অনুবাদ

এসব আলেম লইয়া আমরা কী করিব?
এসব আলেম লইয়া আমরা কী করিব?
অনুবাদ করেছেন রাইফ ইফতিখার
২৫ ডিসেম্বর ২০১৫

মূলঃ উসামা আল আযামী,

(পিএচডি ক্যান্ডিডেইট নিয়ার ইস্টার্ন স্টাডিজ ডিপার্টমেন্ট, প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি। লেখক ইসলামী ধ্রুপদী ধারায় দুইজন প্রসিদ্ধ আলেম এর কাছ থেকে হাদিস, ফিকহ, আরবী প্রভৃতি বিষয়ে ইজাযাত বা সার্টিফেকেট প্রাপ্ত।)

 

অনুবাদঃ রাইফ ইফতিখার 

২০১৩ সালের মিশরীয় রক্তাক্ত বিপ্লবের সমর্থকদের সাথে আইসিস এর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তোলা কিছু মুসলিম উলামার বক্তব্যকে হয়তোবা একটি বিয়োগান্তক বিদ্রূপ হিসেবেই সংজ্ঞায়িত করা যায় । চারজন উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব যথাক্রমেঃ মিসরের সাবেক প্রধান মুফতি “আলি গোমা, তার উত্তরসূরি “শাওকি আল্লাম” , গোমার অতিশয় অনুগত ছাত্র “হাবিব আলি আল জিফরি এবং আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান প্রধান “আহমেদ আল-তৈয়ব” প্রধানত বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে ২০১৩'র বিপ্লবে মিশরীয় সেনাবাহিনী কর্তৃক সংগঠিত অমানবিক এবং নিষ্ঠুর গণহত্যা ও নির্যাতনের অন্যতম সমর্থক এবং সহায়তাকারী হিসেবেই পরিচিত ।

 

রাবা'র গণহত্যাঃ শিক্ষাবিদদের ভূমিকা

 

"হিউম্যান রাইটস ওয়াচে"র ১৮৮ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে রাবা'র গণহত্যাকে মাত্র একদিনে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক ইতিহাসের গণবিক্ষোভ দমনের নামে সংগঠিত অন্যতম বৃহৎ হত্যাকাণ্ড হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে । অন্তত এক হাজার মিশরীয় নাগরিক'কে পূর্বপরিকল্পনার অংশ হিসেবে মিশরীয় নিরাপত্তা বাহিনীর  নিষ্ঠুর সন্ত্রাসের মাধ্যমে হত্যা করা হয় যাদের অন্তত একশ জনের মাথায়,ঘাড়ে কিংবা বুকে সরাসরি গুলি করা হয়েছে । "হিউম্যান রাইটস ওয়াচ''  মিশরীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের "উদ্ধৃতি" দিয়ে জানায় ঘটনার পর রাবা স্কয়ারে অন্তত "১৫'টি অস্র পাওয়া যায়। তারা আরও জানায়, যদি এই সংখ্যাকে সত্য বলেও ধরে নেয়া হয় তবে ঘটনাস্থল থেকে সংগৃহীত উপাত্ত থেকে দেখা যায়;  যদিও অতি সামান্য পরিমান বিক্ষোভকারী অস্রশজ্জিত ছিল তবুও নিরাপত্তা বাহিনী বিনা উস্কানিতে শত শত নিরস্র বিক্ষোভকারীকে হত্যা করেছে ।

পূর্বউল্লেখিত এই চারজন উলামার মধ্যে শীর্ষস্থানীয় "আলি গোমা"। গণহত্যার পরদিন রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত অনুষ্ঠানে প্রায় দুই ঘণ্টা যাবত গনমানুষের এই প্রতিবাদকে সশস্ত্র বিদ্রোহ হিসেবে অভিহিত করেন এবং নিরাপত্তা বাহিনীর এই গণহত্যাকে ধর্মীয় যুক্তির অপব্যাবহারের মাধ্যমে সমর্থন দেন । এই সাক্ষাৎকারটি ঘটনার দশদিন পরে গোমার ব্যাক্তিগত ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশ করা হয় যা আজো এই হত্যাকাণ্ডে তার ভুমিকার একটি নিদর্শন হিসেবে বর্তমান আছে ।

 

এই হত্যা কাণ্ডের এক সপ্তাহ পর, আলি গোমার উত্তরসূরি শাওকি আল্লাম পশ্চিমাদের মিসরের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতে নিষেধ করেন । অন্যদিকে গোমার অতি বিশ্বস্ত ছাত্র হাবিব আলি আল-জাফরী শুরুতে গণহত্যার পক্ষে আলী গোমার দেয়া ফতোয়া কে অস্বীকার করলেও পরবর্তীতে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে দাবী করেন যে, আলি গোমা শুধু মাত্র অস্রধারী বিক্ষোভকারিদের বিরুদ্ধে এই ফতোয়া দিয়েছিলেন। দুজনের বক্তব্যই নির্দেশ করে যে আল-জাফরী এবং গোমা উভয়েই রাবা’য় হাজারো মানুষের গণহত্যাকে শুধু মাত্র পনের জন সশস্র বিক্ষোভকারির উপস্থিতির খোঁড়া যুক্তি'তে ন্যায্যতা দিয়ে দিয়েছেন ।

 

সিসি'কে সমর্থন- আইসিসের নিন্দাজ্ঞাপন !!

 

উপরোক্ত চারজন উলামার মাঝে দুজনকে লেটারটুবাগদাদি ডটকম নামক আইসিসের কট্টর সমালোচক কিছু মুসলিম উলামার বক্তব্য সম্বলিত বিখ্যাত একটি ওয়েবসাইট কর্তৃক আয়োজিত ভোজসভায় দাওয়াত করা হয়। যারা আইসিসের স্বঘোষিত খলিফা বাগদাদির উদ্দেশে বিশ্বব্যাপী মুসলিম পণ্ডিতদের দ্বারা লিখিত একটি সমালোচনামূলক খোলা চিঠির অনুবাদ এবং প্রচারে নিয়োজিত। এই ওয়েবসাইটের দর্শনার্থীদেরকে সাধারণত "মুসলিম জাহানের প্রসিদ্ধ নেতা এবং পণ্ডিতদের সাথে একযোগে" মিলিত হয়ে এই চিঠির প্রচার এবং প্রসারে উদ্ধুদ্ধ করা হয়ে থাকে। এই পাতার মোট এগারজন ব্যাক্তিত্বের মাঝে দ্বিতীয় এবং তৃতীয় অবস্থানে যথাক্রমে শাওকি আল্লাম এবং আলী গোমার বক্তব্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। মূলত, দুজনেই মিশরীয় ধর্মচর্চার হৃদয় আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে সংযুক্ত থাকায় এই ক্ষেত্রে বিশেষ প্রাধান্য লাভ করেন।

 

এই বছরের শুরুর দিকে,  “আল-আজহার”কে  ফরেইন অ্যাফেয়ারস ম্যাগাজিনের একটি নিবন্ধে স্মরণীয় রকমের প্রশংসার সাথে আইসিসের একটি সম্ভাব্য উত্তর হিসেবে পরিচয় দেয়া হয়। যদিও নিবন্ধটির লেখক গত শতাব্দীতে "আল-আজহারে"র ভুমিকার ভূয়সী করেন যখন আজহারের কর্তৃপক্ষকে সম্মান এবং মর্যাদার  সাথে জ্ঞাপন করা হতো ; তবে লেখক এটাও মনে করিয়ে দিয়েছিলেন যে আল-আজহারের বর্তমান মর্যাদা সরকারী প্রভাবের কারণে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। মূলধারার ইসলামে ফিরে যাওয়ার ক্ষেত্রে এর উদ্দেশ্যমূলক অসহযোগিতার চিত্রকে দূরে সরিয়ে রেখে নিবন্ধটিতে আইসিসের সৃষ্টির ক্ষেত্রে আজহারে’র সত্যিকার ভূমিকাকে খাটো করে দেখানো হয়েছে। যদিও এটা ছিল স্বৈরশাসক মোবারাকপন্থী এবং ব্রাদারহুড বিরোধী আজহারে'র প্রধান যিনি মিসরের অগণতান্ত্রিক সেনা সরকারের কার্যক্রমের ক্ষেত্রে ধর্মীয় বৈধতা দিয়েছিলেন যারা সামরিক শাসনের পুনঃপ্রবর্তনের মাধ্যমে মিসরের ইতিহাসে সবচেয়ে " স্বৈরাচারী এবং দমনমূলক যুগে"র সূচনা করেছে ।এই ধরনের চরম নিপীড়ন সাধারণত বৃহত্তর সন্ত্রাসের ক্ষেত্রে উস্কানি দেয় এবং আইসিসের মতো স্বতঃসিদ্ধ উগ্রপন্থী দলের সমভাবাপন্ন চিন্তার রসদ যোগায় । এই নিবন্ধের প্রতিক্রিয়ায় শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আহমেদ আল শামসি, একে- “ নব-ঐতিহ্যবাদী বাগাডম্বর” হিসেবে অভিহিত করে বলেন, হয় এটি নিষ্কলঙ্ক ইতিহাস কিংবা আত্ম-প্রচারণার দোষে দুষ্ট ।

 

 

 

নব-ঐতিহ্যবাদী বাগাডম্বর ??

 

“ফরেইন অ্যাফেয়ারস” ম্যাগাজিনে প্রকাশিত এই লেখার লেখকদ্বয়ের একজন এইচ.এ.হেলিয়ার গত মাসে পুনরায় "ফিনান্সিয়াল টাইম" ম্যাগাজিনের জন্য অনুরুপ আরেকটি লেখা প্রকাশ করেন । এইবারের নিবন্ধে লেখক কর্তৃক নব-ঐতিহ্যবাদী ধারনার একটি নতুন বুলি তুলে দাবী করা হয় যে, আজহারের মতো প্রতিষ্ঠানের তৈরি ইসলামী পণ্ডিতদের পালিত কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্যেময়তা ওয়াহাবিবাদের মতো কিছু সংস্কারবাদি আন্দোলনের মাঝে অনুপস্থিত।

 

এই ধরনের দৃষ্টিকোণের প্রধানতম সমস্যা হল, এরা উভয়ক্ষেত্রেই বিশুদ্ধ নয়, যেমনঃ এটি ঐতিহাসিক ভাবে অসম্পূর্ণ এবং নিঃসন্দেহে এটি অতি গুরুত্বপূর্ণ জটিল এই সমস্যার কোন সমাধান করেনা । ঐতিহাসিক ভ্রমের ক্ষেত্রে মনে রাখা প্রয়োজন যে, ওয়াহাবিজমের ছাত্ররা যারা "মুহাম্মদ বিন আব্দেল-ওয়াহাবের" নামদ্বারা চিহ্নিত এই পদ্ধতির ধারক;  তারাও "শিক্ষাবিদ'দের মধ্যকার পাণ্ডিত্যপূর্ণ বন্ধন"(আশানিদ) এবং  "জ্ঞান বিনিময়ের"(ইজাযাত) এর মাধ্যমেই জ্ঞান বিনিময় করে আসছে। এই সমস্যার জটিলতর ধারনার প্রতি সম্মান রেখেই বলা যায়, শেষতক এটাই প্রতীয়মান হয় যে, উপরল্লেখিত আজহার-সম্বন্ধযুক্ত পণ্ডিতগণ একটি অতি সহিংস এবং দমনমূলক সরকারের সমর্থনের ক্ষেত্রে তাদের আশানিদ এবং ইজাজাতের ব্যাপারে বিশ্বস্ত ছিলেন না । প্রকৃতপক্ষে, বর্তমানে মৃত আল কায়েদার সাথে সম্পর্কযুক্ত পণ্ডিত আনোয়ার আল আওলাকির ক্ষেত্রেও বলা যায়,  তিনিও ইজাযাত এবং আশানিদের ক্ষেত্রে আবিষ্ট ছিলেন । কিন্তু তা তাকে আল কায়েদার মতাদর্শ প্রচার থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারেনি । 

 

সংযুক্ত আরব-আমিরাত ভিত্তিক ইসলাম !!

 

পরোক্ষভাবে হলেও হেলিয়ার  একটি বিষয়ে পরিষ্কার মতামত দিয়েছেন যে, আইসিসের বিরুদ্ধে এই " ধারণাযুদ্ধে" জয়ী হতে হলে এই সকল পণ্ডিতদের যে ধরনের  নৈতিক ভাবমূর্তির প্রয়োজন তা বাইরের পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টিতে আপাতপক্ষেই অভাব রয়েছে । বাহ্যত এই সকল পণ্ডিতের অনেকেই শুধুমাত্র মিশরীয় রাষ্ট্র দ্বারাই আমন্ত্রিত নন, এদের অনেকেই সংযুক্ত আরব-আমিরাতের পক্ষ থেকে আইসিস এবং তার সমর্থকগোষ্ঠীকে প্রতিরোধের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে বিভিন্ন সংস্থা এবং প্রতিষ্ঠান তৈরির প্রকল্পের আওতায় ডাক পেয়েছেন। হেলিয়ার যদিও তার নিবন্ধে এই ধরনের রাষ্ট্রীয় প্রচেষ্টার ব্যাপারে সদাশয় ছিলেন; তবে আরব আমিরাতের পররাষ্ট্রনীতির সাম্প্রতিক স্খলন নিয়ে আরও বাস্তববাদী দৃষ্টিকোণ উপযুক্ত হতো বলেই মনে করা হয়।     

 

 শায়খুল আজহার এবং মৌরিতানিয়ার প্রখ্যাত আলেম আব্দুল্লাহ বিন বাইয়াহ এর সরাসরি সহায়তায় সংযুক্ত আরব আমিরাত "কাউন্সিল অফ মুসলিম এল্ডারস " এবং "ফোরাম ফর প্রোমোটিং পিস ইন মুসলিম সোসাইটিস" নামে দুটি সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেছে। তবে ইউনিভার্সিটি অফ টরেন্টো এর আইনের অধ্যাপক, মোহাম্মদ ফাদেলে’র মতে এই পরিষদ ইসলামের নামে মূলত স্বৈরশাসনের প্রচারণায় নিয়োজিত হতে পারে। সন্দেহাতীত ভাবেই, তার দেয়া দলিল অনুযায়ী,  শায়েখ আল-আজহারে’র -ফোরাম এবং কাউন্সিল উভয় সংস্থায়ই  সম্পৃক্ততা সেই কথারই পথ নির্দেশ করে। এই ধরনের প্রচেষ্টা আইসিসের মতো উগ্রপন্থী দল  গুলোকে দুর্বল করার বদলে আরও বিশ্বাসযোগ্য বিরুদ্ধ-যুক্তির যোগান দেবে । প্রকৃতপক্ষে, এই ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলো মূল লক্ষ্যের বদলে এই অঞ্চলের স্বৈরাচারী শাসকদের আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তার এবং বজায় রাখার নিচু উদ্দেশ্য হাসিলেই ব্যাবহার হতে পারে ।

 

নৈতিক শিথিল অবস্থা এবং বিশ্বাসের সুসম্বন্ধহীনতা

 

যখন আইসিসের তাত্ত্বিক পরিচয়ে ওয়াহাবিজমের তুলনায় সুন্নি ইসলামের ঐতিহাসিক গঠন বেশি প্রাপ্যতার দাবী অধিকার করেছে । তখন এইসব মুসলিম পণ্ডিতদের উপলব্ধির প্রয়োজন যে, তাদের নিজেদের সনাতন প্রতিনিধিত্ব ও প্রতিষ্ঠান গুলোর  অকার্যকরতা এবং অনৈতিক সমর্থনে যে চরম নিপীড়ন এবং  গণহত্যার মতো অপরাধ সংগঠিত হচ্ছে;  তার অবধারিত প্রতিক্রিয়ায় আইসিসের মতো উগ্রপন্থী দল গুলোর উত্থান ত্বরান্বিত করছে । যখন এই সব তথাকথিত পণ্ডিতেরা আইসিসের বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ আনছেন, তখন গুরুত্বপূর্ণ ভাবে মুসলমানদের মনে এক ধরনের নৈতিক শূন্যতার আবেশ অধিষ্ঠান করে। আর শুধুমাত্র এই একটি কারনই যখন আইসিসের উত্থানের ক্ষেত্রে যথেষ্ট হয়, তবে  ধর্মীয় দিক থেকে আলোর আসনে বসে থাকা চরম খ্যাতিমান এবং নেতৃত্বস্থানীয় কিছু মানুষের নৈতিক শিথিলতা এবং বিশ্বাসের এই সুসম্বন্ধহীনতা তাদের লালিত  ঐতিহ্যের মর্যাদার মুকুটকেই ম্লান করে দেয়।

 

 

~How Not to Disown 'Islamist' Terrorism এর অনুবাদ।