অনুবাদ

একবিংশ শতাব্দীর ইসলাম এ হাসান তুরাবি কী দিলেন?
একবিংশ শতাব্দীর ইসলাম এ হাসান তুরাবি কী দিলেন?
অনুবাদ করেছেন রাইফ ইফতিখার
২৮ মার্চ ২০১৬

জন ভল, প্রফেসর এমেরিটাস, জর্জটাউন ইউনিভার্সিটি। লেখক হাসান আল তুরাবির ব্যাক্তিগত সুহৃদ ও দীর্ঘদিনের বন্ধু ছিলেন।

এই মার্চের ৫ তারিখে ডঃ হাসান আল তুরাবির মৃত্যুবরণ করার মাধ্যমে  আধুনিক কালে মুসলিম রাজনৈতিক এবং আদর্শবাদী যুগের এক মহীরুহের জীবনাবসান ঘটেছে  । তুরাবি তার জীবদ্দশায় মুসলিম বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় নবজাগরণের একজন স্বতন্ত্র অগ্রপথিক হিসেবে প্রশংসিত হলেও রাজনৈতিক ইসলামের  কর্তৃত্বের বাতাবরণে  ইসলামকে বেঁধে ফেলার চেষ্টার অভিযোগে প্রবল সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছিলেন । তার অর্ধ শতাব্দীব্যাপী ক্যারিয়ারে একজন সফল মুসলিম রাজনৈতিক ব্যাক্তিত্ত এবং আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গী সম্বলিত একজন ধর্মীয় চিন্তাবিদ হিসেবে ইসলামী দুনিয়ার মূলধারায়  তার অবদান অনস্বীকার্য ।  তাই তুরাবির রাজনৈতিক জীবন এবং বুদ্ধিভিত্তিক জীবন উভয়ই তার অবদানের মাত্রা নির্ধারণ ও জীবনস্মরণের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয়।

জীবদ্দশায় মূলত অন্য অনেকদিকে তিনি দ্যুতি ছড়ালেও সাধারণত তার রাজনৈতিক জীবনের জন্যে তিনি বহুল প্রচারিত । বিদেশফেরত এক জন ছাত্র হিসেবে তার দেয়া প্রথম বক্তৃতা সুদানের রাজনৈতিক মহলে কাঁপন ধরায় এবং শেষ পর্যন্ত ১৯৬৪ সালে বেসামরিক বিপ্লবের মাধ্যমে সামরিক স্বৈরাচারী শাসকের পতনের মঞ্চ তৈরিতে উদ্ধুধ করে । তুরাবির জীবনের শুরুর অধ্যায় এমনি । তুরাবি তার জীবনে স্বৈরাচারী এবং বেসামরিক সরকার উভয় ক্ষেত্রেই কাজ করেছেন এবং  বহু রাজনৈতিক দল মতের নেতৃত্ব দিয়েছেন । জীবনের অনেক সময়ে তিনি কারাগারে কিংবা নির্বাসনে থাকার পাশাপাশি  সরকারের বিভিন্ন স্থানগুলোতেও দায়িত্ব পালন করেছেন । তবে জাফর নুমাইরি কিংবা হাসান আল বাশিরের মত স্বৈরাচারী শাসকদেরকে দেয়া তার সমর্থন সুদানের রাজনীতিতে তুরাবিকে বড় ধরনের সমালোচনার মুখে ফেলে দিয়েছিল।  তবে এসব সত্ত্বেও  দীর্ঘমেয়াদে,একটি আধুনিক ইসলামী দৃষ্টিকোণ উন্নয়নে তার বুদ্ধিবৃত্তিক অবদানসমূহ তার রাজনৈতিক কার্যক্রমের চেয়ে বৃহত্তর ভুমিকা রেখে যাচ্ছে ।

তুরাবির বুদ্ধিভিত্তিক  ধারণার আদ্যস্থল ছিল  মূলত বিশ্বাস এবং চিন্তা(তাজদিদ)র  প্রয়োজনীয়তার পুনর্জাগরণ নিয়ে তার কর্মকাণ্ডে । পুনর্নবীকরণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে তাজদিদ-আল –ফিকর আল ইসলামী বা  “ইসলামী চিন্তার পুনর্জাগরণ”  নামে তার প্রথম দিকে লেখা একটি বইতে তুরাবি দাবী করেন মানবসমাজে ইতিহাসের পরিবর্তন অনতিক্রম্য । ফলস্বরূপ, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে মানুষেরা নিরন্তর তাদের বিশ্বাস ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সাথে সময়ের সাযুজ্যের মাধ্যমে  ক্রমাগত পরিবর্তিত  প্রেক্ষাপটে সত্যিকারের বিশ্বাসী হতে পারবেন। পুনর্জাগরণের এই জোর  বিস্তৃতি মূলত ইসলামের সময়োপযোগীকরনের একটি অধ্যায় যা মধ্যযুগীয় মুসলিম পণ্ডিতদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত স্থবির ধারাকে চ্যালেঞ্জ করে । তুরাবি জোর দিয়ে বলেন ইসলাম সবসময় একটি সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা যা কুরআনে বর্ণিত ইসলামের মৌলিক গুণাবলি থেকে উৎসরিত যা কালের অসঙ্গতির উপর নির্ভর করেনা । ১৯৮০ সালে একটি কনফারেন্সে  তিনি বলেন তাজদিদ হল “ইসলামের মূলরীতিকে অক্ষুণ্ণ রেখে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এর সময়োপযোগি ব্যাখ্যা  প্রদান করা” কারন এই কাঠামোর মাঝে  ইসলামের মূলসূত্র চিরকালই জীবন্ত এবং বর্তমান। আব্দেল ওয়াহাব আল এফেন্দি তুরাবির বিপ্লব নামক গ্রন্থের ১৭০ পৃষ্ঠায় বলেন- তুরাবির তাজদিদ মূলত একটি বিপ্লবী এবং আমূল প্রগতিবাদী দৃষ্টিভঙ্গির উপর প্রতিষ্ঠিত । এই আমূল পরিবর্তিত নবচিন্তার উদ্ভাবনের কারনে তুরাবিকে মুসলিম সমাজ ও চিন্তার ক্ষেত্রে সমকালীন সংস্কারের একই বিষয়ে কর্মরত অনেকের কাছ থেকে আলাদা করা যায়।

 

তুরাবির দৃষ্টিতে এই নব পুনরূজ্জীবনকে হতে হবে সমন্বিত এবং  জীবন ও চিন্তার সকল ক্ষেত্রে এর প্রয়োগ থাকতে হবে । তুরাবির চিন্তার মূলসারে, চিন্তার এই সার্বজনিনতাই হল তাওহীদ যা এক আল্লাহর ছায়াতলে বিশ্বময়তাকে স্থান করে দেয় । যদিও তাওহীদ শতশত বছর ধরেই ইসলামী চিন্তার একটি মূল বিষয় হিসেবে প্রাসঙ্গিক , কিন্তু এটি সাম্প্রতিক কিছু মুসলিম মতাদর্শ ও ঐতিহাসিক ধারায় প্রবলভাবে গৃহীত। আঠারো শতকের ওয়াহাবিজম যা মুহাম্মাদ ইবনুল আব্দুল ওয়াহহাবের মতামত অনুসারে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং মতবাদে রুপান্তরিত হয় সেখানে তাওহীদ একটি সংকীর্ণ এবং কঠোর বিষয় হিসেবে এসেছে। উনিশ শতকের শেষের দিকে, মিসরীয় পণ্ডিত মুহাম্মদ আবদূহু, যিনি ইসলামী আধুনিকতার ভিত্তির গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক বিষয়কে  সংজ্ঞায়িত করেছিলেন তার চিন্তায় তাওহীদ একটি সমেত এবং যুক্তিবাদী বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে । তবে বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে, ইসলামী চিন্তাবিদরা ইসলামী চিন্তার আমূল সংস্কারসাধনের মাধ্যমে একটি সত্যকার ইসলামী রাষ্ট্র ও সমাজ তৈরি করার জন্য জন্য ব্যাপক কর্মসূচির কাঠামো হিসেবে তাওহীদকে  উপস্থাপন করেছেন। এই পদ্ধতির প্রথম সারির বুদ্ধিজীবীদের ইরানের আলী শরীয়তি এবং মিশরীয় দার্শনিক হাসান হানাফী’র সাথে তুরাবির নামও উচ্চারিত হয় । যদিও তাদের মাঝে স্পষ্ট মতভেদ বিদ্যমান তবুও বিংশ শতকের ইসলামী পুনর্জীবনের চিন্তার কেন্দ্রে তাওহীদের ভুমিকাকে যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠায় তাদের অবদান অনস্বীকার্য । 

 

সম্ভবত তুরাবির বুদ্ধিভিত্তিক সক্রিয়তার সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত অংশ ছিল ইসলামি শিক্ষায় নারীর স্থান ও মুসলিম সমাজে তার ভুমিকা নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গি ।  তিনি যুক্তি দেখান যে পুরুষ এবং নারী উভয়ই আল্লাহর নির্দেশ পালনের ক্ষেত্রে সমান  এবং বলেন যে ঐতিহাসিক মুসলিম সমাজে নারীদের পুরুষতান্ত্রিক নিগ্রহ ইসলামী নীতির বিরুদ্ধে ছিল । ১৯৭৩ সালে আল মা’রাহ ফি তা’লিম আল ইসলাম(ইসলামী শিক্ষায় নারী) নামে  তার লেখা পুস্তিকায় তিনি লিঙ্গ সমতার পক্ষে তার মত উপস্থাপন করেন। তার উপস্থাপনা একটি  অংশে দেখা যায় যে তার চিন্তায় সালাফি দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাবহার ছিল । যদিও সমসাময়িক সাংবাদিকরা  "সালাফী" শব্দটি ব্যবহার করেন অনমনীয় মৌলবাদীদের বিষয়ে বর্ণনা করতে,তবে এটি মূলত ধার্মিক পূর্বপুরুষ(সালাফ) বা সাহাবায়ে কেরামের পথ যারা মূলত রাসুলুল্লাহর হেদায়েতের অনুসারী ছিলেন । তুরাবি দেখান যে সেই সময়ে নারীরা বিশ্বাসীদের সমাজের  বিভিন্ন স্তরে অনেক অবদান রাখেন, যার উদাহরণগুলো  আধুনিক নারীদের ক্ষেত্রে তাদের দায়িত্ব ও অধিকার চেতনার বিনির্মাণে অবদান রাখবে । যদিও অনেক মুসলমান তুরাবির দাবির সঙ্গে অসম্মত, তবে তার দৃষ্টিভঙ্গি ব্যাপকভাবে পরিচিত এবং  সমকালীন মুসলিম বিশ্বের লিঙ্গ বিষয়ক বিতর্কের গঠনের রূপদানে সাহায্য করেছে।

ইসলামী রাষ্ট্রের ব্যাপারে তুরাবির চিন্তাধারা প্রচুর সমালোচনার জায়গা দিয়েছিল। এটি মূলত তার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির চেয়েও সুদানের স্বৈরশাসকদের সাথে তার রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে সহযোগিতামূলক অবস্থানের কারনে । যখন তিনি একটি ইসলামী রাষ্ট্রের প্রকৃতি বর্ণনা দেন, তিনি যুক্তি দেখান যে,এই ধরনের একটি রাষ্ট্র বিভিন্ন রুপ নিতে পারে মূলত নির্দিষ্ট সময়, স্থান এবং নির্দিষ্ট অবস্থার উপর নির্ভর করে।যাইই হোক, তাওহীদ নীতির সঙ্গে মিল রেখে রাষ্ট্রকে কোনোভাবেই ধর্মনিরপেক্ষ হওয়া যাবেনা করে যা  জনজীবন থেকে ধর্মকে আলাদা  করে । ইসলামী রাষ্ট্র যে নীতিতেই চলুক না কেন তাকে বিচারের উপর জোর দিতে হবে এবং সে নিপীড়নকারী রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারবেনা । বাস্তবপক্ষে তুরাবির সমালোচনাকারীদের মতে, তিনি আসলে একটি নিপীড়নকারী সামরিক একনায়কতন্ত্রের বৈধতা দিয়েছিলেন যারা বাস্তবে শরিয়া কায়েমের দাবি করেছিল।

ডঃ হাসান তুরাবি এমন একজন ইসলামী চিন্তাবিদ ও কর্মী যিনি বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধের ইসলামী পুনর্জাগরণে অংশগ্রহণ করেছিলেন ।  তাঁর চিন্তা এই পুনরভ্যুদয়ের ধারণাগত বিষয়বস্তুর রূপদানে সাহায্য করেছে । তার রাজনৈতিক জীবনে তিনি যে দলের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তা তার জীবনব্যাপী আন্দোলনের বিবর্তনের একটি উদাহরণ । তিনি  যখন ১৯৬০ সালে সুদানের রাজনীতিতে ইসলামী রাজনৈতিক ফ্রন্টের নেতা হিসেবে তার জীবন শুরু করেন তখনো মুসলিম দেশগুলোতে ইসলামী রাজনীতির কোন কেন্দিভুত ধারা ছিলনা । ১০৮০ এর দশকে রাজনৈতিক ইসলামের রুপায়ন ও বাস্তবায়নে  সবচেয়ে দৃশ্যমান ব্যক্তিবর্গের মাঝে তুরাবি ছিলেন অন্যতম । ৯০ এর দশকে স্বৈরাচারী শাসনের সময় রাজনৈতিক ইসলামের বাস্তবায়নে  করার দাবিতেও তিনি সোচ্চার ছিলেন । কারো কারো মতে , সেই সময়ের রাজনৈতিক ইসলামের ব্যার্থতার ইতিহাসে তিনি ছিলেন একটি অংশ । তবে তিনি বিস্ময়করভাবে প্রত্যাবর্তন করেন এবং ১৯৯৮-৯৯ সালে  বশিরের সাথে একটি সমঝোতায় আসেন । তার রাজনৈতিক দল পপুলার কংগ্রেস পার্টিকে তাই একবিংশ শতকের পোষ্ট-ইসলামিজমের  একটি উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে চিহ্নিত করা যায় ।

তুরাবির চলে যাওয়ার মাধ্যমে আধুনিক মুসলিম ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ একটি যুগের শেষ প্রতীকের  অবসান হল। বর্তমান সময়ে ইসলামী স্টেট বা আইসিসের উথানের  মত ঘটনা বা  তাদের অনুসৃত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং উগ্রপন্থী মতাদর্শ,  তুরাবি এবং তার সংগঠনের অনুসৃত পথের চেয়ে অনেক অনেক দূরের। একইভাবে, সে যুগের মুসলিম তাত্ত্বিক ও কম্যুনিস্টদের মধ্যকার পুরনোধারার উদ্বেগ কিংবা  ইসলামিষ্ট ও সেকুলারিস্টদের মধ্যকার আদিম  ধর্মতাত্ত্বিক ও মতাদর্শগত  বিতর্ক,  ফেসবুক ও টুইটারের মত সামাজিক গণমাধ্যমের  যুগে পোস্ট-আইডিওলজিক্যাল বিতর্কের দিনে নয়া প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করেছে। তুরাবির জীবন ও কাজ এই পরিবর্তিত সময়ে একটি উপযুক্ত বাহন হিসেবে রুপান্তরের কুরুক্ষেত্রে আমাদের সচেতনতার রথ হয়ে চালিত হচ্ছে ।

 

          

   মূল লেখা জাদালিয়্যা ম্যাগাজিন এ প্রকাশিত