অনুবাদ

ঘৃণার ধর্মতত্ত্ব চেনার উপায়ঃ ইসলামী বিজ্ঞানের ভেতরকার বয়ানে
ঘৃণার ধর্মতত্ত্ব চেনার উপায়ঃ ইসলামী বিজ্ঞানের ভেতরকার বয়ানে
অনুবাদ করেছেন পাঠচক্র ডেস্ক
১৭ নভেম্বর ২০১৫

কিছুদিন আগে বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মত শিয়া মুসলিমদের রাজনৈতিক ও দ্বীনি সমাবেশ –তাজিয়া মিছিলে বোমা হামলার মাধ্যমে একটা নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। এই ঘটনার সাথে আসলে কারা জড়িত সেটা নিরূপন এই অদ্ভুত সময়ে খুব কঠিন হলেও আমাদের সমাজে এ ধরনের সন্ত্রাসী কাজ কারবার এর পাশাপাশি, সরাসরি বোমা ফুটানো বা মানুষ কোপানোতে অংশ নেওয়ার ঝুঁকি নিতে ইচ্ছুক নন কিন্তু ঘরে বসে ঘৃণার চাষবাস করেন, ফেসবুকে ঘৃণার প্রসার চালান এমন সুশীল নতুন গজানো “ধর্মপুত্র” ‘র সংখ্যা আরো বেশি। একাডেমিয়ায় এদেরকে বলা হয় “ফ্যানবয়”। এক ধরনের বাইনারী ব্যাখ্যা দাঁড়া করানোর মাধ্যমে তাদের মূল পেশা হয়ে দাঁড়ায় হারাম পুলিশ এর দ্বায়িত্ব পালন এবং গোত্রবাদী শুদ্ধতা যেমন অমুকের নামাজের হাত বাঁধা ঠিক হয়না, তমুকের বিতরের নামাজ বিদায়াত, ঐ আলেমের আক্বীদার ঠিক নাই ইত্যাদির বেচাবিক্রি ও ফেসবুক লাইক কামানো। এটা অস্বীকার করা হবে বোকামী যে, খুব মিষ্টি মিষ্টি কথায় শিয়া মুসলিমদেরকে মুশরিক বানানো এবং তাদের রক্ত হালাল করার এই অভিনব ট্রেন্ড এর আগে ইসলামের ইতিহাসে আর কখনও দৃষ্টিগোচর হয়নি। যারা সুশীল স্ফিয়ারে এই ঘৃণা সোৎসাহে ছড়িয়েছেন এবং ছড়াচ্ছেন তারা অন্তত পরোক্ষাভাবে এধরনের সেক্টেরিয়ান সন্ত্রাসের সাথে জড়িত। এই ঘৃণার চাষবাস শুধু বাংলাদেশেই নয়, বরং বাংলাদেশের সমস্যা গ্লোবাল বাইনারী ঘৃণার ধর্মতত্ত্বের একটা স্পিলওভার মাত্র। ইয়াহিয়া ইব্রাহীম এর লেখা একটি আর্টিকেল এই ঘৃণার ধর্মতত্ত্ব বুঝতে আমাদের সাহায্য করবে। নিচে তাঁর একটি অত্যন্ত প্রাসংগিক লেখার ভাবানুবাদ প্রকাশ করা হল।  

 

তাজিয়া                                

সারা বিশ্বের মুসলমানদের জন্য তাদের ও তাদের খোদার নামে হত্যাকান্ডগুলোর ব্যাপারটি অনুধাবন করতে কষ্ট হচ্ছে। এগুলো যারা করছে তারা উন্মাদ, তাদের পরিচর্যায় ত্রুটি ছিল বা তাদেরকে মুসলমানদের দুর্নাম রটানোর জন্য কিংবা মুসলিম অধুষ্যিত অঞ্চল দখল ত্বরান্বিত করতে পয়সা দিয়ে কেনা হয়েছে  ... নানান কথা বলা খুব সহজ। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমরা যারা ইসলামী বিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা করি তারা উপলব্ধি করতে পারি যে এসব পাপীষ্ঠ, দুর্নীতিবাজ, ধর্মত্যাগী হত্যাকারীদের আমাদের সমাজেই পাওয়া যাবে। নবী (সঃ) নিজেই এই অপশক্তির বিকাশমান রূপ প্রত্যক্ষ করে গেছেন এবং তাঁর মৃত্যুর পর এদের নানা শাখা-প্রশাখার বিরুদ্ধে সাহাবাদেরকেও যুদ্ধ করতে হয়েছে।  

ইসলামের প্রতি আন্তরিক ভালোবাসা, ইসলামী নেতৃত্ব ও দ্বীনের ব্যাপারে সহানুভুতির ছদ্মবেশে এগুলো হলো হত্যাকান্ড ও অরাজকতার আদর্শ। তবে আপনি যদি এদের বক্তব্যগুলো শুনে সেখান থেকে আবেগী প্রতিক্রিয়াশীলতাকে ছাটাই করতে পারেন তাহলে বুঝবেন এগুলো ইসলাম ও এর উদ্দেশ্যের মিথ্যা ও বিকৃত উপলব্ধি তারা সত্যের কাছাকাছি কিছু কথা বলে থাকে, কিন্তু তা ভুল পথে পরিচালিত হবার উদ্দেশ্যেই। 

সচেতন মানুষদের কাছে তাদের বিপদজনক লক্ষণগুলো সুস্পষ্ট। হযরত মুহাম্মদ (সঃ) এর হাদীস ও সাহাবাদের সতর্কবাণী থেকে উগ্রপন্থীদের চারিত্রিক কিছু লক্ষণ নিচে উল্লেখ করা হলোঃ

 

 

১. তারা হবে অল্প বয়স্ক

শেষ যামানায় এমন একদল মানুষের আবির্ভাব ঘটবে, যারা হবে অল্পবয়স্ক এবং যাদের বুদ্ধি হবে স্বল্প। (বুখারী ৫০৫৭)

এটি আপাতদৃষ্টিতে একটু আশ্চর্যের হলেও অত্যন্ত গুরত্বপূর্ণ একটি কথা। কিব্বার বা  প্রবীণ অভিজ্ঞ আলিমরা জ্ঞানের বাহক। যদি দেখেন সমাজে যারা আস্থাভাজন নয়, এবং এদের স্বল্প দায়িত্ববোধ কিংবা অভিজ্ঞতাবিশিষ্ট একটি অপরিণত বয়স্কের দল কোন বিষয়ে একমত হয়ে যখন সেই ব্যাপারে অন্যদের মধ্যে মতপার্থক্য প্রবল তাহলে এইসব বোকা অল্পবয়স্কদের থেকে দূরে থাকতে হবে। তাদেরকে বাক্যবাগীশ এবং বিশ্বস্ত মনে হতে পারে কিন্তু তাদের বোধগম্যতা অপরিপক্ক ও ভিত্তিহীন।


২. ক্রুদ্ধ ও বোকা

হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এদের হাবভাবের ব্যাপারে বলেছেন তারা হবে কর্কশ, অল্পতে রেগে যাবে এবং কিছুটা নির্লজ্জ হবে। তারা চিন্তা করার আগেই কথা বলবে, না জেনে না বুঝেই দ্বন্দ্বে লিপ্ত হবে, তারা যা বুঝেছে সেটাই একমাত্র সত্য মনে করবে এবং তাদের বিরোধী মতাবলম্বীদেরও মুক্তির প্রয়োজনে একমাত্র তাদেরই অনুসরণ করা উচিৎ মনে করবে।

এটি উগ্রপন্থার একটি বৈশিষ্ট্য। যে উদ্দেশ্য নিয়ে তারা কাজ করে সেটা ন্যায়সংগত কিন্তু তার ব্যাপারে তাদের উন্মত্ততা আইন ও নৈতিকতার সীমা অতিক্রম করে। তাদের ক্রোধের কারণে রসূল (সাঃ) কে নিয়ে  ব্যঙ্গ করার অপরাধে ১২জনকে হত্যা করা তাদের কাছে সমর্থনযোগ্য – যার ব্যাপারে আমরাও সবাই ক্রুদ্ধ হয়েছি। কিন্তু আমরা বৈধ উপায়ে আমাদের রাগ প্রকাশ করার চেষ্টা করেছি, হত্যাকান্ডের মাধ্যমে নয়।

তারা যে ক্রোধের বশবর্তী হয়ে তাড়াহুড়ো করে নির্বোধের মতো অপরিপক্ক কাজ করে তা তাদের স্বভাবের অংশ হয়ে যায়।


. অহংকারী এবং দাম্ভিক

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে যে, নবী (সাঃ) আমাকে বললেন যে:

"... মানুষ তাদের দ্বারা বিস্মিত হবে এবং তারা নিজেদের নিয়ে গর্বিত হবে, এবং তারা দ্বীন থেকে এভাবে বেরিয়ে যাবে, যেমন ধনুক থেকে তীর বেরিয়ে যায়।  " (মুসনাদে আহমাদ).

তারা অন্যদের ভাল মুসলিম হওয়ার জন্য সংগ্রাম রত দেখতে পেলে তাদের প্রতিও সমালোচনায় কঠোর হয় এবং নিজেদেরকে তাদের চেয়ে উচু মর্যাদাসম্পন্ন হিসেবে প্রকাশ করে। তাদের নিজেদেরকে কোন বিশিষ্ট দলের অন্তর্ভুক্ত মনে করে এবং মনে করে তারা অন্যদের থেকে উত্তম এবং সেটা তাদের কথা,  চালচলনে প্রকাশ করে। অন্যদেরকে কাফির ও মুনাফিক লেবেল ডাকা তাদের আরেকটি স্বভাব, এর পরিণতি এবং এগুলোর অর্থ অনুধাবন না করেই তারা এই শব্দগুলো অনায়াসে উচ্চারণ করে।


৪.
 অত্যাধিক ইবাদাত বন্দেগী

আনাস (রাঃ) বলেছেন রাসুল (সাঃ) আমাকে বলেন তোমাদের মধ্যে এমন কিছু লোক আসবে যারা আল্লাহ্‌র বন্দেগীর পথে কঠোর সাধনা করবে...... এবং তারাই আবার দ্বীন থেকে এমনভাবে বেরিয়ে যাবে যেমনিভাবে ধনুক থেকে তীর বেরিয়ে যায়। মুসনাদে আহমাদ হযরত আলী রাঃ থেকে বর্ণিত, আমি রাসুল (সাঃ) কে বলতে শুনেছিঃ আমার উম্মতের মধ্যে এমন কিছু মানুষের উদ্ভব হবে যাদের কুরআন তেলাওয়াতের নিকট তোমাদের তেলাওয়াত তুচ্ছ মনে হবে, যাদের নামাজের তুলনায় তোমাদের নামাজকে তুচ্ছ মনে হবে এবং তাদের সিয়ামের তুলনায় তোমাদের সিয়ামকে তুচ্ছ মনে হবে। (মুসলিম ১০৬৬)

এ কথা সত্য যে, এসব অল্পবয়েসী অপরিপক্ক ও বোকা লোকেরা নিঃসন্দেহে একনিষ্ঠ। তারা আল্লাহকে ভালবাসে এবং দ্বীনকে বিজয়ী করার ইচ্ছাই পোষণ করে। তারা যা করে তা দৃঢ়বিশ্বাস নিয়েই করে। দুঃখজনক হলো, তাদের নামাজ , তিলাওয়াত ও হিফজ আমাদের চেয়ে উত্তম হওয়া সত্তেও তারা নিজেদের বুদ্ধিমত্তাকে কুরআনের সঠিক অর্থের সাথে সংযোগ স্থাপন করতে পারেনি । কুরআন তাদের জিহ্বায় রয়ে গেছে মর্মে প্রবেশ করতে পারেনি, তা কন্ঠনালী অতিক্রম করতে পারেনি। তারা আয়াতের গভীর ও সুদূরপ্রসারী অর্থ বুঝতে পারেনা বরং একটা অর্থের উপরই অটল থাকে। এই মনোভাব তাদেরকে ভুল ব্যাখ্যার দিকে ধাবিত করে।


৫.
 কুরআনের ভুল ব্যাখ্যা

নবী (সাঃ) বলেছেন ‘তারা কুরআন তিলাওয়াত করবে কিন্তু তা তাদের কন্ঠনালীর বেশী অতিক্রম করবেনা’ (মুসলিম ১০৬৬) তিনি আরো বলেন ‘তারা আল্লাহ্‌র কিতাব পাঠ করবে অনায়াসে কিন্তু তা তাদের কন্ঠনালী অতিক্রম করবেনা’। (মুসলিম-১০৬৪) হৈ চৈ আর স্লোগান হলো আবেগের তীব্র বহিপ্রকাশ, এসব বিষয়গুলো প্রায়ই নিগূঢ় অর্থকে সুষ্পষ্ট করেনা। কুরআন আমাদেরকে ভালোবাসা, সৌহার্দ্য-সম্প্রীতি ও শান্তির মনোমুগ্ধকর বাণী শিক্ষা দেয়। যারা এভাবে দ্বীনের একটি বিষয় নিয়েই আঁকড়ে পড়ে থাকে তারা এই বিষয়টিই লক্ষ করেনা।


৬.
 বক্তৃতাবাগীশ

হযরত আলী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, আমি রাসুল (সাঃ) কে বলতে শুনেছিঃ আমার উম্মতের মধ্যে এমন কিছু মানুষের উদ্ভব হবে যাদের কুরআন তেলাওয়াতের নিকট তোমাদের তেলাওয়াত তুচ্ছ মনে হবে, যাদের নামাজের তুলনায় তোমাদের নামাজকে তুচ্ছ মনে হবে এবং তাদের সিয়ামের তুলনায় তোমাদের সিয়ামকে তুচ্ছ মনে হবে। (মুসলিম ১০৬৬)

রাসুল (সাঃ) আরো বলেন, ‘এমন কিছু লোক আসবে যারা কথায় উত্তম কিন্তু কার্যকলাপে খারাপ’ (সহীহ আবু দাউদ-৪৭৬৫)

একজন উগ্রপন্থীর সাথে তর্ক করা খুবই কঠিন। তারা খুবই আবেগপ্রবন আবার মুসলিম উম্মাহর দুরাবস্থাও অস্বীকার করার মতো নয়। তারা সাধারনত বিভিন্ন ঘটনার অস্পষ্ট রেফারেন্স উপস্থাপন করে নিজেদের নিষ্ঠুর আচরণের বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করে। আপনি তাদের কোন অপরাধের নিন্দা জানালে তারা বলে আমাদের সাথে যা করা হলো তার কী হবে?। আপনি যদি নিরপরাধ মানুষ হত্যার নিন্দা করেন তারা বলবে ড্রোনের কথা। পেশোওয়ারে স্কুল শিক্ষার্থীদের নৃশংসভাবে হত্যার পর তারা বলেছে আমাদের শিশুদেরও হত্যা করা হয়েছিল।

 

৭.  মুসলিমদেরকে কাফির ফতোয়া দেয়া এবং হত্যার বৈধতা দেয়া

রাসুল (সাঃ) বলেছেন ‘তারা মুসলমানদের হত্যা করবে’ (বুখারী-৭৪৩২) এটা খুবই আশ্চর্যজনক যে যারা ইসলামের প্রতি ভক্তি প্রদর্শন করে তারাই অন্যদের চেয়ে বেশি মুসলমানকে হত্যা করে। জনবহুল জায়গায় বোমা হামলা, অপহরণ, স্কুলে হামলা, ভিন্ন মতাবলম্বীদের হত্যা, পুড়িয়ে মারা হেন নৃশংসতা নেই তারা করছেনা। ইয়েমেনে আলকায়েদা হাসপাতালে হামলা চালিয়ে সবাইকে হত্যা করলো, পাকিস্তানে স্কুলে হামলা করে ১৪৬ জন শিশু হত্যা করলো ভিন্ন মতাবলম্বী মুসলিমদের মসজিদে বোমা হামলা করা কিংবা তাদের মতের সাথে না মিললেই কুফরীর ফতোয়া দেয়া এদের কাজ।

 

৮. আলেম উলামাদেরকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করা

আলেম উলামাদের কথা বলা হলে এরা  তাদেরকে  লেবেল লাগিয়ে দেয় ‘টাকায় বেচা আলেম’, ’পেট্রোল আলেম’, ‘ফিক্বহের আলেম-জিহাদের নয়’... এবং আরো নানাবিধ অপমানজনক কথা বলে।

পাঠচক্র ডেস্ক