অনুবাদ

উদঘাটনঃ সেব্রেনিতসার পতন এবং গণহত্যার নেপথ্যে পশ্চিমা বিশ্বের ভূমিকা
উদঘাটনঃ সেব্রেনিতসার পতন এবং গণহত্যার নেপথ্যে পশ্চিমা বিশ্বের ভূমিকা
অনুবাদ করেছেন পাঠচক্র ডেস্ক
১১ সেপ্টেম্বর ২০১৫

সেব্রেনিতসার গণহত্যা

 

আজ থেকে ২০ বছর আগে সেব্রেনিতসার পতনের মধ্যে দিয়ে শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের মাটিতে সংঘটিত সব থেকে বৃহত এবং ঘৃণিত এক হত্যাযজ্ঞ। এটি খুব বিস্ময়কর নয় যে এই গণহত্যা  বিশ্বের তিন পরাশক্তি মার্কিন, ব্রিটিশ এবং ফরাসি সরকারের পররাষ্ট্রনীতির জন্য ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার।

১৯৯৫ সালের জুলাই মাসে সেব্রেনিতসা শহরটিকে ঘোষণা করা হয় জাতিসঙ্ঘ শান্তিরক্ষী বাহিনির অধীনে একটি “নিরাপদ এলাকা” হিসেবে।  এই ঘোষণার সাথে সাথেই বসনিয়ান-সার্ব ঘাতক বাহিনি ৪ দিন ধরে শহরটিতে অভিযান চালায় এবং তাদের হাতে নিহত হয় আট হাজার নিরপরাধ বসনিয়ান-মুসলিম তরুণ। এই হত্যাযজ্ঞ  কে দ্য হেগ এ অবস্থিত আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল “জেনোসাইড” হিসেবে ঘোষনা করে। ততকালীন বসনিয়ান- সার্ব নেতা রাদোভান কারাদজিচ এবং জেনারেল রাতকো ম্লাদিচ এই গনহত্যার নির্দেশ দানের অভিযোগে অভিযুক্ত হন এবং তারা আজ রায়ের অপেক্ষা করছেন।

ডাচ সেনাবাহিনির ওপরও অভিযোগের দায় বর্তায় কারণ যখন হাজার হাজার বসনিয়ান মুসলিম তাদের সদর দপ্তরে আশ্রয়ের আসায় ছুটে এসেছিল ডাচ সেনাবাহিনি তাদের নির্মমভাবে ফিরিয়ে দেয় এবং যারা আশ্রয় নিয়েছিল তাদেরকে উচ্ছেদ করে। এরপর যখন সার্বিয়ার ঘাতক বাহিনি এই মুসলিমদের হত্যা করছিল  ডাচ সেনাবাহিনির ভূমিকা ছিল নিরব দর্শকের।  

সেব্রেনিতসার পতন এবং এই গনহত্যার ইতিহাস সংরক্ষণের প্রয়াসে করা সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানে উঠে আসে সেব্রেনিতসা পতনের পিছনে পশ্চিমা পরাশক্তিগুলোর নেপথ্য ভূমিকার ইতিহাস। অবমুক্ত তারবার্তা, গুরুত্বপূর্ন সাক্ষাতকার এবং  ট্রাইব্যুনালে প্রদানকৃত সাক্ষ্যপ্রমান থেকে জানা যায় যে মার্কিন, ব্রিটিশ এবং ফরাসি সরকার রাদকো ম্লাদিচের সেব্রেনিতসা দখলের অনেক আগে থেকেই সিদ্ধান্ত নেয় যে সেব্রেনিতসা এবং আরো ২টি জাতিসংঘ ঘোষিত “নিরাপদ এলাকায়” তারা কোন সমর্থন প্রদান করবে না। এই সিদ্ধান্তে কিছুটা মতদ্বৈততা থাকলেও যেকোন মূল্যে আঞ্চলিক শান্তির জন্য তারা সার্বিয়ার কাছে সেব্রেনিতসা সমর্পন করতে সম্মত হয় এবং সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট স্লবোদান মিলোসেভিচের মানচিত্র বাস্তবায়নে সম্মতি প্রকাশ করে।

এই পরাশক্তিগুলো যখন সেব্রেনিতসার মুসলিমদের সার্বদের হাতে তুলে দেয়ার কথা ভাবছিল তখন তারা নিশ্চিতভাবেই  জানত সার্বিয়ার সামরিক বাহিনির অধ্যাদেশ নম্বর ৭ এর কথা যেখানে বসনিয়ান মুসলিমদের চিরস্থায়ী ভাবে জাতিসঙ্ঘ ঘোষিত “নিরাপদ এলাকা” থেকে  উতখাত করার নির্দেশ স্পষ্টভাবে বলা আছে। তারা এটাও জানতেন যে ম্লাদিচ সার্বিয়ার জনসভায় স্পষ্টভাবে বলেছিল, “আমার কাজ হল তাদের (বসনিয়ান মুসলিমদের) সম্পূর্নভাবে উতখাত করা” এবং কারাদজিচ বলেছিল, “আমার সেনাবাহিনি সেব্রেনিতসা দখল করলে সেখানে হাটু পর্যন্ত রক্ত থাকবে।

রবার্ট ফ্রেযার নামের একজন মার্কিন কূটনীতিক যিনি সেখানে একজন আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছিলেন ওয়াশিংটনে জানান যে জাতিসঙ্ঘ ঘোষিত “নিরাপদ এলাকা” সার্বিয়ার কাছে সমর্পণ না করলে সার্বিয়া কোন শান্তিপ্রস্তাবে সম্মতি জ্ঞাপন করবে না। মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা রবার্ট ফ্রেযারের উর্দ্ধতন কর্মকর্তা এন্থনি লেক একটি সংশোধিত মানচিত্র প্রস্তাব করেন যেখানে সেব্রেনিতসাকে সার্বিয়ার হাতে সমর্পণ করার বিষয়টি প্রস্তাব করা হয়। মার্কিন নীতি-নির্ধারণি প্রধান কমিটি সুপারিশ করে যে “ঝুকিপূর্ন এলাকাগুলো” থেকে জাতিসঙ্ঘ শান্তিরক্ষি বাহিনীর  সরে আসা উচিত।

ফ্রান্স এবং ব্রিটেন সম্মতি জ্ঞাপন করে এবং ব্রিটিশ নিরপত্তা সচিব স্যার ম্যালকম রিফকিন্ড মত প্রকাশ করেন যে “নিরাপদ এলাকাগুলোতে আর নিরাপত্তা প্রদান করা সম্ভব নয়”। ম্লাদিচের সেনাবাহিনী যখন সেব্রেনিতসার দিকে অগ্রসর হচ্ছিল পশ্চিমা পরাশক্তিগুলো তখন সেব্রেনিতসার পতন ঠেকাতে সম্পূর্ন ব্যর্থ হয়। ডাচ প্রতিরক্ষা মন্ত্রনালয়ের জেনারেল ভ্যান ডার উইন্ড বলেন যে জাতিসঙ্ঘ সার্বদের থেকে ৩০,০০০ লিটার পেট্রোল সরবরাহ করে তাদের যানবাহনগুলো বধ্যভূমিতে চালিয়ে নিয়ে যাবার জন্য এবং মৃতদেহগুলো গণকবরে ফেলার জন্য।

গণহত্যা যখন পূর্ণউদ্যমে চলছিল তখন প্রভাবশালী পশ্চিমা কূটনীতিকেরা ম্লাদিচ এবং মিলোসেভিচ দুজনের সাথেই দেখা করেন কিন্তু গনহত্যার ব্যাপারে তারা কোন প্রশ্নই উত্থাপন করেন নি। যদিও কিছু অবমুক্ত তারবার্তা থেকে জানা যায় যে মার্কিন গোয়েন্দা বাহিনি সি আই এ  এই হত্যাযজ্ঞ  তাদের স্যাটেলাইট বিমান থেকে সরাসরি পর্যবেক্ষণ করেছিল।

সেব্রেনিতসাকে সার্বদের হাতে ব্রিটিশ, মার্কিন এবং ফরাসি সরকারের পরিকল্পিতভাবে তুলে দেয়ার এই গোপন ইতিহাস উদ্ঘাটন করে সংকলিত করেন Le Monde পত্রিকার সাবেক প্রতিনিধি ফ্লোরেন্স হার্টম্যান। তিনি তার রচিত The Srebrenica Affair: The Blood of Realpolitik নামের একটি গ্রন্থের জন্য  পনের বছর ধরে অনুসন্ধান করে এই তথ্যগুলো সংগ্রহ এবং সংকলন করেন। এর আগে তিনি ২০০০ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত  আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের সাবেক যুগোস্লাভিয়ার পক্ষের আইনজীবির মুখপাত্র হিসেবে কাজ করেন। তার আরেকটি গ্রন্থ Peace and Punishment (প্রকাশকাল ২০০৭) এ তিনি বর্ণনা করেছেন কিভাবে দ্য হেগের আন্তর্জাতিক আদালত  সেব্রেনিতসার গণহত্যা সম্পর্কে বসনিয়ান সরকারকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এবং দলিলপত্র সরবরাহ করতে অসম্মতি জানায় যখন বসনিয়ান সরকার সার্বিয়ার বিরুদ্ধে সেখানে অভিযোগ উত্থাপন করতে চেষ্টা করেছিল। ফলশ্রুতিতে তখন বসনিয়ান সরকার অভিযোগ উত্থাপন করতে ব্যর্থ হয়।

২০০৮ সালের আগস্ট মাসে দ্য হেগের আন্তর্জাতিক আদালত হারম্যানকে গোপনীয়তা লঙ্ঘনের অভিযোগে অভিযুক্ত করে এবং তাকে বিচারের জন্য তলব করে। ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তাকে আদালত অবমাননার অভিযোগে দোষি সাব্যস্ত করা হয় এবং তাকে ৭০০০ ইউরো জরিমানা গুনতে হয়। হার্টম্যান জরিমানার অর্থ পরিশোধ করেন একটি ফরাসি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে কিন্তু আদালত জানায় তারা সেই অর্থ পায় নি এবং এর ফলে তাকে ৭ দিন কারাবাসের শাস্তি দেয়া হয়। আদালত ফরাসি সরকারকে নির্দেশ দেয় হার্টম্যান কে অবিলম্বে সমর্পণ করতে কিন্তু ফরাসি সরকার তা প্রত্যাখান করে।    

 

source: http://www.theguardian.com/world/2015/jul/04/west-true-role-in-srebrenica-massacre-bosnia              

পাঠচক্র ডেস্ক