অনুবাদ

দায়েশ/ISIL সদস্য হতে চান এমন তরুনদের প্রতি খোলা চিঠি
দায়েশ/ISIL সদস্য হতে চান এমন তরুনদের প্রতি খোলা চিঠি
অনুবাদ করেছেন জাহিদুল হোসেন
০৪ জানুয়ারি ২০১৬

আল্লাহর নামে জিহাদ করতে চাওয়া প্রিয় মুসলিম ভাইটি আমার,


আমার সন্দেহ আছে আসলেই তুমি এই লেখাটি পড়বে কিনা। কিন্ত তবুও একবার চেষ্টা করে দেখতে চাই এবং বন্ধু হিসেবে তোমাকে আমার কিছু চিন্তার কথা জানাতে চাই।

খুব সম্ভবত তুমি তরুণ, একনিষ্ঠ এবং খুবই রাগান্বিত। তুমি রেগে আছো, কেননা আমাদের মুসলিম সভ্যতা গত দুই শতাব্দী যাবত চরম অবমাননাকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে আছে। আমরা ইউরোপিয়ানদের দ্বারা অধ্যুষিত হয়েছি, বিদেশী সৈন্যদের দ্বারা দখল হয়েছি এমনকি নিজেদের স্বৈরশাসকের দ্বারা অত্যাচারিত হয়েছি।

ইতোমধ্যে আমাদের মূল্যবোধের অবক্ষয় হয়েছে, আমাদের পবিত্র প্রতীক সমূহের অবমাননা করা হয়েছে। এমন এক সময় ছিলো, যখন মুসলমানরা সবচেয়ে গৌরবময় সভ্যতার নেতৃত্ব দিয়েছিলো। কিন্ত সে সময় আমরা পার হয়ে এসেছি। সাম্প্রতিক সময়ে আমরা পরাজয়ের পরে পরাজয় বরন করছি। সহ্য করছি লাঞ্ছনার পরে লাঞ্ছনা।

আমি মনে করি, নিজের আত্মমর্যাদাসম্পন্ন একজন বিশ্বাসী মুসলমান হিসেবে উম্মাহর এহেন অসুস্থতার ব্যাপারে চিন্তা করা অবশ্যই মহৎ।

এই চিন্তা মাথায় রেখেই, তুমি কিন্ত অসাধারণ সব কাজ করতে পারো। নিজেকে সুশিক্ষিত রূপে গড়ে তুলতে পারো। হতে পারো সুপ্রতিষ্ঠিত একজন স্কলার কিংবা একজন বিজ্ঞানী কিংবা একজন ব্যবসায়ী কিংবা একজন শিল্পী।

তোমার কাজের মাধ্যমেই তুমি আমাদের এই উম্মাহর জন্য অবদান রাখতে পারো। এই উম্মাহর যে এমন বুদ্ধিবৃত্তিক, বৈজ্ঞানিক, অর্থনৈতিক, শৈল্পিক পুনর্জাগরণ বড্ড প্রয়োজন। অবশ্যই ইসলামের জন্য চিন্তা করবে। এবং আমি তোমাকে পরামর্শ দিবো, আত্মোন্নয়নের জন্য এই চিন্তাকেই অনুপ্রেরণা করে নাও।

জিহাদ কিংবা সংগ্রাম যেই নামই দাও না কেনো, অবশ্যই তাতে সামিল হও। কিন্ত এমন কিছুতে আত্মনিয়োগ করো যা শান্তি, শিষ্টাচার এবং সম্মানের সহিত তোমার পরিবার, সম্প্রদায় এবং উম্মাহর মান-মর্যাদাকে উন্নিত করে।

কিন্ত এরই মধ্যে সে সকল মানুষ থেকে সাবধান থেকো, যারা তোমাকে তোমার পথ হতে বিচ্যুত করতে চাইছে। হিংসাত্মক, নির্মম এবং রক্তপিপাসু কাজ করতে উতসাহিত করছে। যেমনটা করে চলেছে ISIL।

 

ইসলামি সভ্যতার ইতিহাসে ISIL এর মতো করে জিহাদের নামে বাছবিচারহীন হত্যা কখনো ঘটেনি। কুরআন অবশ্যই আগের মুসলিমদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন এই বলে যে, "আর লড়াই কর আল্লাহর ওয়াস্তে তাদের সাথে, যারা লড়াই করে তোমাদের সাথে।" সেই সাথে তিনি যোগ করে দিয়েছেন, “কিন্ত কারো প্রতি বাড়াবাড়ি করো না।" (সূরা বাকারা - আয়াত ১৯০)। আমাদের মহানবী (স:) এই বাড়াবাড়ির সীমারেখাও ব্যাখ্যা করে দিয়েছেন, “বৃদ্ধ, নাবালক, শিশু অথবা নারীদেরকে হত্যা করোনা।"

মুসলিম ইতিহাসে সশস্ত্র জিহাদকে সবসময়ই যোদ্ধাদের মাঝে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে। নিরীহ নাগরিকরা ছিলেন যুদ্ধের আওতামুক্ত। উপরন্ত মুসলমানরা কখনো জিহাদের লক্ষবস্ত ছিলোনা। তারা যেই গোত্রেরই হোক না কেন কিংবা যেই বিশ্বাস ই তারা ধারণ করতেন না কেনো।

এ কারণেই, প্যারিস, মসুল কিংবা রাক্বার রাস্তায় নিরীহ বেসামরিক মানুষ হত্যা কখনোই জিহাদ হতে পারেনা। এ তো ঠান্ডা মাথার খুন ছাড়া আর কিছুই নয়। এ তো মহাপাপ।

তুমি হয়তো জিজ্ঞেস করতে পারো, তবে কেন এতো মুসলিম ISIL এ যোগ দিয়েছে ? কি এমন আছে যা তাদেরকে অনুপ্রাণিত করছে। তারা কি "আল্লাহর জন্য" তাদের প্রাণকে বিপন্ন করেনি?

অবশ্যই তারা এমনটাই বলে। এমনকি বিশ্বাসও করে। কিন্ত তুমি যদি একটু সাবধানতার সাথে তাদের কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করো তবে দেখতে পাবে যে, তাদের কার্যকলাপ খুব অল্পই আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যে। বরং বেশীরভাগ ক্ষেত্রে তা কেবল নিজের নাফসের আরাধনা করার জন্যেই।

কেননা ISIL এবং এর সমমনা দলগুলোর মূল লক্ষ হলো, উম্মাহর অগ্রদূত হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করা, নিজেদেরকে নেতৃস্থানীয় পর্যায়ে আসীন করা এবং তারা ভিন্ন অন্য সকল মুসলিমদের নিন্দা করা।

তাদের দৃষ্টিভঙ্গি মোতাবেক, কেবলমাত্র তারাই সঠিক পথে আছে এবং মন্দকে চ্যালেন্জ করার সাহস রাখে। আর বাদ বাকি সবাই ঘুমিয়ে আছে অজ্ঞানতার অন্ধকারে। ISIL তাদের নিজেদেরকে মনে করে, “খিলাফতের সিংহ" কিংবা "সব মানুষের মধ্যে সেরা মানুষ" রূপে।

মনে রেখো, এখানে আসল উদ্দেশ্য হলো ক্ষমতা, খ্যাতি এবং গৌরব অর্জন করা। এর সাথে ধর্মীয় আবেগের কোন সম্পর্কই নেই। এর আগে কিছু ধর্ম নিরপেক্ষ দল একই ধরণের প্রেরণার দ্বারা তাড়িত হয়েছিলো। সমাজতান্ত্রিকদের কিছু অংশ নিজেদেরকে সর্বহারাদের নেতা রূপে দাবি করেছিলো। পৃথিবী বদলে দেওয়ার মিশনে নেমেছিলো তারা, যা পরবর্তীতে তাদেরকে ধাবিত করেছে মৃত্যু আর হত্যালীলার দিকে।

একদিকে তারা যেমন আত্মত্যাগী ছিলো, নিজেদের আরামের আবাস-গৃহ ত্যাগ করেছে যুদ্ধের জন্য, “বিপ্লবের জন্যে"। অপরদিকে তারা আত্মনিয়োগ করেছিলো সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক আত্ম-অহমিকায়। নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলো অপরের বিচার করার এবং শাস্তি দেওয়ার যোগ্য সীমিত ব্যক্তিসমূহের মধ্যে অন্যতম হিসেবে।

বিপরীত দিকে দেখা যায় যে, শতাব্দিকাল ধরে ধর্মপ্রাণ মুসলিমরা ধর্মীয় আবেগ অনুসরণ করে এসেছেন। আল্লাহর কাছে নিজেদেরকে পরিপূর্ণরূপে সমর্পণ করেছেন। আল্লাহর সম্মানে নিজেদের সম্পর্কে, ইতিহাসে তাঁদের অবস্থান, উম্মাহর মাঝে তাঁদের স্থানের ব্যাপারে সকল প্রকারের অসংযত দাবী হতে বিরত থেকেছে । বরং তাঁরা সবসময় ত্রুটি-বিচ্যুতি এবং খুঁত হতে দুরে থাকার চেষ্টা করেছে এবং সকল প্রকারের দাম্ভিকতা হতে মুক্ত থাকার চেষ্টা করেছে।

এই দুইয়ের মাঝে, ISIL এর দৃষ্টিভঙ্গির সাথে মুসলিম ঐতিহ্যের দৃষ্টিভঙ্গি মিলিয়ে দেখো। ISILএর দৃষ্টিভঙ্গি একটি দৃঢ় সংকল্পের দ্বারা পরিচালিত হয়। "খিলাফাহ"ই কেবল ইসলামের সঠিক ব্যাখ্যা জানেন, সকল ব্যাপারে সবচেয়ে সেরা ফয়সালা করেন, এবং সোৎসাহে শাস্তি প্রদান করেন। এমনকি সেই সকল মুসলিমদেরও, যারা অসম্মতি করার দু:সাহস দেখায়।

অপরদিকে চিরাচরিত ইসলামিক উৎসসমূহ সবসময় সাবধান থাকেন যেকোন প্রকারের দৃঢ়তার ব্যাপারে। প্রখ্যাত ফিকহবিদ ইমাম আশ-শাফিইর ব্যাপারে কথিত আছে যে, যেকোন বিতর্কে তিনি সবসময় চাইতেন যে, তাঁর প্রতিপক্ষ যেন জিতে যায়। এতে করে তিনি নতুন কিছু শিখতে পারবেন এবং নিজেও অহংকার থেকে বাঁচতে পারবেন।

একই রকম বিনয়ের সাথে, অনেক ইসলামিক স্কলারও এভাবে তাঁদের যুক্তিতর্ক শুরু করতেন নিজেদের নম্রতা এবং জ্ঞানের দারিদ্রতা প্রকাশ করে, “এই কপর্দকশূণ্য ব্যাক্তির বিশ্বাস অনুযায়ী"। সাধারণত তাঁরা এই বলে তাঁদের যুক্তিতর্ক শেষ করতেন যে, “আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন।"

এটা কোন দুর্ঘটনা নয় যে, ISIL কখনোই তাদের কেন ভিডিও বার্তা কিংবা প্রকাশনায় "আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন" টার্মটি ব্যবহার করেনি। এর মানে হচ্ছে অস্পষ্টতা; এবং অস্পষ্টতা কখনোই তাদের উদ্দেশ্য পূর্ণ করবেনা।

ISIL দাবি করে যে, তারা তাই জানে যা কিনা কেবল আল্লাহই জানেন। এবং সবাইকে সেদিকে ধাবিত করতে চায়। তুমি যদি মনে করো যে এর মাধ্যমে আল্লাহকে সম্মান করা হচ্ছে, তবে ভুল করছো। এর মাধ্যমে কেবল আল্লাহর নামকে ব্যবহার করা হচ্ছে মানুষের ওপরে নিজের ক্ষমতা বাড়ানোর জন্যে।

আমরা প্রিয় মুসলিম ভাইটি, “খিলাফাহর সিংহ" হওয়ার আগে একটিবার এই কথাগুলি ভেবে দেখো। তুমি যদি আসলে স্রষ্টার জন্যে এখুনি কিছু করতে চাও, তবে কুরআনে দেওয়া তাঁর উপদেশ অনুসরণ করো, “দুর্ভিক্ষের দিনে তোমার এতিম আত্মীয়কে অন্নদান করো।….." (সূরা আল-বালাদ, আয়াত ১৪-১৭)

পারলে সিরিয়ান রিফিউজিদেরকে সাহায্য করো। এ যদি সম্ভব না হয়, তবে তোমার এলাকার অন্য কোন অসহায় মানুষের জন্যে কাজ করো। পৃথিবীকে কাঁপিয়ে দেওয়ার জন্যে কোন "জিহাদী জন" হয়ে উঠো না।

তাতেই আল্লাহ তোমাকে জানবেন। তুমি জয় করে নিতে পারবে তাঁকে। এবং তবেই বিনয় এবং মর্যাদার সাথে কাঁটাতে পারবে জীবনের বাকি দিনগুুলো।

 

(আল জাজিরাতে প্রকাশিত মোস্তফা আকিওলের এর লেখা)

মূল লেখা: Open letter to the future ISIL recruit

জাহিদুল হোসেন