অনুবাদ

ঔপনিবেশিকতা মনে উদয় হওয়া একটা ভাবেরও নাম
ঔপনিবেশিকতা মনে উদয় হওয়া একটা ভাবেরও নাম
অনুবাদ করেছেন পাঠচক্র ডেস্ক
১৯ নভেম্বর ২০১৫

সালমান সাইয়্যিদ 

9/11 এর পর কেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কুরআন বিক্রি  বেড়ে গেল? কারণ ধরে নেয়া হয়েছে কুরআন পড়লেই তারা ইসলামকে বুঝতে পারবে, ইসলামকে বুঝলে তারা মুসলিমদের বুঝতে পারবে, এবং যদি মুসলিমদের বুঝতে পারে তাহলে বুঝতে পারবে কেন ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ধ্বসিয়ে দেয়া হলো, কেন পেন্টাগন আক্রান্ত হলো এবং কেন প্রায় ৩০০০ আমেরিকান তাদের জীবন হারালো?

এই অনুমানগুলো এবং এগুলোর মতো অনেক অনুমানই ওরিয়েন্টালিজম  ওরিয়েন্টালিজম থেকে এসেছে,  যেখানে সকল মুসলমানদের সাথে অযৌক্তিক সহিংসতার সংযোগ আছে বলে ধারনা দেয়া হয়। ওরিয়েন্টালিজম এর এঁকে দেয়া এই চিত্রের বাইরে কিন্তু এই অনুমানগুলোর কোন সম্পর্ক নেই। কুরআন আপনাকে বলতে পারবেনা কেন ৯/১১ ঘটেছে, ইসলামও পারবেনা, কিংবা মুসলমানরাও নয়। আমরা যদি মুসলিম  জনগোষ্ঠীর মধ্যে অস্থিরতা বুঝতে চাই আমাদের ওরিয়েন্টালিজম  নয় বরং ঐতিহাসিক পটভূমির দিকে তাকাতে হবে।

পশ্চিমা সমাজের জন্য – তাদের রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ এবং বিনোদনশিল্পীদের জন্য – তারা কে এবং তাদের পরিচয় কি হওয়া উচিত এটুকু বুঝতে হলে তাদেরকে বলে দেয়া লাগে তারা কে নয়। পশ্চিমের গনতান্ত্রিক প্রমাণাদি অন্যদের স্বৈরতন্ত্রের প্রতি ইঙ্গিত করে প্রতিষ্ঠিত হয়। পশ্চিমকে যদি যুক্তিবাদী বিবেচনা করা হয়, তার কারণ হলো অন্যরা যেন অযৌক্তিক; পশ্চিমকে যদি সাম্যের মাপকাঠি ধরি, এর কারণ অন্যরা তা যেন হতে পারছে না ।

কুরআনে বা ইসলামে ৯/১১ বা অন্যান্য সহিংসতার ব্যাখ্যা রয়েছে এরূপ বিশ্বাস বিদ্যমান কেননা যে পৃথিবীতে আমরা বাস করি তা পশ্চিমা ঔপনিবেশিক এন্টারপ্রাইজে/ আবহে গড়া, এবং ওরিয়েন্টালিজম এর জাতিগত/সাম্প্রদায়িক উপস্থাপনা সেই প্রক্রিয়ারই এক অপরিহার্য অংশ। ওরিয়েন্টালিজম  শুধু ইসলামকে অধ্যয়ন করার প্রয়াস নয়, বরং পশ্চিমারা সেটিকে কি মনে করে তারই প্রকাশ।

১৬ শতকে ইউরোপীয়ান উপনিবেশবাদ গড়ে উঠার সময়  পাশ্চাত্য ও বাকী পৃথিবীর মধ্যে যে পার্থক্যটা তৈরী হয়  তা অত্যন্ত গুরত্বপূর্ণ। এই জাতিগত বিভাজন শুধুমাত্র বাথরুম কিংবা পার্ক বেঞ্চেই নয়, বরং সাদাদের এই বিশেষ সুবিধা উপভোগ করার ধারনাটি উপনিবেশ স্থাপনকারী ও উপনিবেশের শিকার সকলের মধ্যে গেথে দেয়া হয়।

শুধু কতৃত্বপরায়ণ সাম্প্রদায়িক বিভেদনীতির আরোপই উপনিবেশবাদ ছিলোনা, এটি ছিল একটি মূল্যবোধ যা  চিন্তা চেতনায়ও লালিত হয়।

emotion

যেসব সমাজ তাদের নিজেদের ইতিহাস ঐতিহ্য রচনায় পারঙ্গম আর যেসব সমাজ ও সংস্কৃতি পাশ্চাত্য থেকে কিছু ধার করা ছাড়া তেমন কিছুই পারেনা বলে ধারণা করা হয়; এই দুয়ের মাঝে পাশ্চাত্য ঔপনিবেশিকরা একটি সুস্পষ্ট বিভেদরেখা একে দিয়েছে। ইতিহাস সৃষ্টি করতে পারার কৃতিত্ব দিয়ে সাদাদেরকে সবচেয়ে বেশী উচ্চকিত করা হয়। যারা পশ্চিমা নয় তাদেরকে পশ্চিমাকরণ করতে হবে অথবা পিছিয়ে পড়া অসহায় জনগণ হিসেবে থাকতে হবে। আজকের  বিশ্বব্যবস্থা ও বিশ্ববাস্তবতা  ইউরোপীয় উপনিবেশের হাতে  গড়ে দেয়া -  এ কথা মেনে নিয়েই মুসলিম মন মানসের পরিবর্তনকে অনুধাবন করা যাবে, শুধু কুরআন কিংবা গতানুগতিক ইসলাম কী বলছে তার ভিত্তিতে নয়।

ঔপনিবেশিক প্রভাব শুধুমাত্র পাশ্চাত্যের সরকারের সরাসরি শাসনের মাধ্যমেই নয়, বরং তুরস্কে মুস্তফা কামাল, ইরানের রেজা খা পাহলবী, তিউনিসিয়ার হাবিব বুরগুইবার (যিনি রমজানের রোজা পর্যন্ত বন্ধ করতে তৎপর ছিলেন) মতো শাসকদের কর্মকান্ডের মাধ্যমেও বিস্তৃত হয়েছিল। নানা পার্থক্য সত্বেও এরা সবাই দৃঢ়বিশ্বাস  লালন করতেন যে, আধুনিকায়ন হলো পশ্চিমাকরণেরই একটি রূপ। তারা তাদের সমাজকে পাশ্চাত্যের ছাঁচে গড়তে চেয়েছিলেন পশ্চিমাদের মতোই সফলতা  লাভের জন্য।

১৯২০ সালে উসমানী খেলাফতের পতনের পর থেকে ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামী বিপ্লবের পূর্বকাল পর্যন্ত মুসলমানরা এমন একটি অভিজাত শ্রেণী দ্বারা শাসিত হয়েছে যারা পশ্চিমাকরণ ছাড়া নিজেদের কোন ভবিষ্যতই দেখতে পেতোনা। ইরানে বিপ্লবের পর বিশ্বব্যাপী মুসলিম সমাজ (যেমন তুরস্ক, ইরান, মিসর, বাংলাদেশ)দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে গেল। পশ্চিমা ধ্যান ধারণার অনুগত অভিজাত শ্রেণী ও এদের বিরোধী মতাবলম্বী মুসলমানরা সুস্পষ্ট দ্বন্ধে লিপ্ত হলো।

মূলত উপনিবেশবাদ নয়, উপনিবেশবাদের ছোয়ায় যে পৃথিবী গড়ে উঠেছে তার বিরুদ্ধে সংগ্রামই হল অত্র অঞ্চলে এবং আমেরিকার মাটিতে বিপর্যয়ের কারণ বোঝার উপায়। এটা এমনই এক বিপর্যয় যা গতানুগতিক ওরিয়েন্টালিজম  ব্যাখ্যা করতে পারেনা।

সূত্র

পাঠচক্র ডেস্ক