অনুবাদ

ইসলাম যেভাবে ইউরোপকে তৈরি করছে
ইসলাম যেভাবে ইউরোপকে তৈরি করছে
অনুবাদ করেছেন শাইখ মাহদী
৩০ এপ্রিল ২০১৬

সুদূর অতীতে এই ধর্মটি ভূমধ্যসাগরীয় বিশ্বকে দ্বিখন্ডিত করেছিল। আজকের দিনে এসে এই ধর্মটিই আবার নতুন আঙ্গিকে গড়ছে মহাদেশটিকে।

মোদ্দাকথা, ইসলামই ইউরোপ মহাদেশটিকে বিন্যস্ত করেছিল, আজকে আবার ইসলামই সেটিকে পুনর্বিন্যস্ত করছে।

প্রাচীনকাল কিংবা মধ্যযুগে, ভূমধ্যসাগর বা রোমানদের আদর করে দেয়া নাম Mare Nostrum (আমাদের সাগর) এর চারপাশের স্থলভাগটিকেই ইউরোপ বলা হতো, এবং উত্তর আফ্রিকার কিছু অংশও এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল। আজকের উত্তর আফ্রিকা ঐ সময়গুলোতে ইতালি বা গ্রীসের মতই খ্রিস্টান ধর্মের কেন্দ্রবিন্দু ছিল, বিশেষ করে পঞ্চম শতাব্দীতে সেন্ট অগাস্টিন যে জায়গাটিতে বাস করতেন, সেটি হচ্ছে আজকের দিনের আলজেরিয়া। তবে সপ্তম এবং অষ্টম শতাব্দিতে উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ইসলামের জাগরণের ফলে সেখানে খ্রিষ্টান প্রভাব একেবারেই কমে আসে, যার ফলে মূলত ভূমধ্যসাগরের দুই তীরে দ্বিখণ্ডিত দুইটি সভ্যতার জন্ম হয়, এবং উত্তাল সাগরটি সেখানে দুই পক্ষের মধ্যে শক্তিশালী দেয়াল হিসেবে দাঁড়িয়ে যায়। এবং ঠিক তখন থেকেই, স্প্যানিশ দার্শনিক হোসে ওরতেগা গ্যাস্তের ভাষায় – ইউরোপের ইতিহাস ক্রমশই উত্তর দিকে সরে যেতে শুরু করে।

রোমান সাম্রাজ্যের ভাঙ্গনের পর, এই উত্তরমুখী অভিগমন বা হিজরতের অন্যতম প্রধান দিক হচ্ছে, এ সময়ে জার্মানিক গোষ্ঠী, অর্থাৎ গথ, ভ্যান্ডাল, ফ্রাঙ্ক এবং লোম্বার্ড জাতিগোষ্ঠীর মানুষেরাই আজকের পশ্চিমা সভ্যতার খন্ড খন্ড টুকরোগুলো জোড়া দেবার কাজ শুরু করে, এবং গ্রীক বা রোমান সভ্যতার উত্তরাধিকার এতে অনেক অনেক পরে এসে সংযুক্ত (রেনেসাঁর মাধ্যমে) হয়। আধুনিক ইউরোপীয় সভ্যতার রাষ্ট্রকাঠামোতে আসতে বহু শতাব্দি সময় লাগে। সামন্ততান্ত্রিক কাঠামো ধীরে ধীরে রূপ নেয় কনসেনশুয়াল (অনুমোদিত) আদান-প্রদানের মাধ্যমে স্থাপিত ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য কাঠামোর দিকে, এবং এভাবেই ‘আধুনিক সাম্রাজ্য’গুলোর পতন ঘটে এবং তা রূপান্তরিত হয় জাতীয়তাবাদ এবং গণতন্ত্রে। আর এই স্বাধীনতাগুলোর ফলে সমাজের কর্তৃত্ব নিয়ে নেয় ‘এনলাইটমেন্ট’, বা জাগরণ। যা হোক, উপরের সামগ্রিক বক্তব্যের মোদ্দাকথা হচ্ছে, ইসলাম যখন ইউরোপ মহাদেশকে দ্বিখণ্ডিত করে ফেলে, তখন এর উত্তরাংশেই খুব ধীরে ধীরে জেগে ওঠে আজকের ‘পশ্চিমা বিশ্ব’।

তবে, ইউরোপের গঠনে ইসলামের ভূমিকা স্রেফ শুধুমাত্র ভৌগলিক সীমারেখা টানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না।  ১৯৫৭ সালে প্রকাশিত ‘ইউরোপঃ দ্য ইমারজেন্স অফ অ্যান আইডিয়া’ নামের একটি দুর্দান্ত (তবে কিছুটা ধোঁয়াটে) বইয়ে ব্রিটিশ ঐতিহাসিক ডেনিস হে বলেছিলেন, ঐক্যবদ্ধ ইউরোপের যাত্রা শুরু হয়েছিল মূলত খৃষ্টবাদে ধারণার ওপর ভিত্তি করে (যার উদাহরণ হচ্ছে রোল্যান্ডের গান), কারণ এটিই ছিল ইসলামকে প্রতিহত করবার একমাত্র দৃশ্যমান উপায়, এবং এর পরিণতি আমরা দেখতে পাই ক্রুসেডগুলোতে। ১৯৭৮ সালে লিখা এডওয়ার্ড সাঈদের মাস্টারপিস ‘ওরিয়েন্টালিজম’ এই ধারণাটিকে আরও স্পষ্ট করে তোলে, যেখানে তিনি দেখিয়েছেন ইসলাম মূলত ইউরোপকে তার ‘ইউরোপীয় মূল্যবোধের বিপরীত’ ধারণাগুলো চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, এবং এর মাধ্যমে ইউরোপের সাংস্কৃতিক কাঠামোটি তৈরি করে দেয় ইসলাম। আরও সহজভাবে বলতে গেলে, ইউরোপের আত্মপরিচয়ের ভিত্তিমূলের একটি বড় অংশই তৈরি হয়েছিল তাদের নিজেদের পরিসীমায় মুসলিম আরব বিশ্বের শ্রেষ্ঠত্বের একটি প্রতিবাদ হিসেবে। এই ধারণাটির সত্যতা আমরা ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদের ইতিহাসে দেখতে পাই; যেমন আধুনিক ইউরোপের ইতিহাসে, নেপোলিয়নের কথাই ধরুণ, ইউরোপ প্রথমেই মধ্যপ্রাচ্য দখল করলো, এবং তার নিজেদের জ্ঞানীগুণী শিক্ষিত ব্যক্তি এবং কূটনীতিকদের ইসলামী সভ্যতা স্টাডি করতে পাঠালো; তাদের ভাষায়, এই সভ্যতাটি খুব সুন্দর এবং চমকপ্রদ তবে (সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়) – এটা ইউরোপ থেকে নিম্নমানের।

আজকের পোস্ট-কলোনিয়াল সময়ে, উত্তর আফ্রিকা এবং লেভান্তে গজিয়ে ওঠা স্বৈরাচারী ‘পুলিশ স্টেট’গুলো ইউরোপের এই সাংস্কৃতিক আভিজাত্যের ধারণাটিকে আরও ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে তুলছে। যেহেতু স্বৈরাচারী সরকারগুলো তাদের নিশ্ছিদ্র সীমান্তের ভেতরেই (যে সীমান্তগুলো তৈরিই করেছিল সাম্রাজ্যবাদী ইউরোপের এজেন্টরা) তার দেশের নাগরিকদের ‘বন্দী’ রেখে নিপীড়ন চালাতে পারছে, সুতরাং ইউরোপ আজকে আরবদেরকে মানবাধিকার নিয়ে বড় বড় লেকচার দিতেই পারে; কারণ কোন গণতান্ত্রিক এক্সপেরিমেন্ট চালানোর ঝুঁকি সেখানে নেই যা কিনা ইউরোপ অভিমুখী অভিবাসীদের ঢল নামাতে পারে।  যেহেতু আরব দেশগুলোর মানুষদের এখন কোন মানবাধিকার নেই, সে কারণেই ইউরোপ নিজেকে আজ তাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ এবং অবশ্যই, ‘নিরাপদ’ ভাবতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে।

একসময় ইসলাম যা তৈরিতে সাহায্য করেছিল, আজকের দিনে ইসলাম সেটিকেই আবার ভেঙ্গে গড়তে সাহায্য করছে।  সন্ত্রাসবাদের অপশক্তি আর নিরীহ অভিবাসীদের ঢলে ভূমধ্যসাগরীয় অববাহিকায় ইউরোপের সাথে উত্তর আফ্রিকা এবং লেভান্তকে ঘিরে প্রাচীন সেই ভৌগলিক সীমারেখাটি আবারও জেগে উঠছে। তবে মহাদেশ হিসেবে ইউরোপ এর আগেও অনেক রকম জাতিগোষ্ঠীকেই আশ্রয় দিয়েছিল, এমনকি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভিবাসনের ঘটনাটি ছিল পূর্ব ইউরোপে, মধ্যযুগে – যখন স্লাভ এবং মাগার জাতিগোষ্ঠীর বিপুল সংখ্যক মানুষ ইউরেশিয়ার নিম্নাঞ্চল থেকে মধ্য এবং পূর্ব ইউরোপে সরে যেতে থাকে।  তবে এই জাতিগোষ্ঠীর মানুষেরা সকলেই খ্রিষ্টান ধর্মে দীক্ষিত হয়েছিল, এবং নিজেদের মধ্যে শক্তিশালী সংঘবদ্ধতার ফলে তারা উত্তরে পোল্যান্ড থেকে শুরু করে দক্ষিণে বুলগেরিয়া পর্যন্ত বিভিন্ন রাষ্ট্রের জন্ম দেয়, যা পরবর্তীতে কিছু রক্তাক্ত অধ্যায়ের মধ্যে দিয়ে হলেও ইউরোপের মূল রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অংশে পরিণত হয়ে যায়।  তবে স্নায়ুযুদ্ধের সময়ে যেসব আলজেরিয়ান অভিবাসীরা ফ্রান্সে এবং তুর্কি বা কুর্দি অভিবাসীরা জার্মানিতে চলে যান, তারাই ছিলেন মূলত আজকের এই অভিবাসন ঢলের অগ্রগামী অংশ, যাদেরকে ইউরোপ সহজেই আত্মীকরণ করে নিয়েছিল।

আজকে শত শত মুসলিম (যাদের খ্রিষ্টান হবার নূন্যতম কোন বাসনাই নেই) প্রবেশ করছেন ইউরোপের অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল দেশগুলোতে, এবং ঐ দেশগুলো ভঙ্গুর সামাজিক কাঠামোও হুমকিতে পড়ে গিয়েছে।  যদিও ইউরোপের অভিজাত নেতৃত্ব যুগের পর যুগ ধর্মীয় বা জাতিগত যেকোন শক্তিকে প্রতিহত করবার এক ‘আদর্শিক রেটোরিক’ শুনিয়ে আসছিলেন, কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না, এই ধর্মীয় বা জাতিগত শক্তিই ইউরোপিয়ান দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ বন্ধনকে সুদৃঢ় করে রেখেছে।

তবে যুদ্ধ এবং রাষ্ট্রের অরাজকতার ফলে এখনকার এই অভিবাসীর ঢল ঔপনিবেশিক শাসক এবং তাদের পূর্বেকার কলোনীগুলোর  মধ্যকার ব্যবধান ধীরে ধীরে কমিয়ে এনেছে। এডওয়ার্ড সাঈদ ঠিকই ধারণা করেছিলেন, আজকের এই কসমোপলিটান পৃথিবীতে যেখানে সভ্যতা-সংস্কৃতিগুলোর মধ্যে আদান-প্রদান এবং তুলনামূলক অধ্যয়ন অনেক বেশি, সেখানে ওরিয়েন্টালিজম ধারণাটি ক্রমশই ক্ষয়ে আসছে, যেখানে মূলত একটি সংস্কৃতি অপর একটি সংস্কৃতিকে ডমিনেট করবার মাধ্যমে স্বীকৃতি দিতে চেষ্টা করে। যে সভ্যতা-সংস্কৃতি একসময়ে ইউরোপকে ডমিনেট করতো, সেটির হাত থেকে বাঁচতেই ইউরোপ গড়ে তোলে জাতীয়তাবাদভিত্তিক সাংস্কৃতিক পরিচয়ের এক অলীক প্রাচীর, যার মাধ্যমে জন্ম নেয় অতি বাম এবং অতি ডানপন্থী দলগুলো।

যদিও সকল জাতিগত বা ভৌগলিক বিবাদ-বিসম্বাদের ইতি টেনে ইতিহাসের সমাপ্তি খোঁজা বা এই ধরনের কোন ধারণা এখন ফ্যান্টাসী বলেই মনে হয়, কিন্তু তার মানে এই নয় যে, জাতীয়তাবাদে ফিরে গিয়ে আমাদের এসব সমস্যার সমাধান খুঁজতে হবে। আজকের অভিবাসীদের ঢলের সামনে দাঁড়িয়ে ইউরোপ যে সাংস্কৃতিক শুদ্ধতার অজুহাত দেখিয়ে তাদের থামিয়ে দিতে চায়, সেটা এখনকার এই পৃথিবীতে, যেখানে মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক এবং মিথস্ক্রিয়া অনেক বেশি, এক প্রকার অসম্ভব বলেই মনে হয়।

‘পশ্চিমা বিশ্ব’ বলতে যা বোঝায়, যদি ভৌগলিক সীমারেখার বাইরে এর কোন দার্শনিক বা আধ্যাত্মিক অস্তিত্ব থেকে থাকে, তাহলে সেটি হচ্ছে ইনক্লুসিভ লিবারেলিজম, অর্থাৎ সবাইকে ধারণ করতে পারার সক্ষমতা।  উনবিংশ শতাব্দিতে জ্ঞান-বিজ্ঞানের নব উন্মেষের সামনে দাঁড়িয়ে মানুষ যেমন পুরনো সেই সামন্ততন্ত্রে ফিরে যাবার কথা চিন্তাও করতে পারতো না, ঠিক তেমনি আজকেও আমাদের জাতীয়তাবাদের দিকে ফিরে যাবার কোন অর্থ হয় না, যদি না আমরা নিজেরাই নিজেদের ওপর কোন বিপদ ডেকে আনতে চাই।  বিখ্যাত রাশান বুদ্ধিজীবি আলেক্সান্দার হারজেন বলেছিলেন, ইতিহাস কখনো পিছন ফিরে তাকায় না; ইতিহাসে যা যত পুরনো ঋণশোধ বা পিছুটান দেখা যায়, এর সবকিছুই আসলে মুখোশ।

এখন, সভ্যতার দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশ্ন এসেই যায়, তাহলে ‘রোম’কে প্রতিস্থাপন করতে যাচ্ছে কে? সাঈদ দেখিয়েছিলেম, যদিও এই সাম্রাজ্যের অনেক দোষত্রুটি ছিল, তারপরেও ভূমধ্যসাগর-কেন্দ্রিক এক বিশাল সাম্রাজ্য শাসন করা এবং এর বিভিন্ন সমস্যাদি সমাধানের ক্ষমতাও সেই ‘রোমান এম্পায়ার’ এর ছিল, যা এখন আর কারও নেই।

আজকের ইউরোপকে তাই অবশ্যই মুসলিম বিশ্বকে আপন করে নেবার মত কিছু ডায়নামিক পথ খুঁজে বের করতে হবে, তবে অবশ্যই ইউরোপের স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে, অর্থাৎ আইনের শাসনভিত্তিক কাঠামো যার উৎপত্তি ছিল উত্তর ইউরোপে, যে ব্যবস্থায় মানুষের ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকার এবং দায়বদ্ধতা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পায়।  যদি এই সভ্যতা সার্বজনীন মূল্যবোধের দিকে না এগুতে পারে, তাহলে এটি রয়ে যাবে এক জরাগ্রস্থ আদর্শ এবং কঠোর জাতীয়তাবাদের এক ঠুনকো ফাঁপা দেয়াল হিসেবে। আদতে যা ইউরোপ মহাদেশে ‘পশ্চিমা সভ্যতা’র বিদায় ঘন্টা বাজিয়ে দেবে।

 

দি আটলান্টিকে প্রকাশিত ROBERT D. KAPLAN এর How Islam Created Europe:  In late antiquity, the religion split the Mediterranean world in two. Now it is remaking the Continent. Robert David Kaplan (born June 23, 1952 in New York City) is an American author of many books on politics primarily foreign affairs and travel, whose work over three decades has appeared in The Atlantic, The Washington Post, The New York Times, The New Republic, The National Interest, Foreign Affairs and The Wall Street Journal, among other newspapers and publications.