অনুবাদ

চিন্তার সংকট এবং ইজতিহাদ - শাইখ ড. তাহা জাবির আল আলওয়ানী
চিন্তার সংকট এবং ইজতিহাদ - শাইখ ড. তাহা জাবির আল আলওয়ানী
অনুবাদ করেছেন শিহান মির্জা
১১ সেপ্টেম্বর ২০১৫

 

মুসলিম মানসে ইসলামী সভ্যতার প্রারম্ভিক শতাব্দীগুলোতেই চিন্তার সংকট অনুভূত হতে শুরু করে। ইজতিহাদ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের নিয়মতান্ত্রিক বিজ্ঞান (methodology) বিবেচিত না হয়ে কেবলমাত্র আইনসংক্রান্ত ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। ইজতিহাদের এই সীমাবদ্ধ ধারণা এক ধরনের ব্যাধির সৃষ্টি করে যার ফলে তাক্বলীদ এতটা প্রসিদ্ধি লাভ করতে সক্ষম হয় এবং এর সংক্রামক ব্যাধি, সংকীর্ণতা এবং অপ্রাসঙ্গিক ফিক্বহ মুসলিমদের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে। যদি ইজতিহাদ তার আভিধানিক অর্থ এবং সৃজনশীলতা বজায় রেখে টিকে থাকতে পারত এবং ফিক্বহ এর অনেকগুলো ব্যবহারের অন্যতম একটি ব্যবহার হিসেবে বিবেচিত হত তাহলে হয়তোবা মুসলিমরা তাদের মুখোমুখী হওয়া অনেক সমস্যার সমাধান করতে পারত। ইজতিহাদের এই নির্দিষ্ট বা সীমাবদ্ধকরণ মুসলিম মানসকে সীমাবদ্ধ করে দেয়। তাক্বলীদও শেষ পর্যন্ত মুসলিম উম্মাহর সৃজনশীল বৈশিষ্ট্যগুলোকে পক্ষাগাতগ্রস্ত করে দেয়। যদি ইজতিহাদ আল্লাহর নির্দেশানুযায়ী মুসলিমদের জীবনধারার একটি অংশ হিসেবে থাকতে পারত তাহলে মুসলিমরা তাদের সমাজ এবং সভ্যতার জন্য প্রয়োজনীয় বৈজ্ঞানিক ধারাগুলোকে ইসলামের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করার ব্যাপারে পিছিয়ে থাকত না এবং বিশ্বনেতৃত্বের ধারা পাশ্চাত্যের হাতে ন্যস্ত হওয়াও মুসলিমদের প্রত্যক্ষ করতে হত না; যে পাশ্চাত্যের সবচেয়ে বড় গুণ ছিল সৃজনশীলতা এবং বৈজ্ঞানিক যুক্তিবিদ্যায় নিজেদের নিয়োজিত করা। পাশ্চাত্যের বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্য গ্রীক পৌত্তলিক চিন্তাধারা দ্বারা দূষিত হওয়া সত্ত্বেও এটি নিজেকে বিশ্বনেতৃত্বের পদে আসীন করতে সক্ষম হয়। যদি মুসলিমরা সেসব বিজ্ঞানগুলোকে চর্চা করত এবং সমাজের ভিত্তিকে তাওহীদের উপর প্রতিষ্ঠিত করতে পারত তাহলে পৃথিবীর চেহারা অন্যরকম হতে পারত এবং মানবসভ্যতার অবস্থাও বর্তমানের চেয়ে অনেক বেশী সুখী হত। ইজতিহাদ ফিক্বহের আইনীকাঠামোতে সীমাবদ্ধ হয়ে যাওয়ার পূর্বে মুসলিম মানস ছিল আলোকিত। চিন্তাক্ষেত্রের সকল শাখা-প্রশাখায় নিয়োজিত হওয়ার ব্যাপারে তারা ছিল আগ্রহী। তারা বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা ও সমাধান নির্ণয়ের ক্ষেত্রে ছিল সক্ষম। সেই সাথে নিজেদের লক্ষ্য পূরণে ছিল সমর্থ। বুদ্ধিবৃত্তি যদি তাক্বলীদের বশীভূত হয়ে না পড়ত তাহলে মুসলিম মানস অনেক অসাধারণ ফলাফল অর্জন করতে পারত। একটি মন যেটার সূচনা হয় “পড় তোমার প্রভুর নামে যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন” আয়াত দ্বারা, সেটা উম্মাহর মানসিকতাকে জাগ্রত করা ছাড়াও, সদাপরিবর্তিত পরিস্থিতির মোকাবেলা এবং সভ্যতা নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় বিজ্ঞানসমূহ উদ্ভাবন করতে সক্ষম ছিল, একইসময়ে যখন পাশ্চাত্যজগত ছিল জংলী গোত্রসমূহের পদভারে নিষ্পেষিত।

ইজতিহাদ বলতে আমরা কি বুঝি

উপরে বর্ণিত কারণগুলোর জন্যই আমরা এক নতুন ধরনের ইজতিহাদের ডাক দিচ্ছি। তবে এই ইজতিহাদ উসূল এর আলিমদের দ্বারা সংজ্ঞায়িত ইজতিহাদ না (যেটার ব্যাপারে আমরা পরবর্তী আর্টিকেলে আলোচনা করব)। আমরা যে ইজতিহাদের ডাক দিচ্ছি সেটা চিন্তার জগতে কাজ করার একটি নিয়মতান্ত্রিক বিজ্ঞান (methodology)। ইজতিহাদের এ ধরনের ধারণা মুসলিম মানসকে বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদে নামতে উদ্বুদ্ধ করবে, যে জিহাদের উদ্দেশ্য হবে নতুন আইডিয়া উৎপন্ন করা এবং নতুন ধরনের মুসলিম ব্যাক্তিত্ব, পরিচিতি এবং মানসিকতা সৃষ্টি করা। এ জিহাদ জ্ঞানের সকল ক্ষেত্রে সংঘটিত হবে এবং উম্মাহকে তার ‘খিলাফত’ ও ‘মধ্যবর্তী জাতি (উম্মাতে ওয়াসাতাহ) হওয়ার’ দায়িত্ব পালন করার উপযোগী করে গড়ে তুলবে। এই ইজতিহাদ শুধু আইনী ও বিচারব্যবস্থাসংক্রান্ত ফিক্বহের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে না, এমন সব ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে যেখানে উম্মাহর সম্পৃক্ততা ও সৃজনশীলতার প্রয়োজন আছে। যেমনঃ ধর্মচারিতার ফিক্বহ(ফিক্বহ আত তাদাইয়ুন), দাওয়াহর ফিক্বহ(ফিক্বহ আদ দাওয়াহ) ইত্যাদি।

ইজতিহাদঃ জিহাদের সঙ্গী

ইজতিহাদ এবং জিহাদ এ দুটো শব্দের আভিধানিক মূল একই, جهد . জিহাদ এবং ইজতিহাদ দুটোরই লক্ষ্য হচ্ছে একই; সকলকে সৃষ্টির আনুগত্য থেকে মুক্ত করা যাতে তারা স্বাধীনভাবে স্রষ্টার আনুগত্য করার সুযোগ পায়; তাদেরকে ধর্মীয় বিচ্যুতি ও কুসংস্কার থেকে ইসলামের সুবিচার আর বস্তুগত পৃথিবী ও চিন্তার সংকীর্ণতা থেকে ইসলাম এবং ক্বুরআনের বিস্তৃত সীমানার মধ্যে নিয়ে আসা। এজন্যই ইজতিহাদকে জিহাদের মতই ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। জিহাদ ছাড়া উম্মাহর কোন অস্তিত্ব নেই আর ইজতিহাদ ছাড়া উম্মাহর কোন প্রাণশক্তি নেই। তাই জিহাদ এবং ইজতিহাদ উভয়কেই অপরিহার্য এবং সদাচলমান প্রক্রিয়া বলা যেতে পারে। ইজতিহাদ যখন থেকে শুধুমাত্র ফিক্বহের ব্যাপারগুলোতে সীমাবদ্ধ হয়ে গেল তখন ইজতিহাদের ব্যবহার খুবই দুর্লভ হয়ে পড়ল, প্রতি শতাব্দীতে হয়তোবা একবার মুসলিম চিন্তাবিদ এবং পন্ডিতদের দ্বারা ইজতিহাদের প্রয়োগ হত। আর এসব চিন্তাবিদ আর পন্ডিতদের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম, আধুনিক কালে আধুনিক পার্লামেন্ট বা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকে তেমন। ইজতিহাদ ছিল মুসলিমদের জন্য অজ্ঞতা, অবিচার এবং বিচ্যুতি মোকাবেলা করার এক নিয়মতান্ত্রিক পন্থা। কিন্তু যখনই এটা পরিত্যক্ত হল, তখন থেকেই মুসলিমদের উপর সব ধরনের সমস্যা চেপে বসল। ইজতিহাদের দরজা বন্ধ করে মুসলিমরা ভাবছিল তারা তাদের আইনসংক্রান্ত সমস্যা দূর করতে সক্ষম হয়েছে কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ইজতিহাদ বন্ধের দ্বারা মুসলিমরা নিজেদের বুদ্ধিবৃত্তিকেই শুধুমাত্র পঙ্গু করে দিচ্ছিল। যদিও এমন কোন সময় ছিল না যখন ইজতিহাদ পুনঃপ্রচলন করার আওয়াজ একেবারে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু তা উম্মাহকে তার বুদ্ধিবৃত্তিক সংকট থেকে রক্ষা করতে পারেনি যেটার কর্দমায় উম্মাহর পা আটকে গিয়েছিল। এর ফলে ইজতিহাদ করার জন্য কেবলমাত্র বিপথগামীরাই বাকি রইল, শেষ পর্যন্ত এই ইজতিহাদের দায়িত্বভার এসে পড়ল প্রাচ্যবিদদের ঘাড়ে(!)। কোন প্রকৃত মুসলিম যদি এমন কোন মতামত বা চিন্তা নিয়ে সামনে আসত যা শুনতে মানুষ অভ্যস্ত ছিল না কিংবা ইজতিহাদ করার সাহসী ঘোষণা করত, তবে সাথে সাথেই তাক্বলীদের অন্ধ সমর্থকদের কাছে তিনি লাঞ্চনা আর হাসির পাত্রে পরিণত হতেন। মুসলিম উম্মাহকে অবশ্যই বুঝতে হবে, ইজতিহাদ হচ্ছে তাদের জন্য পৃথিবীতে নিজেদের পরিচয় এবং অবস্থান পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার প্রয়োজনীয় এক মৌলিক কর্মপন্থা। ইজতিহাদ ছাড়া মুসলিম মানস কখনোই ইসলামের আকাঙ্খিত মানে উপনীত হতে পারবে না; উম্মাহও পৃথিবীতে নিজেদের যথাযথ স্থান অধিকার করতে পারবে না। যতক্ষণ না পর্যন্ত ইজতিহাদ ব্যাপক হারে একটি স্বাভাবিক বুদ্ধিবৃত্তিক ধারা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত এটা খুব কমই আশা করা যায় যে, উম্মাহ আবার বিশ্বসভ্যতায় উল্লেখযোগ্য কোন অবদান রাখবে বা নিজের গতিপথকে সঠিক নির্দেশনার ফিরিয়ে আনবে। নিজস্ব সংস্কৃতি দাঁড় করানোর অথবা সমাজ সংশোধন ও সংস্কারের আশাও খুব কমই করা যায়। মুসলিম মানসকে মুক্ত করার জন্য, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই ইজতিহাদের প্রয়োজন। উম্মাহ যদি তার উপর ন্যস্ত দায়িত্ব পালন করতে চায়, তাহলে তাকে ক্বুরআন ও সুন্নাহ নতুন পরিস্থিতির আলোকে পুনঃপঠনের দায়িত্ব নিতে হবে। উম্মাহকে নিজের অতীত থেকে শিক্ষা নিতে হবে, বর্তমানকে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে আর এভাবেই ভবিষ্যতের সুনিশ্চিত পথ নির্মাণ করার কাজ করে যেতে হবে।

মুজতাহিদ সঠিক বা ভুল যাই করেন না কেন পুরষ্কৃত হবেন

শুধুমাত্র ইজতিহাদের ঘোষণা-আহবান আর বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ইজতিহাদের সূচনা বা মুজতাহিদ পয়দা হতে পারে না। যেহেতু একজন মুজতাহিদ হচ্ছেন উম্মাহর সবচেয়ে সুদক্ষ এবং সুপন্ডিত ব্যাক্তিত্ব, তাই ইজতিহাদের এ ধারা প্রচলন করার জন্য চাই প্রয়োজনীয় সাংস্কৃতিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশ তৈরী করার যথাযথ প্রস্তুতি। যখন রাসূলুল্লাহ (দ) ইজতিহাদের ফল সঠিক হলে দুটো প্রতিদান আর ভুল হলে একটা প্রতিদানের কথা ঘোষণা করেছিলেন, তখন তিনি এমন এক উম্মাহকে উদ্দেশ্য করে এ কথাগুলো বলছিলেন যারা বুঝতে পেরেছিল যে ইজতিহাদের এই গুরুদায়িত্ব খুব কম লোকই নিতে পারে। এই দায়িত্ব এত গুরুত্বপূর্ণ আর ভারী ছিল যে, ইজতিহাদের এই কঠিন দায়িত্ব যারা পালন করেছেন তারাও সংখ্যাগরিষ্ঠ কিংবা শাসকদের মতের বিরুদ্ধে নিজেদের ইজতিহাদী মত সবসময় প্রকাশ করতেন না। এটা সুস্পষ্ট যে, ইজতিহাদ এবং এর প্রয়োজনীয়তার কথা বলে গেলেই শুধু হবে না, এর জন্য যথাযথ বুদ্ধিবৃত্তিক এবং সাংস্কৃতিক পরিবেশ সৃষ্টি করার একনিষ্ঠ প্রচেষ্টাও চালিয়ে যেতে হবে। আর এই লক্ষ্যপানে সর্বপ্রথম ধাপ হল স্বাধীনভাবে চিন্তা ও মতামত প্রকাশের পরিবেশ নিশ্চিত করা। জনগণের যদি জিহাদ করার সাহসিকতার অভাব থাকবে, তাহলে ইজতিহাদ করা এবং সেটার ফলস্বরূপ যে দায়িত্ব আসবে তা কাধে তুলে নেয়াটা তাদের জন্য আরো বেশী কঠিন। এমন অনেক বুদ্ধিবৃত্তিক মত আছে আছে যেগুলো প্রতিরক্ষা করা কোন সামরিক অবস্থান প্রতিরক্ষা করা থেকেও বেশী কঠিন। বর্তমান অবস্থায় সৃজনশীল আইডিয়া উৎপন্ন কিংবা আংশিক ইজতিহাদ করতে সক্ষম কোন ব্যাক্তির নিজের মতামত প্রকাশ করতে মোটেও দ্বিধা করা উচিত নয়। ইজতিহাদে ভুল করলেও যে একটা প্রতিদান পাওয়া যায় এ ব্যাপারে জ্ঞাত কোন ব্যাক্তির কাছে নিজের সৃজনশীলতা বা আইডিয়া দিয়ে উম্মাহকে উপকৃত করার ব্যাপারে কার্পণ্য করার কোন অজুহাত থাকতে পারে না। হয়তোবা, তাদের সেসব আইডিয়াই উম্মাহর মধ্যে নতুন কোন সাংস্কৃতিক কিংবা বুদ্ধিবৃত্তিক ধারার সৃষ্টি করবে। যারা সবসময় ইজতিহাদকে ঝুঁকিপূর্ণ বলে তা করতে নিরুৎসাহিত করেন তাদের কথার প্রতি আর কর্ণপাত করা উচিত নয়। এ মতবাদধারীদের কথা উম্মাহ অনেক শুনেছে এবং তাদের কোন কথাই উম্মাহর কোন উপকারেই আসে নি।

ইজতিহাদের আভিধানিক এবং প্রায়োগিক অর্থ

আরবি অভিধানে جهد (ইজতিহাদ শব্দের মূল) এর অর্থ কোন ব্যাপারে সেটার প্রয়োজনানুসারে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা করা। এর ভিন্ন ভিন্ন সব প্রায়োগিক রূপেই বুদ্ধিবৃত্তিক এবং মানসিক দিক দিয়ে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টার ব্যাপারটি অন্তর্ভুক্ত। আর এ জন্যই মুজতাহিদ হচ্ছে এমন একজন একনিষ্ঠ পন্ডিত ব্যাক্তি যিনি কোন একটি বিষয়ে প্রাপ্ত সব উৎস, তথ্য, উপাত্ত, পরিসংখ্যান যাচাই এবং গবেষণা করে নিশ্চিত হন যে তিনি ঐ ব্যাপারে জানার জন্য তার সাধ্যানুযায়ী সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা করেছেন। মুজতাহিদের পক্ষ থেকে তার নিজের প্রচেষ্টার সবটুকু উজাড় করে দেয়ার পরই তার মতকে যৌক্তিকভাবে নির্ভরযোগ্য ভাবা চলে। আর এজন্যই ইমাম গাজ্জালীর মতে ইজতিহাদ হচ্ছে “মুজতাহিদের পক্ষ থেকে কোন বিষয়ে শারীয়াহর হুকুম জানার জন্য নিজ সর্বোচ্চ চেষ্টাটুকু করা।” এ ব্যাপারটি আরো পরিষ্কার করার জন্য ইমাম গাজ্জালী বলেন, “সম্পূর্ণ ইজতিহাদ তখনই হয় যখন একজন মুজতাহিদ নিশ্চিত হন যে তিনি (ইজতিহাদরত বিষয়ে জানার জন্য) যতটুকু প্রচেষ্টা করেছেন এরচেয়ে বেশী প্রচেষ্টা করা আর সম্ভব নয়।” ইজতিহাদের এই সংজ্ঞা মূলত আইনসংক্রান্ত বিষয়ে ইজতিহাদের ক্ষেত্রে দেয়া হয়েছে। তবে এ থেকে বোঝা যায় যে, ইজতিহাদ হতে পুঙ্খনাপুঙ্খ এবং যোগ্য ব্যাক্তিদের দ্বারাই ইজতিহাদের কাজ হতে হবে। কোন অযোগ্য লোক যদি ইজতিহাদের জন্য প্রয়োজনীয় একই কর্মপন্থা অনুসরণ করে তবে তা ইজতিহাদ বলে গণ্য হবে না।

কিভাবে তাক্বলীদ ও পরনির্ভরতার ব্যাধি দূর করা যায়

তাক্বলীদের কবল থেকে মুক্তি পেতে আমাদেরকে অবশ্যই খুবই সতকর্তার সাথে নিজেদের বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকান্ডের ভিত্তি (premise) নির্ধারণ করে নিতে হবে যাতে আমরা ইজতিহাদের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারি। তবে সেটা করতে গিয়ে আমাদেরকে আধুনিক পাশ্চাত্য নমুনা (paradigm) থেকে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে যেটা কিনা বর্তমান যুগে প্রত্যেক প্রাতিষ্ঠানিক মতামতের কেন্দ্রবিন্দু এবং বেশীরভাগ আধুনিক চিন্তাবিদদের চিন্তার সূচনাস্থল হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ সতর্কতা অবলম্বন করার একটি বড় কারণ হচ্ছে আধুনিক পাশ্চাত্য নমুনা ধর্মনিরপেক্ষ বস্তুবাদিতার ভিত্তির উপর স্থাপিত। এ ধর্মনিরপেক্ষ বস্তুবাদি চিন্তাধারা সোজাসুজিভাবে যেকোন আসমানী ওহীর ধারণাকে নাকচ করে দেয়। এটি কেবলমাত্র পরিমাপযোগ্য জিনিসকেই গবেষণার বিবেচনায় আনে। যারা পাশ্চাত্যের চিন্তাধারা দ্বারা প্রভাবিত তারাও জ্ঞানকে শুধুমাত্র পঞ্চ ইন্দ্রিয় কিংবা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে অর্জিত তথ্য হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেন। আধুনিক সামাজিক-মানবিক এবং প্রাকৃতিক বিজ্ঞানগুলো জ্ঞানের এই সংজ্ঞার উপর স্থাপিত। রাজনীতি, সমাজ, অর্থনীতি এবং নীতিবিদ্যার আধুনিক সব তত্ত্বের শিকড়ও এর মধ্যে প্রোথিত। ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ তাই বুদ্ধিবৃত্তিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক সকল গবেষণা, বিশ্লেষণ এবং সংশ্লেষণের (synthesis) ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বের চিন্তাবিদ এবং পন্ডিতগণ পাশ্চাত্যের এই ধর্মনিরপেক্ষ নমুনাকে মেনে নিয়েছেন। পাশ্চাত্যের এই মডেল গ্রহণ করে নেয়ার ফলে উম্মাহর বুদ্ধিবৃত্তিক পরনির্ভরতাই কেবল বৃদ্ধি পেয়েছে। একইভাবে পাশ্চাত্য এবং প্রাচ্যের সাংস্কৃতিক এবং সভ্যতার যে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগত পার্থক্য তাও এই মডেল উপড়ে ফেলছে এবং সম্ভবত পাশ্চাত্য দ্বারা প্রাচ্যের নির্জলা শোষণেও এর ভূমিকা রয়েছে। তাই যতক্ষণ না পর্যন্ত এই পরনির্ভরতা দূর করা যাচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত কোন ইজতিহাদ বা বুদ্ধিবৃত্তিক সৃজনশীলতা প্রদর্শন করা সম্ভবপর হবে না।

[The Crisis of Thought and Ijtihad আর্টিকেল থেকে অনুদিত]