অনুবাদ

পথ নির্দেশক - (আল শারীয়াহ)
পথ নির্দেশক - (আল শারীয়াহ)
অনুবাদ করেছেন শাইখ মাহদী
০৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৬

তারিক রমাদান

শারীয়াহ কথাটা শুনলেই পশ্চিমা মননে ইসলামের একটি অন্ধকারাচ্ছন্ন ছবি ভেসে ওঠেঃ নারী নির্যাতন, শারীরিক শাস্তি, পাথর মেরে হত্যা সহ আরও নানান বীভৎসতা। বিষয়টা এমন পর্যায়েই চলে গিয়েছে যে, অনেক মুসলমান বুদ্ধিজীবিই তাদের লিখায় আর এই শব্দটা ব্যবহার করতে চান না, কারণ এটি হয়তো মানুষকে ভয় পাইয়ে দিবে, কিংবা স্রেফ এই এক শব্দের ব্যবহারেই তাদের সকল গবেষণা লেখালেখি সম্বন্ধে সন্দেহ করা শুরু হবে। 

এটা সত্য, আইনবিশারদ এবং জুরিসপ্রুডেন্স বোদ্ধারা ‘শারীয়াহ’ ধারণাটিকে সবসময় তাদের নিজেদের জ্ঞানগত পরিসরের মাঝেই ব্যাখ্যা করেছেন, অর্থাৎ, ‘‘শারীয়াহ’ বিষয়টিকে স্বৈরাচারী শাসকেরা সবসময় শোষণ-নির্যাতনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছে, এবং বেশিরভাগ মুসলমানেরাই শারীয়াহর মূল আদর্শটিকে কখনোই ঠিকমত ধারণ করতে পারেননি। ’ তবে মনে রাখতে হবে, ইসলামি বিশ্ব এবং চিন্তাজগতের কেন্দ্রবিন্দু এই বিষয়টি কিভাবে যুগের পর যুগ তার মৌলিক চেহারা অক্ষুণ্ণ রেখে মুসলিম মননকে প্রভাবিত করেছে, সেটি নিয়ে আমাদের গবেষণা করাটাও খুবই গুরুত্বপূর্ণ।     

যদি শারীয়াহ বলতে আমরা ‘শা-রা-আ’ শব্দধাতু থেকে অর্থটি গ্রহণ করি, যার মানে হচ্ছে স্রেফ ‘আইন প্রতিষ্ঠা’, তাহলে এই ধারণাটির বিশালত্ব বোঝা কঠিন হয়ে যায়। এর চেয়ে বরং শব্দটির মৌলিক এবং সাধারণ অর্থ – ‘বসন্তের দিকে চলমান পথ’ গ্রহণ করা হলেই এর সামগ্রিকতার প্রতি সুবিচার করা হয়। আমরা দেখিয়েছি যে, ইসলামী টার্মিনোলজী বা শব্দগুলোর ব্যাখ্যা সবসময়ই একটি নির্দিষ্ট ধারায় প্রতিফলিত হয়, যা আমাদের মনুষ্যত্বকে সংজ্ঞায়িত করে, এবং আল্লাহর সাথে আমাদের সম্পর্কের  জায়গাটা ওহীর মাধ্যমে নির্দিষ্ট করে স্রষ্টার সাথে সৃষ্টির যোগাযোগ তৈরি করে দেয়। এই নির্দিষ্ট ধারাটি মুসলিম মানসের জন্য সার্বজনীন, এবং কিছু সুনির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর তা নির্ভর করে, যথাঃ আল্লাহ, মানুষের চরিত্র (যা আমাদের সত্যিকারের ‘মানুষ’ করে তোলে এবং আমাদের জীবনে আল্লাহর প্রয়োজনকে স্বীকৃতি দেয়), যুক্তি (যেটা সক্রিয় এবং বিনয়ের চাঁদরে মোড়া) এবং সবশেষে অবশ্যই ঐশী বাণী, যা আমাদের জ্ঞানকে সঠিক  পথনির্দেশক হয়ে উঠতে সাহায্য করে। 

ঠিক যে ভাবে ‘শাহাদা’ শব্দটি ব্যক্তিগত পর্যায়ে অসীম সত্তার প্রতি সমর্পণকে বোঝায়, (আদতে যার অর্থ আসলে নিজের প্রতিই ফিরে আসা, সেই নিজ আত্নার প্রতি যা আল্লাহ আমাদের মাঝে ফুঁকে দিয়েছিলেন), ঠিক সেভাবেই শারীয়াহ হচ্ছে অসীম সত্তার প্রতি একক এবং দলগতভাবে আত্নসমর্পণের নাম, যার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা সম্ভব হয়। সহজভাবে বলতে গেলে, ‘শাহাদা’ হচ্ছে মুসলিম হয়ে যাওয়া, আর ‘শারীয়াহ’ হচ্ছে কিভাবে মুসলিম হয়ে যাওয়া যায়, এবং কিভাবে মুসলিম থাকা যায় তার এক চলমান প্রক্রিয়া। আমরা যদি একে আরও একটু বিস্তৃতভাবে ব্যাখ্যা করতে যাই, তাহলে বলতে হবে যে শারীয়াহ’র মানে শুধু ইসলামের সার্বজনীন নীতিমালাই নয়, বরং এটি হচ্ছে ইসলামের কাঠামো এবং চেতনা, যা মানবতার ইতিহাসে ইসলামকে বিশুদ্ধভাবে ফুটিয়ে তোলে। শারীয়াহ’র অর্থই হচ্ছে সময়ের সীমাবদ্ধতাকে ছাড়িয়ে গিয়ে অসীম সত্তার সাথে আমাদের সম্পর্ক সৃষ্টিকারী একটি সুনির্দিষ্ট পথ। জ্ঞানের এই ধারাটিই আজকের উত্তরাধুনিক মননের ‘সকল কিছুই সাময়িক’ – সিদ্ধান্তটিকে বাতিল করে দিয়ে দেখিয়ে দেয় এক অসীম সার্বজনীন সত্তার অস্তিত্ব, যা হচ্ছেন শুধুমাত্র এক আল্লাহ, যিনি আমাদের এমন কিছু চিরস্থায়ী বিধানাবলী দিয়েছেন, যা ‘সাময়িক বা নমনীয় ধ্যান ধারণা’র বিপরীতমুখী পাকেচক্রে পড়ে গুলিয়ে যায় না, আবার যুক্তির সক্রিয় এবং কৌশলী অনুশীলনকেও কখনও বাঁধা দেয় না।            

অনেক বিজ্ঞজনই ইসলামের এই সার্বজনীন বিশালত্বকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করেন। এর ফলে তারা মনে করেন, মুসলমানদের উচিত বহুমাত্রিকতা (প্লুরালিজম) মেনে নিয়ে, তাদের বিশ্বাসের বহিঃপ্রকাশটুকু একেবারে ব্যক্তিগত পর্যায়ে রেখে, এমনকি ‘সংখ্যালঘু’ হিসেবে দাবী তুলে সেই বাতাবরণের আড়ালে নিজেদের সুরক্ষিত রাখা। অপরদিকে দেখুন,  ‘সার্বজনীন পশ্চিমা মূল্যবোধ’ এর ওপর অটুট বিশ্বাস অথবা উদার মানসিকতা প্রমাণের জন্য পশ্চিমা মনন কি চায়? ‘যুক্তির প্রাধাণ্য এবং শ্রেষ্ঠত্বের ওপর বিশ্বাস’; অথবা, ইদানিংকালের ফ্যাশন হিসেবে অতিদুর্বল সুফিজমের একটি অ্যাপোলোজেটিক রূপ, যার সাথে ইসলামের সম্পর্ক খুবই ঝাপসা; অথবা, ক্রমাগত কালিমা লেপন এবং চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে মুসলমানদের এমনভাবে কোণঠাসা করে রাখা, যেন তারা ‘সংখ্যালঘু’ হিসেবে কোনভাবে টিকে থাকার রক্ষণাত্নক লড়াই ছাড়া আর কিছুই ভাবতে না পারে। তাহলে ইসলাম এবং মুসলিমদের যে স্বাতন্ত্র্য, সেটি কোথায় যাবে? অবস্থা এমন পর্যায়ে এসেই দাঁড়িয়েছে যে, ইসলামের ‘কল্যাণমূলক সম্প্রসারণবাদী’ সার্বজনীন রূপটিকে মোকাবেলা করবার জন্য এখন হয় ইসলামকেই প্রত্যাখ্যান করতে হবে, অথবা মুসলিমদের যে কোন ভাবেই হোক এই সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে ‘নমনীয়’ভাবে চলতে হবে।             

এখন, এক দিকে যেমন কিছু মুসলিম বুদ্ধিজীবি এই চাপিয়ে দেয়া গেম-রুল গুলো মেনে নিয়েছেন, তেমনি আবার অন্য অনেকে ঢালাওভাবে পশ্চিমা বিরোধিতার অংশ হিসেবেই এর বিরোধিতা করেছেন/ করছেন শুধু এই কারণে যে, তারা খোদাদ্রোহী, অথবা তাদের যাবতীয় সব কর্মকাণ্ডই প্রমিথিউস বা দেবতাদের (শয়তান নাই বা বললাম) অনুসরণ। এই দুই চরমপন্থী ধারার মধ্যেও এই বিতর্কটির গতিবিধি মধ্যপন্থায় চালিত করবার একটি রাস্তা আছে বলে আমি বিশ্বাস করি।       

মুসলিমেরা যদি এই ‘নমনীয়করণ’ প্রক্রিয়াকে তাদের বিশ্বাস এবং মূল্যবোধের সাথে সাংঘর্ষিক হবার কারণে প্রত্যাখ্যান করতে চায়, তাহলে তাদের দায়িত্ব হচ্ছে, এই মূল্যবোধ কিভাবে নমনীয়তা এবং মানবিক বৈচিত্র্যকে ধারণ করে আসছে, সেটিও পরিস্কার ভাবে দেখিয়ে দেওয়া। যদি এই ‘শারীয়াহ’, অর্থাৎ ঐশী বিশ্বস্ততার পথ নির্দেশক সত্যিকার অর্থেই ইসলামের সার্বজনীন বিশালত্বের যথাযথ চিত্রায়ন হয়ে থাকে, তাহলে আজকের দিনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে, ‘শারীয়াহ’ কিভাবে চিরস্থায়ী সত্য, যৌক্তিকতা, যুগ-কাল-সময়ের সাথে সাথে অগ্রগতি এবং সবচেয়ে বড় কথা, পারস্পরিক ভিন্নতার মত বিষয়গুলোকে কি কাঠামোতে ধারণ করেছে এবং কিভাবে প্রকাশ করেছে, এগুলো নিয়ে আলোচনা/ সংলাপ করা।

আরও গভীরে যদি যাই, এই  নমনীয়করণ প্রক্রিয়ার চাপ প্রত্যাখ্যান এবং ইসলামের মৌলিক নীতিমালাগুলোকে পশ্চিমের সামনে উপস্থাপন করবার ক্ষেত্রে আমাদের মননে যে উপলব্ধিটুকু থাকতে হবে সেটা হচ্ছে, এই কাজটি হবে দুই সভ্যতার মধ্যে বিশুদ্ধতম আলোচনার একমাত্র উপায়, যা আজকের দিনে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। বিশ্বায়নের এই যুগে পশ্চিমের হাতে আছে এক পূর্ণ ‘পশ্চিমায়িত’ বিশ্ব। সুতরাং পশ্চিমের সাথে অন্য কোন সভ্যতার কোন সংলাপে এই আশংকাটি মোটেও অমূলক নয়, যে সেই ‘সংলাপ’ হয়তো ‘একপাক্ষিক আলোচনা’ কিংবা কেবলই ‘বক্তৃতামূলক মিথস্ক্রিয়া’য় পর্যবাসিত হবে; কারণ অপর সভ্যতাটি ইতোমধ্যেই দুর্বল হতে হতে তাদের স্বাতন্ত্র্য শুধু নামেই বজায় রেখেছে, তাদের মূলধারা থেকে বিচ্যুত হয়েছে অথবা নিজেদের সমৃদ্ধ বৈচিত্র্যময়তার কথা ভুলে গিয়ে স্রেফ টিকে থাকবার আলোচনা করতে পেরেছে। একমাত্র মুসলিমদেরই এই যুক্তির লড়াইয়ে সমান শক্তি নিয়ে অংশ নেবার যোগ্যতা রয়েছে, আর তাই তাদের করা উচিত, যার মাধ্যমে এই বিতর্কের যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী খুঁজে নিয়ে তার সাথে আইডিয়া এবং আইডিয়ালস (চিন্তা-ধারণা এবং আদর্শের) এক সমৃদ্ধ এবং প্রয়োজনীয় লড়াইয়ে মুখোমুখী হতে পারে, যেটি এই সময়ের দাবী।