অনুবাদ

ক্যু এর কফিনে শেষ পেরেক
ক্যু এর কফিনে শেষ পেরেক
অনুবাদ করেছেন পাঠচক্র ডেস্ক
২২ জুলাই ২০১৬

ড. স সাইয়্যিদ, প্রফেসর, ইউনিভার্সিটি অফ লিডস, যুক্তরাজ্য 

অভ্যুত্থান প্রচেষ্টার ব্যর্থতা এটিই সুস্পষ্ট করল যে জনগণ ও তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই ভবিষ্যত তুরস্কের জিম্মাদার

সারাবিশ্বের নানাপ্রান্তের মানুষের সাথে আমিও ভীষণ উদ্বেগ আতংক ও অসহায়ত্বের মিশ্র এক অনুভূতি নিয়ে গত জুমাবার রাতের ঘটনাবলী প্রত্যক্ষ করেছি। তুরস্ক কি মিশরের ভাগ্যবরণ করতে যাচ্ছে? প্রাথমিকভাবে পরিস্থিতি খুব একটা ভালো ছিলনা। বেশ কয়েক বছর ধরে একে পার্টির বিরুদ্ধে কতৃত্ববাদীতা ও মৌলবাদীতার অভিযোগ আনা হচ্ছিল। এসব অভিযোগ ঘণীভূত হয়ে এতোটাই বাস্তব মনে হচ্ছিল যে অভ্যুত্থানপন্থীরা কোন দ্বিধা ছাড়াই সেদিন ‘আইনের শাসন, মানবাধিকার ও স্বাধীনতা পুণঃবহাল’ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করতে পেরেছিল। ২০১৩ সালের মিশরের মতো একে প্রাথমিকভাবে ক্যু হিসেবে বিবেচনা করতে অনীহা ছিল। মার্কিন সেক্রেটারি অব স্টেট জন কেরি তার দ্ব্যর্থবোধক বক্তব্যে স্থিতি ও ধারাবাহিকতা বজায় রাখার আহবান জানান। সৌদী মালিকানাধীন মিডিয়ায় গুজব ছড়িয়ে পড়ল যে প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েব এরদোগান পালিয়ে গেছেন এবং ইসলামবিদ্বেষীরা দাবি করল যে, একে পার্টির ক্ষমতায় আরোহণই আসল ক্যু ছিল সুতরাং এই সেনা অভ্যুত্থানই তুরস্ককে ইসলামী স্টেটে পরিণত হওয়ার প্রক্রিয়া থামানোর সুবর্ণ সুযোগ।

ধন্যবাদ হতাহত মানুষগুলোসহ জনতার বীরোচিত ভূমিকাকে। একে পার্টীর নেতৃত্বের দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ ও সিদ্ধান্তমূলক পদক্ষেপ, বিরোধীদলসমূহের অভ্যুত্থানের প্রতি অনাস্থা এবং একে পার্টির সমর্থকদের উদ্দীপনা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধই বৈধ সরকারের পক্ষে নৈরাজ্য সৃষ্টিকারীদের অভ্যুত্থানের প্রতিরোধে যথেষ্ট ছিল।

তুরস্কের বাইরের একজন পর্যবক্ষক হিসেবে আমি এই অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা কিংবা দেশের আভ্যন্তরীন কোন নির্দিষ্ট পরিস্থিতি সম্পর্কিত সুস্পষ্ট কোন কারণ ব্যক্ত করতে পারছিনা যা একদল বেপরোয়া সৈন্যদলকে এমন আকস্মিক, অকল্পনীয় ও ধ্বংসাত্মক পথে পরিচালিত করতে পারে।  তবে একথা আমি নির্দ্বিধায় বলতে পারি যে, এই অভ্যুত্থান সফল হলে তুর্কী জনগণ বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়ত এবং সামগ্রিকভাবে মুসলিম বিশ্বও ক্ষতিগ্রস্থ হতো।

ন্যটোর গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অন্যতম কৌশলগত মিত্র এবং অস্থিতিশীলতার পথে বড় অন্তরায় হিসেবে আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে তুরস্ককে সবসময় গুরুত্বসহকারে উপস্থাপন করা হয়ে থাকে। এসব বিষয় নিঃসন্দেহে গুরুত্ববহ, কিন্তু শুক্রুবারের ঘটনা তুরস্কের বাইরের দুনিয়ার কাছে একটু বেশিই গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

একে পার্টী ঐতিহ্যগতভাবে ও সাম্প্রতিক পরিমণ্ডলে সবসময়ই দেশে একটি শক্তিশালী মুসলি্ম জাতিসত্তার প্রতিনিধিত্ব করে থাকে। এটি এমন একটি সরকার যা ইসলামকে লজ্জার কারণ হিসেবে দেখেনা। বরং একই সাথে এটি মিশরের সিসি, সৌদি শাসন, ইরাকের বাথ কিংবা দায়েশের তাকফিরিজমের উত্তম বিকল্প হিসেবে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করেছে। একে পার্টির সরকার ইসলামী পরিচয় লালনে নতুন সম্ভাবনা ও ক্ষেত্র তৈরী করেছে।

এটি হলো এমন ইসলাম ও জনগণের চাহিদার এমন এক সমন্বয় যা ইসলামবিদ্বেষী গোষ্ঠীকে খুবই বিচলিত করে। কেননা এমন পরিস্থিতি তাদের অবস্থানকে চ্যলেঞ্জের মুখে ফেলে দেয়। এরদোগানের প্রতি নব্য রক্ষণশীল ও পশ্চিমা শক্তির উচু পর্যায়ে অপরিসীম বিদ্বেষ লালন করা হয়। এই ঘৃণার বিষবাস্প তাদের ইসলামবিদ্বেষপ্রসূত ভ্রান্তিকে আরো পরিপুষ্ট করে এই ধারণার মাধ্যমে যে, ইসলামী দেশসমূহ কখনোই আত্মবিশ্বাসী, পরমতসহিষ্ণু, বহুজাতিক ও গণতান্ত্রিক হতে পারেনা।

যতদিন ইসলামবিদ্বেষী ও অরিয়েন্টালিস্টদের এহেন বয়ান চ্যলেঞ্জবিহীন অবস্থায় থাকবে ততদিন অভ্যুত্থানপন্থী ষড়যন্ত্রকারী গোষ্ঠীকে দমিয়ে রাখতে পারলেও  একে পার্টির অর্জনসমূহ অনিশ্চিত। এই অনিশ্চয়তা বাড়তে থাকলে শুধু একে পার্টিকেই প্রভাবিত করবেনা বরং বিরোধী দলগুলোসহ পুরো নাগরিক শক্তির মাঝে ক্যু এর পক্ষাবলম্বনে সহানুভূতি তৈরী করবে। এখন সময় হলো ইউরোপ-কেন্দ্রিক ধ্যান-ধারণা পরিত্যাগ করে সমাজের প্রতিটি অংশকে নিয়ে নতুন ঐক্যবদ্ধ একটি তুরস্কের কাঠামো দাড় করা।

একে পার্টির সরকার বিরোধীদেরও উচিত নানা কৌশল ও নীতিমালা পরিচালনার মাধ্যমে এগিয়ে যাওয়া যা সমৃদ্ধ সমাজ গঠনে ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। ভিন্নমত ও বিরোধীতার প্রকাশের জন্য সবসময় সুন্দর ক্ষেত্র থাকতে হবে। যাইহোক একে পার্টির বিরোধিতা সুনির্দিষ্ট না হলেও বিদ্যমান, যারা একে পার্টির সব কর্মকান্ডই চোখ বুযে বিরোধিতা করে। কেননা তারা একে পার্টির ইসলাম সংশ্লিষ্টতা, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, জনগনের চাহিদার বৈধ্যতা সব কিছুরই বিরোধী। আর এরূপ বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাবই ক্যু ঘটানোর এবং পশ্চিমা দৃষ্টিভংগির আদলে তুরস্ক গড়ার ইন্ধন দিয়ে যাচ্ছে।

এটা এখন সুস্পষ্ট যে পুরনো ব্যবস্থায় ফিরে যেতে হলে নির্বাচন প্রক্রিয়া বাতিল করে দিতে হবে। সুতরাং ভবিষ্যত অভ্যুত্থানের কোন সম্ভাবনাকে প্রতিরোধ করতে তুরস্কের সর্বক্ষেত্রে নির্বাচন প্রক্রিয়া সংরক্ষিত রাখা প্রয়োজন।

৩৫ বছর আগে স্পেনের বিকাশমান গ্ণতন্ত্র একটি ব্যর্থ অভ্যুত্থানের মুখোমুখী হয়েছিল যা সামরিক বাহিনী পরিচালিত স্বৈরতন্ত্র কায়েম করতে চেয়েছিল। ১৯৮১ সালের সেই ব্যর্থ অভ্যুত্থান স্পেনের সমস্যার অগণতান্ত্রিক সমাধানের ধারণাকে ধ্বংস করে দিতে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছিল। যে ইস্যুগুলোতে অভ্যুত্থানপন্থীরা উৎসাহী হয়েছিল যেমন আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন, সন্ত্রাস, সমাজে নতুন শ্রেণির উদ্ভব এসব স্পেনিশ রাজনীতিতে অস্বস্তি সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু অগণতান্ত্রিক উপায়ে চোরাইপথে সমাধানের চেষ্টা প্রতিহত করা হয়েছিল। স্পেনের ব্যর্থ অভ্যুত্থান সেদিন এটিই নিশ্চিত করেছিল যে গণমতের প্রতিফলন এবং অনুশীলন একমাত্র নির্বাচনী প্রতিনিধিত্বের মাধ্যমেই সম্ভব এবং জনগণের চাহিদাই রাজনৈতিক বৈধতার উৎস।

তুরস্ক অভ্যুত্থানের ব্যর্থতা এটিই সুস্পষ্ট করল যে জনগণ ও তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই ভবিষ্যত তুরস্কের জিম্মাদার। নির্বাচনভিত্তিক প্রতিনিধিত্বমূলক ব্যবস্থা  এখন আর শুধুমাত্র শাসকদলের জন্য সংরক্ষিত কোন বিষয় নয়, বরং এটি দেশের সমস্ত নাগরিকদের উত্তরাধিকার সুত্রে প্রাপ্ত অধিকার।

 

পাঠচক্র ডেস্ক