অনুবাদ

কাশ্মীর সংগ্রামের এই কঠিন দিনগুলোতে আমাদের অর্জন কী ?
কাশ্মীর সংগ্রামের এই কঠিন দিনগুলোতে আমাদের অর্জন কী ?
অনুবাদ করেছেন রাইফ ইফতিখার
১৮ অক্টোবর ২০১৬

ডঃ শেখ শওকাত হুসাইন

২০১০ সালের দিকে জওহরলাল ন্যাশনাল ইউনিভারসিটিতে একবার এক বক্তৃতা দেয়ার সময় আমাকে এক ছাত্র প্রশ্ন করেছিলেন - কিভাবে পাঁচ মাসব্যাপী হরতাল, ধরপাকড়, এবং কার্ফ্যুর মত একের পর এক রাজনৈতিক ঝড়ের পরও কাশ্মীরি জনগণ টিকে আছে ? আমার তৎক্ষণাৎ দেয়া স্বতঃস্ফূর্ত জবাব ছিল এই'যে - 'আমরা জানিনা আমরা কিভাবে টিকে আছি । তবে এই দীর্ঘ পাঁচ মাস ব্যাপী অস্থিরতার মাঝেও শ্রীনগরের রাস্তায় যারা ভিক্ষা করছে তাদের ৮০ ভাগ'ই কাশ্মীরি নয়'। আমার ভিন্নতর দেখা অভিজ্ঞতাও একই ধরণের । ২০১৪ এঁর বন্যার পর তেংপোরা সড়কের আসে পাশে ভিক্ষারত এবং তাবুগুলোর মাঝে বসবাসকারী যারাই ছিল তাদেরও অধিকাংশই ছিল কাশ্মীরের বাইরের লোক । জীবনের নিরন্তর কাঠিন্যতা আর অমানুষিক কৃচ্ছতা কাশ্মীরিদের করে তুলেছে জীবনের প্রতি স্থিতিস্থাপক আর সরল । শুধুমাত্র প্রতিকূলতার সম্মুখীন হলেই এই স্থিতিস্থাপকতাকে ব্যাখা করা যায় । ৮০ লক্ষ মানুষ যারা প্রতিনিয়ত তিন মাস বা তারও বেশিদিনের কার্ফ্যুর মাঝে বসবাস করে তাদের হার মানানো খুবই কঠিন । কাশ্মীরিরা যত্নের সাথে, দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্যদিয়ে, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এমন এক বিপ্লবের জন্ম দিয়েছে যার সাথে পৃথিবীর খুব অল্প দেশের সাথে তুলনা করা যায় । কাশ্মীরিরা তাদের শুধু একটি উদ্দেশ্যের জন্য তাদের স্বাভাবিক জীবনকে বিসর্জন দিয়েছে । একটি দীর্ঘ মেয়াদী সংগ্রাম পরিচালনার জন্য এই ধরণের সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকল্প অবশ্যই জরুরী । যেভাবে কাশ্মীরি জনগণ তাদের জনসম্পদ ও বস্তুগত উপকরণ গুলোকে ব্যাবহারের মাধ্যমে আহত, ক্ষতিগ্রস্ত কিংবা সাধারণ রোগীদের চিকিৎসার ব্যাবস্থা করেছে তা অতুলনীয় ।

সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো নিপীড়নের শিকার জনগন ও ক্ষতিগ্রস্তদের খাদ্য, পরিবহন,ওষুধ এবং এমনকি রক্ত সুবিধা দিতে পরস্পরের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। কিন্তু এই মহৎ প্রচেষ্টাকেও জালিমের দল বিভিন্ন ঠুনকো অজুহাত তৈরির মাধ্যমে বন্ধ করে দেয়ার চেষ্টা করছে । মানুষের সেবায় সদা নিয়োজিত মানবাধিকার ও ত্রানকর্মীদের গ্রেফতারের মাধ্যমে হয়রানী করছে । আহতদের বহনকারী এ্যাম্বুলেন্স গুলকে আটক করে তাদের ত্রান কার্যক্রম বন্ধ করার জন্য বলা হচ্ছে । রাষ্ট্রের এই অমানবিক আচরণের কারন হল জনগণের দুর্ভোগ আরও বৃদ্ধি করা যাতে তারা প্রতিরোধের পথ থেকে অবসর নিতে বাধ্য হয় । রাষ্ট্র তার নিজস্ব ভুয়া ত্রান কার্যক্রমের নামে আসল ত্রান প্রতিষ্ঠান গুলকে সরিয়ে দিয়ে নিজস্ব মায়াকান্না দেখিয়ে কাশ্মীরের জনগনের সাথে প্রতারণার ষোলোকলা পূর্ণ করছে।জুলুমের মাধ্যমে সকল ত্রান কার্যক্রমকে বন্ধ করার ষড়যন্ত্রের পরে রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা আর মন্ত্রীরা হাশপাতালে হাসপাতালে তাদের নধর চেহারা দেখিয়ে ভিডিও করছেন এবং কাশ্মিরে জনতার জন্য তাদের ভালবাসা ও উদারতার এহেন উদাহরণকে নিরন্তর প্রচার করে চলেছেন যাতে সাধারণ মানুষেরা বিভ্রান্ত হয়। মসজিদ কমিটি ও বায়তুল মাল গুলো জনগনের জন্য প্রশংসনীয় উদ্যোগ নিয়েছে । প্রতি এলাকায় জনগণ তাদের প্রাত্যহিক রেশনের এক কিলো করে অভাবগ্রস্থ ও বঞ্চিতদের জন্য ডান করে থাকে । যদিও একটি ধারনা আছে যে কাশ্মীরিরা তাদের কৃষিকাজের ক্ষেত্রে অন্য অঞ্চলের শ্রমিকদের উপর নির্ভরশীল । এর মৌলিক কারন হল শস্য বপনের সময় খুবই অল্প এবং এই সময়ে প্রচুর পরিমানে শ্রমশক্তি ও সাহায্যের প্রয়োজন হয় । কিন্তু এই ধারাও আজ শেষের পথে কারন কাশ্মীরিরা এখন বিভিন্ন ক্ষেত্রের পাশাপাশি কৃষিকাজের ক্ষেত্রেও নিজেদের স্বয়ংসম্পূর্ণ করে তুলেছে । বিয়েতে অতিরিক্ত ব্যায়ের ক্ষেত্রেও জনগণ আজ অনেক বেশী সচেতন । গত তিন মাসের সর্বোচ্চ বিবাহ সংগঠনের শময়েও ৯৫ ভাগ বিয়ের অনুষ্ঠান অতি সরল ও সংক্ষিপ্ত হয়েছে । যদি আমরা এই ধারা কে অব্যহত রাখতে পারি তবে আমরা আজাদির পথে আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে যাব । আমরা এটা জনগনকে বোঝাতে পেরেছি যে বিবাহের সফলতা জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান, বিপুল ভোজ কিংবা অনেক বেশী অপ্রয়োজনীয় সংস্কারে নিহিত নয় । এটি নিহিত মানুষের সম্পর্কের প্রতি বিশ্বাস ও শ্রদ্ধায় ।

 

বিয়ের বিষয়ে মিতব্যায়িতা ও কৃষিকাজে নিজেদের অংশগ্রহণের পরিমাণ আরও বাড়ানোর সাথে অর্থনৈতিক স্বাবলম্বীতার সম্পর্ক আছে।এই ভাবে আমরা কোটি কোটি রুপির সাশ্রয় করছি আর লক্ষ লক্ষ নতুন চাকরীর স্থান ও কর্মঘণ্টা সৃষ্টি করছি। ভারসাম্যপূর্ণ সমান্তরাল শিক্ষা পদ্ধতির মাধ্যমে বিভিন্ন কারনে সাধারণ শিক্ষার সময়ের অপচয়কে রোধ করার উদ্যোগ ও আরেকটি প্রশংসনীয় বিষয় । গত ২৫ বছর ধরে চলমান এই ব্যাবস্থা আমাদের শিক্ষা ব্যাবস্থার স্থিতিশীলতায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। বর্তমানের ভারতে সংগঠিত বিভিন্ন প্রতিযোগিতাপূর্ণ পরীক্ষা ও শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে কাশ্মীরি তরুণরা বিশাল কৃতিত্তের স্বাক্ষর রেখেছে । এটি তাদের কাছেও বাস্তবতা যারা কাশ্মীরি পণ্ডিতদের দেশত্যাগের পড়ে কাশ্মীরের শিক্ষা ব্যাবস্থার ভবিষ্যৎ ধ্বংসের কথা বলেছিলেন। কাশ্মিরই জনগনের ব্যাবহারেই শুধুমাত্র এই সামাজিক- অর্থনৈতিক পরিবর্তনের ধনাত্মক প্রভাব এসেছে তা নয় । কাশ্মীরি রাজনৈতিক নেতাদের ক্ষেত্রেও তা সমান ভাবে কার্যকর।তাদের পাকিস্তানী প্রতিরুপী ইমরান খানের ক্ষেত্রেও দেখা যায় যে , শুধুমাত্র মুখোমুখ কোন একই বিষয়ে দ্বিমত ছাড়া দেশের পরিবর্তনের সকল বিষয়ে তারা প্রজ্ঞার পরিচয় দিচ্ছেন । ধর্মীয় নেতারাও তাদের একতাবদ্ধ প্রচেষ্টার জন্য প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য। শিয়া, সুন্নি, আহলে হাদিস, দেওবন্দি কিংবা বেরেল্ভি ধারার মধ্যে বিবাদ ভুলে মানুষকে সংগ্রামের চেতনায় উদ্ধুধ করতে তারা শহর, নগর , গ্রাম গুলোতে অসাধারণ অবদান রেখে চলেছেন। সমস্ত শহর সংগ্রামের দিন গুলোতে কার্ফুর আগে তাদের নিরাপদ চলাচল আর নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহে নেমে পড়ে । ডাক্তার এবং তাদের সহযোগীরা এই পরিস্থিতিতে মানুষকে স্বাস্থ্য শেবা প্রদান, পানি বিদ্যুতের মত সেবা গুলোকে সচল রাখার জন্য প্রশংসার দাবীদার। আমাদের নতুন প্রজন্ম আজ দীর্ঘমেয়াদী এই সংগ্রামকে বিশ্ববাসীর সামনে উপস্থাপনের জন্য নিজস্ব মিডিয়া ও প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাজ করে যাচ্ছে । তুলনামুলকভাবে অতি ক্ষুদ্র এই জনগোষ্ঠী তাদের বিশাল ব্যাপক বিরোধী গোষ্ঠীর বিপক্ষে শুধু মাত্র নিজস্ব ত্যাগ, তিতিক্ষা ও উদার সংগ্রামী চেতনার মাধ্যমে টিকে আছে ও ত্যাগের আশ্চর্য উদাহরণ তিরি করেছে। এটি তাদের সংকল্প, নেতৃত্বের আনুগত্য এবং তাদের সংগ্রামের প্রকৃত কারন অনুধাবনের বুঝের মাধ্যমেই সম্ভব হয়েছে এবং সমগ্র বিশ্ববাসীর সামনে একটি রক্তাক্ত কিন্তু অনন্য একটি সংগ্রামী স্বাধীন কাশ্মীরি পরিচয়ের সৃষ্টি করেছে । সরকারের সামনে সাধারণত তাদের মধ্যকার যোগাযোগ বন্ধ করতে টেলিযোগাযোগ বন্ধ করা ছাড়া দ্বিতীয় কোন বিকল্প নেই । কিন্তু  এটি কাশ্মীরি জনগনের একীভূত হৃদয়ের পরিচয় হয়ে দাঁড়িয়ে কাশ্মীরি জনগণের মাঝে তাদের প্রতি বিদ্বেষের পরিমাণ বৃদ্ধির পাশাপাশি জনতার নিজস্ব প্রতিরোধ চেতনাকে আরও দৃঢ করে তুলেছে ।