকদের বুদ্ধিমত্তা এবং নৈতিক শক্তিকে শানিত করে। ইখওয়ানুস ছফা, ইবনে সিনা, সোহরাওয়ার্দী এবং ইবনে তোফায়েলদের দার্শনিক রুপকধর্মী রচনা কোরআনের কাহিনী এবং কল্পিত বিষয়কে ফুটিয়ে তুলে। যা একসাথে কল্পনাশক্তি ও বুদ্ধিমত্তাকে অনুপ্রাণিত করে এবং এদের মাঝে মিলবন্ধন তৈরি করে। আধ্যাত্মিক সাহিত্যকর্মে কোরআনের প্রভাব আরো স্পষ্টভাবে লক্ষণীয়। যেমন: জালালুদ্দীন রুমীর মসনবি, ফরিদ-উদ-দ্বীন আত্তারের মানাতিক-আল-তাইর, ইবনে আতাইল্লাহর হিকাম এবং আল-বুসীরী, হাফিজ, ইবনুল ফরিদ, ইউনুস এমরে, আমীর খসরু, হামজাহ ফানসুরী, শায়েখ আহমাদু বাম্বা, শায়েখ ইবরাহীম নিয়াসী সহ আরো অনেকের কাব্য। এসব সাহিত্যকর্ম অর্থে, গঠনে, রচনাশৈলীতে এমনকি ধ্বনিতেও কোরআনকে ঘনিষ্ঠভাবে মুকুরিত করে। এসব সাহিত্যকর্ম উপহ্রদের মত যা কোরআনের মহাসগরে গিয়ে মিলিত হয় এবং আসমানি জগতের বাস্তবতার দরজা খুলে দেয়। সাহিত্যকর্ম আমাদেরকে কোরআনের কাছাকাছি নিয়ে আসে এবং কোরআনকেও আমাদের কাছে নিয়ে। সাহিত্য আমাদেরকে নানা অর্থ থাকা কোরআনের আয়াত বুঝতে ও ব্যাখা করতে শেখায়; বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে আয়াত এবং ঘটনা চিন্তা এবং ব্যাখ্যা করতে শিক্ষা দেয়; আমাদেরকে অর্থের গভীরতায় ডুব দিয়ে মনি-মুক্তা নিয়ে আসতে প্রশিক্ষণ দেয় এবং সাহিত্য আমাদেরকে কোরআন ও সুন্নাহ বুঝতে এবং সমুন্নত রাখতে উজ্জীবীত করে। এককথায় সাহিত্যকর্ম মূলত আদাব এরই চর্চা করে।

 

ইসলামের ইতিহাস জুড়ে দেখা যায়, অধিকাংশ মুসলিমরাই  কবিতা ও সাহিত্যকর্মের মাধ্যমে অধিবিদ্যা, সৃষ্টিতত্ত্ব এবং নীতিশাস্ত্র শিখতেন। দক্ষিন এশিয়ার একজন মুসলিম নবাবের অনুতাপকে প্যারাফ্রেইজ করলে এমন হয় “যখন আমরা সাদীর গুলিস্তা পড়া বন্ধ করে দিয়েছি তখন আমরা আমাদের সংস্কৃতি এবং ধর্মের বাস্তব অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলেছি”। আমাদের দাদা-দাদীরা এবং পূর্বপ্রজন্মের মুসলিমদের অধিকাংশরাই কবিতা ও সাহিত্যকর্ম পড়ে এবং মুখস্থের মাধ্যমে জানতেন, কিভাবে কোরআন ও সুন্নাহ বুঝতে, চর্চা করতে এবং সমুন্নত রাখতে হয়। যদিও তারা পড়তে পারতেন না কিংবা লিখতে পারতেন না। অষ্টম শতাব্দীর (হিজরী দ্বিতীয় শতাব্দী) আলেম এবং মুহাদ্দিস ইবনে মুবারক (র:)এর একটি বানী আজকের প্রেক্ষাপটে খুব সত্য মনে হয় “আমাদের অনেক বেশি হাদীস শিখার চেয়ে অনেক বেশি আদব শিখা জরুরি।”

 

ট্রাডিশনাল মাদ্রাসাগুলো আদাব শিক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি arts of ambienceও শিক্ষা দিয়ে থাকে। প্রথাগতভাবেই সুন্দর পরিবেশে ইসলামী জ্ঞান শিক্ষা দেওয়া হয়। চৌখুপি অঙ্কনে অলঙ্কৃত এবং বিস্তৃত মারাকেশের বেন ইউসুফ মাদ্রাসা অথবা আফ্রিকার সাহেল অঞ্চলে আল্লহার প্রাকৃতিক শিল্পকর্ম, সাধারণ বাওবাব গাছের ছায়ায় ঘেরা মাদ্রাসা। এ ধরনের পরিবেশের গুরুত্ব এবং উদ্দেশ্য আছে। যেহেতু, চারপাশের পরিবেশ চিন্তার উপর গভীর প্রভাব ফেলে। একদিন একটি মরক্কোন দরজায় খচিত দুজোড়া গোলাপ এবং তারা আমাকে আল্লাহর সত্ত্বা এবং তার নামের সম্পর্ক; পাশাপাশি বিশ্বজগতে এবং মানুষের আত্মায় কিভাবে তাদের সম্পর্কের প্রকাশ ঘটে তা অনুধাবন করতে সাহায্য করেছিল। আরো একদিন ফেজের ইনানিয়া মাদ্রাসায় খচিত টাইলসের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আল্লাহর জন্য ব্যবহৃত একটি উপমার অর্থ অনুধাবন হয়েছিল। উপমাটি হচ্ছে, “আল্লাহ হচ্ছেন এমন বৃত্ত যার কেন্দ্র সবর্ত্র, এবং যার কোথাও পরিধি নেই।”

ben yusuf madrasa

মারাকেশের বেন ইউসুফ মাদ্রাসা

 

ইসলামী পরিবেশ তৈরি করা সবচেয়ে সর্বব্যাপী এবং তাৎপর্যপূর্ণ শিল্প হচ্ছে কোরআন তেলাওয়াত। ইসলামী শিল্পকলার সর্বোচ্চ রূপ হচ্ছে কোরআন তেলওয়াত, যার থেকে ইসলামী শিল্পকলার অন্যান্য রূপের বিকাশ ঘটে। তাজবিদ শাস্ত্রের নিখুত শিল্পকলা এবং মাকাম শাস্ত্র (কোরআন তেলয়াতের সুর-তালের ধরন নিয়ে যে শাস্ত্র আলোচলা করে) কোরআনের  ওহীকে সৌন্দর্য এবং জ্যামিতিক রূপে এমনভাবে প্রকাশ করে যেভাবে ওহি রাসুল ﷺ এর কাছে নাযিল হয়েছিল। যখন আমরা কোরআন তেলাওয়াত করি তখন আমরা আসলে ‘আল্লাহর ওহী নাযিল এবং রাসুলের ওহী গ্রহণ’ পক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করি। যার ফলে আমাদের কলবে পরিবর্তনমূলক প্রভাব পড়ে। কোরআন তেলওয়াতের ধ্বনি ইসলামি শহর বা জনপদের ধ্বনিসম্ভারের অবিচ্ছেদ্য অংশ, যার মধুর ধ্বনি প্রায় সবসময় মনকাড়িয়ে নেয়। এর উল্লেখযোগ্য গুরুত্ব আছে। যেহেতু , ইসলামী সভ্যতায় দেখা যায় সত্য (কোরআন যার শেষ্ঠ প্রমান) সব সময় সুন্দরের সহগামী। বস্তুত কোন কিছু ইসলামী হওয়ার জন্য শর্ত হচ্ছে সৌন্দর্য। ইসলামী এমন কিছু নাই যা সুন্দর না। এই স্বতঃসিদ্ধ সত্য সকল ট্রাডিশনাল arts of ambience (যেমন স্থাপত্যকলা ও জ্যামিতিক নকশা, সংগীত এমনকি পোষাক, খাদ্য এবং সুগন্ধি) এর ক্ষেত্রে মূলনীতি হিসেবে ছিল। যেহেতু সংগীত সমসাময়িক পাশ্চাত্য সংস্কৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, তাহলে ইসলামি শিল্পকলা হিসেবে সংগীতের অবস্থানটা কোথায়, তা আন্তরিকতার সাথে তলিয়ে দেখা দরকার।

 inania

ফেজের ইনানিয়া মাদ্রাসার টাইলস

যাদের সংগীত অথবা ইসলাম সম্পর্কে জানাশোনা কম তারাই আত্মবিশ্বাসের সাথে দাবী করে “ইসলামে সংগীত বলতে কিছু নেই”। এমন দাবী করার কারন হল ইসলামী আইনে সংগীতের অবস্থান নিয়ে ঐক্যমতের অভাব। প্রথমত, ইংরেজি পরিভাষা ‘music’ এর সাথে আরবি পরিভাষা ‘musica’র পার্থক্য করা জরুরি। যদিও উভয় পরিভাষা একই গ্রীক শব্দ থেকে আসছে, গ্রীক ভাষায় যার অর্থ হলো (দেবী মিউজেসের শিল্প কলা), কিন্ত উভয়ের অর্থে ও দ্যোতনায় সামন্য পার্থক্য আছে। একজন ইংরেজি ভাষাভাষী কবিতা নামাজ, আজান এবং কোরআনে থাকা ধর্মীয় সুরকে music অথবা musical হিসেবে শ্রেণীভুক্ত করবে। কিন্ত, এসব শিল্পকলাকে আরবি ভাষায় ‘musica’ বলা যাবেনা। কারন আরবিতে  musica বলা হয় তখন, যখন সেখানে বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহারের এবং অ-ধর্মীয় হওয়ার একটা ভাব থাকে। একইভাবে, কিছু সুফী জলশাতে ব্যবহৃত বাদ্রযন্ত্র এবং কণ্ঠসংগীতকে (ইংরেজি ভাষাভাষী লোকদের অর্থে) কদাচিৎ musica বলা হয়। বরং সামা (আধ্যাত্মিক শ্রবণ) কিংবা জিকির (স্মরণ) বলা হয়।

 

তবুও musica কিংবা সামা হোক গানে বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করা ইসলামী  আইনের ধারায় অমিমাংসিত বিষয় হিসেবে রয়ে গেছে। কারন বাদ্যযন্ত্র একদিকে আত্মার উন্নতিসাধন অপরদিকে অধঃপতন ঘটানোর প্রচণ্ড ক্ষমতা রাখে। সাধারণভাবে একটি heavy metal সংগীতানুষ্ঠানের দর্শকের সাথে আন্দালুসিয়ান সংগীতানুষ্ঠানের দর্শকদের আচার-ব্যবহার তুলনা করে দেখেন। যখন অপরাধী বা সৈন্যরা কোনো সহিংসতা ঘটানোর জন্য প্রস্তুতি নেয়, তখন তারা খুব কমই আলি আকবর খানের ভারতীয় উচ্চাঙ্গসংগীত শুনে। ট্রাডিশনাল ইসলামী সংগীত স্মৃতি, শান্তি, তৃপ্তি, আনন্দ, মনোবল, ঐক্য, ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থা এবং সবচেয়ে বিশেষভাবে ভালবাসা এবং আল্লাহর প্রতি তীব্র আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তোলার প্রচণ্ড ক্ষমতা রাখে। সংগীতের প্রাক-বিদ্যমান ধারা ব্যাখ্যা এবং পরিশুদ্ধ করার জন্য ইসলামী দার্শনিকগণ Pythagorean harmonyর মূলনীতির উপর ভিত্তি করে সংগীতের বিশদ তত্ত্ব হাজির করেছিলেন। রাজদরবারের সঙ্গীতবিশারদরা পরিমার্জিত এবং পরিমার্জন সংগীত চর্চা করতেন, যা একসাথে ছিল শ্রবণযোগ্য এবং আদাবসঙ্গত। আর সুফি তরিকারা আধ্যাত্মিক সঙ্গীতের শক্তিশালী ধারা গড়ে তুলেন, যা আত্মাকে ঊর্ধ্ব-জগতে নিয়ে যেতে পারত। যদিও ইসলামী সংগীতের সংস্কৃতিভেদে ভিন্নতা আছে, কিন্ত এদের মধ্যে ইসলামি বিশ্বতত্ত্ব সম্পর্কিত এবং তাওহীদের উপর গুরুত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট মিল আছে। ইসলামি সংগীতের এক ধরনের স্বাভাবিক ছন্দ থাকে, গানের বা অনুষ্ঠানের শেষের দিকে তাল আস্তে আস্তে বাড়তে থাকে শব্দহীন হয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত (যা কেয়ামত হিসেবে সময়ের ত্বরণকে প্রতিবিম্ব করে); ইসলামি সংগীত সবসময় কোরআন তেলাওয়াত বা দুরুদ দিয়ে শুরু হয় এবং একক সুরেলা ধ্বনির স্বাদ থাকে; পাশাপাশি তাওহীদের উপর জোড় দেওয়ার কারনে পাশ্চাত্যের সেরা সংগীতের বৈশিষ্ট্যকেও ( জটিল সুর ও অনেক কন্ঠের সম্মিলন,যেমন:ব্যাচ সংগীত) এড়িয়ে চলে। ইসলামী ট্রাডিশনে দেখা যায়, দক্ষ সংগীতবিশারদের কাছে গান করা হচ্ছে দোয়া করার মত। আর দর্শকাদের কাছে ছিল একাগ্রচিত্তে ফেরেশতা এবং বিশ্বজগতের প্রতি নীরব প্রশংসা শোনা। সাইয়্যেদ হোসেইন নাসের মন্তব্য করেন “ইসলামী সভ্যতা ইসলাম সত্ত্বেও ইসলামের কারনে বিভিন্ন বিখ্যাত সংগীত ধারা অক্ষুণ্ণ রাখতে এবং বিকশিত করতে পারে নাই।”

 ensemble ibn arabi

সংগীত পরিবেশন করছে সমসাময়িক আন্দালুসিয়ান-মরোক্কান গানের দল ফিরকাতু ইবনে আরাবী/Ensemble Ibn Arabi 

একথা মনে রাখা দরকার, শুধুমাত্র অতীতের নয় বর্তমানের ধারাও সংগীত এবং অনান্য ট্রাডিশনাল ইসলামী শিল্পকলার অন্তর্ভুক্ত। এসকল ধরনের শিল্পকলার রূপ প্রাণবন্ত। তারা তাদের স্ব-স্ব রূপের (art form) মৌলিক ইসলামী মূলনীতি থেকে সরে না গিয়ে অবিরামভাবে পরিবর্তন হয়, খাপ খাইয়ে নেয় এবং নতুন নতুন সম্ভাবনা হাজির করে। একই মূলনীতিগুলো শিল্পকলার নতুন রুপ যেমন: আলোকচিত্র, চলচ্চিত্রশিল্প, ওয়েব এবং গ্রাফিক ডিজাইনের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যেতে পারে। চলচ্চিত্রশিল্প মূলত থিয়েটারশিল্প থেকে আসছে। থিয়েটার শিল্প প্রাচীন গ্রিক, খ্রিস্টান এবং হিন্দু সভ্যতায় ছিল, কিন্ত কখনোই মূখ্য ইসলামী শিল্প হিসেবে ছিলনা। কেবল নাটক এবং থিয়েটার শিল্পকর্মগুলোই মুসলিমরা গ্রীক থেকে অনুবাদ করেনাই। যেহুতু ইসলামে ওহী ‘চলমান পরিস্থিতি বিবেচনা করা’র বিষয় প্রকাশ করার উপর প্রতিষ্ঠিত, বরং খ্রিষ্টানদের মত খোদার পুত্রের বীরত্বপূর্ণ আত্মবিসর্জন কিংবা প্রাচীন গ্রীক এবং হিন্দুদের মত খোদাকে মানুষের কাতারে নিয়ে আসার পৌরাণিক কাহিনীর উপর প্রতিষ্ঠিত নয়। মূলত এসব কাহিনীই liturgy (গির্জায় প্রচিলিত বিশেষ উপসনা) এবং passion play তে (ক্রুশবিদ্ধ যিশুখ্রিস্টের যন্ত্রণা-ভোগ ও মৃত্যু নিয়ে রচিত নাটক) পুনরাবৃত্তি করা হত। ইসলামি ট্রাডিশনের তুলনামূলকভাবে অ-পৌরাণিক চরিত্র থাকায় এবং আল্লাহর একত্ববাদ ও সর্বশক্তিমানের উপর জোড় দেওয়ার কারনে ঐশ্বরিক জগতের মধ্যে কিংবা মনুষ্য বীর এবং ঐশ্বরিক মধ্যে নাটকীয় উত্তেজনা টানা হয়েছে। যাহোক,পারস্যের শিয়ারা কারবালার ঘটনা চিত্রিত করে ‘তাজিয়া’ নাটকের বিকাশ ঘটায়। এটি প্রধান প্রবিত্র শিল্পকলা (sacred art) না হলে ও তবু ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় শিল্পকলা। সম্ভবত এর সাথে যেকোনো মুসলিম দেশের চেয়ে ইরানের উন্নত চলচ্চিত্রশিল্পের একটা সম্পর্ক আছে। মাজিদ মাজিদির কিছু চলচ্চিত্র মোটামুটি ভাল করলেও, আমার বিশ্বাস এখনো ইসলামী চলচ্চিত্রশিল্পের কলা উন্নয়ন হয়নি। ইসলামী চলচ্চিত্রশিল্প কেবল ইসলাম বা মুসলিম সম্পর্কিত চলচ্চিত্র না, কিংবা মুসলিমদের তৈরি চলচ্চিত্র না। বরং এর চলচ্চিত্র শিল্পের দর্শন এবং কলাকৌশলের শিকড় ততটা ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গির মূলে থাকবে, ব্রেসেন এর চলচ্চিত্র যতটা খ্রিষ্টধর্মের মূলে থাকে; টেরেন্স মালিকের কাজগুলো যতটা হাইডেগার দর্শনের মূলে থাকে এবং টরস্কির কাজগুলো যতটা রাশিয়ার অর্থোডক্স খিস্ট্রান ধর্ম দ্বারা প্রভাবিত তার নিজের একক মেটাফিজিকাল দৃষ্টিভঙ্গির মূলে থাকে।

 

সকল ইসলামী শিল্পকলা পরম শিল্প তথা আত্মার পরিশুদ্ধকরন, চরিত্রের উন্নতিসাধন এবং আল্লাহর জিকির চর্চা করে থাকে। রাসুল ﷺ বলেন: “আমাকে একমাত্র চরিত্রের সৌন্দর্য পরিপূর্ণ করতে প্রেরিত করা হয়েছে”। সুতরাং ইসলামী শিল্পকলায় “শিল্পকলা কেবল শিল্পকলার জন্য”বা “art for art’s sake” এ ধরনের কোনো প্রশ্ন আসতে পারেনা। যেহুতু সকল ধরনের ইসলামী শিল্পকলার ব্যবহারমূলক, মনস্তাত্ত্বিক এবং আধ্যাত্মিক কার্য আছে। ইসলামী শিল্পকলা বিলাসিতা না; বরং এমন শিল্পকলার চর্চা করে যে শিল্পকলা হচ্ছে ইসলামি আইন, ধর্মতত্ত্ব এবং পুরা ইসলামী ট্রাডিশনের অস্তিত্বের উদ্দেশ্য তথা আল্লাহর স্মরন এবং খলিফা হিসেবে মানবতার ভূমিকার মাধ্যমে মানুষের ও গোটা বিশ্বজগতের সম্পূর্ণ সম্ভাবনা অনুধাবন করা। ইসলামী শিল্পকলায় কদর না দেওয়ার কারনে উম্মাহর ব্যক্তিগত এবং সামষ্টিক উভয়ভাবে এই পরম শিল্পকলা চর্চা করার ক্ষমতা অক্ষম হয়ে গেছে।

 

 শিল্পকলা কি আমাদের অন্তরের আরোগ্য দিতে পারে ?

 

ভ্রাতাগণ জেনে রাখ...,দৃষ্টিগ্রাহ্য জ্যামিতি অধ্যয়নেরর ফলে সকল ব্যবহারগত

শিল্পকলায় দক্ষতা অর্জন হয়,আর বুদ্ধিগ্রাহ্য জ্যামিতি অধ্যয়নের ফলে

বুদ্ধিগ্রাহ্য শিল্পকলায় দক্ষতা অর্জন হয়।সেহুতু, বিজ্ঞান হচ্ছে আত্মার

সত্ত্বা-জ্ঞান লাভ করার অন্যতাম প্রবেশদ্বার এবং সকল জ্ঞানের মূল।

-ইখওয়ানুস সাফা

 

সৌন্দর্যই জগতকে বাচিয়ে রাখবে।

-দস্তয়ভস্কি

 

এই প্রবচনগুলো ইঙ্গিত দেয়, ইসলামী শিল্পকলা হচ্ছে মহাবিশ্ব, ওহী এবং আমাদের আত্মার সত্য জ্ঞান পাওয়ার প্রবেশদ্বার। সুতরাং শিল্পকলার কদর না দেওয়া কেবল আমাদের সৌন্দর্যতত্ত্বের জন্য নয়, বরং আমাদের নৈতিক, বুদ্ধিগত এবং আধ্যাত্মিক জীবনের জন্য চরম দুর্ভাগ্যের বিষয়। ঠিক যেমন খাওয়ার ফলে আমাদের দেহ পরিপূর্ণতা পায়। তেমনিভাবে দেখা, শোনা, পড়া, চিন্তা করার ফলে আমাদের আত্মা পরিপূর্ণতা পায়। তো ইসলামী শিল্পকলার অবস্থা যখন দুর্লভদর্শন, অস্বীকৃতিপূর্ণ এবং অসমাদৃত তখন আমাদের আত্মার কী অবস্থাটা ঘটে?

 

                               ঠিক যেমন খাওয়ার ফলে আমাদের দেহ পরিপূর্ণতা পায়। তেমনিভাবে দেখা, শোনা,

                             পড়া, চিন্তা করার ফলে আমাদের আত্মা পরিপূর্ণতা পায়। তো ইসলামী শিল্পকলার অবস্থা

                             যখন দুর্লভদর্শন, অস্বীকৃতিপূর্ণ এবং অসমাদৃত তখন আমাদের আত্মার কী অবস্থাটা ঘটে?

 

ইসলামী শিল্পকলার চর্চাহীনতার সাথে চরম সাম্প্রদায়িকতার উত্থান, কল্পনাশক্তির অবনতি সহ বহুর মাঝে যে একজনের অস্তিত্ব আছে তা বুঝতে না পারার বিষয়গুলো গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। ট্র্যাডিশনাল ইসলামী সৃষ্টিতত্ত্ব এবং অধিবিদ্যা অনুয়ায়ী সংখ্যাধিক্য এবং বিভিন্নতা আমাদের বহির্জগতের আকারকে নিয়ন্ত্রণ  করে। কিন্ত একজন যত চিন্তা এবং আধ্যাত্মিক জগতের দিকে যেতে থাকে সে তত সংখ্যাধিক্য এবং বিভিন্নতার মাঝে একতা খুজে পায়। যেহেতু আল্লাহ এক, সেহেতু একজন যত ঊর্ধজগতের দিকে অগ্রসর হয়, সবকিছু তত ঐক্যবদ্ধ হয়ে ওঠে। তাই এই একতার জগতে প্রবেশ করতে না পারলে ঐক্য বুঝা যাবেনা এবং ঐক্যবদ্ধ হয়েও থাকা যাবেনা। আর একতা জগতের বাহিরের চেহারার সাথে জগতের আসল বাস্তবতাকে সংযুক্ত করে দেয়। সুতরাং imagination এবং শিল্পকলা হচ্ছে এই দুই জগতের মধ্যকার সেতু।

ইসলামী শিল্পকলার প্রতি যাদের কদর নাই তারা আসলে মরক্কোর আলমোহাদ, মিশরের মামলুক কিংবা সাফাভী আমলের (এসব সম্রাজ্যের সরকারী মাযহাব বা আকীদা যাই হোক না কেন) স্থাপত্যকর্মে ফুটে উঠা গভীর বাস্তবতাগুলো ধরতে পারবেনা এবং সেখান থেকে ‘বরকত’ লাভ করতে পারবেনা। অধিকন্তু, ইসলামী শিল্পকলার গভীর মূলনীতি সম্পর্কে যারা জ্ঞান রাখেন তারা অবশ্যই অনান্য ওহীপ্রাপ্ত ধর্মের পবিত্র শিল্পকলার (sacred arts) মূলনীতির সাথে ইসলামী শিল্পকলার মূলনীতির সাদৃশ্য খুজে পাবেন, যদিও অনান্য ধর্মের শিল্পকলার মূলনীতির প্রকাশের ধরনটা ভিন্ন হয়। ইসলামের মতই ইসলামী শিল্পকলা পূর্ববর্তী অনান্য ধারার প্রবিত্র শিল্পকলাকে নিজের সাথে সমন্বয় করে নেয়; পাশাপাশি এদেরকে স্বীকৃত দেয়। ইসলামী সংগীতের তত্ত্ব এবং মূলনীতির সম্বন্ধে যাদের জানাশোনা আছে তারা অবশ্যই ‘বাস’ সংগীতকে কদর করবে। ঠিক যারা সাহিত্যে(ইসলামী) প্রাজ্ঞবান তারা শেক্সপিয়র অথবা চুয়াং জি এর সাহিত্যে সমাদর করার মত অনেক কিছু খুজে পাবেন। যদিও জগৎকে দেখার মূলনীতির ক্ষেত্রে মুসলীম সংগীতজ্ঞ এবং সাহিত্যিকদের ভিন্নতা আছে।এছাড়াও, ইসলামের পবিত্র জ্যামিতির সম্পর্কে যারা জ্ঞান রাখেন তারা অবশ্যই খুজে পাবেন, একই মূলনীতিগুলো হিন্দু এবং বৌদ্ধ ‘মন্ডল’ চিত্রকলা এবং মন্দিরের ক্ষেত্রে কাজ করছে।

 almohad

মরক্কোর আলমোহাদ

ঠিক একইভাবে মুসলীমদের জ্ঞানী ও শিল্পী ব্যাক্তিরা অন্যান্য সভ্যতার বিজ্ঞান ও শিল্পকলার ধারা নিয়ে চিন্তা করেছেন, কদর করছেন এবং নিজেদের বিজ্ঞান ও শিল্পকলার চিন্তার সাথে সেগুলা সমন্বয় করেছেন। আমাদের পতনের পরিষ্কার আলামত হচ্ছে এসব সৃজনশীল বুদ্ধিবৃত্তিক, শৈল্পিক এবং সমন্বয় করার চর্চা হারিয়ে ফেলা। এ চর্চাহীনতার সাথে বিভিন্ন মুসলিম জনগোষ্ঠী এবং যুগ যুগ ধরে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে থাকা অন্যান্য ধর্মের জনগোষ্ঠীর মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ার সম্পর্ক আছে। কোরআন বর্ণনা করেছে, মানুষকে বৈচিত্র্যতা দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে আল্লাহর একটি সুন্নত এবং তার ইচ্ছা, যাতে করে আমরা সৃষ্টিকর্তার জ্ঞানের মাধ্যমে আমাদের নিজেদেরকে, একে অপরকে, এবং সৃষ্টিকর্তাকে জানতে পারি। যেহুতু আমাদের এখন আর নিজেদের শিল্পকলা, ইতিহাস, ট্রাডিশন, আল্লাহ এবং আমাদের নিজেদের সম্পর্কিত জ্ঞানের সাথে যোগাযোগ নাই, সেহুতু বাস্তবতার সাথে আমাদের কোন সম্পর্ক নাই; পাশাপাশি আমরা সত্য এবং আমাদের ভিন্ন অন্যান্য গোষ্ঠীকে মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছি।

 

মুসলিমদের মধ্যে যারা একটি শিল্পেরও চর্চা করেন তাদের সে শিল্পটি ক্যালিগ্রাফি, কবিতা এবং কোরআন তেলাওয়াতের মত ইসলামী আধ্যাত্মিকতা জাগিয়ে তুলতে পারে। যেকোনো শিল্পেকে সারা জীবন ধরে চর্চায় এবং উৎকর্ষ সাধনে রাখতে হয় এবং শিল্প কোনো বিস্কুট বানানোর চাঁছের মত না, যেখানে উপাদানসমূহ মাপমত না দিলেও হয়। যদি আমরা অন্তরের পরিশুদ্ধকরণ, রাসুলের দেখানো পথে সফর করা, এবং আল্লাহকে জানার ব্যাকুলতাকে নিজেদের একটমাত্র পরিচয় হিসেবে দেখার পরিবর্তে একটা শিল্পচর্চার রূপ হিসেবে দেখি, তাহলে দেখব নানা পথ কিভাবে এক মঞ্জিলে এসে মিশে গেছে। আমার বিশ্বাস, মুসলিম পরিচয়ের একটিমাত্র ধারনার উপর জোড় দেওয়ার পরিবর্তে ইসলাম চর্চাকে একটি শিল্পরূপ হিসেবে দেখলে, হালআমলের ‘তাকফিরী’ মহামারি কমে যাবে।

 

যাহোক, সবকিছু তো আর হারিয়ে যায় নাই বুদ্ধিবৃত্তিক কিংবা নান্দনিক চর্চা একবার বন্ধ হয়ে গেলে, তা পুনঃজারি করা কঠিন। তবে কোরআন বলে, “যিকির করা লোকদের(আহলুজ যিকির) প্রশ্ন কর, যদি তোমরা না জান” (২১:১৭) । যেসকল সমাজে এখনো ইসলামী আধ্যাত্মিকতার রুহানিয়্যাত মজবুত ভাবে জারী আছে, দেখা যায় সেসব সমাজ (যেমন:আফ্রিকা) অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধশালী না হলেও সেখানে শিল্পকলার দারুণ চর্চা হয়। যেহুতু ইসলামী আধ্যাত্মিকতা হচ্ছে রুচির জ্ঞান, তাই তা রুচি (যাওক) পরিশুদ্ধ করে, এবং এর মাধ্যমে আধ্যাত্মিক সত্য ও বাস্তবতা প্রত্যক্ষ করা যেতে পারে। একইভাবে ইসলামী শিল্পকলা আধ্যাত্মিকতা চর্চাকে জারি রাখে এবং পরিশোধন করে। মুসলিমদের মন এবং আত্মার পুনঃস্পন্দন জাগিয়ে দিতে মুসলিমদেরকে দুনিয়াজুড়ে শিল্পকলার নবোন্মেষের দিকে জরুরত দিতে হবে। প্লেটো লিখেছেন: “শিল্পকলা তোমাদের জনগনের দেহ এবং আত্মার পরিচর্যা করবে”। যখন অনেকে ইসলামের ট্রাডিশনকে নিছক আচার এবং বিশ্বাসকেন্দ্রিক নিয়মকানুনের জগতে সঙ্কুচিত করতে চায়, তখন ইসলামী শিল্পকলা ট্রাডিশনের সবচেয়ে গভীরতম জগৎ  ‘ইহসানের’ কথা স্মরণ করিয়ে দেয়; পাশাপাশি পুরা ট্রাডিশনের উদ্দেশ্যর ( উদ্দেশ্য-সর্বোৎকৃষ্ট শিল্পকলা হচ্ছে মানুষের আত্মাকে তার পূর্বাবস্থায় বা ‘ফিতরায়’ ফিরিয়ে আনা, যাতে করে জালাল (মহিমা বা মহত্ত্ব) এবং জামাল (সুন্দর) সিফাত সহ আল্লাহর সকল নাম এবং সিফাত মানুষের অন্তরে প্রতিফলিত হয়) কথা সবার আগে নিয়ে আসার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

 

মূল লেখাঃ https://renovatio.zaytuna.edu/article/the-silent-theology-of-islamic-art 

 প্রাসংগিক ভিডিও লেকচারঃ https://www.youtube.com/watch?v=iA7Z31n0Aag 

https://www.youtube.com/watch?v=qi3jyhYORRc