অনুবাদ

ক্ল্যাশ অভ সিভিলাইজেশনঃ একটি বর্ণবাদী তত্ত্বের ব্যাবচ্ছেদ
ক্ল্যাশ অভ সিভিলাইজেশনঃ একটি বর্ণবাদী তত্ত্বের ব্যাবচ্ছেদ
অনুবাদ করেছেন রাইফ ইফতিখার
১৩ মার্চ ২০১৬

মুলঃ হাতেম বাযীয়ান

অনুবাদঃ রাইফ ইফতিখার

ক্ল্যাশ অভ সিভিলাইজেশনের প্রবক্তা “স্যামুয়েল টি. হান্টিংটন” তার নিজস্ব বয়ানে  সর্বপ্রথম আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইন্সটিটিউটের একটি নব্য-রক্ষণশীল আড্ডায় এই তত্ত্ব প্রথম জনসম্মুখে উথাপন করেন। পরবর্তীতে একটি নিবন্ধ এবং ১৯৯৬ সালে প্রকাশিত তার বহুল প্রচারিত বই “ক্ল্যাশ অভ সিভিলাইজেশন এন্ড দ্যা রিমেকিং অভ ওয়ার্ল্ড অর্ডার” এ তিনি ঘোষণা করেন তার এই নতুন জগতে সভ্যতার সংঘাতের মৌলিক উৎস প্রাথমিকভাবে মতাদর্শগত বা অর্থনৈতিক হবে না। তিনি আরও যোগ করেন, মানবজাতি এবং আধিপত্যবাদী শক্তিগুলোর ভবিষ্যৎ সংঘাতের ক্ষেত্র হবে মূলত সাংস্কৃতিক । যদিও হান্টিংটন শীতল যুদ্ধের প্রাক্কালে, চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক শক্তি এবং  ইসলামী নবজাগরণের ভীতি  থেকে ব্যাক্ত করেছিলেন - ভবিষ্যতের সংঘাত মূলত সিনো-ইসলামী সংযোগ থেকে উদ্ভূত হবে ।

আরেকটি বই “হু আর উই? দ্যা চ্যালেঞ্জ টু আমেরিকান ন্যাশনাল আইডেন্টিটি”, যেখানে ল্যাটিনো এবং  মেক্সিকান অভিবাসনকে আমেরিকার জাতীয় পরিচয়ের হুমকি হিসেবে দেখানো হয়েছে; যার অনুসরণে হান্টিংটন তার বইয়ে ল্যাটিনোদের আমেরিকার জাতীয়  ঐক্যে ও সংহতির উঠতি হুমকি হিসেবে দেখান। শুরু থেকেই ল্যাটিনো ও মেক্সিকান আমেরিকানদের বিরুদ্ধে ব্যাবহৃত এই তত্ত্ব, বর্তমান ও অতীতে কালো এবং আমেরিকার আদিবাসী থেকে শুরু করে ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকার মুসলমানদের বিরুদ্ধে ব্যাবহৃত হয়েছে । এছাড়াও  ল্যাটিনো অভিবাসনকে কেন্দ্র করে আমেরিকার জাতীয় সংহতি বিনষ্টের ভুয়া জুজু কি করে হান্টিংটন এবং তার চ্যালাদের মনে দুই জাতির, দুই সংস্কৃতির, এবং দুই ভাষার আমেরিকার কল্পিত হুমকি তৈরি করেছিল তা স্বভাবতই চিন্তার বিষয় ! । এটিই হয়ত একাডেমিয়ার  উচ্চ-গোত্রীয় পণ্ডিতদের সূক্ষ্ম বর্ণবাদ,  যারা তাদের ভাষা,বই কিংবা কলমের সাহায্যে আমাদের  মানবিক মানসে দস্যুপনা সৃষ্টি করে । এরা সাপ হয়ে কামড় দেয় এবং ওঝা হয়ে ঝাড়ে ।

 

বর্তমান অর্থনৈতিক অস্থিরতার জন্য চীন, জাপান এবং ভিয়েতনামের মত দেশগুলোকেও এই তত্ত্বের আওতায় দায়ী করা হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে “ক্ল্যাশ অভ সিভিলাইজেশনের” ধ্বজাধারীদের সরবরাহকৃত প্রমান কিংবা তথ্যকে যাচাই করা কিংবা তাদের বক্তব্যের প্রভাবকে মূল্যায়ন করাটাও সময়ের অপচয় বলা যায়। কারন সব ক্ষেত্রেই, মূল কারণকে উহ্য রেখে ভিন্ন কোন কারণ, যেমন- কোন বিশেষ গোত্রের সংস্কৃতি, ধর্ম কিংবা জাতিগত নজরদারির মত বিষয় গুলোকে সামনে টেনে আনা হয় । যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের দিকে তাকালে  ট্র্যাম্প,কারসন কিংবা যে কোন রিপাবলিকান প্রার্থীর বক্তব্যে দেখা যায়, বিশেষত ইসলাম, সংখ্যালঘু   কিংবা চায়নার মত ইস্যুগুলোতে  এই তত্ত্বের দোসর হিসেবেই  তারা তোতাপাখির মত একই শেখানো বুলি কপচে যাচ্ছেন।

ইতিহাসের সাথে সম্পর্কমুক্ত,গতিহীন এবং ইতোমধ্যে সমাধান হয়ে যাওয়া কিছু উপাদানকে “ক্ল্যাশ অভ সিভিলাইজেশনে”র যুক্তিতে, সামাজিক বিষয়গুলোর মাঝে বিবাদের উপকরণ হিসেবে উপস্থাপনের জোর চেষ্টা  করা হয়েছে; আদতে যার মূল লুকিয়ে আছে এর উপনিবেশিক ও প্রাচ্যঘনিষ্ঠ এক বর্ণবাদী চেহারার মাঝে ।  রাজনৈতিক ব্যাক্তি, ধর্মীয় চরমভাবাপন্ন কিংবা পাবলিক ফিগারদের দ্বারা বারবার আওড়ানো  “ক্ল্যাশ অভ সিভিলাইজেশন”  তত্ত্বের প্রসারের যে আয়োজন, তাতে বোঝা যাচ্ছে, ইতিমধ্যেই অনেক কলঙ্কযুক্ত  সাইন্টিফিক কিংবা বায়োলজিকাল বর্ণবাদের যে  ধারনা,  তাকেই নতুন খোলসে   সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় এবং জাতিগত  নিয়মের আওতায় নতুন  পোষাকে দাঁড় করানো হয়েছে । মূলত এর প্রবক্তারা বারবার করা বাকওয়াসের মাধ্যমে এই ক্ল্যাশ অভ সিভিলাইজেশন তত্ত্বকে প্রচলিত কথায়  জনপ্রিয় রাজনৈতিক আলোচনার বিষয়বস্তু হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন যাতে প্রচলিত রাজনীতিকে এই পাণ্ডুলিপিতে এই তত্ত্ব মঞ্চায়নের আয়োজন করা যায় ।

আশঙ্কাজনকভাবে, বর্তমান সময়ে জাতিগত এবং সাংস্কৃতিক বিভেদের আগুনকে উস্কে দেয়ার মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী ক্ষমতার কেন্দ্রে নিজেদের জন্য সুবিধাজনক অবস্থান সৃষ্টির উদ্দেশ্যে এই তত্ত্বের অনুসারীরা পরিকল্পিত ভাবে অগ্রসর হচ্ছে; যাতে সমস্ত পৃথিবীতে আধিপত্যবাদী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তাদের ক্ষমতা সুসংহত করা যায়। এই সাম্রাজ্য যুদ্ধবাজ চরিত্রের মধ্য দিয়ে সমগ্র মানবজাতির উপর ছড়ি ঘুরিয়ে তার রাজকীয় ক্ষমতার প্রয়োগ করতে চায়। “ক্ল্যাশ অভ সিভিলাইজেশন”কে তার প্রস্থানবিন্দু হিসেবে ধরে নিয়ে এই তত্ত্বের সিপাহীরা নিজেদের ক্ষমতা জাহির করার বামনসুলভ শয়তানীর মাধ্যমে দুনিয়ার দক্ষিণ পর্যন্ত যুদ্ধ বাঁধিয়ে দিতে পারে । যদি দুনিয়ার দক্ষিণপন্থী অংশকে এভাবে “স্থায়ী শত্রু” এবং  “অপরিবর্তনীয় হুমকি” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, তবে এইসব বর্বর চিন্তার বাহকদের সভ্যতার কল্পিত দরজা থেকেই একটি সর্বাত্মক যুদ্ধ কিংবা রুপক হস্তক্ষেপের মাধ্যমেই ফিরিয়ে দেয়া প্রয়োজন ।

 

এই তত্ত্ব যেকোনো সাম্রাজ্যের সম্প্রসারণ, সহিংসতার যৌক্তিকীকরণ এবং বিশ্বব্যাপী সকল ব্যাপারে স্বতঃস্ফূর্ত নাক গলানোর একটি পূর্বশর্ত হিসেবে কাজ  করে।  সহিংসতা দমনের নামে যুদ্ধ এবং অবৈধ  হস্তক্ষেপ হল এমন এক ক্যান্সার, যার অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসায় সমস্যা সমাধানের বদলে আরও বৃদ্ধি পায়। এই ক্ল্যাশ অভ সিভিলাইজেশন তত্ত্ব মোদ্দাকথায় বর্তমান উত্তর-ঔপনিবেশিক সময়ে আবারও জৈবিক(বায়োলজিক্যাল) বর্ণবাদের কুৎসিত শরীরে সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্বের নতুন পোষাক পরিয়ে উপস্থাপন করে। যখন সে ইউরোপকেন্দ্রিক বিশ্বব্যাবস্থা কিংবা শ্বেতাঙ্গ শ্রেণীর মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের মোড়কে মানবিক মূল্যবোধের কল্পিত সংযোগ ঘোষণা করে । সহজ কথায় এটি কল্পিত এবং শেকড়হীন ইতিহাসের সাথে সত্যিকার ইতিহাসের একটি পরোক্ষ পার্থক্য তৈরি করে মানুষকে বিভ্রান্ত করে । যার কারনে এর প্রতিরোধের  ক্ষেত্রে একটি সুনির্দিষ্ট অবস্থান এবং প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সহ লড়াই করা প্রয়োজন। 

সত্যিকার অর্থে এই তত্ত্বের বিষয়ে কারন কিংবা সমস্যার মূল  খুঁজতে গেলে শেষতক উত্তরের চেয়ে প্রশ্নের সংখ্যাই বেশি এসে যায়। আশা হয়তো এটাই যে, এই প্রশ্নগুলো এই তত্ত্বের কাঠামোর গভীর অসারতাগুলোকে প্রমান করবে যা অন্য অনেকের কষ্টের কারন হয়েছে। অভিবাসন এবং উদ্বাস্তু সংকট, সুরক্ষার  রাজনীতি, ভিনদেশে আইনসিদ্ধ ভাবে উন্মুক্ত দখলদারিত্বের যুদ্ধ কিংবা অর্থনীতিক কিংবা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ সহ নানাবিধ সামাজিক ও শিক্ষা প্রকল্পের মাধ্যমে “ক্ল্যাশ অভ সিভিলাইজেশন” এর যে বিভিন্ন রুপ তাকে আমরা কিভাবে দেখবো তাও আলোচনার বিষয় । আরও জরুরিভাবে এই তত্ত্বের সিপাহীদের প্রতিরোধে এর মৌলিক সমস্ত প্রশ্নের বিপরীত আখ্যান নির্মাণ করার প্রয়োজন, যা শুধুই প্রতিশোধের আকাঙ্খায় নির্মিত নয়; বরং যৌক্তিক,বৈচিত্র্যময়,বহুমুখী এবং সমবেত একটি পূর্ণাঙ্গ আলোচনার জন্ম দেবে, যা ইউরোপে কেন্দ্রীভূত এই তত্ত্বের ধারণাকে অকেজো করে একটি অ-আধিপত্যবাদী এবং টেকসই একটি নতুন চিন্তায় সমৃদ্ধ হবে ।