অনুবাদ

তুরস্কঃ একটি নতুন মডেল
তুরস্কঃ একটি নতুন মডেল
অনুবাদ করেছেন তারিকুর রহমান শামীম
২৩ জুলাই ২০১৬

এই লেখাটি উমের তাসপিনারের লেখা "দ্য ইসলামিস্ট আর কামিংঃ হু দে রিয়েলি আর" নামক বইয়ের একটি অধ্যায়ের অনুবাদ। বইটি উইলসন সেন্টার এবং ইউ এস ইন্সটিটিউট অফ পীস কর্তৃক একটি যৌথ প্রকাশনা।  

একবিংশ শতাব্দীতে বিশ্বের সাতান্নটি মুসলিম রাষ্ট্রের মধ্যে তুরস্কের মডেলটি রাজনৈতিক ইসলামের ক্ষেত্রে (তর্ক সাপেক্ষে) সবচেয়ে ডাইনামিক অভিজ্ঞতা। ওসমানী খেলাফতসহ আরো অনেক উত্তেজনাপূর্ণ ইতিহাস সত্ত্বেও, পূর্ণবিকাশ সাধনের ক্ষেত্রে এটি আরব বিশ্বের জন্য অনেক দৃষ্টান্তমূলক প্রস্তাবনা বহন করে।

ভোটারদের অন্তর্ভুক্তির পাশাপাশি সামরিক বাহিনীর অনিচ্ছুক স্বীকৃতির সামঞ্জস্যতা খুঁজে পেতে তুরস্কের ক্ষমতাসীন দল জাস্টিস এন্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি একেপিকে পাঁচটি পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। একেপি’র এই বিবর্তনে প্রমাণ হয় যে, তুরস্কের মত একটি ভূ-রাজনৈতিক বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ একটি দেশে কিভাবে গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য এবং প্রতিষ্ঠানগুলো রাজনৈতিক ইসলামের সাথে পরস্পর কাজ করতে পারে। তুরস্কের ইসলামী দলগুলো নির্বাচনী এবং পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থার সাথে একধরণের খাপ খাইয়ে নিয়েছে। তুরস্কের মিলিটারি কর্তৃক চাপিয়ে দেয়া কট্টরপন্থী ইহজাগতিকতাবাদ (সেক্যুলারিজম) একসময়কার অনমনীয় ধর্মীয় রাজনৈতিক চিন্তাধারাকে আরো নমনীয় করেছে। পূর্বেকার কর্মপদ্ধতি ইসলামী রাজনীতিকদেরকে অনেক সমস্যায় ফেলেছিল। তাদের অনেককে কারাবরণও করতে হয়েছিল। 

একেপি একটি রাজনৈতিক দল যার শেকড়টা পরিষ্কারভাবেই ইসলামের সাথে সংযুক্ত। পূর্বের নিষিদ্ধ দল থেকে বেরিয়ে এসে এক যুগের মধ্যে এটি প্রায়োগিকভাবে নিজেকে ডান কেন্দ্রিকতাতে (সেন্টার রাইট) স্থানান্তর করেছে। যদিও আদর্শিক বিষয়াদির সাথে দলটির সফলতার সম্পর্ক খুব সামান্যই ছিল। তুরস্কের ভোটাররা রুটি রুজির ব্যাপারেই বেশি চিন্তিত ছিল। দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অগ্রগতি, সমৃদ্ধি সাধন এবং উন্নত সামাজিক সেবা প্রদান বিশেষ করে স্বাস্থ্য ও আবাসন ক্ষেত্রে অবদান রাখার প্রতিদানস্বরূপ তারা রজব তৈয়ব এরদোগানকে ২০১১ সালের জুলাই মাসে পুনর্নিবাচিত করে।

একেপির বিজয় ছিল ঐতিহাসিক। ১৯৪৬ সালে তুরস্কের বহুদলীয় গণতন্ত্র শুরু হওয়ার পরে একটি রাজনৈতিক দলের জন্য পর পর তিনবার নির্বাচনে জয়ী হওয়ার এটি মাত্র দ্বিতীয় ঘটনা। এবং এটিই ছিল সর্বপ্রথম ঘটনা যেখানে একটি দল তার প্রত্যেক পূর্ববর্তী নির্বাচন থেকে নতুন নির্বাচনে ভোটের হার উত্তরোত্তর বৃদ্ধি ঘটিয়েছে। ২০০২ সালের নির্বাচনে একেপি ৩৪.২৮ শতাংশ, ২০০৭ সালের নির্বাচনে ৪৬.৫৮ শতাংশ এবং ২০১১ সালের নির্বাচনে ৪৯.৯০ শতাংশ ভোট অর্জন করে।

এটা তুরস্কের রাজনৈতিক সমীকরণকেও উল্টে দিয়েছে। তুরস্কের পূর্ববর্তী সব ইসলামী দল হয় মিলিটারি কর্তৃক নয় সাংবিধানিক আদালতের রায়ে নিষিদ্ধ হয়েছে: ১৯৭০ সালে প্রতিষ্ঠিত ন্যাশনাল অর্ডার পার্টি ১৯৭১ সালে সাংবিধানিক কোর্ট কর্তৃক নিষিদ্ধ হয়। ন্যাশনাল স্যালভেশন পার্টি ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়ে ১৯৮০ সালের সামরিক ক্যু এর পরে আইনত নিষিদ্ধ হয়। দ্য ওয়েলফেয়ার পার্টি ১৯৮৩ তে প্রতিষ্ঠিত হয়ে সাংবিধানিক আদালতের মাধ্যমে ১৯৯৮ সালে নিষিদ্ধ হয়। দ্য ভার্চ্যু পার্টি ১৯৯৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়ে ২০০১ সালে নিষিদ্ধ হয়।  

তুরস্কের রাজনীতির বিবর্তনে এই অধ্যায়গুলো বেশ প্রনিধানযোগ্য কারণ প্রতিবার নিষিদ্ধ হওয়ার পরে সে দেশের ইসলামী দলগুলো আরো মডারেট ও আরো প্র্যাগমাটিক ভাবে নিজেদের আবির্ভাব ঘটিয়েছে। ২০০৮ এ দ্য ইকোনোমিস্ট এর মতে “মুসলিম রাষ্ট্রের স্বৈরতান্ত্রিক সরকারগুলো প্রায়শই ধর্মভিত্তিক দলগুলোকে নিষিদ্ধ করে, যা পরে আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যায় এবং সহিংসতায় রূপ নেয়। সেক্ষেত্রে তুরস্কের ইসলামপন্থীরা ভিন্ন পথ অবলম্বন করেছে। বার বার নিষিদ্ধ হওয়া এবং ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত হওয়া সত্ত্বেও ধার্মিক রাজনীতিকরা সহিংসতা থেকে দূরে থেকেছে, গণতন্ত্রকে আঁকড়ে থেকেছে এবং মূলধারার রাজনীতির দিকে এগিয়ে গেছে। কোন ইসলামী দলই একেপির মতো এত মডারেট ও পশ্চিমা-বান্ধব ছিল না। যেমন একেপি ২০০২ সালে তুরস্ককে ইয়োরোপীয় ইউনিয়নে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার আশ্বাসে সরকার গঠন করেছে”।

একেপির প্রতিষ্ঠাতা এরদোগান মূলত তার দলকে ধর্মীয় পরিভাষায় সংজ্ঞায়িত করাকে প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি ২০০৫ সালে বলেন “আমরা ইসলামী দল নই, এবং আমরা ‘মুসলিম-ডেমোক্র্যাট’ লেবেলকেও প্রত্যাখ্যান করি”। তদস্থলে একেপির এই নেতা তার দলের এজেন্ডাকে “রক্ষণশীল গণতন্ত্র” হিসেবে আখ্যায়িত করাকে পছন্দ করেন।

রাজনৈতিক ইসলাম থেকে রক্ষণশীল গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের ক্ষেত্রে একেপি’র যাত্রাটা শুধুই রাজনৈতিক স্বার্থ অর্জন অথবা তুর্কি ইহজাগতিকতাবাদ আরোপিত বাধ্যবাধকতার ফলাফল নয়। ১৯৮০ সালে তুরগুত উজালের নেতৃত্বে তুর্কি পুঁজিবাদের বিকাশের সময় সে দেশের তদানীন্তন প্রাণকেন্দ্র  আনাতোলিয়ায় একটি  মধ্যবিত্ত মুসলিম উদ্যোক্তা শ্রেনী তৈরি করেছিল। রাজনীতিতে এই নতুন মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সম্পৃক্ততার প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। ফলত তারা আরও সম্পৃক্ত হয়ে যায়।  

এইসব “ইসলামী ক্যালভিনিস্টরা” ইসলামী আইন ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবী উপস্থাপনার চাইতে মুনাফা সর্বোচ্চকরণ, আন্তর্জাতিক মুদ্রা বাজারে প্রবেশ এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রতি বেশি উৎসাহী ছিলেন। তুরস্কে এখন এরকম হাজার হাজার ক্ষুদ্র ও মাঝারি মাপের রপ্তানিমুখী ব্যবসায় আছে যাদেরকে প্রায়শই আনাতোলিয়ান টাইগার হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। এদের অধিকাংশই একেপিকে সমর্থন করে। ১৯৯০ এর শুরু থেকে এই দলের রাজনৈতিক ক্ষমতা-সম্পর্ক সম্বন্ধীয় ধারণা তুরস্কের রাজনৈতিক ইসলামের রক্ষণশীল চিন্তাধারাকে ধীরে ধীরে সহনশীল করেছে।

একেপির নেতৃত্ব দলটিকে স্পষ্টতই অন্যান্য মুসলিম দেশগুলোর জন্য মডেল হিসেবে দেখে। ২০১১ সালের ১২ই জুন এরদোগান একেপির ভূমিধ্বস বিজয় উদযাপনকারী হাজার হাজার জনতার উদ্দেশ্যে বলেছিলেন আজ সারাজেভো ইস্তাম্বুলের মতই জয়ী হয়েছে। বেইরুত জয়ী হয়েছে ইজমিরের মতো, দামেস্ক জয়ী হয়েছে আংকারার মতো। রামাল্লা, নাবলুস, জেনিন, পশ্চিম তীর এবং জেরুজালেম জয়ী হয়েছে যতটুকু জয়ী হয়েছে দাইয়ারবাকির।                             


যেভাবে শুরু

প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের পর উসমানী খিলাফতের পতনের পরে যে যুদ্ধবিধ্বস্ত আধুনিক রাষ্ট্রের জন্ম ঘটেছিল, তুরস্কে রাজনৈতিক ইসলামের উত্থানটা ছিল বহুলাংশে তারই প্রতিক্রিয়া। ১৯২০ থেকেই কামালবাদ তুরস্কের রাষ্ট্রীয় আদর্শ হিসেবে রয়ে গেছে, যা তুর্কি প্রজাতন্ত্রের জনক মুস্তফা কামাল আতাতুর্কের কট্টর ইহজাগতিকতাবাদী (সেক্যুলার) দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই গড়ে উঠেছে। কামালবাদের অনুসারীরা আধুনিকায়নের নামে টপ-ডাউন (শীর্ষ পর্যায়ে পরিবর্তন দিয়ে শুরু করে মাঠ পর্যায়ে পরিবর্তন আনা) প্রোজেক্ট অনুসরণ করেছিল। ইউরোপীয়ো সভ্যতা আমদানির উচ্চাভিলাষী চেতনায় তুরস্কের প্রজাতন্ত্র থেকে তারা খিলাফত, বর্ণমালা থেকে আরবি হরফ, ইসলামী শিক্ষা, এবং ধর্ম ও সংস্কৃতির সুফি ভাতৃত্ববোধকে বিলুপ্ত করে।         

কামালবাদী তুরস্ক জার্মানি, ইটালি এবং সুইজারল্যান্ড হতে পাশ্চাত্যের আইনিধারা সমূহ, লাতিন বর্ণমালা, পশ্চিমা দিনপঞ্জিকা, পশ্চিমা ছুটির দিন এবং পশ্চিমা পোশাক পরিচ্ছদ পরিগ্রহণ করেছিল। দেশের দাপ্তরিক ইতিহাস ও ভাষা নতুন করে সাজানো হয়েছিল। নতুন শিক্ষাব্যবস্থায় অধুনালুপ্ত উসমানী খিলাফতের গৌরবময় ইতিহাসকে পাশ কাটিয়ে ইসলাম-পূর্ব তুর্কি সভ্যতাকে মহিমান্বিত করা হয়েছিল। “খাঁটি” তুর্কি শব্দকোষ তৈরি করতে গিয়ে অনেক আরবি ও ফারসি শব্দকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। এমনকি ধর্মপ্রাণ মুসলমানদেরকে নিরাশ করতে আরবিতে আযান দেয়া নিষিদ্ধ করে আধুনিক তুর্কি ভাষায় (অনুবাদ করে) দেয়ার নিয়ম করা হয়েছিল।   

এত পরিবর্তন সত্ত্বেও সেক্যুলার কামালপন্থীরা বৃহত্তর তুর্কি সমাজে তাদের আদর্শকে তেমন অনুপ্রবেশ ঘটাতে পারেনি। আনাতোলিয়ার গ্রামগঞ্জ এবং ধার্মিক জনসাধারণ আংকারার এই সাংস্কৃতিক ইঞ্জিনিয়ারিং দ্বারা বহুলাংশেই অনাক্রান্ত ছিল। অন্যদিকে সামরিক বাহিনী, আমলাতন্ত্র এবং শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষেরা কামালবাদের বাহ্যিক পাশ্চাত্যায়নকে গ্রহণ করে নিয়েছিল। কামালপন্থীদের দ্বারা অধ্যুষিত কেন্দ্র এবং আনাতোলিয়ান প্রান্তিক জনমানুষের সাংস্কৃতিক বৈপরীত্যটা অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছিল। ১৯২০ এর দশকের কামালবাদের একটি  স্লোগান “For the people, despite the people” একধরণের স্বীকারোক্তি বহন করে যে তুর্কি সরকারের শাসন পরিচালিত হয়েছিল জনসাধারণের ইচ্ছা অনিচ্ছাকে অনেকটাই অবজ্ঞা করে।           

তুরস্কের পাশ্চাত্যায়ন, ইহজাগতিকতাবাদ এবং সমজাতীয় তুর্কি জাতিরাষ্ট্র গঠনে কামালবাদী মিশনের সক্রিয় বিরোধিতা করেছিল ধর্মীয় রক্ষণশীল এবং কুর্দিরা । নতুন কামালবাদী সরকার ১৯২৩ থেকে ১৯৩৮ সালে কুর্দি ও ইসলামী বিদ্রোহীদের ধারাবাহিক বিদ্রোহ দমনের জন্য তার সেনাবাহিনীকে লেলিয়ে দিয়েছিল।   

১৯৪৬ এর পরে তুর্কি রাজনীতি এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করে। যখন শীতল/স্নায়ু যুদ্ধ বিশ্বকে বিভক্ত করে দিয়েছিল, তখন তুরস্কের ন্যাটোতে যোগদানের সিদ্ধান্ত দেশটিকে বহুদলীয় গণতন্ত্রের দিকে ধাবিত করে। দেশটির রাজনৈতিক শক্তিকে বাম ও ডান পন্থার আলোকে পুনর্বিন্যাস করা হয়। কুর্দি অসন্তোষ সমাজতান্ত্রিক বামপন্থী ধারা এবং রাজনৈতিক ইসলাম কমিউনিস্ট বিরোধী ডানপন্থী ধারায় নিজেদের স্থান খুঁজে নেয়। দৃশ্যের অন্তরালে সেনাবাহিনী একটি শক্তিশালী শক্তি হিসেবে রয়ে যায়। সেনাবাহিনী ১৯৬০, ১৯৭১ এবং ১৯৮০ সালে কামালবাদী শাসনকে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে বামপন্থী ও রক্ষণশীল দলগুলোর বিরুদ্ধে বারবার হস্তক্ষেপ করতে থাকে।

কিন্তু ১৯৯১ সালে স্নায়ু যুদ্ধের অবসান ও সমাজতন্ত্রের পতনের পরে তুরস্কের পরিচিতির সংকট  নতুন করে চাঙ্গা দিয়ে উঠে। কুর্দি ও ইসলামী মতদ্বৈধতাকে ধারণ করতে ডান ও বামধারা আর যথেষ্ট রইলো না। তুরস্ক প্রতিদ্বন্দ্বিতার দুইটি প্রতিকুল মেরুতে বিভক্ত হল। একদিকে কুর্দি বনাম তুর্কি পরিচিতি এবং অন্যদিকে ইসলামী বনাম ইহজাগতিকতাবাদী (সেক্যুলার) পরিচিতি। আর বাদ বাকিরা ছিল ১৯৯০ এর পথহারা দশকের প্রজন্ম। এটি এমন একটি ঘটমান দশক যখন একই সময়ে কুর্দি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সাথে যুদ্ধ, ধর্মীয় মূল্যবোধগত দ্বন্দ্ব, অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলা এবং অস্থিতিশীল জোট সরকারের উপস্থিতি দিশেহারা করে দিয়েছিল অসংখ্য মানুষকে।

 

ইসলামপন্থীদের বিজয়

ইসলামী দলের তৃতীয় সংস্করণ দি ওয়েলফেয়ার পার্টি ১৯৯৪ সালে দেশব্যাপী স্থানীয় নির্বাচনে  বিজয় অর্জন এবং ইস্তাম্বুল ও আংকারার মতো দুইটি বৃহৎ শহরের নিয়ন্ত্রণ কব্জা করে প্রভাবশালী কামালবাদী গোষ্ঠীকে ভড়কে দিয়েছিল। দলটি তখন ছিল নাজমুদ্দিন আরবাকানের নেতৃত্বাধীন, যার সাথে মিশরের মুসলিম ব্রাদারহুডের সাথে নিবিড় সম্পর্ক ছিল। দীর্ঘ সাত যুগ পরে তুরস্কের সেক্যুলার বন্ধনে ভাটা চলতে লাগলো। এর এক বছর পর দি ওয়েলফেয়ার পার্টি তুরস্কের সংসদীয় নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি আসনে জয়ী হল, যার ফলে ইসলামপন্থীদের নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের হাতে দেশের ক্ষমতা এলো।       

ওয়েলফেয়ার পার্টির এই বিজয় বেশিদিন স্থায়ী হল না। নতুন সরকার প্রত্যক্ষ ইসলামী এজেন্ডা বাস্তবায়ন করবে এই শঙ্কায় সেনাবাহিনী সক্রিয় হয়ে উঠলো। তুরস্কের জেনারেলরা শঙ্কিত ছিলেন যে সরকার সেক্যুলার আদর্শধারী বিরোধী দলকে দমন করবে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইসলামী পোশাক অনুমোদন দিয়ে দিবে এবং তুরস্কের পশ্চিমা মৈত্রী বন্ধনকে বর্জন করবে। প্রকৃতপক্ষে ওয়েলফেয়ার পার্টি কিন্তু  তুরস্কের গতানুগতিক রাজনীতির প্রায় সব আচরণই অনুকরণ করছিল। দলটি তার নিয়ন্ত্রিত মন্ত্রীসভায় সহানুভূতিশীলদেরকেই বসিয়েছিল, কিন্তু সেটাতো পূর্ববর্তী সরকারগুলোও করেছিল। তবুও সেক্যুলার মিডিয়া বার বার একটি আসন্ন ইসলামী বিপ্লবের ভয় দেখিয়ে যাচ্ছিল।

১৯৯৭ সালের ২৮শে ফেব্রুয়ারিতে মিলিটারি, নাগরিক সমাজ ও সেক্যুলার মিডিয়ার পৃষ্ঠপোষকতায় আরবাকান ও তার দলকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়া হল। রক্তপাতহীন এই অভ্যুত্থানের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিণতিগুলো ছিল অনেক বিশাল। এই অভ্যুত্থান তুর্কি ইসলামপন্থীদের মধ্যে এক অভূতপূর্ব আত্মজিজ্ঞাসার উদ্দীপনা সৃষ্টি করলো। অবশেষে যা ইসলামী আন্দোলনের অভ্যন্তরেই প্রজন্মগত এবং আদর্শগত ফাটল সৃষ্টি করলো।

ওয়েলফেয়ার পার্টির বাস্তববাদী তরুণ নেতৃত্বরা - বিশেষ করে রজব তৈয়ব এরদোগান এবং আব্দুল্লাহ গুল তুর্কি ইহজাগতিকতাবাদ (সেক্যুলারিজম) এর অলঙ্ঘনীয় সীমাটা ধরতে পেরেছিলেন। (সে সময়ের ইস্তাম্বুলের মেয়র এরদোগান অত্যন্ত কঠিন ভাবে এই শিক্ষাটা পেয়েছিলেন। ১৯৯৯ সালে ইসলামী ভাবপূর্ণ কবিতা আবৃত্তির জন্য তিনি চার মাস জেলে ছিলেন)। তিন যুগেরও বেশি সময় গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে অংশগ্রহণের পর তুরস্কের ইসলামপন্থীরা পরবর্তী নির্বাচনে আরো বড় জয়ের লক্ষ্যে ততদিনে নিজেদের ইসলামী দর্শনে পরিবর্তন নিয়ে এসেছিলেন। ১৯৯০ সালের শেষ নাগাদ তুরস্কের রাজনৈতিক ইসলাম গতানুগতিক রাজনৈতিক ধারার সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেল।       

২০০১ সালে এরদোগান জাস্টিস এন্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি প্রতিষ্ঠা করলেন। এটা ছিল অবলুপ্ত ইসলামী দল ওয়েলফেয়ার পার্টি ও ভার্চ্যু পার্টির ভস্ম থেকে পঞ্চম সংস্করণ। তিনি তাঁর রাজনৈতিক এজেন্ডা ব্যাখ্যা করার জন্য ইসলামী সূত্রের শরণাপন্ন না হয়ে “রক্ষণশীল গণতন্ত্র” নামে এক নতুন পরিভাষা উত্থাপন করলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে রাজনৈতিক সহানুভূতিশীলতা একেপির ক্ষমতার ভিত্তি মজবুত করবে।

দুইটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য অর্জনের জন্য এরদোগান ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের গাইডলাইনের সাথে সামঞ্জস্য সাধনে গণতান্ত্রিক সংস্করণকে তাঁর এজেন্ডার সর্বাগ্রে স্থান দিলেন। তাঁর এই পদক্ষেপ তাঁকে তুরস্কের ব্যবসায়ী সমাজ, উদার বুদ্ধিজীবী এবং প্রয়োগবাদী মধ্যবিত্তের আস্থা অর্জনে সাহায্য করলো। এটা সেনাবাহিনীর চোখে তাঁর বৈধতাও এনে দিলো। মূলত ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের স্বীকৃতি অনেকদিন ধরেই কামাল আতাতুর্কের তুরস্কের পাশ্চাত্যায়ন মিশনের চূড়ান্ত প্রত্যাশা ছিল। সামাজিক সেবায় প্রাধান্য দেয়ার মাধ্যমে একেপি তুরস্কের সুবিধাবঞ্চিত নিম্নশ্রেণীর প্রতিও আবেদন সৃষ্টি করলো। এরদোগানের কৌশল কাজে দিলো। ২০০২ সালের নভেম্বরে তাঁর দল সংসদীয় নির্বাচনে সর্বোচ্চ আসনে জয় লাভ করলো।

 

সংস্কার

২০০২ এবং ২০০৬ এর মধ্যে একেপি সরকার তুর্কির বিচারব্যবস্থা, নাগরিক-সেনা সম্পর্ক এবং ইউরোপীয় মানদণ্ডে মানবাধিকার চর্চায় ধারাবাহিক সংস্কার এনেছে। দলটির তৃণমূলের দুর্দান্ত নেটওয়ার্ক ও হাতে থাকা সরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে তারা স্বাস্থ্য সেবা এবং হাউজিং লোনকে করেছে সহজলভ্য, তারা খাদ্য সরবরাহ করেছে, ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য বরাদ্ধ বৃদ্ধি করেছে, অপেক্ষাকৃত গরিব শহরগুলোর অবকাঠামোগত উন্নয়ন করেছে এবং সংখ্যালঘু কুর্দি ও অমুসলিমদের অধিকারকে প্রাধান্য দিয়েছে।

সংস্কার রাজনৈতিক গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। দলটি ইন্টারন্যাশনাল মনিটারি ফান্ড (আইএমএফ) এর দেয়া গাইড লাইন অনুসরণ করে ২০০১ এর মন্দাবস্থা থেকে দেশের অর্থনীতিকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছিল।

২০০২ - ২০১১ সালে তুরস্কের অর্থনীতির গড় প্রবৃদ্ধি ছিল বছরে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। মূল্যস্ফীতি ও সুদের নিম্ন হার সেদেশের ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতা বাড়িয়েছে।  সুশৃঙ্খল বেসরকারিকরণ প্রোগ্রামের মাধ্যমে তুরস্কের অর্থনীতি বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে অভূতপূর্ব নজির স্থাপন করতে শুরু করে। গড় মাথা পিছু আয় ২০০১ এর ২৮০০ ডলার থেকে বেড়ে ১০০০০ ডলারে উন্নীত হল যা কিছু ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন (ইইউ) ভুক্ত দেশের গড় বাৎসরিক আয়কেও ছাড়িয়ে যায়।          

একেপি অধিকতর উদার নীতি অবলম্বন করা সত্ত্বেও তুর্কি সমাজের কামালপন্থী গোষ্ঠী ক্রমাগত সন্দিহান হয়ে উঠতে লাগলো যে, একেপির কোন গোপন উদ্দেশ্য  রয়েছে। তারা ভয় করছিল যে একেপি সেনাবাহিনীর রাজনৈতিক প্রভাব বিলোপ এবং পর্যায়ক্রমে কামালের সেক্যুলার অর্জনকে বিনাশ করতে  ইইউ’র সদস্যপদ প্রক্রিয়াকে কাজে লাগাচ্ছে। উদাহরণ স্বরূপ উল্লেখ্য যে তারা জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদে সেনাবাহিনীর চাইতে অসামরিক সদস্যের হার বাড়ানো, জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান হিসেবে একজন বেসামরিক ব্যক্তিকে নির্বাচিত করা, উচ্চতর শিক্ষাবোর্ড এবং রেডিও ও টেলিভিশন হাই কাউন্সিল থেকে সেনা প্রতিনিধিত্বকারীদের সরিয়ে দেয়া এবং কুর্দিদের সাংস্কৃতিক ও  সম্প্রচার অধিকার প্রদানের ক্ষেত্রে একেপির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে লাগলো।  

বৈদেশিক নীতিতে প্রধানমন্ত্রী এরদোগানের সাইপ্রাস প্রশ্নে আপোষ করাও তুরস্কের রাজনীতিকে দ্বিধাবিভক্ত করেছে। দ্বীপ দেশটিকে পুনরায় একীভূত করার জাতিসংঘের পরিকল্পনাকে একেপি সমর্থন করেছিল। সেনাবাহিনী কঠোরভাবে এই পরিকল্পনার বিরোধিতা করেছিল। এই অচলাবস্থা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদ লাভের ক্ষেত্রে একটি শক্ত প্রতিবন্ধক ছিল। আর ইসলামপন্থী দলটি মূলত সেক্যুলার বা সেনাবাহিনীর চাইতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদ লাভের ক্ষেত্রে বেশি আগ্রহী হিসেবে হাজির হল। পরে একটি তদন্তে বেরিয়ে আসে যে ২০০৪ সালে সাইপ্রাস ইস্যুতে একটি সেনা অভ্যুত্থান প্রায় সফল হয়ে যেতে চলেছিল।

 

বিভাজন

২০০৬ থেকে ২০০৮ এর মধ্যে তুরস্কের আভ্যন্তরীণ বিভাজন আরও গভীর হল। একেপি বহুদিন থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইসলামী পোশাক অথবা মাথায় উড়না দেয়ার উপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে দিতে চাচ্ছিল। তারা ইসলামী উচ্চবিদ্যালয় থেকে পাশ করা বিশেষত বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে ছাত্র-ছাত্রীদের প্রতি বৈষম্য দূর করতে চেয়েছিল। উভয় উদ্যোগের ক্ষেত্রেই একেপির প্রচুর জনসমর্থন ছিল। তুর্কি মেয়েদের অর্ধেকেরও বেশি মাথায় কাপড় পরিধান করে।

দলের নেতৃত্ব সেক্যুলার আধিপত্যবাদের সাথে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে পরিবর্তন আনার চাইতে জাতীয় ঐক্যমত্য তৈরির মাধ্যমের পরিবর্তনের প্রতি জোর দিয়েছিল। কিন্তু সেক্যুলারেরা উদ্বিগ্নই রইলো। তারা ২০০৪ সালে ব্যভিচারকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করার এরদোগানের প্রচেষ্টা, ধর্মীয় রক্ষণশীলদেরকে আমলাতান্ত্রিক পদে নিয়োগ দেয়া, এবং মদ বিক্রয়কে নিরুৎসাহিত করার প্রচেষ্টাকে ইস্যু বানালো।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল্লাহ গুলকে রাষ্ট্রপতি বানানোর জন্য এরদোগানের মনোনয়ন একেপি ও সেনাবাহিনীর মধ্যকার উত্তেজনাকে চরম পর্যায়ে নিয়ে যায়।  রাষ্ট্রপতি আনুষ্ঠানিক পদ হলেও একটি মর্যাদাপূর্ণ পদ। বিরোধী দল ও সেনাবাহিনীর চোখে এই পদটি ইহজাগতিকতাবাদ (সেক্যুলারিজম) এর জন্য ছিল শেষ দুর্গ।

২০০৭ সালের ২৭শে এপ্রিলে তুরস্কের জেনারেলরা সর্বপ্রথম ই-ক্যু এর মঞ্চায়ন করলো। তারা মিলিটারি ওয়েবসাইটে একটি সতর্কবার্তা পোষ্ট করে জানালো যে “যদি প্রয়োজন হয় তবে তুরস্কের সশস্ত্র বাহিনী সেক্যুলারিজমের প্রকৃত রক্ষক হিসেবে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করতে বিন্দুমাত্রও দ্বিধা করবে না”। তুরস্কের  সেনা হস্তক্ষেপের ইতিহাস অনুযায়ী, এই সতর্কবার্তাটি ছিল সূক্ষ্ম  হুমকি এই মর্মে যে সম্ভবত এর চেয়েও গতানুগতিক ক্যু সামনে রয়েছে।      

একেপির আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধির একটি লক্ষণ হল, এরদুগান থেমে যান নাই। তিনি বরং আগাম নির্বাচন ডেকে জেনারেলদের বিরোধিতা করতে সিদ্ধান্ত নিলেন। একেপি ২০০৭ এর মাঝামাঝি শতকরা ৪৭ ভাগ ভোট নিয়ে এক ভূমিধ্বস বিজয় অর্জন করেছিল। ২০০২ সালের শতকরা ৩৪ ভাগ নিয়ে যখন তারা ক্ষমতায় এসেছিল তাঁর তুলনায় এর হার চেয়ে অনেক বেশি। এ নির্বাচনটি ছিল জেনারেলদের প্রতি এক গণ তিরষ্কার।        

সংসদ যখন গুলকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করলো তখন একেপির অর্জনে আরেকটি মুকুট যুক্ত হল। কিন্তু সেনাবাহিনীর ছায়া তখনও তুরস্কের উপর ছাপ ফেলছিল। তুরস্কের প্রধানমন্ত্রীত্বের অভিষেক অনুষ্ঠান থেকে সেনাবাহিনীর উচ্চ পর্যায়ের কর্তাব্যক্তিরা নিজেদের দূরে সরিয়ে রেখেছিলেন। ইসলামী এজেন্ডা বাস্তবায়নের মাধ্যমে সেদেশের সেক্যুলারিজম উৎখাত প্রচেষ্টার অভিযোগে ২০০৮ সালে তুরস্কের চিফ প্রসিকিউটর একেপিকে নিষিদ্ধ করারও চেষ্টা চালিয়েছিলেন। দলটি এই সাংবিধানিক উভ্যুত্থান প্রচেষ্টা থেকে অল্পের জন্য বেঁচে যায়। আদালত মাত্র এক ভোটের ব্যবধানে এই নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে রায় দেয়।       

 

সংহতি 

২০০৮ এবং ২০১১ সালের মধ্যে একেপি তাঁর অর্জনকে সংহত করেছে। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সত্ত্বেও তুরস্ক ২০০৮ সালের বিশ্ব অর্থনীতির বিপর্যয়কে অসাধারণ সফলতার সাথে সামাল দিয়েছে। হালকা অর্থনৈতিক মন্দার পরে ২০০৯ সালে দুই অংকের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অব্যাহত ছিল। ২০১২ সালের মধ্যে তুরস্কের বাজেট ঘাটতি ও বেকারত্বের হার সর্বনিম্ন হারের রেকর্ড অর্জন করে। 

২০১১ সালের জুনে একেপি পর পর তৃতীয়বারের মতো নির্বাচনে জয় পায় যেখানে তারা প্রায় শতকরা ভোটের ৫০ ভাগ অর্জন করে। বিশ্ব দরবারে দেশের অবস্থানও নতুন উচ্চতায় পৌঁছে যায়। মধ্যপ্রাচ্য কাঁপিয়ে দেয়া জাগরণগুলোতে মিশর, জর্ডান, লিবিয়া, মরক্কো, সিরিয়া ও তিউনিশয়ার  সংস্কারকরা প্রায়ই তুরস্ক ও একেপিকে নতুন মডেল হিসেবে উদ্ধৃত করতে লাগলো।     

আধুনিক তুরস্ক গঠনের পরে এই প্রথম একেপি সেনাবাহিনীর উপর নিজের কর্তৃত্বকেও সংহত করেছে। ২০১১ সালের ২৯ শে জুলাই, সেনাপ্রধান এরদোগানের সাথে সেনাবাহিনী স্টাফদের পদোন্নতি নিয়ে বিবাদের জের ধরে পদত্যাগ করেন। একই দিনে আর্মি, নেভি, এবং এয়ার ফোর্স প্রধানরাও আগাম অবসরের আবেদন করেন। ২০১২ সালের শুরুর দিকে তুরস্কের অর্ধেক এডমিরাল, প্রতি দশজনের মধ্যে একজন দায়িত্বরত জেনারেলকে সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগে জেলে পাঠানো হয়। পর পর তিনটি সেনা অভ্যুত্থান ও শতাব্দী ধরে নিরবচ্ছিন্ন সেনা প্রভাবিত একটি দেশের জন্য এটি ছিল এক প্রকৃতিগত পরিবর্তন।   

 

গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান সমূহ

গণতন্ত্র

একেপি গণতন্ত্রের অগ্রদূত হিসেবে কাজ করেছে। দলটির সহনশীল রাজনীতিকরা দুই যুগ ধরে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। কিন্তু তুরস্ক তার ধুঁঁকতে থাকা কর্তৃত্ববাদ ও ইসলাম বিষয়ে সবসময়েই বেশি মনযোগী বিরোধীদলগুলোর প্রতি দ্বন্দ্ব মুখরই থেকে গিয়েছিল। বিরোধী পক্ষ, বিরোধী গণমাধ্যম এবং প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলো সরকারকে একটি বেসামরিক স্বৈরতান্ত্রিক সরকার বলে ডাকে এবং বিচার ব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে সেনাবাহিনীকে নির্জীব করে দেয়ার নীতিকে নিন্দা করে।

এরগেনেকন নামে সেনাবাহিনীর সাথে যোগসাজশ থাকা একটি ছায়া সংগঠনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলায় বিরোধীদলের আশংকাটা ফুটে উঠে। বিচার বিভাগ ২০০৭ সালে একেপির ২য় ভোট জয়ের কিছুকাল পরেই মামলাটি শুরু করে এই দাবিতে যে এরগেনেকন একটি অভ্যুত্থানের পায়তারা করছিল। প্রসিকিউটর শত শত মিলিটারি কর্মকর্তা, সাংবাদিক এবং রাজনৈতিক কর্মীর বিরুদ্ধে এই অভ্যুত্থানের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগ তোলেন। ফাঁস হয়ে যাওয়া প্রমাণাদি অনুযায়ী এরগেনেকন নেটওয়ার্ক অসংখ্য বোমাবাজি ও হত্যার পরিকল্পনার সাথে জড়িত ছিল। সংগঠনটি সামরিক অভ্যুত্থানকে ন্যায্যতা দান ও বিভ্রান্তি তৈরিতে সংকল্পবদ্ধ ছিল। একেপির সমালোচকরা মনে করে যে, এরদোগানের সরকার তাঁর সেক্যুলার বিরোধী পক্ষকে চুপ করাতে এই মামলাটিকে ব্যবহার করেছে। জবাবে একেপি দাবি করে যে তারা আদালতকে নিয়ন্ত্রণ করেনি। যেটি (আদালত) এমনকি ২০০৮ সালে দলটিকে নিষিদ্ধ করতে চেয়েছিল।

সংখ্যালঘু সম্প্রদায়

একেপির সবচেয়ে দুর্বল ব্যাপারটি ছিল তুরস্কের কুর্দি জনগণের পদ মর্যাদার বিষয়টি। ১৯৮২ সালের সামরিক শাসনের সময়ে লিখিত সংবিধানে যে আইনগত ও রাজনৈতিক বিষয়গুলো বর্তমানে অবশিষ্ট রয়ে গিয়েছিল সেগুলো কুর্দিদের আশা-আকাঙ্ক্ষার পথে চরম বাধা হিসেবে রয়ে গিয়েছিল। কুর্দিদের আশা-আকাঙ্ক্ষার ব্যাপারে একেপির বাগাড়ম্বরপূর্ণ প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও এরদোগান তুরস্কের নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা নিরসনে প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে নাই। এখন তাকে তুরস্কের অবিসংবাদী মন্ত্র “সন্ত্রাসবাদের মুখোমুখি হয়ে গণতন্ত্রায়ন চলতে পারে না” কে অজুহাত হিসেবে দাঁড় করাচ্ছেন। ফলে কুর্দিদের দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলে সহিংসতা কেবলই বেড়েছে। 

নারী অধিকার

একেপি নারী অধিকার পরিবর্তনে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছুই করে নাই। অবশ্য ইইউ সদস্যপদ লাভ ও তুর্কি আইনে ইউরোপিয়ান মানদন্ডের সামঞ্জস্য আনার জন্য একেপি শ্রমবাজার ও নাগরিক নীতিমালায় নারীদের বিরুদ্ধে বৈষম্য সৃষ্টিকারী কিছু আইনি বাধাকে দূর করেছে। কিন্তু একেপি একটি রক্ষণশীল ও পুরুষতান্ত্রিক দল।  পরিবারের মূল্যবোধ ও  লিঙ্গ সমতার ব্যাপারে এরদোগানের ধারণা লিবারেল ধারার নয়।

কিছুদিন আগে পর্যন্ত তুরস্কের কড়া সেক্যুলার সংবিধানের নিয়ন্ত্রণ প্রাকটিসিং মুসলিম নারীদেরকে সেক্যুলার নারীদের চেয়ে বেশি বাধাগ্রস্ত করেছে। যে সকল নারীরা হিজাব পরতো অথবা মাথা ঢেকে রাখতো তারা আনুষ্ঠানিক সকল ক্ষেত্রে এবং সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসগুলোতে নিষিদ্ধ ছিল। উদাহরণ স্বরূপ, এরদোগান তাঁর দুই হিজাবী মেয়েকে আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠিয়েছেন কারণ তারা তুরস্কের কলেজ গুলোতে অংশগ্রহণ করতে পারেনি। ২০১১ সালে একেপি পাবলিক প্লেসে ড্রেস-কোড সম্পর্কিত আইন পরিবর্তন করে এবং হিজাবকে আইনত বৈধতা প্রদান করে। তবে বেসামরিক কর্মক্ষেত্রে ড্রেসকোডের কড়াকড়ি বলবত থেকে যায়।

পশ্চিমা বিশ্ব

একেপি দাবী করে যে ইইউ সদস্যপদ অর্জন তাদের কৌশলগত অগ্রাধিকার। তথাপি তারা তুরস্কের অগ্রগতি ও কূটনীতিতে পশ্চিমা বিশ্বের গণ্ডি ছাড়িয়ে যাওয়ার মাধ্যমে তাদের বাড়ন্ত আত্মবিশ্বাসের প্রদর্শন করেছে। তুরস্ককে আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করার ব্যাপারে ইইউর অনীহা ও ইউরোপের অর্থনৈতিক সংকট তুরস্ককে মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, রাশিয়া এবং মধ্য এশিয়ার দিকে আগ্রহী করেছে যেখান থেকে তারা কিছুটা শক্তি অর্জন করতে পারে। এটাকে তুরস্কের তদানীন্তন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আহমদ দাউতুগলো তুরস্কের কৌশলের গভীরতা বা "স্ট্রাটেজিক ডেপথ" হিসেবে আখ্যায়িত করেন। বিশ্লেষকরা তুরস্কের পররাষ্ট্রনীতিকে নিও-উসমানিজম বলে নামান্তর করেছেন।

এতদসত্ত্বেও একেপির সাথে যুক্তরাষ্ট্রের বলতে গেলে কোন সমস্যাই হয়নি। একেপির একজন সিনিওর কর্মকর্তার মতে, আমেরিকানরা একসময় জিজ্ঞেস করতো “তুরস্ককে কে ডুবালো?” এখন তারা তুরস্ক মডেলটির সফলতা সম্পর্কে প্রশ্ন করতে ব্যতিব্যস্ত। এমনকি একেপি নিজ দেশে আমেরিকার নতুন ক্ষেপণাস্ত্র  প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য ইরানের বিরুদ্ধে  ন্যাটোর প্রয়োজনীয় রাডার স্থাপন করতে দিতে সম্মত হয়।

ইজরাইল

অনেক যুগ ধরে যেকোনো মুসলিম দেশের চেয়ে তুরস্কের সাথে ইসরাইলের সম্পর্ক ভাল ছিল। একেপি ক্ষমতাসীন সময়ে এরদোগান সিরিয়া ও ইজরাইলের মধ্যে ২০০৭ এবং ২০০৮ এ মধ্যস্থতা করেছিলেন। একেপির পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য ছিল “zero-problem with neighbors.”। কিন্তু একেপি ইরান ও গাজায় হামাসের সাথে তাদের সম্পর্ক গভীর করার কারণে - যেখানে গাজায় মানবিক সাহায্য প্রেরণে একেপির প্রচেষ্টাও অন্তর্ভুক্ত -  ইসরাইলের সাথে দূরত্ব বৃদ্ধি পায়। এরদোগান একবার সিরিয়ার বাশার আল আসাদকে নিজের ভাই বলেও ডেকেছেন, যদিও সিরিয়ার ২০১১ সালের শুরু হওয়া গণজাগরণের পর তুরস্ক আসাদকে পদত্যাগ করতে আহবান জানায়। এরদোগান সিরিয়ার বিরোধী দলের সামিটগুলো, স্বদেশত্যাগী সৈন্য ও শরণার্থীদের জন্য তুরস্কের সীমানা খুলে দিয়েছিলেন। ২০১২ সালের মধ্যে তুরস্ক দৃশ্যত এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে তাদের এমন প্রতিবেশী নেই যাদের সাথে তাদের কোন সমস্যা বাঁঁধে নাই। একজন জ্যেষ্ঠ কূটনীতিবিদ বলেন, প্রতিবেশী সিরিয়া, ইরান এবং ইসরাইলের সাথে সমস্যা বৃদ্ধির কারণে তুরস্ক “zero-problem with neighbors” অর্জনের স্থলে “zero neighbors without problems” অর্জন করেছে।

 

ভবিষ্যৎ

বহুদলীয় নির্বাচনী রীতি থাকা সত্ত্বেও একেপির আওতাধীন তুরস্ক এখন পর্যন্ত প্রকৃত গণতন্ত্র হয়ে উঠতে পারেনি। তবে ফেলে আসা ১৯৯০ এর দশকের তুলনায় দেশটি অধিকতর বহুমাত্রিক গণতন্ত্রে পরিণত হয়েছে। নির্বাচন, জনমত, বিরোধী দলসমূহ, সংসদ, গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজ শক্তিশালী করণের মাধ্যমে তাদের এই গণতান্ত্রিক বহুমাত্রিকতা পূর্বের যেকোন সময়ের চেয়ে বুলন্দ হয়েছে। প্রজাতন্ত্রের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো তুরস্কের কর্তৃত্ব সম্পূর্ণভাবে তার নাগরিকদের হাতে এসেছে। যে সেনাবাহিনী একসময় নাগরিকদের রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা রাখতো তা আর নাক গলানো ও হুমকি দেয়ার মতো যথেষ্ট শক্তি রাখে না। ইসলামের সাথে শেকড়বদ্ধ এই দলটি ইইউতে প্রবেশের জন্য অন্য যেকোন সেক্যুলার দলের চেয়ে বেশি সংস্কার করেছে।

ইসলামী দুনিয়ায় নিজেদের অবস্থান বুঝাতে একেপি সরকার সংযমী আচরণ করেছে। “আমরা নিজেদেরকে মডেল হিসেবে উপস্থাপন করছি না” এরদোগান ২০১১ সালে তুরস্কের সাংবাদিকদের উদ্দেশ্য করে বলেন। “হয়তো আমরা কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রেরণার উৎস অথবা সফলতার উদাহরণ”। তবুও ইসলামী রাজনীতির সাথে তুরস্কের এই অভিজ্ঞতা নিছক কোন পরীক্ষা নিরীক্ষা নয়। এটি ব্যাপকভাবে ভেতরে ও বাইরে উদ্ধৃত হয়েছে একটি নতুন মডেল হিসেবে।

তারিকুর রহমান শামীম