অনুবাদ

মানবিক উন্নয়ন অধ্যয়ন: পুঁজিবাদী সমাজতত্ত্বের আসন্ন সংকট
মানবিক উন্নয়ন অধ্যয়ন: পুঁজিবাদী সমাজতত্ত্বের আসন্ন সংকট
অনুবাদ করেছেন পাঠচক্র ডেস্ক
০৯ এপ্রিল ২০১৬

লেখকঃ মাহমুদ ধাওয়াদি, সমাজবিজ্ঞানী, তিউনিস বিশ্ববিদ্যালয়, তিউনিসিয়া।

অনুবাদঃ রাহনুমা সিদ্দিকা ও শিব্বির আহমদ

পুঁজিবাদী উন্নয়ন মডেল গুলো উন্নয়নের মানবিক বা আত্মিক (অবস্তুগত)উপাদান গুলোকে উপেক্ষা করে বস্তুবাদী বা জড়বাদী অর্থনৈতিক উন্নয়নকে একমাত্র লক্ষ্যমাত্রা স্থির করে নিয়েছে। যার ফলশ্রুতিতে, পুঁজিবাদ প্রভাবিত সমাজ বিজ্ঞানের এ ধারা অনুন্নত দেশগুলোতে উপনিবেশায়নের (colonization)  নেতিবাচক প্রভাবকে ব্যাখ্যা করতে পারে না। এ সংকট নেহায়েৎ আদর্শিক নয়, জ্ঞানতাত্ত্বিক ও বটে! পজিটিভ সমাজ বিজ্ঞানও (যা পুঁজিবাদের-ই একটি প্রশাখা- নীতিবাচকতার ঊর্ধে থেকে সমাজে যা ঘটছে তার বস্তুনিষ্ঠ ব্যাখ্যা করার দাবিদার) উপনিবেশায়িত সমাজের সাংস্কৃতিক, মনস্তাত্ত্বিক ও ভাষাগত অনুয়ন্নয়নের কোন যৌক্তিক ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে ব্যর্থ হয়েছে। উপনিবেশায়নের পুঁজিবাদী মডেলগুলোর সীমাবদ্ধতা আলোচনাপূর্বক লেখক এখানে একটি রূপরেখা প্রস্তাব করেছেন যা সমাজের উন্নয়ন/অনুন্নয়ন অধ্যয়নে উন্নয়নের অবস্তুগত বা আত্মিক ধারার (সাংস্কৃতিক, মনস্তাত্তিক, ভাষাগত ও বুদ্ধিভিত্তিক) বিশ্লেষণকে ও অন্তর্ভুক্ত করবে।  

 

 

তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়ন

বিগত তিন দশকে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর ‘উন্নয়নের অভিজ্ঞতা’ বেশ হতাশাজনক। অনুন্নয়নের প্রান্তিক উদাহরণ হিসেবে খরা, দুর্ভিক্ষ, গৃহযুদ্ধ, এইডস মহামারী কবলিত সোমালিয়া, ইথিওপিয়া, সুদানের মত আফ্রিকান দেশগুলো সারা দুনিয়ায় পরিচিতি লাভ করেছে।

আবার অন্যদিকে, কিছু উন্নয়নশীল দেশ যেমন- দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, ইন্দোনেশিয়া, হংকং, থাইল্যান্ড, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো বেশ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করেছে। এদের কোন কোনটি এশিয়ায় জাপানের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। তবে সামগ্রিক বিবেচনায় তৃতীয় বিশ্বের দেশ গুলোতে উন্নয়নের মাত্রা আশানুরূপ নয় বরং মোটের উপর ব্যর্থ।

 

ষাটের দশকে গোড়ার দিকে আফ্রিকা, এশিয়া, লাতিন আমেরিকার নবগঠিত দেশগুলো নিয়ে ডেভলপমেন্ট থিওরিস্টরা বেশ আশার বাণী শোনাচ্ছিলেন। অথচ এই ত্রিশ বছরে- সেইসব আশা বিভ্রমেই পরিনত হয়েছে! ঘন ঘন সরকার পরিবর্তন যা কিনা একসময় লাতিন আমেরিকান ফেনোমেনা মনে করা হত আমরা এখন দেখছি তা বিশ্বের বহু দেশে বিশেষ করে আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্রগুলোতে নিত্যদিনের ঘটনা। দ্রুত শিল্পায়ন ও প্রচুর বৈদেশিক সাহায্য থাকা সত্ত্বেও অনেক দেশে (যেমন- ব্রাজিল, সাউথ আফ্রিকা) অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার, সামাজিক সমতা এবং গনতান্ত্রিক অগ্রগতি হতাশাজনক। তৃতীয় বিশ্বের এই হতাশাজনক উন্নয়ন চিত্র উন্নয়ন তাত্ত্বিকদের বুদ্ধিবৃত্তির সংকটকেই ইংগিত করছে এবং এর একটা পূনর্মূল্যায়নের দাবি করছে।

 

পুঁজিবাদের প্রবল প্রতাপ

নিজ জন্মভূমিতে (সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন) সমাজতন্ত্রের পতন বিশ্বব্যাপী পশ্চিমা ধনতন্ত্রের কর্তৃত্বের পথ করে দিয়েছে। আমেরিকান স্কলার ফ্রান্সিস ফুকুয়ামার মতে- পশ্চিমা লিবারেল পুঁজিবাদী ব্যবস্থা ও গনতন্ত্র নিশ্চিতভাবেই কট্টরপন্থী সমাজতন্ত্রের উপর জয়ী হয়েছে। এবং সমাজতন্ত্রের পতনের পর বিশ্বে আর কোনো বৃহৎ আদর্শিক লড়াইয়ের অবকাশ রইলো না- তিনি একে অভিহিত করেছেন ‘ইতিহাসের অবসান’ (End of History) হিসেবে। আদর্শিক লড়াইয়ের অবসানের ফলে এককালের দুই পরাশক্তির মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধের সমাপ্তি ঘটলো। এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে পুঁজিবাদ ও গনতন্ত্র কেবল পূর্ব য়্যুরোপের সাবেক স্যোশালিস্ট দেশগুলোতেই নয়, উন্নয়নশীল তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতেও প্রভাব বিস্তার করতে থাকলো। উন্নয়নশীল দেশে পশ্চিমা গনতন্ত্রের সার্থকতা তর্ক সাপেক্ষ। উদাহরণ স্বরূপ- ১৯৯২ সালে, ইসলামিক সালভেশন ফ্রন্টের আসন্ন বিজয়ে ভীত হয়ে আলজেরিয় সরকার দ্বিতীয় পর্যায়ের নির্বাচন বাতিল করে দেয়। এটি কেবল একটি উদাহরণ মাত্র- এধরণের জঘন্য অগনতান্ত্রিক আচরণ নব্য স্বাধীন উন্নয়নশীল দেশগুলোতে নিয়মিত ঘটনা।

সবমিলিয়ে ‘সমাজতন্ত্রের পতন এবং পুঁজিবাদের বিজয়’ – এই বৈশ্বিক পরিবর্তন পুঁজিবাদ ও উন্নয়নের মধ্যকার সম্পর্কের পুনরালোচনা দাবী করে। দু’টো প্রশ্নের উত্তরের মাধ্যমে তা জানা যেতে পারে-

[১] পুঁজিবাদ কি সমাজের প্রকৃত প্রয়োজন মেটানোর সেরা ব্যবস্থা? 

 

[২] বর্তমান পশ্চিমা উন্নত বিশ্বের পুঁজিবাদী ব্যবস্থা কি স্বল্পোন্নত/ অনুন্নত দেশগুলোর জন্য একইভাবে প্রযোজ্য হবে? 

 

পুঁজিবাদ ও উন্নয়ন

এই লেখায় আমরা পুঁজিবাদ বলতে বোঝাচ্ছি- ইউরোপে সামন্তবাদের পতনের পর থেকে সমসাময়িক পশ্চিমা বিশ্বে উদ্ভাবিত প্রভাবশালী উদারনৈতিক আর্থ-সামাজিক পলিসি এবং গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সিস্টেমকে যা মূলত বেড়ে উঠেছে ফ্রান্স ও আমেরিকান বিপ্লবের হাত ধরে। প্রভাবশালী উন্নয়ন মডেল হিসেবে চার শতকের অধিককালের অভিজ্ঞতায় সিক্ত পুঁজিবাদের পূণর্মূল্যায়নের সময় এসেছে। জ্ঞান-বিজ্ঞান, তথ্যপ্রযুক্তি, শিল্প, জীবনযাত্রার মানের উন্নতি নিসন্দেহে পশ্চিমা পুঁজিবাদের বড় অর্জন। ম্যাকলুহানের ভাষায় গোটা বিশ্ব ‘ছোট্ট গ্রাম’ হতে পারত না এই জ্ঞান-বিজ্ঞান আর প্রযুক্তির উন্নতি না হলে। সম্প্রতি জাপান-ছাড়া বিজ্ঞান ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে কেউ পশ্চিমা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচিত হতে পারছে না। পশ্চিমা পুঁজিবাদের আরেক বড় অর্জন উদার গনতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া।

তেমনি মুদ্রার অপরপিঠে- ব্যাপক শিল্পায়নের ফলে কেবল পশ্চিমা সমাজেরই নয়- সারা বিশ্বেরই পরিবেশগত ভারসাম্য (ecological balance) মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। ক্রমাগত পরিবেশ দূষণের (বায়ু দূষণ, পানি দূষণ, বনাঞ্চল ধ্বংস) ফলে বিশ্ব ক্রমেই বসবাসের অনুপযুক্ত হয়ে যাচ্ছে। পশ্চিমা মোড়ল রাষ্ট্রগুলো দ্বারা আশঙ্কাজনক হারে নানান পারমানবিক ও জৈব-রাসায়নিক অস্ত্র-শস্ত্রের উদ্ভাবন, প্রয়োগ ও নানান পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফলে প্রকৃতি কলুষিত হচ্ছে। বিষাক্ত রাসায়নিক দ্রব্য মিশ্রিত দূষিত পানি ব্যবহারের ফলে আসন্ন স্বাস্থ্য ঝুঁকি এবং বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ঐসব দেশ গুলোতে এখন আলোচনার অন্যতম ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। ১৯৯২ সালে অনুষ্ঠিত ‘ধরিত্রী সম্মেলনে’ ও এ বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। পশ্চিমা বিশ্বের সামরিক শক্তির যথেচ্ছ ব্যবহার মানব জাতিকে অস্তিত্ত্বের সংকটে ঠেলে দিচ্ছে। হিরোসিমা-নাগাসাকি আজও পারমানবিক বোমার ক্ষতচিহ্ন বয়ে চলছে।

পশ্চিমা সামাজিক ব্যবস্থাও আদতে সুঠাম ও সুশৃঙ্খল নেই। অপরাধপ্রবণতা, আত্মহত্যা, তালাক, মাদকাসক্তি, এইডস, প্রিম্যারিটাল প্রেগন্যান্সি ইত্যাদি সামাজিক সমস্যার তীব্রতা সারা দুনিয়ার চেয়ে পশ্চিমা সমাজে অনেক বেশি। এসবই পুঁজিবাদ আর ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের ফসল।  

প্রকৃতপক্ষে, যখন কোনো সমাজ কেবল ‘বস্তুগত’ উন্নয়নের জন্য প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্যকে (nature’s ecological balance) ধ্বংস করে তখন সে সমাজের সামাজিক ভারসাম্য (social ecology) ও নষ্ট হয়ে যায় যা আমরা পশ্চিমা সমাজে আজ দেখতে পাচ্ছি। সুতরাং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও সমাজের ভারসাম্য রক্ষা দুই-ই সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এবং একটি আরেকটির উপর নির্ভরশীল। ১৯৯২ সালে অনুষ্ঠিত ধরিত্রী সম্মেলন টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রাকৃতিক পরিবেশের আসন্ন ক্ষতির ব্যাপারে সতর্ক করেছে।  

কিন্তু উন্নয়নের পুঁজিবাদী মডেল গুলো শুধুমাত্র বস্তুগত উন্নয়নকেই উন্নয়ন মনে করে এবং এর জন্য তারা প্রাকৃতিক সম্পদের যাচ্ছেতাই ব্যবহারকে দোষণীয় মনে করে না যতক্ষন পর্যন্ত সেখান থেকে অর্থনৈতিক/বস্তুগত উপযোগ আহরণ করা যায়। সেকারণেই ‘বস্তুবাদী’ জ্ঞানের শাখাগুলো –  মানবিকতা ও আধ্যাত্মিকতাকে পাশ কাটিয়ে কেবল বৈষয়িক ও তথাকথিত প্রায়োগিক দিকে গুরুত্বারোপ করেছে। প্রকৃতি এবং উন্নয়ন এসে দাঁড়িয়েছে মুখোমুখি অবস্থানে যেন একটির ক্ষতিসাধন বিনে অন্যটির সংরক্ষন সম্ভব নয়।  

বর্তমান পশ্চিমা সমাজের সাথে ইসলামী ব্যবস্থায় জ্ঞান-বিজ্ঞানের তুলনা করলে আমরা দেখি- ইসলামে জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার উদ্দেশ্য নেহায়েৎ প্রকৃতির আইনসমূহ ( Laws of the Nature) আবিষ্কার ও তার পার্থিব ব্যবহার নয়। ইসলামে জ্ঞানের চর্চা স্রষ্টার কাছাকাছি যাওয়ার ও পার্থিব ও পারলৌকিক মুক্তি অর্জনের উপায় হিসেবে বিবেচিত। কুর’আন বলে,

“তাঁর (আল্লাহর) বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই তাঁকে ভয় করে।” – (৩৫ :  ২৮)

ইসলামী ব্যবস্থায় জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা মানুষকে স্রষ্টা ও সৃষ্টির কাছাকাছি নিয়ে যায়; আর পশ্চিমা বস্তুবাদী বিজ্ঞান ঠিক তার উল্টোটা করে।

আমরা বলতে পারি, বর্তমান পশ্চিমা পুঁজিবাদী ব্যবস্থা বৈষয়িক জ্ঞানে উন্নতি লাভ করলেও মানবিক ও প্রাকৃতিক দিক থেকে তা অনুন্নত! গণতন্ত্র ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার জন্যই কেবল  পুঁজিবাদের প্রশংসা করা যায়। অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা অনেক ব্যয়বহুল কারন এটা বিপুল হারে প্রাকৃতিক সম্পদ খরচ করে, পরিবেশগত ভারসাম্যকে নষ্ট করে এবং বলা চলে গোটা পৃথিবীর অস্তিত্ত্বকেই বিপন্ন করে চলছে। এটা হচ্ছে একের ক্ষতি করে অন্যের উন্নতি করা যাকে গেইম থিওরীতে বলা হয় ‘জিরো সাম গেইম’।  অন্যদিকে সামাজিক ভারসাম্য ও ন্যায়বিচারের দিক থেকে চিন্তা করলে উন্নত পুঁজিবাদী সমাজ গুলোর অবস্থা খুবই হতাশাজনক। 

 

পশ্চিমা আধিপত্য : রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্য বিস্তার

পুঁজিবাদ তার জন্মভূমির সীমানা ছাড়িয়ে একটা কর্তৃত্ববাদী ও শক্তিশালী কর্তাবাবু হিসেবে আধিপত্য বিস্তার করেছে সারা দুনিয়াতেই। অনুন্নত বিশ্বের সাথে পুঁজিবাদের এই অসম সম্পর্ক তাকে অতিরিক্ত সুবিধা পেতে সহায়তা করেছে। উপনিবেশায়ন এবং অর্থনৈতিক শোষণের সবচেয়ে বড় ঘটনাটি ঘটেছে পশ্চিমা পুঁজিবাদী শক্তি গ্রেট ব্রিটেন এবং ফ্র্যান্স এর নেতৃত্বে, যা ছিল কল্পনাতীত।  একদিকে পুঁজিবাদী পশ্চিমা শক্তির যেনতেন প্রকারে সম্পদ কুক্ষিগত করার মোহ অন্যদিকে প্রাকৃতিক সম্পদের আধার উপনিবেশায়িত দূর্বল-রাষ্ট্র গুলোর শত্রু-রাষ্ট্র থেকে নিজেদের সম্পদের নিরাপত্তা বিধানের অপারগতা পুঁজিবাদকে পরিপুষ্ট করেছে। উপনিবেশন তাত্ত্বিকরা (dependency Theorists) সে কথাই বলছেন, পুঁজিবাদ উন্নতি করেছে তৃতীয় বিশ্বে সাম্রাজ্য বিস্তার করে। পুঁজিবাদী অর্থনীতি সবল হয়েছে দুর্বল রাষ্ট্রগুলোকে শোষণ করে।

রাজনৈতিক আধিপত্য : সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো তৃত্বীয় বিশ্বের দেশগুলোকে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল এবং পরনির্ভরশীল করে তোলে যাতে করে তারা স্বাধীনভাবে নিজেদের ব্যাপার গুলো সমাধান করতে না পারে। রাষ্ট্রিয় পলিসি, আইন, প্রতিরক্ষা সকল ক্ষেত্রেই দেশগুলোর স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকে নিঃশেষ করা হয়। শেষমেষ এরা রাজনৈতিকভাবে পশ্চিমা প্রভূদের কাছে নতজানু হয়েই থাকে।

মানসিক আধিপত্য:  নতজানু রাষ্ট্রের নিজেদের সমস্যা গুলো নিজেরা সমাধান বা পরিচালনা করতে না পারার কারনে তাদের মাঝে একধরনের হীনম্মন্যতার জন্ম নেয়। যা তার আচার-আচরণে বঞ্চণা, নির্ভরশীলতা ও অসহায়ত্বের প্রকাশ ঘটায়। এই হীনম্মন্যতা চুড়ান্তভাবে উপনিবেশায়িত সমাজের মানুষের সম্ভাবনার বিকাশকে থমকে দেয়, আত্ম-মর্যাদাহীন করে তোলে। রাষ্ট্র পরিচালনার উপযুক্ত মানব-সম্পদ গড়ে উঠতে পারে না এবং আরো নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।

অর্থনৈতিক আধিপত্য:  উপনিবেশন-ভিত্তিক গবেষণাগুলোতে দেখি, ভূতপূর্ব সাম্রাজ্যস্থাপনকারী দেশগুলোর শিল্পায়নের বড় হাতিয়ার ছিলো উপনিবেশগুলো থেকে আনা সস্তা কাঁচামাল ও শ্রমিক। তদুপরি, উপনিবেশগুলোতে উৎপাদিত কৃষিজাত পণ্যের বড় অংশই চলে যেত সাম্রাজ্যবিস্তারকারী শক্তির হাতে। আন্দ্রেই জি ফ্রাংক অধিকৃত দেশগুলোকে পশ্চিমা পুঁজিবাদের ‘উপগ্রহ’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি তৃত্বীয় বিশ্বের অনুন্নয়নকে এই ‘মেট্রোপলিস-স্যাটেলাইট কাঠামো’ ভিত্তিক সম্পর্কের ফল বলে উল্লেখ করেছেন; যে সম্পর্কটা স্যাটেলাইট (উপগ্রহ) থেকে অর্থনৈতিক উদ্বৃত্তকে মেট্রোপলিসের (সেন্টার বা নগরী) দিকে চালান দেয়ার একটা মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছে।

সাংস্কৃতিক আধিপত্য: ঔপনিবেশিক শক্তিরা কেবল অর্থনৈতিক/ রাজনৈতিক আধিপত্যই চাইতো না। তারা এমনভাবে পলিসি গ্রহণ করতো যাতে দখলকৃত দেশে তাদের সাংস্কৃতিক আধিপত্য কায়েম হয়। ফলে সংস্কৃতি অর্থাৎ ভাষা, শিক্ষা-ব্যবস্থা, বুদ্ধিবৃত্তি, ধর্ম, জ্ঞান-বিজ্ঞান, দর্শন, সামাজিক আচার ইত্যাদিতে সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিস্তার করে।

 

‘আদার আন্ডারডেভেলপমেন্ট’  (অনুন্নয়নের বিস্মৃত অধ্যায়)

মাইকেল হারিংটনের ‘আদার আমেরিকা’ টার্ম থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে আমরা একটি টার্ম ব্যবহার করছি- ‘আদার আন্ডারডেভেলপমেন্ট’। ‘আদার আমেরিকা’ শব্দটি দ্বারা বোঝানো হয়েছিলো- কালো, হিসপ্যানিক ইত্যাদি জনগোষ্ঠীকে – যারা শেতাঙ্গদের অবিচার ও অবহেলার শিকার হয়েছিলো। ‘আদার আন্ডারডেভেলপমেন্ট’/ ‘অনুন্নয়নের বিস্মৃত অধ্যায়’ বলতে আমরা মূলত তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নের সেসব দিককে বোঝাচ্ছি সাধারণত যেসবে পুঁজিবাদী সমাজবিজ্ঞানীরা গুরুত্বারোপ করেন না।

আদার আন্ডারডেভেপলমেন্টের দু’রকম হতে পারে - সাংস্কৃতিক ও মানসিক।

সাংস্কৃতিক ভাবে অনুন্নত তৃতীয় বিশ্বের দেশের তিনটি বৈশিষ্ট্য-

[১] এক/একাধিক বিদেশী ভাষার ব্যাপক প্রচলন। মৌখিক অথবা লৈখিক কিংবা উভয় রূপে নেটিভ ভাষার কম প্রয়োগ।

[২] জ্ঞান-বিজ্ঞানে পশ্চিমা সভ্যতার উপর বিপুল নির্ভরশীলতা। পশ্চিমা কারিকুলামে শিক্ষিত বুদ্ধিজীবী ও বৈজ্ঞানিক। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে নিজ দেশের অতীত অবদান সম্পর্কে কম ধারণা রাখা। 

[৩] পশ্চিমা প্রভাবে ক্রমশ নিজস্ব সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ হারানো।  

 

মানসিক অনুন্নয়ন দু’টি লক্ষণে বোঝা যেতে পারে-

[১] নিজস্ব সভ্যতা ও সংস্কৃতি নিয়ে হীনম্মন্যতাবোধে ভোগা। নিজস্ব সভ্যতার উপর আস্থা হারা্নো। পশ্চিমা সভ্যতাকে সুপিরিয়র মনে করা।

[২] আধুনিক পশ্চিমা কালচার ও ট্রাডিশনাল কালচারের মাঝে প্রবল দ্বন্দ্বের ফলে ডিসঅর্গানাইজড পারসোনালিটি তৈরি হওয়া।

নিচের টেবিল-১ এ অনুন্নয়নের প্রধান উপাদান গুলো এবং তাদের আন্তঃসম্পর্ক দেখানো হয়েছে।

 

tb

সাংস্কৃতিক প্রতীকসমূহ ব্যাখ্যায় সামাজিক বিজ্ঞান

 

এডওয়ার্ড টেইলরের ‘সংস্কৃতি’র সংজ্ঞানুযায়ী, ‘সামাজিক মানুষের জ্ঞান, বিশ্বাস, শিল্পকলা, আচার, নীতিবোধ, অভ্যাস সবকিছু মিলেই সংস্কৃতি।’ এগুলোই সাংস্কৃতিক প্রতীক। মানবসত্তার ব্যক্তিপরিচয় ও সামগ্রিক পরিচয় আসলে এই প্রতীকগুলোর উপরই নির্ভর করে।

তাই তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর ‘অনুন্নয়নের বিস্মৃত অধ্যায়গুলোর’ (Other Underdevelopment) ব্যাখ্যায় পুঁজিবাদ ও নয়া পুঁজিবাদ প্রভাবিত সামাজিক বিজ্ঞানের দীর্ঘ নীরবতা- বিজ্ঞান হিসেবে তার প্রয়োগযোগ্যতা ও উপযোগিতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। তৃতীয় বিশ্বের সমাজের সাংস্কৃতিক প্রতীকগুলোর প্রতি সমাজবিজ্ঞানীদের এমন অবহেলা/ নিরুৎসাহ ও পক্ষপাতদুষ্ট অবস্থানের দু’টো কারণ উল্লেখ করা হলো-

[১] পশ্চিমা গোষ্ঠীকেন্দ্রিকতার (Western Ethnocentrism) প্রভাব-  মূলধারার সামাজিক বিজ্ঞানে উন্নয়ন/ অনুন্নয়ন/ আধুনিকায়নকে কেবল পশ্চিমা দৃষ্টিকোন হতে দেখা হয়। তৃতীয় বিশ্বের অনুন্নয়নের কারণ হিসেবে উপনিবেশায়নের প্রভাবকে উপেক্ষা করে কেবল দেশগুলোর অভ্যন্তরীন উপাদানগুলোই যেমন - এদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যগুলোকেই দায়ী করেন। কেবল পশ্চিম-প্রভাবিত হওয়ার ফলে ঠিক কোন ডাইমেনশনে তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়ন/ অনুন্নয়কে অধ্যয়ন করতে হবে (সামাজিক, অর্থনৈতিক, মনো-সাংস্কৃতিক) তা নির্বাচনেও পক্ষপাতদুষ্টতা থাকে। ফলশ্রুতিতে ‘আদার আন্ডারডেভেলপমেন্ট’কে বিবেচনায়ই নেওয়া হয় না! 

 

[২]  জ্ঞানতাত্ত্বিক (Epistemological) সীমাবদ্ধতার প্রভাব-   পশ্চিমা পুঁজিবাদী ও সমাজতান্ত্রিক সমাজবিজ্ঞানীরা কেবল বস্তুগত ও সাংখ্যিক মানের ওপর নির্ভর করেছেন। আমরা দেখি- মার্ক্সবাদী সমাজবিজ্ঞানীরা তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর প্রতি পুঁজিবাদের অর্থনৈতিক বঞ্চনার উপর অসংখ্য একাডেমিক ও স্কলারলি কাজ করলেও পশ্চিমের সাংস্কৃতিক আধিপত্য ও বঞ্চনার দিকে তারা কমই নজর দিয়েছেন। মোটকথা, পুঁজিবাদী ও মার্ক্সবাদী উভয় ঘরানার সমাজবিজ্ঞানীরাই উন্নয়ন ও অনুন্নয়নের বৈষয়িক দিকে জোর দিয়েছেন। তাদের আলোচনায় বিস্মৃত হয়েছে মানবিক উন্নয়ন।

 

সাংস্কৃতিক নির্ভরশীলতাই সর্বাপেক্ষা ভয়াবহ  

সাংস্কৃতিক প্রতীকগুলো আমলে নেওয়া জরুরী এজন্য যে- সামরিক যুদ্ধে পরাজিত হওয়ার চাইতে সাংস্কৃতিকভাবে পরাজিত হওয়া বেশি ভয়ংকর। সাংস্কৃতিক নির্ভরশীলতা মানে হলো- নিজস্ব শেকড় থেকে চ্যুত হয়ে অন্যকোনো সমাজের সংস্কৃতির প্রতি নির্ভরশীলতা। বর্তমান বিশ্বে আমেরিকান, ফরাসি, ইংরেজ সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্য প্রসারের একটি উদাহরণ হলো- এশিয়া আফ্রিকার দেশগুলোতে ইংরেজি ও ফরাসির ব্যাপক ব্যবহার। ফলে এই দেশগুলোতে নেটিভ ভাষা উন্নতি লাভ করতে পারে নি।

কলোনিয়াল শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীরা শিখছে পশ্চিমা ভাষা, ইতিহাস, দর্শন, ভূগোল এবং আইডিয়া। এই সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদের ফলে কলোনাইজড রাষ্ট্রগুলোর নিজস্ব পরিচয়, স্বাতন্ত্র্যবোধ, মূল্যবোধ দৃঢ় হতে পারে নি।

অগবার্নের সাংস্কৃতিক মন্থরতা  সংজ্ঞা  (Cultural Lag definition)

আমেরিকান সমাজবিজ্ঞানী অগবার্নের মতে, ‘সাংস্কৃতিক পরিবর্তন বস্তুগত পরিবর্তনের চেয়ে মন্থরগতিতে সাধিত হয়। ‘ আমরা অগবার্নের ‘সাংস্কৃতিক মন্থরতা’ সংজ্ঞাটির কার্যকারিতা পরীক্ষা করার অন্য আমাদের সাংস্কৃতিক প্রতীকগুলো সাহায্য নিতে পারি-

মানবজাতির প্রকৃত পরিচয় তাদের সাংস্কৃতিক-প্রতীকী পরিচয়েই নিহিত! আমরা দেখেছি সাংস্কৃতিক প্রতীকগুলো মূলত অবস্তুগত (মানসিক/ আধ্যাত্মিক) প্রতীক। এই আপাত-অপার্থিব ( Quasi-supernatural ) প্রতীকগুলোকে সহজে পরিবর্তন করা যায় না। এই ‘মন্থর’ পরিবর্তনের কারণ নিয়ে আধুনিক নৃতত্ত্ব ও সমাজবিজ্ঞান সম্প্রতি আলোচনা করা শুরু করেছে।  যা নিচের ছকে সংক্ষেপে দেখানো হলো-  

আমরা মনে করি- স্যোশাল অ্যাক্টরদের (সামাজিক মানব, রাজনৈতিক দল, ট্রেড য়্যুনিয়ন, সামাজিক সংগঠন/ প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি)  ভূমিকা ব্যাখ্যায় তাদের সাংস্কৃতিক প্রতীকসমূহ ও আধ্যাত্মিক/ মানবিক দিকগুলোকে অন্তর্ভূক্ত করলে বোঝা যাবে কেন সাংস্কৃতিক পরিবর্তন বস্তুগত পরিবর্তনের চেয়ে ধীর গতিতে হয়।

 

tbb

সামগ্রিক ব্যাখ্যামূলক সমাজতত্ত্বের (Verstehen Sociology) প্রয়োজন  

মূলধারার সমাজতত্ত্বে সাবজেক্টিভ মেথডোলজির প্রয়োগ একরকম বাতিল করে দেয়। ফলে তাদের ফোকাস হয় সমাজের বস্তুবাদী গঠন। তারা মানবিক দিক থেকে স্যোশাল অ্যাক্টরদের ভূমিকা ব্যাখ্যা করতে সমর্থ হন না।  

আমাদের পুরো আলোচনায় আমরা দেখাতে চেয়েছি-

মানুষ মূলত সাংস্কৃতিক-প্রতীকী (cultural symbolic) সত্তা। তাই ব্যক্তিমানব বা মানবিক-সমাজ অধ্যয়নে বস্তগত দিকের পাশাপাশি অবস্তুগত দিকগুলোর অর্থাৎ সাংস্কৃতিক প্রতীকগুলোর অন্তর্ভূক্তি প্রয়োজন।  আমরা এমন একটি সামগ্রিক ব্যাখ্যামূলক সমাজতত্ত্বের (Verstehen Sociology) গোড়াপত্তন চাচ্ছি যা কিনা বৃহত্তর অর্থে-  মানব সমাজের জটিল ধাঁধাসমূহের উত্তর খুঁজে বের করতে সক্ষম হবে।          

 

পাঠচক্র ডেস্ক